শরীয়াহ আদালত বনাম বাস্তবতা

শরীয়াহ আদালত বনাম বাস্তবতা – একজন মুসলিম যত বড় ফাসিক হোক না কেন, তার অন্তরের সুপ্ত বাসনা থাকে শরীয়াহ শাসন। শরীয়াহকে ঘৃণা করলে সে আর মুমিন থাকে না। সে আস্তে আস্তে কুফর ও রিদ্দাহর পথ বেছে নেয়।

আমাদের দেশ এবং এই বিশ্ব চলছে সেক্যুলার সিস্টেমে। এর ফলে দেশের আদালত গড়ে উঠেছে পাশ্চাত্যের আদলে।

যেখানে একটি মামলার নিষ্পত্তি হতে সময় লাগে কয়েক বছর।

২০২৪ সালের রিপোর্ট অনুযায়ী, “সারা দেশে প্রায় ৪৩ লাখ মামলা অমিমাংসিত হয়ে আছে। এই সংখ্যা প্রতি বছর বাড়ছেই।”

খুনের মামলার সমস্ত প্রমাণ থাকার পরও দোষী ব্যক্তি সাথে সাথে শাস্তি পায় না। অপেক্ষা করতে হয় মাসের পর মাস, বছরের পর বছর।

এমন সংকটময় মুহূর্তে অনেকেই বিভিন্ন সময় দেশের প্রচলিত আদালতের পাশাপাশি শরীয়াহ আদালত প্রতিষ্ঠার দাবি জানিয়েছেন।

যেমন কয়েক মাস আগে আন্দালিব রহমান পার্থ সাহেব বলেছিলেন এই বিষয়ে, ভিকারুন্নিসা স্কুলের ছাত্রীরাও একবার আন্দোলন করে শরীয়াহ আদালতের দাবি জানিয়েছিল, চরমোনাইয়ের ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশও বিভিন্ন সময় শরীয়াহ আদালতের দাবি জানিয়েছে।

তাদের এই সৎ নিয়ত অবশ্যই সাধুবাদ পাওয়ার যোগ্য। কিন্তু বাস্তবতার নিরিখে যদি আমরা এটি পর্যালোচনা করি তাহলে বেশ কিছু খুঁত বেরিয়ে আসে।

দ্বৈত শক্তির দ্বন্দ্ব

পৃথিবীর যেকোনো সিস্টেমের দুইটা ভার্সন একই সাথে চলতে পারে না। সামান্য একটি সফটওয়্যারের কথাই ধরুন।

আপনার নিকট যতই পূর্বের কোনো ভার্সন ভালো লাগুক না কেন, একই সাথে দুইটা ভার্সন মোবাইলে ইন্সটল করা অসম্ভব।

যেকোনো একটা ব্যবহার করতে হয়। যখন দেশের প্রচলিত সেক্যুলার আদালত এবং শরীয়াহ আদালত পাশাপাশি থাকবে তখন বাস্তবিক অর্থে শরীয়াহ আদালত হবে নখর বিহীন সিংহের ন্যায়।

যার প্রভাব সমাজে থাকলেও জৌলুস এবং স্বাধীনতা থাকবে না।

একই মামলায় কেউ চাইবে শরীয়াহ আদালতে ফয়সালা হোক, কেউ চাইবে রাষ্ট্রীয় আদালতে ফয়সালা হোক।

আবার শরীয়াহ আদালতে যখন চোরের হাত কাঁটা, ব্যভিচারের শাস্তি বেত্রাঘাত বা পাথর মেরে হত্যা, ধর্ষণ, ডাকাতি, সমকামিতার শাস্তি মৃত্যুদণ্ড বাস্তবায়ন করবে তখন রাষ্ট্র এতে বাধা দেবে। সেক্যুলার সরকার এই শাস্তি বাস্তবায়ন করতে দেবে না।

মুসলিমবিশ্বে শরীয়াহ শাসন

শরীয়াহ আদালত নবীজি ﷺ এর সময় থেকে খেলাফত ধ্বংস হওয়ার পর্যন্ত মুসলিমবিশ্বে বলবৎ ছিল। খলিফাদের উত্থান-পতনে দেশের শাসনব্যবস্থার উত্থান-পতন ঘটেছে।

