ইউরোপের নবজাগরণ

ইউরোপের নবজাগরণ – ১৪শ শতাব্দীর পরবর্তী সময়টাকে আলোকিত যুগ, রেনেসাঁ, এনলাইটেনমেন্ট আরও বহু নামে ডাকা হয়। ইউরোপীয় চিন্তার প্যাটার্ন পরিবর্তনের মূল অবদান ছিল মুসলমানদের।

খ্রিষ্টান চার্চ যখন মানুষকে জ্ঞান অর্জন করতে নিরুৎসাহিত করছিল এবং জ্ঞান অর্জনের অপরাধে কাউকে পুড়িয়ে হত্যা করছিল আবার কাউকে কারাগারে নিক্ষেপ করছিল, সেই একই সময়ে মুসলমানরা জ্ঞানবিজ্ঞানের শাখা-প্রশাখায় ঘুরে বেড়াচ্ছিল।

মুসলিমবিশ্বে গ্রিক দর্শনের ব্যাপক প্রচার-প্রসার শুরু হয় আব্বাসি খিলাফতের সময়ে। প্রথম দিকে প্রচার হওয়া ভ্রষ্ট গ্রিক দর্শনকে আরও পরিমার্জিত করেন তৎকালীন মনীষীরা।

উদ্ভব ঘটে কালাম শাস্ত্রের। এটি মুসলিম দর্শন ও আকিদার গুরুত্বপূর্ণ শাস্ত্র। এই সময়টাতে চিকিৎসাবিজ্ঞান, ভৌগোলিক বিজ্ঞান, সামুদ্রিক বিজ্ঞান, সমর বিজ্ঞান, কৃষিবিজ্ঞানে মুসলমানরা ছিল অনেক অগ্রসর।

রোমান ক্যাথলিক চার্চের মাঝে তখন দুইটা গ্রুপ ছিল। এক দল বলত, যুক্তির মাধ্যমে কোনো কিছু সাব্যস্ত করা যাবে না। বিশ্বাসকে আঁকড়ে ধরতে হবে। অপর দল বলত, পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে স্রষ্টার মহত্ত্ব উপলব্ধি করার চেষ্টা করতে হবে।

এই সময়টাকে বলা হয় ‘প্রাক রেনেসাঁ। সময়কালটা তখন ছিল ১৩০০ খ্রিষ্টাব্দের পরবর্তী সময়ে। ইউরোপে এই সময়ে বেশ কিছু বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা হয়। যেগুলো মূলত চার্চ স্কুল হিসেবে প্রতিষ্ঠা হলেও এখানে চার্চের সিলেবাস পুরোপুরি মান্য করা হতো না।

বিশ্ববিদ্যালয়গুলো হলো,

  • সালের্নো মেডিকেল স্কুল (ইতালি)
  • রোম বিশ্ববিদ্যালয়
  • অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় (ইংল্যান্ড)
  • কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়
  • প্যারিস বিশ্ববিদ্যালয় (ফ্রান্স)
  • মন্টপিলিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়
  • স্যালামাঙ্কা বিশ্ববিদ্যালয় (স্পেন)
  • ভিয়েনা বিশ্ববিদ্যালয়

ফলে গ্রিক দর্শন ও মুসলিম সভ্যতার প্রভাব পরিলক্ষিত হয় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে। এই প্রতিষ্ঠানের ছাত্রদের হাত ধরেই রেনেসাঁর গোড়াপত্তন ঘটে।

হিউম্যানিজম ও রেনেসাঁ

১৪শ শতকে ইতালিতে জিওভান্নি বোকাচ্চিও এবং পেট্রার্কের হাত ধরে উত্থান ঘটে হিউম্যানিজম আন্দোলন। এটাকে বলা যায় রেনেসাঁর প্রাণ ভোমরা।

আস্তে আস্তে গ্রিক দর্শন ও রোমান মূল্যবোধের চর্চা বাড়তে থাকে তাদের মধ্যে। হিউম্যানিজমের বিখ্যাত কিছু চিন্তাধারা এখনও আমরা আঁকড়ে আছি।

যেমন, সবার উপর মানুষ সত্য, তাহার ওপরে নাই। তাই আগে মানুষ হোন ইত্যাদি।

হিউম্যানিজম আন্দোলন ইউরোপে চিন্তার ঝড় তুলে দেয়। সেগুলো সংক্ষেপে নিচে যুক্ত করছি।

