নবীজির জন্ম তারিখ

নবীজির জন্ম তারিখ – মুহাম্মাদ মুস্তফা সা. ছিলেন আমাদের আমাদের আদর্শ। পৃথিবীর সবচেয়ে স্মার্ট ও সবচেয়ে উত্তম চরিত্রের অধিকারী ব্যক্তির নাম মুহাম্মাদ মুস্তফা সা.। পৃথিবী যখন ঘোর অন্ধকারে নিমজ্জিত ছিল, মানুষ অসহায়রুপে নিজেদের আবিষ্কার করছিল তখনই মুহাম্মাদ সা. জন্মগ্রহণ করেন আরবের সম্রান্ত এক পরিবারে।

নবীজির জন্ম

জন্ম

রাসূলের জন্মতারিখ নিয়ে রয়েছে ঐতিহাসিকদের মধ্যে অনেক মতভেদ। রয়েছে মতপার্থক্য। এই মতপার্থক্য ঘটার কয়েকটি কারণ রয়েছে। যেমন:

তৎকালীন সময়ে মানুষ বছর গণনা করতো চন্দ্র হিসেব করে। কিন্তু মক্কার চন্দ্র হিসাব ছিল এক রকম আবার মদিনার চন্দ্র হিসাব ছিল অন্যরকম।

মানুষ ফসল উৎপাদনের জন্য প্রাচীনকাল থেকেই সৌর বছরের উপর নির্ভরশীল। কারণ, চন্দ্র হিসেবে ফসল উৎপাদন করলে সম্পদের ক্ষতির আশংকা থাকে।

আমরা একে একে সবগুলো বর্ণনাই ইতিহাসের গ্রন্থগুলো থেকে এখানে উল্লেখ করবো। তবে আগে থেকেই একটা কথা বলে রাখা উচিৎ বলে মনে করছি, নবীজির জন্মতারিখ হলো এমন একটি বিষয়, আপনি যদি তা না মানেন তাহলে এতে আপনার কোনো গুনাহ হবে না অথবা কোনো আকিদাগত সমস্যা হবে না।

বিখ্যাত সীরাত গ্রন্থ ও রাবেতা আল ইসলামিয়ায় প্রথম স্থান অধিকারী “আর রাহিকুল মাখতুম” গ্রন্থে উল্লেখ রয়েছে,

রাসূল সা. মক্কায় বনু হাশেমে ৯ রবিউল আউয়াল রোজ সোমবার জন্মগ্রহণ করেন। আর সেই বছরেই হাতির যুদ্ধ বা হস্তি যুদ্ধ সংগঠিত হয়েছিল।

নবীজির জন্মতারিখকে ইংরেজি হিসেবে ধরলে ৫৭১ খৃষ্টাব্দের ২০ বা ২২ তারিখে মুহাম্মাদ সা. এর জন্ম হয়।

বিখ্যাত মুসলিম ইতিহাস গ্রন্থ “আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া” কিতাবে এই সম্পর্কে যত বর্ণনা রয়েছে, সেগুলো সবই উল্লেখ করার চেষ্টা করা হয়েছে।

সোমবার জন্ম

রাসূল সা. সোমবার দিন জন্মগহণ করেন, এ বিষয়ে প্রায় সবাই একমত। কিন্তু সমস্যা শুরু হয় যখন তারিখ হিসেব করা শুরু করে।

সহীহ মুসলিমে বর্ণিত আছে, আবু কাতাদা রা. বর্ণনা করেছেন যে, এক বেদুইন জিজ্ঞাসা কররো, ইয়া রাসূল্লাল্লাহ! সোমবার দিনের রোযা সম্পর্কে আপনি কি বলেন? জবাবে রাসূল বলেছেন, “ঐ দিনেই তো আমার জন্ম এবং ঐ দিনেই আমার উপর ওহী অবতীর্ণ হয়।”

আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর রা. ইবনে আব্বাস থেকে বর্ণনা করেছেন যে, রাসূল সা. সোমবারে জন্মগ্রহণ করেছেন এবং সোমবারেই ইন্তিকাল করেছেন।

সুতরাং সোমবার নিয়ে আমাদের আর কোনো দ্বিমত নেই।

এখন কথা হলো কোন মাসে জন্মগ্রহণ করেছেন?

