আমরা ভালো মুসলিম – ব্যস্ততম শহরের পরতে পরতে মিশে আছে রক্ত ঝরানো ঘাম, পাখিদের কিচির-মিচির এবং মানুষের কোলাহল। সকলেই আশেপাশে থাকলেও মনে হয় যেন কোথাও কেউ নেই। নিস্তব্ধ, নীরব শহর। শহুরে পরিবারের ছোট্ট মেয়ে তাসফিয়া। সবেমাত্র ক্লাস ফাইভ পেরিয়েছে। পেটের দায়ে বাবা-মা দুইজনই কর্মক্ষেত্রে থাকেন সারাদিন। ছোট্ট তাসফিয়া বড়ো হচ্ছে দাদির কাছে। একাকী, নিঃসঙ্গভাবে। সারাদিন কাজ করে এসে সন্ধ্যার পর আর মেয়েকে সাথে নিয়ে গল্প করা হয় না তাশফিয়ার বাবা-মায়ের। মেয়ের জানতে চাওয়া উৎসুক মনের প্রশ্নের জবাব কয়টা দেওয়া যায়? কয় দিন এভাবে সহ্য করা যায়? বাবাকে কিছু জিজ্ঞেস করলেই তিনি তেঁতে ওঠেন।
সারাদিন খাটুনি শেষে শরীর বিধ্বস্ত এবং মেজাজ সপ্তাকাশে চড়ে আছে। ড্রয়িং রুমে অথবা বিছানায় মোবাইল ক্রলিং করেই তার অবসর অতিবাহিত হচ্ছে। মা সারাদিন কাজ করে এসে আবার ঘরে রান্নার কাজে ব্যস্ত। মেয়ের সাথে কথা বলার মতো এক চিলতে সময় পর্যন্ত নেই। বৃদ্ধার দাদির সাথে আর কতদিন এভাবে গল্প করা যায়? কিছুদিন পরে ছোট্ট তাশফিয়ার সাথে পরিচয় হলো পাশের বিল্ডিংয়ের আবিরের। ক্লাস এইট শেষ করে এখন নাইনে পড়ছে। পাশাপাশি থাকে বিধায় শুরু থেকেই আবিরের মা-বাবাকে চিনত তাশফিয়ার বাবা-মা। তাই স্রেফ খেলার সাথি বা গল্পের সাথি হিসেবেই ধরে নেয় তারা আবিরকে। আবিরের সাথে তাশফিয়ার ভাব এখন অনেক। কখনো কখনো আবির তাশফিয়াদের বাসায় চলে আসে। গল্প করে, খেলাধুলা করে।
কোনো এক বিমর্ষ বিকেল…..। আবির তাশফিয়াকে ঘুরতে নিয়ে যাওয়ার কথা বলে এলাকার শেষ মাথায় নতুন কাজ চলা বিল্ডিংটিতে নিয়ে গেল। সেখানে…..! ছোট্ট তাশফিয়ার শরীরে ক্ষুধার্ত নেকড়ের মতো ঝাঁপিয়ে পড়ল আবির। আতঙ্কে যখনই চিৎকার করতে যাবে তাসফিয়া তখনই আবির তার মাথায় ভারি ইট দিয়ে আঘাত করল। অজ্ঞান হয়ে যাওয়া ছোট্ট শরীরটিতে চলল পাশবিক নির্যাতন। সাথে যুক্ত ছিল আবিরের বখাটে বন্ধুরাও। একটি স্বপ্নের এখানেই ইতি!
