যুদ্ধকৌশলে ৭ অক্টোবর – ২০২৩ সালের স্বরণীয় একটি দিন। তুফানুল আকসা। ঝটিকা আক্রমণের মাধ্যমেই শুরু হয় এই শতকের অন্যতম বড় এবং গুরুত্বপূর্ণ সংঘাত।
আল কাসসাম ব্রিগেডের যোদ্ধারা বহু জায়োনিস্ট সৈন্যকে জাহান্নামে পাঠায় এবং অনেককেই জিম্মি করে। যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই উম্মাহ দুইভাগে বিভক্ত হয়।
কেউ এই যুদ্ধ সূচনার মাধ্যমে এটিকে এক মহান কাজ বলে অবহিত করছেন। বিপরীতে কেউ এই আক্রমণকে স্বেচ্ছায় আগুনে ঝাঁপ দেওয়া মনে করছেন।
আমরা এটা নিয়েই খানিকটা পর্যালোচনা করবো ইনশাআল্লাহ। আসলে কোনটি সঠিক?
যুদ্ধকৌশলে কি গুরুত্বপূর্ণ?
এককালের ঢাল-তলোয়ার, কামান এবং দুর্গ অবরোধ সিস্টেম পরিবর্তন হয়ে এখন যুদ্ধক্ষেত্রে আকাশযুদ্ধ, নৌ-যুদ্ধ এবং স্থলযুদ্ধ শামিল হয়েছে।
যুদ্ধকৌশলেও তাই এসেছে পরিবর্তন। মানুষ শতাব্দীর পর শতাব্দী অভ্যস্ত ছিল সম্মুখ যুদ্ধে।
কিন্তু গত শতাব্দীর শুরুতেই এই সমীকরণ পাল্টিয়ে গেল ফ্লাইং প্রযুক্তি ও আরো বিভিন্ন কারণে।
নতুন একটি জিনিষ সামনে আসে। তা হলো, গেরিলা আক্রমণ। পূর্বেরকালে এটি কখনোই যুদ্ধের মূল স্ট্যাটিজি ছিল না। বরং এটি ছিল যুদ্ধসূচনার প্রথম ধাপ।
কিন্তু বর্তমানে গেরিলা যুদ্ধ একটি স্বতন্ত্র যুদ্ধক্ষেত্র। চেচনিয়া থেকে মরক্কো, সর্বত্রই এই কৌশলের মাধ্যমে জয় পদচুম্বন করছে।
গেরিলা আক্রমণে এক পক্ষ হঠাৎ আসে, ঝটিকা আক্রমণ করে, আবার গায়েব হয়ে যায়। শত্রুপক্ষের সবচেয়ে বেশি ক্ষয়ক্ষতি হয় এই পদ্ধতিতে।
বিখ্যাত যুদ্ধবিষয়ক বই সানজুর লিখিত দ্য আর্ট অব ওয়ার এ উল্লেখ রয়েছে, যে প্রথমে ময়দানে এসে শত্রুর জন্য অপেক্ষা করে, সে লড়াইয়ের জন্য থাকে তরতাজা। আর যে পরে আসে, সে লড়াইয়ে তাড়াহুড়ো করে এবং পরে ক্লান্ত ও বিধ্বস্ত হয়ে পড়ে।
এছাড়াও সানজু আরো বলেন, চতুর যোদ্ধারা নিজের ইচ্ছাকে চাপিয়ে দেয় শত্রুর উপর। কিন্তু শত্রুর ইচ্ছাকে নিজের উপর চাপতে দেয় না।
এবার ফিরে চলুন ৭ অক্টোবরে। ইসরাইলের বিরুদ্ধে কেন হামাস যুদ্ধ শুরু করলো? যুগের পর যুগ ধরে ইসরাইলের দখলদারিত্ব এবং নির্যাতনের কারণে।
প্রতি বছর অথবা দুই তিন বছর পর পরই ইসরাইল গাযায় যুদ্ধ বাধাতো।
পশ্চিম তীরে প্রতি বছরই সংঘর্ষ করতো। চেকপয়েন্টে মানুষকে অবরোধ করে রাখতো।
পুঞ্জিভূত এই ক্ষোভ একত্রে জমা হয়ে বিস্ফোরিত হয়েছে ৭ অক্টোবরে। যুদ্ধ শুরু করেছিল হামাস। আর এটিই যুদ্ধকৌশলের সর্বোত্তম সিদ্ধান্ত।
কারণ, হামাসের বড় একটি অংশই গেরিলা ইউনিটের সাথে যুদ্ধ। হামাস যোদ্ধারা ইসরাইলকে প্রলুদ্ধ করে, ইসরাইল সেই ফাঁদে পা দেয়।
গাযায় হামাস যোদ্ধারা থাকে সবচেয়ে সুবিধাজনক অবস্থানে। তা ট্যানেলে হোক আর ভূমিতে হোক। সানজু বলেন,
সবল দল নিজের সুবিধাজনক অবস্থানে থাকার কারণে শত্রুকে তার দিকে আসতে বাধ্য করে। অথবা শত্রুর প্রচুর ক্ষয়ক্ষতি করে শত্রুকে তার কাছে আসাটা করে দেয় অসম্ভব।
গেরিলা যুদ্ধজয়ের সাফল্য
এই পদ্ধতিতে বড় শক্তির বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে সহজেই বিজয় অর্জন করা সম্ভব ইনশাআল্লাহ। চেচনিয়ার প্রথম যুদ্ধ, আফগান যুদ্ধ এর সাক্ষী।
আর গেরিলা যুদ্ধের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হলো পাহাড়, গুহা, জঙ্গল, ঘন বন। যখন এসব পাওয়া যায় তখন তো আলহামদুলিল্লাহ।
কিন্তু যখন এসব পাওয়া না যায় তখন শেষ ভরসা ট্যানেল সিস্টেম। ট্যানেল সিস্টেম একটি আলাদা জগত, একটি আলাদা দুনিয়া।
গাযায় তুফানুল আকসা যুদ্ধে মুহাম্মাদ দেইফ এবং ইয়াহইয়া সিনওয়ারের1 ভূমিকা অপরিসীম। তাদের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় এই প্রতিরোধ আন্দোলন এখনও চলমান।
সর্বশেষ সানজুর একটি উক্তি দিয়ে শেষ করি। তুমি এমন জায়গায় সেনাবাহিনী নিয়ে আবির্ভূত হও, যেখানে শত্রু কেবল নিজেকে বাঁচাতেই ব্যস্ত থাকবে। দ্রুত এমন জায়গায় হাজির হও যেখানে শত্রুরা তোমার অবস্থানের কথা কল্পনাও করবে না।
- আল কাসসাম ব্রিগেডের মিলিটারি প্রধান এবং ইসমাইল হানিয়ার পর হামাসের প্রধান ইয়াহইয়া সিনওয়ার গত ১৭ অক্টোবর ২০২৪ তারিখ সম্মুখ যুদ্ধে শহীদ হয়েছেন। ইসরাইল কল্পনাও করতে পারে নি, সিনওয়ার গ্রাউন্ডে যুদ্ধ করবে! ↩︎