প্রসিদ্ধ ও সর্বসম্মতিক্রমে সিদ্ধান্ত হলো, রবিউল আউয়াল মাসে নবীজি জন্মগ্রহণ করেছেন।

রবিউল আউয়ালের এক তারিখ

ইমাম ফাকিহী নিজের সনদে ইবনে আব্বাস থেকে বর্ণনা করেছেন, নবীজির জন্ম-মৃত্যু উভয়টাই হয়েছে ১ তারিখে। কিন্তু এই রেওয়ায়েতটি যায়িফ।

মুসলিম উম্মাহর ইতিহাস। খণ্ড ১। পৃষ্ঠা ২৫৪

রেফারেন্স অনুযায়ী,

মিযানুল ইতিদাল। খণ্ড ৪। পৃষ্ঠা ১১৪

রবিউল আউয়ালের দুই তারিখ

ইবনে আব্দুল বার রহ. তার ইসতিয়াব গ্রন্থে রবিউল আউয়ালের ২ তারিখে জন্মগ্রহণ করেছেন বলে উল্লেখ করেছেন। ওয়াকিদী রহ. বর্ণনার ক্ষেত্রে ২ তারিখ বর্ণনা করেছেন।

রবিউল আউয়ালের আট তারিখ

হুমাইদী ইবনে হাযম ৮ তারিখের কথা উল্লেখ করেছেন। মালিক, আকীল ও ইউনুস ইবনে ইয়াযীদ তারাও ৮ তারিখের কথা উল্লেখ করেছেন। ইবনে আব্দুল বার রহ. বলেছেন, এই মতটি সঠিক।

হাফিয মুহাম্মাদ ইবনে মুসা আল খাওয়অরেযমী এই অভিমতটি অকাট্য বলে দাবী করেছেন।

ইবনে জাওযী রহ. নিজের সনদে মুহাম্মাদ বিন আহমাদ আলবারা থেকে নবীজির জন্ম ৮ তারিখ বলে সাব্যস্ত করেছেন।এই বর্ণনা বা বর্ণনার সনদটি মুনকাতি।

প্রখ্যাত জ্যোতির্বিদ আল্লামা ইবনে কুনফুজ রহ. ৮ তারিখকে প্রাধান্য দিয়ে লিখেছেন, অধিকাংশ ব্যক্তিরাই আট তারিখকে বিশুদ্ধ বলেছেন।

 রবিউল আউয়ালের বারো তারিখ

ইবনে হিশাম রহ.  মুহাম্মাদ ইবনে ইসহাক রহ. থেকে বর্ণনা করেন যে, রাসূল সা. হস্তীবর্ষের ১২ রবিউল আউয়াল সোমবার জন্মগ্রহণ করেন।

প্রসিদ্ধ গ্রন্থ অনুযায়ী, নবীজির জন্ম বারো তারিখে নয়। বরং ৮ বা ৯ তারিখে।

বিস্তারিত জানেত পড়ুন।

মুসলিম উম্মাহর ইতিহাস।

আর রাহিকুল মাখতুম।

রমজানের বারো তারিখ

হাফেজ ইবনে কাসির রহ. জুবায়ের বিন বাক্কা রহ. এর সুত্রে একটি বক্তব্য উল্লেখ করেছেন, যার দ্বারা মা আমিনার গর্ভধারণ শুরু হয়েছে আইয়ামে তাশরিকে। নয়মাস গর্ভধারণ সমাপ্ত হয়ে রমজান মাসে নবীজি জন্মগ্রহণ করেন। দিনটি ছিল ১২ রমজান।