বাস্তবতার ছলচাঁতুরি
উপর্যুক্ত ঘটনাটি কি বাস্তব? হতেও পারে, আবার না-ও হতে পারে। দেশে এমন ঘটনা যে একদম ঘটেনি, তা কিন্তু নয়। পত্রিকার পাতায়, নিউজ চ্যানেলের ফটো কার্ডে আমরা সর্বদাই এমন ধর্ষণের ঘটনা দেখি। এরপর আমাদের অনুভূতি কি হয়? আমরা ধর্ষকদের শাস্তি চাই। নির্মম শাস্তি। বিভিন্ন নিত্য নতুন পদ্ধতি বলি শাস্তির জন্য। কখনো কখনো রাস্তায় বের হয়ে প্রতিবাদও করি। অনলাইনে লেখালেখি, অ্যাক্টিভিজম করি। কট্টরপন্থি হিউম্যানিজম বিশ্বাসী না হলে সকলেই ধর্ষকদের মৃত্যুদণ্ড চায়। দুনিয়ার বাস্তবতায় এই চাওয়াটা অমূলক নয়। ইসলামী শরীয়াহ আইনেও ধর্ষকের শাস্তি মৃত্যুদণ্ড নির্ধারিত।[1]
জেনে অনেকেই খুশি হয় যে, শরীয়াহ শাস্তিও এই। বাংলাদেশে মাসখানেক আগে ঘর্ষণের অনেকগুলো ঘটনা একত্রে সামনে এসেছিল। তখন দেশের স্বনামধন্য স্কুলের ছাত্রীরা প্রতিবাদ জানিয়ে বলেছিল, আমরা শারীয়াহ ল’ চাই। এটা নিশ্চিত যে, তারা জেনে বুঝেই এ কথা বলেছিল। এজন্য তারা সাধুবাদ পাওয়া যোগ্য।
সমস্যাটি দেখা দেয় অন্য জায়গায়। আমরা যারা অন্যত্র ইসলামের শাস্তি খুঁজে বের করি, তারাই আবার কাফির-মুশরিকদের উপর সিম্প্যাথি রাখি। যেখানে ইসলাম বলছে, কাফির-মুশরিকরা চিরস্থায়ী জাহান্নামি। তাদের সাথে অন্তরঙ্গ সম্পর্ক রেখো না। সেখানে আরা কাফিরদের সাথে বন্ধুত্ব গড়ে তুলি। তখন আমরা ধর্মীয় বিভেদ ভুলে মানুষ হওয়ার স্লোগান তুলি। যখন বলা হয়, ব্যক্তিজীবন থেকে শুরু করে রাষ্ট্রীয় জীবন পর্যন্ত শরীয়াহ আইন বাস্তবায়ন করো তখন আমরা তাদেরই শত্রু মনে করা শুরু করি।
“রাষ্ট্র চালাতে ধর্মের কী প্রয়োজন? ধর্ম থাকবে শুধু মসজিদ-মাদরাসায়!” এমন চিন্তা আমরা লালন করি অন্তরে। আমরা মুসলিম। আমরা ভালো মুসলিম । আমরা ধর্ষকের শাস্তি মৃত্যুদণ্ড চাই, কিন্তু চোরের শাস্তি হাতকাটা চাই না। আমরা ডাকাতের শাস্তি মৃত্যুদণ্ড চাই, কিন্তু জিনা-ব্যভিচারের শাস্তি রজম বা বেত্রাঘাত চাই না। আমাদের নিকট তখন শরীয়াহ হয়ে যায় বর্বরদের কার্যপ্রণালি। এই সময় আমরা খুঁজি হিউম্যান রাইটস কি বলেছে? জাতিসংঘের চার্টারে কি লিপিবদ্ধ আছে?
গাজ্জায় মুসলমানদের হত্যা করলে হৃদয়ে রক্তক্ষরণ শুরু হয়, কিন্তু অন্য দেশে কোনো মুসলিম ইহুদিকে হত্যা করলে সেই ইহুদির জন্য মায়াকান্না করি। আমরা ইয়েমেনের বোমায় বিধ্বস্ত মসজিদ দেখলে কান্নায় ভেঙে পড়ি, কিন্তু মূল দোষী সৌদ সরকারের দিকে আঙুল তুললে তাকেই তুলাধুনা করি। কুকুরের বাচ্চাকে কেউ মেরে ফেললে আমরা তাকে শাস্তি দেওয়ার জন্য মায়াকান্না করি। কিন্তু মানুষের বাচ্চাকে মেরে ডাস্টবিনে ফেলে দিলে আমরা অন্যদিকে তাকিয়ে হাঁটা দিই। আমরা মুসলিম। আমরা ভালো মুসলিম । আল্লাহ ও নবীজি ﷺ ছাড়া দুনিয়ার সকলের কাছে আমরা দায়বদ্ধ!
[1] الاغتصاب لا يخلو من عقوبة شرعية । معاقبة مغتصب الأطفال بالإخصاء الكيميائي؟