হাফসা বিনতে উমর

হাফসা বিনতে উমর – হাফসা বিনতে ওমর রা. আনুমানিক ৬০৫ খ্রিষ্টাব্দে জন্মগ্রহণ করেন। মক্কায় থাকা অবস্থায় তিনি মুসলমান হন। সে সময় তার বিয়ে হয় স্বামী খুনায়েস বিন হুযাফা রা. এর সাথে।

তিনি ছিলেন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের একজন সাহাবী। মদীনায় হিজরতের পর তিনি ইন্তিকাল করেন।

সে সময় উমর রা. এর মেয়ে হাফসা রা. বিধবা হয়ে পড়ে। যেহেতু তৎকালীন আরব সমাজে মেয়েদের বিধবা হলে কোনো অসুবিধা ছিল না, তাই তিনি বাবার বাড়িতে অবস্থান করতে থাকেন।

সে সময় বিধবাদের খুব তাড়াতাড়ি বিয়ে হয়ে যেত। এটাই ছিল সেখানকার রীতি ও নীতি।

বিখ্যাত সাহাবীদেরকে ওমর রা. এর প্রস্তাব – হাফসা বিনতে উমর

ওমর রা. তখন নবীজির অন্যতম সাহাবী ও জামাতা উসমান রা. এর নিকট গেলেন। এরপর তিনি তার মেয়ে হাফসার ব্যাপারে বিয়ের প্রস্তাব দিলেন।

তখন ওমর রা. উসমান রা. কে বললেন, তুমি চাইলে হাফসাকে আমি তোমার নিকট বিয়ে দিব। উসমান রা. এই প্রস্তাব পাওয়ার পর বললেন, আমি বিষয়টা নিয়ে ভেবে দেখবো।

এভাবে কিছুদিন অতিবাহিত হলো। এরপর একদিন উসমান রা. ওমর রা. এর নিকট আসলেন। তিনি বললেন, আমি এই মুহুর্তে বিয়ে করার ইচ্ছা করছি না।

উসমান রা. প্রস্তাব ফিরিয়ে নেয়ার পর ওমর রা. আবু বকর রা. এর নিকট গেলেন। আবু বকর রা. কে ও বললেন, আপনি চাইলে হাফসাকে আপনার সাথে বিয়ে দিব।

আবু বকর রা. তখন চুপ করে থাকলেন। কোনো উত্তর দেন নি। এতে ওমর রা. খুব কষ্ট পেলেন।

কারণ, এই দুই বিখ্যাত সাহাবীর সাথে সম্পর্ক আরো মজবুত হওয়ার জন্য আত্মীয়তার বন্ধন তৈরি করতে চেয়েছিলেন।

তবে উসমান রা. এর প্রস্তাব প্রত্যাখ্যানের চেয়ে আবু বকর রা. এর প্রস্তাব প্রত্যাখ্যানে উমর রা. বেশি কষ্ট পেয়েছিলেন।

রাসূল সা. এর হাফসার ব্যাপারে প্রস্তাব – হাফসা বিনতে উমর

এরপর একদিন রাসূল সা. এর ওমরের নিকট হাফসা রা. এর ব্যাপারে বিয়ের প্রস্তাব দিলেন।

ওমর রা. এতে এতটাই খুশী হয়েছিলেন যে, পূর্বের সমস্ত দুঃখ-কষ্ট ভুলে গেলেন।

পরে আবু বকর রা. এর সাথে ওমরের দেখা হলে আবু বকর বললেন, তুমি আমার সাথে হাফসার বিয়ের জন্য প্রস্তাব দিয়েছিলে।

কিন্তু আমি এর কোনো উত্তর দেই নি। সে জন্য হয়তো তুমি কষ্ট পেয়েছ? উমর রা. বললেন, হ্যাঁ। তখন আবু বকর রা. বললেন,

আমি রাসূল সা. কে হাফসার ব্যাপারে কথা বলতে শুনেছি। তাই আমি তোমার নিকট জবাব দেয়া থেকে বিরত ছিলাম।