যুবায়ের ইবনে বাক্কা রহ. একজন সিকাহ্ রাবী। তিনি হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে যুবায়ের রা. এর বংশধর। এখন কথা হলো, রমজান মাস কেন উল্লেখ করা হলো? তৎকালীন আরবে চন্দ্রবর্ষ হিসেবের জন্য কয়েকটা ক্যালেন্ডার ছিল।

একটা ক্যালেন্ডার মক্কার ব্যক্তিরা ব্যবহার করতো। তাই সেটাকে বলা হয়, মক্কী ক্যালেন্ডার

অন্য আরেকটা ইয়াসরিব তথা মদীনার অধিবাসীরা ব্যবহার করতো। তাকে বলা হতো, মাদানী ক্যালেন্ডার।

উপরোক্ত দুইটি ক্যালেন্ডারেই মাস নির্ধারণের ক্ষেত্রে পার্থক্য রয়েছে। তাই এখানে রমজান মাস দ্বারা মদীনার ক্যালেন্ডার উদ্দেশ্য। কিন্তু মক্কী ক্যালেন্ডার অনুযায়ী সে সময় রবিউল আউয়াল মাস ছিল।

তথ্যসুত্র

১. আর রাহিকুল মাখতুম। ছফিউর রহমান মোবারকপুরী। আল কোরআন একাডেমী লন্ডন, বাংলাদেশ সেন্টার। পৃষ্ঠা ৭১

২. আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া। হাফিজ ইবনে কাসীর রহ.। ইসলামিক ফাউন্ডেশন। খণ্ড ২। পৃষ্ঠা ৪৮২

মুসলিম উম্মাহর ইতিহাস। ইসমাইল রেহান। মাকতাবাতুল ইত্তিহাদ। খণ্ড ১। পৃষ্ঠা ২৫৪

৩. আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া। খণ্ড ২। পৃষ্ঠা ৪৮৩

৪. মুসলিম উম্মাহর ইতিহাস বইয়ের রেফারেন্স অনুযায়ী,

আল ‍মুনতাযাম। খণ্ড ২। পৃষ্ঠা ২৪৬

৫. মুসলিম উম্মাহর ইতিহাস বইয়ের রেফারেন্স অনুযায়ী,

উসিলাতুল ইসলাম। ‍পৃষ্ঠা ৪৪

৬. মুসলিম উম্মাহর ইতিহাস। পৃষ্ঠা ২৫২

মুসলিম উম্মাহর ইতিহাস বইয়ের রেফারেন্স অনুযায়ী,

সিরাতে ইবনে হিশাম। খণ্ড ১। পৃষ্ঠা ১৫৮

৭. মুসলিম উম্মাহর ইতিহাস। খণ্ড ১। পৃষ্ঠা ২৫৩

মুসলিম উম্মাহর ইতিহাস বইয়ের রেফারেন্স অনুযায়ী, আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া (আরবী)। খণ্ড ৩। পৃষ্ঠা ৩৭৬

আরো পড়ুন

আবু বকর রা. জন্ম

উসমান বিন আমের আবু কুহাফা রা.

সালমা বিনতে সাখর রা.

আমি একজন ইসলামিক আলোচক, লেখক। ছোটবেলায় পড়ালেখা করেছি কওমী মাদ্রাসায়। পরবর্তীতে সাইন্স বিভাগ থেকে এসএসসি পরীক্ষা দিয়ে কৃতিত্বের সাথে পাশ করি। বর্তমানে আমি ডিপ্লোমা ইন মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং এ অধ্যায়নরত। অবসরে আমি বই পড়তে পছন্দ করি। নতুন কিছু শিখতে, নতুন কিছু জানতে ভালোবাসি। আমার ইচ্ছা, ভালো মানুষ হয়ে সমাজকে সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজে বিরত রাখার চেষ্টা করা।

https://www.arhasan.com