  • হিউম্যানিজমের মূল ধারণা ছিল মানুষই পৃথিবীর কেন্দ্র এবং তার আচরণ, অনুভূতি এবং চিন্তা ই গুরুত্বপূর্ণ।
  • হিউম্যানিস্টরা প্রাচীন গ্রিক ও রোমান সাহিত্য, দর্শন, এবং কলা পুনরুদ্ধারের প্রতি আগ্রহী ছিলেন।
  • হিউম্যানিজমের তৎকালীন চেতনাগুলোর মধ্যে অন্যতম ছিল ব্যক্তিগত স্বাধীনতা।
  • মানুষের বোধ, অনুভূতি, এবং তার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতাগুলো গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হতো। তাই বিশ্বাসকে আঁকড়ে ধরে চার্চকে ছুড়ে ফেলার মধ্যেই মানুষের মর্যাদার পুনরুত্থান ঘটবে।
  • মানবজাতির উন্নতি এবং সমাজের সামগ্রিক উন্নতি শিক্ষা ও গবেষণার মাধ্যমে সম্ভব। (তৎকালীন ইউরোপে ব্যাপক পরিসরে শিক্ষাদীক্ষা নিষেধ ছিল। নির্দিষ্ট গণ্ডির বাহিরে যাওয়া যেত না)
  • তারা ইউরোপে জেঁকে বসা বিদেশি মতবাদ তথা খ্রিষ্টবাদের সমালোচনা করতেন এবং এটার শেকল ভেঙে ধর্ম ও রাষ্ট্রের কার্যবিধি আলাদা করতেন চাইতেন।

এভাবেই যাজক ও পোপদের অনৈতিকতা, শতাব্দী ধরে নিষ্পেষিত করে রাখা, বিভিন্ন রোগ ও ভাইরাস ছড়িয়ে পড়া এবং পোপদের চিকিৎসা বিজ্ঞানের প্রতি অনীহা, চার্চের স্বর্গ বিক্রয়, ধর্মযুদ্ধের নামে চার্চের লুটপাট ও গণহারে মানুষকে যুদ্ধে পাঠানো, ধর্মযুদ্ধের নামে খ্রিষ্টান খ্রিষ্টানে মারামারি করে ইউরোপ ধর্মকে চিনেছে শত্রু হিসেবে।

জীবনের বিকাশ, জ্ঞান অর্জন, চিন্তার স্বাধীনতা, মুক্তির আনন্দ থেকে বাধা প্রদানকারী হিসেবেই ইউরোপ ধর্মকে চিনেছে।

রিফরমেশন আন্দোলন – ইউরোপের নবজাগরণ

১৫১৭ সালে জার্মান যাজক মার্টিন লুথার ক্যাথলিক চার্চের দুর্নীতির বিরুদ্ধে কথা বলা ‍শুরু করেন।

এই সময়ে মার্টিন লুথার Ninety-Five Theses লিখে গির্জার দরজায় ও জার্মানির উইটেনবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের গেটে টাঙিয়ে দেন।

এতে ক্যাথলিক গির্জার অর্থপাচার, লুটপাট ও জনগণের থেকে অর্থকড়ি হাতিয়ে নেওয়ার সমালোচনা করা হয়। পোপ ও পাদরিদের আহ্বান জানানো হয় এই অভিযোগকে মিথ্যা প্রমাণিত করতে।

এভাবেই জন্ম নেয় রিফরমেশন আন্দোলন। এর মাধ্যমেই ক্যাথলিক ধারণার বিপরীতে খ্রিষ্টধর্মে নতুন একটা মতবাদের সূচনা শুরু হয়।

এরই নাম প্রোটেস্ট্যান্ট মতবাদ। এই মতবাদের চিন্তাধারা ছিল,

  • পোপের প্রাধান্য অস্বীকার
  • যাজকরা ঈশ্বরের নিযুক্ত, এমন উদ্ভট ধারণার অস্বীকার
  • রুটি ও মদ যিশুর মাংস-রক্ত হয়ে যাওয়ার বিশ্বাসকে অস্বীকার (এটা ক্যাথলিকরা বিশ্বাস করে)
  • বাইবেলই একমাত্র ধর্মীয় কর্তৃত্বের অধিকার পাবে
  • মানুষ স্বর্গলাভ করবে ঈশ্বরের প্রতি বিশ্বাসের মাধ্যমে, কোনো আমলের মাধ্যমে নয়। ঈশ্বর যাকে ইচ্ছা স্বর্গ দেবে, এটা তার অনুগ্রহে থাকবে
  • ব্যক্তিগত ধর্মীয় বিশ্বাসের স্বাধীনতা