কিন্তু শরীয়াহ শাসনে কোনো হেরফের হয়নি। যেকোনো খলিফা যত বড়ো ফাসিক হোক না কেন, সে আল্লাহর আইনের বিপরীতে নিজের আইন চাপানোর দুঃসাহস করেনি, নতুন করে আইন প্রণয়ন করেনি, যদিও সে শরীয়াহর উপর নিজের খেয়াল-খুশিকে প্রাধান্য দিয়েছিল।

মুসলিম সমাজে শরীয়াহ আদালত ছিল আপসহীন। কখনো কখনো স্বয়ং খলিফাকেও কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হতো।

অর্থব্যবস্থা চলমান ছিল জাকাত, জিজিয়া, উশর, খেরাজ ইত্যাদি দ্বারা। এটাই ছিল মুসলিম সমাজের আভিজাত্য।

পরবর্তী সময়ে তাতারিরা মুসলিমবিশ্বের সুবিশাল ভূখণ্ড দখল করে নিলে এবং বাগদাদের পতন ঘটালে মুসলিমবিশ্বে নতুন একটি ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ে।

তাতারিরা ‘ইয়াসাক’ নামক একটি আইন মান্য করত। হালাকু খাঁর কয়েক প্রজন্ম পরেই তাতারিরা মুসলিম হওয়া শুরু করে।

তারা মুসলিম হলেও তাদের প্রাচীন এই ইয়াসাক ত্যাগ করতে পারেনি। ফলে মুসলিমবিশ্বে তারা একটি নতুন ফিতনার আবির্ভাব ঘটাল।

তারা বলল, যার ইচ্ছা ইয়াসার ফলো করবে আর যার ইচ্ছা মুসলিম আইন ফলো করবে।

সমকালীন আলিমগণ এমন স্পর্ধার বিরুদ্ধে বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়ে গেলেন।

ইমাম ইবনে তাইমিয়া রহ. তাতারিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করলেন। যুদ্ধে তাতারিরা পরাজিত হয়।

মুসলিমবিশ্বে পূর্বেও আল্লাহর আইনের বিরুদ্ধে অন্য কারও আইন গ্রহণযোগ্য হয়নি, আজও হওয়া সম্ভব নয়।

দুটো আলাদা আলাদা দৃষ্টিভঙ্গি একই সাথে চলতে  পারে না।

খিলাফত পরবর্তী সময়

খেলাফতের পতনের পর ‘ইসলামী রাষ্ট্র, শরীয়াহ আইন, আল্লাহর আইন, ইসলামী আইন’ শব্দগুলো মিডিয়া ও প্রাচ্যবিদদের প্রোপাগান্ডায় মুসলমানদের নিকটই অপরিচিত হয়ে গেছে।

এই শব্দগুলো কেউ উচ্চারণ করলে তার দিকে ভয়ে ভয়ে, বিদ্রুপের সাথে, ভ্রু কুঁচকে তাকানো হয়।

সেক্যুলার রাষ্ট্রব্যবস্থায় থাকতে থাকতে প্রচলিত শাসনব্যবস্থাকেই মানুষ এখন স্বাভাবিক মনে করছে।

বিগত ১০০ বছর ধরে আমরা এমন এক কাঠামোর মধ্যে আছি, যা পাশ্চাত্য সভ্যতা দ্বারা প্রভাবিত।

এখানে গোলাম বুঝেও না যে, সে গোলামি করছে। কেউ গোলামির জিঞ্জির ছিন্ন করার চেষ্টা করলে তার আশেপাশের গোলামরাই তাকে থামিয়ে দেয়, নিষেধ করে।

আল্লাহর আইন, শরীয়াহ শাসন একদিনেই পৃথিবীতে প্রতিষ্ঠিত হবে না। অতীতেও হয়নি।

এটি প্রতিষ্ঠার জন্য সংগ্রাম করতে হয়, নিজের সর্বোচ্চ ত্যাগের নজরানা দিতে হয়, শরীরের তাজা রক্ত দ্বারা জমিন সিঞ্চিত করতে হয়।

নামকাওয়াস্তে শরীয়াহ শাসন কায়েম করে কোনো লাভ নেই। শরীয়াহ কায়েম হবে তার পূর্ণ প্রভাব ধরে রেখে।

সিংহকে সিংহের মতোই উপস্থাপন করতে হয়, তাকে বিড়ালের মতো উপস্থাপন করে বিশেষ কোনো লাভ নেই।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top