দেশে দেশে জঙ্গি নাটক – ওয়ার অন টেররের পর বহির্বিশ্বে জঙ্গিবাদের নাটক যতটা করা হয়েছে, তার চেয়েও শত গুণ বেশি করা হয়েছে বাংলাদেশে, আলজেরিয়ায়, তিউনিশিয়ায়, কাজাখিস্তানে।
এই দেশগুলোর সরকার প্রধানরা সর্বদা ছিল পশ্চিমা ও পার্শ্ববর্তী শক্তিশালী রাষ্ট্রের মদদপুষ্ট এবং নিকৃষ্ট চরিত্রের অধিকারী।
তারা নিজেদের ক্ষমতার মসনদ টিকিয়ে রাখতে যাকে তাকে ‘জঙ্গি ট্যাগ’ গিয়ে গ্রেফতার করেছে, গুম করেছে, ক্রসফায়ার দিয়েছে।
এই দেশগুলোর আদালত বিভিন্ন সময় সরকারকে জঙ্গিবাদের বয়ান তুলে ধরতে সহায়তা করেছে।
বাংলাদেশে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন ও সাইবার নিরাপত্তা আইন, ব্লগার হত্যা, জুমুআর বয়ানে শাসকের বিরুদ্ধে সত্য উচ্চারণের কারণে বহু মানুষকে গুম-খুন এবং আটক করেছে।
আলজেরিয়াতে ইসলামিক দল (FIS) ক্ষমতায় আসলে সেনা বিদ্রোহ করে তাদের নামিয়ে দেওয়া হয়।
পরবর্তী সময়ে বহু মানুষকে ‘ইসলামিস্ট ট্যাগ’ দিয়ে নির্বিচারে হত্যা করা হয়।
তিউনিশিয়াতে ‘সন্ত্রাসবিরোধী আইন’ তৈরি করে আন-নাহদা পার্টির বহু সমর্থককে হত্যা করা হয়।
কাজাখিস্তানে ‘ধর্মীয় উগ্রবাদ’ ট্যাগ দিয়ে গণহারে আলিম ও প্রাকটিসিং মুসলিমদের গ্রেফতার করা হয়।
এসব কাজ শুধু এই কয়েকটি দেশ করেছে, এমন নয়। আরও বহু দেশ এমন নির্মম কাজের সাথে জড়িত।
সৌদি আরব থেকে শুরু করে তুরস্ক, মালয়েশিয়া থেকে শুরু করে আরব আমিরাত, সকল দেশেই ইসলামকে পরিপূর্ণভাবে আঁকড়ে ধরা ব্যক্তিরা আজ নিরাপত্তাহীন।
বাংলাদেশে ২০১০ সালে বিডিআর হত্যাকাণ্ডের পর হাসিনা নিজের ক্ষমতা পাকাপোক্ত করে নেয়।
যে সকল সেনাসদস্যরা তার বিরোধিতা করে, তাদের গুম-খুন, কারাবাস এমনকি দেশ থেকে পালিয়ে যেতে বাধ্য করা হয়।
যারা আত্মগোপনে গিয়েছিলেন তাদের হাসিনার নিয়ন্ত্রিত মিডিয়ার মাধ্যমে (প্রথম আলো, ডেইলি স্টার, কালবেলা, সময় টিভি, একাত্তর টিভি ইত্যাদি) সমানে ‘জঙ্গি তকমা’ দিয়ে সমাজে তাদেরকে ভুলভাবে উপস্থাপন করা হয়।
২০১৩ সালে জামায়াতের নেতাদের বিরুদ্ধে ধারাবাহিক মিডিয়া প্রোপাগান্ডা চালিয়ে তাদের ডাকাত, গাদ্দার হিসেবে উপস্থাপন করা হয়।
পরবর্তী সময়ে তাদের কয়েকজনকে ফাঁসি দিয়েছে এই হাসিনা। কেউ কেউ জেলেই মারা গেছেন।
এরই রেশ ধরে উত্থান ঘটে শাহবাগে ফ্যাসিবাদীদের। নাস্তিক ব্লগাররা সমানে ইসলামের বিরুদ্ধে কুৎসা রটানো শুরু করে।
যার ফলে হেফাজতে ইসলাম জেগে উঠে এবং ঐতিহাসিক ৬ এপ্রিল ও ৫ই মে সংগঠিত হয়।
জঙ্গি নাটকের শুরু
২০১৩ সালের আগে জঙ্গি নাটকের কার্যক্রম এতটা শুরু হয়নি। ব্লগার রাজিব হত্যাকাণ্ডের পর বাংলাদেশে জঙ্গি নাটকের হালে পানি পায়।
এই একই সময় বৈশ্বিক ও দেশের বেশ কিছু ঘটনা হাসিনার জঙ্গি নাটকের পূর্ণতা দিয়ে দেয়।
ইরাক, সিরিয়াতে আইএসের উত্থান এবং বাংলাদেশে হলি আর্টিজানের ঘটনা উল্লেখযোগ্য।
এই নাটকের নির্মমতার শিকার হয়েছেন শায়েখ আবদুর রহমান, মুফতি হান্নান, শায়েখ জসিম উদ্দিন রহমানী হাফিঃ, শায়েখ হারুন ইজহার হাফিঃ, মাওলানা আকবর হোসাইন, শায়েখ আবু তাহের হাফিঃ এবং আরও অসংখ্য আলিম, ত্বলাবা, দ্বীনে সদ্য পা রাখা তরুণরা।
কত ভাই-বোন তো জেলেই মৃত্যুবরণ করেছেন! কত বোন ধর্ষিত হয়েছেন, তার কোনো ইয়ত্তা নেই।
যে-ই আসামিরা সমাজে তেমন একটা পরিচিত ছিল না, তাদের পরিণতি হয়েছিল ক্রস ফায়ারের নামে নির্মম হত্যা।