আমি চাই নি যে, রাসূল সা. এর গোপনীয়তা প্রকাশ হয়ে যাক। যদি রাসূল সা. হাফসাকে বিয়ে করার সিদ্ধান্ত না নিতেন তাহলে আমি তাকে বিয়ে করে নিতাম।

স্ত্রীদের সাথে রাসূলের মনমালিন্য ও ওমর রা. এর প্রতিক্রিয়া

ওমর রা. তার মেয়ে হাফসাকে মাঝেমধ্যে উপদেশ দিতেন। একবার তিনি তার মেয়েকে বললেন,

তোমরা কি রাসূল সা. এর সাথে তর্ক করো?

হাফসা রা. বললেন, হ্যাঁ। ওমর রা. তখন বললেন, যারা এমন করে তারা সকলেই ভুল পথে আছে।

তোমার কি মনে হয় না,

রাসূল সা. যার উপর রাগ করেন আল্লাহও তার উপর রাগ করেন। খবরদার, তুমি রাসূল সা. এর সাথে তর্ক করবে না।

আর তার নিকট বেশি কিছু চাইবে না। আর তোমার প্রতিবেশী আয়েশা তোমার চেয়ে বেশি সুন্দরী এবং রাসূলের প্রিয় বলে মন খারাপ করবে না।

ওমর রা. এর একজন প্রতিবেশী ছিল। সে আর ওমর রা. পালাক্রমে নবীজির নিকট হাদীস শুনতে যেতেন। একবার সে সন্ধাবেলা ওমর রা. এর দরজা ডাক্কাতে ডাক্কাতে বললো,

সর্বনাশ হয়ে গেছে। ওমর রা. অবাক হয়ে বললেন, কি হয়েছে? গাসসানীরা হামলা করেছে নাকি?

তখন উক্ত প্রতিবেশী বললো, এর থেকেও বড় সর্বনাশ হয়েছে। রাসূল সা. তার সকল স্ত্রীদের তালাক দিয়েছেন।

ওমর রা. তখন মাটিতে বসে পড়ে বললেন, হাফসা শেষ। আমি জানতাম এমন কিছু একটা হবে।

ওমর রা. এর অস্থিরতা

ফজরের নামাজ পড়েই ওমর রা. তার মেয়ে হাফসার নিকট গেলেন। ঘরে প্রবেশ করে দেখেন, হাফসা রা. ফুঁপিয়ে ‍ফুঁপিয়ে কাঁদছে।

তাকে ওমর রা. জিজ্ঞাসা করলেন, রাসূল সা. কি তোমাকে তালাক দিয়েছেন? হাফসা রা. বললেন, আমি জানি না। তিনি পাশের একটি ঘরে আছেন।

ওমর রা. তখন রাসূলের খাদেমের নিকট গিয়ে বললেন, গিয়ে বলো যে ওমর দেখা করতে এসেছেন।

খাদেম ফিরে এসে বললো, আমি আপনার নাম বলেছি। তিনি কিছু বলেন নি। ওমর রা. তখন মসজিদে নববীতে প্রবেশ করলেন।

সেখানে লোক জড়ো হয়ে আছে। কেউ কেউ রোনাজারি করছিল। ওমর রা. সেখানে কিছুক্ষণ বসে থাকলেন।

এরপর আবার রাসূলের নিকট গিয়ে অনুমতি চাইলেন।

এবারও খাদেম পূর্বের ন্যায় উত্তর দিল। উমর রা. তখন চলে যাচ্ছিলেন এমন সময় খাদেম পেছন থেকে ডাক দিল। বললো, রাসূল আপনাকে ডেকেছেন।

ওমর রা. ভেতরে প্রবেশ করে বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আপনি কি স্ত্রীদের তালাক দিয়েছেন?