দেশের RAB সদর দফতর, DGFI সদর দফতরে বানানো হয়েছিল বিভিন্ন ‘জিহাদ ট্রাপ’।
ফেক আইডি, ক্যাপশন আর অ্যানিমেশন ভিডিও বানিয়ে দেশের বহু ইসলামপ্রিয় তরুণদের টার্গেট করে আটক ও গুম করা শুরু করে তারা।
জিহাদে আগ্রহী ভাইদের ধোঁকা দিয়ে চট্টগ্রাম, বান্দরবান, রাঙ্গামাটির পাহাড়ি অঞ্চল থেকে গ্রেফতার করে পত্রিকায় হেডলাইন দেওয়া হতো “জঙ্গি ক্যাম্প থেকে ট্রেনিং রত অবস্থায় জঙ্গি গ্রেফতার”।
বিভিন্ন ব্যক্তিদেরকে গুম করে পরবর্তী সময়ে আটক দেখানো হতো বন্দুকযুদ্ধের মাধ্যমে।
কত মানুষের সাজানো জীবন বিধ্বস্ত হয়ে গিয়েছে, তার নির্দিষ্ট কোনো পরিসংখ্যান নেই।
হাসিনার পতনের পরও জঙ্গি নাটকের অবসান হয়নি। কেননা এটা অবসান হলে দেশের সেক্যুলার সরকারের লস।
তারা মুরগি পাবে না, আর মুরগি না পেলে বহির্বিশ্ব থেকে ফান্ডও পাবে না। হাসিনার সময় এত বেশি জঙ্গি নাটক করা হয়েছিল যে, খোদ মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্টও এসব নিয়ে সন্দেহ পোষণ করে।
পুরো ইউরোপ-আমেরিকায় ৫ বছরে যতজনকে জঙ্গি বলে আটক করেছে, হাসিনা ৫ মাসেই তার চেয়ে বেশি আটক করেছে।
ওখানেও ফাঁসিয়ে দেয় সাধারণ মানুষকে, এখানেও ফাঁসানো হয়। একই সাপের দুই মুখ দুই স্থানে ফোঁস ফোঁস করে।
তারা ষড়যন্ত্র করে, আল্লাহও কৌশল করেন …
তারিক মেহেন্না থেকে জসিমউদ্দিন রহমানী সবার ক্ষেত্রেই একটি কমন প্যাটার্ন লক্ষ্য করা যায়, তাদের অফার দেওয়া হতো তাগুতের হয়ে কাজ করার। তাহলে সরকার তাদের ছেড়ে দেবে। সাথে আলিশান বাড়ি এবং পদমর্যাদাও দেবে।
কিন্তু এই মর্দে মুজাহিদরা কখনোই রাজি হননি। কাফিররা ভাবে, আল্লাহর মনোনীত বান্দারা নিজেদের ঈমান বিক্রি করে দেবে।
অথচ তারা জানে না, ঈমান দুনিয়ার সকল বস্তুর চেয়েও দামি। তা দুনিয়ার কোনো সম্পদ দ্বারা পরিমাপ করা যায় না।
দেশে জঙ্গি নাটক চলমান থাকবে। এটা এই শতাব্দীর বাস্তবতা। এটি অবসান হবে না। সময়ে সময়ে স্তিমিত হবে, কিন্তু ধূলিসাৎ হবে না।
চীন আগামী দিনে বৈশ্বিক পরাশক্তি হতে পারে। যদিও সম্ভাবনা এখনও অনেক দূর। কিন্তু তারাও এই জঙ্গি কার্ড খেলবে।
এখনই তো তারা জিংজিয়াং এর মুসলমানদের উপর এই কার্ড ব্যবহার করছে। ভবিষ্যতেও করবে।
জঙ্গি শব্দটাকে আপন করে নেওয়াটাই হবে বুদ্ধিমানের কাজ। যেমন রাজাকার শব্দকে আপন করে নেওয়ার দ্বারাই হাসিনার পতন নিশ্চিত হয়েছে।
হ্যাঁ, আমরা প্রতিবাদ করব এমন ট্যাগ গিয়ে গ্রেফতার করার। কিন্তু আখেরে শেষ পর্যন্ত এখানে আমাদের দাবি মেনে নেওয়ার হার অর্ধেকও নয়।
লেখক, দাঈ, বক্তা, আলেমদের সাথে জঙ্গি ট্যাগ লেগে থাকবেই। ত্যাগের নজরানার মাধ্যমেই ভবিষ্যতের সোনালি সূর্য উদিত হবে।
ভারত, আমেরিকা, চীন, ফ্রান্স, দক্ষিণ আফ্রিকা কিংবা রাশিয়া – এরা সমস্ত মুসলমানদেরকেই জঙ্গি মনে করে। তাদেরকে মুসলমানদের আসল রূপ দেখানো উচিত।
যেমনটা আমাদের পূর্বপুরুষরা ছিলেন। আবু বকর রা. থেকে নিয়ে খালিদ বিন ওয়ালিদ, মুসান্না ইবনে হারেসা থেকে নিয়ে সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস, তারিক বিন যিয়াদ থেকে নিয়ে মুহাম্মাদ বিন কাসিম, ওয়ালিদ ইবনে আব্দুল মালিক থেকে নিয়ে হারুনুর রশীদ, বাইজিদ ইলদিরিম থেকে নিয়ে সুলায়মান আল কানুনী।
আমাদের বিজয় রেখা রক্তের সাথেই মিশে আছে। প্রয়োজন শুধু নতুন ছবি আঁকার।