নবীজি মাথা তুলে বললেন, না। ওমর রা. তখন আল্লাহু আকবার বলে উঠলেন। এরপর বললেন, হে আল্লাহর রাসূল!

আমরা কুরাইশ নারীদের উপর কর্তৃত্ব করতাম। কিন্তু মদীনায় এসে দেখি নারীরা পুরুষদের উপর কর্তৃত্ব করে। আমাদের মেয়েরাও এসব শিখেছে।

আমি একবার আমার স্ত্রীর সাথে রাগারাগি করছি। একটু পর সেও আমার সাথে পাল্টা রাগারাগি করতে লাগলো। আমি বিরক্ত হচ্ছিলাম দেখে সে বললো,

আমার তর্ক করা দেখে আপনার ভালো লাগছে না, তাই না? নবীর স্ত্রীরা তো তার সাথেও তর্ক করে। একজন তো রাতের আগে সামনেই আসেন না?

আমি তখন বললাম, যারা এমন করে তাদের ধ্বংস অনিবার্য। রাসূল যার উপর রাগ করেন, আল্লাহও তার উপর রাগ করেন।

রাসূল সা. তখন এই কথা শুনে হাসতে লাগলেন। ওমর রা. বলেন, আল্লাহর কসম! আমি সেই ঘরে তিন টুকরো কাঁচা চামড়া ব্যতিত আর কিছু ছিল না।

হাফসা বিনতে উমর রা. এর ইন্তিকাল

হযরত হাফসা রা. ৪৫ হিজরীর শাবান মাসে মদীনায় ইন্তিকাল করেন। তাকে জান্নাতুল বাকীতে দাফন করা হয়।

তথ্যসুত্র

জীবন ও কর্ম: ওমর রা.। পৃষ্ঠা ১২৫-১২৯

আরো পড়ুন

এতিমের অধিকার সম্পর্কে কুরআন কি বলে

বীমা কাকে বলে এবং বীমা কেন অপ্রয়োজনীয়

হুদাইবিয়ার দিন ওমর রা. এর অস্থিরতা

ইসলাম গ্রহণের পূর্বে ওমর রা. কেমন ছিলেন

অসহায় সাহাবীদের উপর জুলুম নির্যাতন

বাহ্যিক লিংক থেকে পড়ুন

নাস্তিকদের প্রশ্নের জবাব: আল্লাহ কি মক্কার ৩৬০ মূর্তির একজন ছিলেন

উল্কা ও নক্ষত্রের ব্যাপারে কি কুরআনে ভুল তথ্য রয়েছে

আল্লাহ কেন শয়তান সৃষ্টি করলেন

বিশেষ দ্রষ্টব্য: আমাদের লেখাগুলো সূচিপত্র অনুযায়ী দেখুন www.subject.arhasan.com এই ওয়েবসাইটে। আমরা কোন প্রকাশনীর বই রেফারেন্স হিসেবে ব্যবহার করি তা জানতে ভিজিট করুন www.arhasan.com/book এই ওয়েবসাইটে। আমাদেরকে গুগল নিউজে ফলো করতে পারেন এই লিংক থেকে। আমাদের ইউটিউব চ্যানেল ভিজিট করুন এই লিংক থেকে। এই লেখার লেখক সম্পর্কে আরো জানুন এই লিংক থেকে

আমি একজন ইসলামিক আলোচক, লেখক। ছোটবেলায় পড়ালেখা করেছি কওমী মাদ্রাসায়। পরবর্তীতে সাইন্স বিভাগ থেকে এসএসসি পরীক্ষা দিয়ে কৃতিত্বের সাথে পাশ করি। বর্তমানে আমি ডিপ্লোমা ইন মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং এ অধ্যায়নরত। অবসরে আমি বই পড়তে পছন্দ করি। নতুন কিছু শিখতে, নতুন কিছু জানতে ভালোবাসি। আমার ইচ্ছা, ভালো মানুষ হয়ে সমাজকে সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজে বিরত রাখার চেষ্টা করা।

https://www.arhasan.com