মাত্র ২০ বছরের মধ্যে ডেনমার্ক, সুইডেন, নরওয়ে এবং জার্মানির কিছু প্রদেশ ক্যাথলিক থেকে প্রোটেস্ট্যান্ট হয়ে গেল।

সুইজারল্যান্ডে প্রোটেস্ট্যান্ট মতবাদের আরেক ভার্সন জুইংলি মতবাদ জনপ্রিয় হয়ে উঠে।

ফ্রান্স, স্কটল্যান্ড, জেনেভা, হল্যান্ডে জন ক্যালভিন প্রচারিত প্রেসবাইটারিয়ান মতবাদ প্রতিষ্ঠিত হয়।

ইংল্যান্ডে ১৫৩৪ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় অ্যাংলিকান চার্চ। খানিকটা মধ্যমপন্থি ক্যাথলিক ছিল এটি।

রাজা অষ্টম হেনরি চাচ্ছিলেন পোপের প্রভাবমুক্ত ক্যাথলিক ধর্ম। যদিও পরে ইংল্যান্ড প্রোটেস্ট্যান্ট মতবাদকে গ্রহণ করে নেয়।

মজার বিষয় হলো, পরে আবার আরেক রানী এসে প্রোটেস্ট্যান্টকে বাদ দিয়ে ক্যাথলিককে ইংল্যান্ডে প্রতিষ্ঠিত করে। শেষ পর্যন্ত রানী ১ম এলিজাবেথ এসে এর একটা মীমাংসা করেন।

১৬১৮-১৬৪৮ সাল মোট এই ৩০ বছর ইউরোপে ক্যাথলিক এবং প্রোটেস্ট্যান্ট মতবাদের মাঝে লাগাতার যুদ্ধ হয়। এর ফলে মারা যায় ৮০ লাখ মানুষ।

শেষ পর্যন্ত ১৬৪৮ সালে ওয়েস্টফেলিয়া চুক্তির [1] মাধ্যমে এই যুদ্ধের অবসান ঘটে। এই চুক্তির মাধ্যমেই আধুনিক রাষ্ট্রের ধারণার উদ্ভব ঘটে।

পরবর্তী সময়ে এই ফরমেট কেই সামনে রেখে ইউরোপ মুসলিম বিশ্ব, আফ্রিকা এবং আমেরিকায় আগ্রাসন চালায়।

এনলাইটেনমেন্ট – ইউরোপের নবজাগরণ

খ্রিষ্টধর্মের রন্ধ্রে রন্ধ্রে জেঁকে বসা চার্চের খবরদারি নস্যাৎ করার জন্য রেনেসাঁর সূচনা হয়।

কিন্তু রেনেসাঁর সময়টাতে ধর্মীয় গ্রুপগুলোর মধ্যে মারামারি করে উলটো আরও হতাশা বাড়ে খ্রিষ্টান সমাজের মধ্যে।

শেষ পর্যন্ত তাদের হাতে সমাধান ছিল একটাই। ধর্মকে রাষ্ট্র, সমাজ ও অর্থনীতি থেকে বের করে ব্যক্তিগত জীবনের সাথে সীমাবদ্ধ করে নেওয়া।

১৭শ শতকে ইউরোপে শুরু হলো বুদ্ধিবৃত্তিক আন্দোলন। যাকে অভিহিত করা হয় এনলাইটেনমেন্ট নামে। এটির শেকড় ছিল রেনেসাঁ এবং মর্ডানিটি।

এনলাইটেনমেন্ট মোটাদাগে তিনটা বৈশিষ্ট্যকে সামনে রাখে।

  1. ব্যক্তি স্বতন্ত্র। অর্থাৎ স্বাধীনতা ও সমতা। সকল মানুষ সমান, কেউ কাউকে নিয়ন্ত্রণ করবে না।
  2. সংশয়বাদ। বিনা প্রশ্নে কোনো কিছুই মেনে নেওয়া হবে না। খ্রিষ্টান সমাজ বিনা প্রশ্নে মেনে নিয়ে এতদিন চার্চের নির্যাতনে ভুগেছে। আর নয়।
  3. যুক্তি। যুক্তিতে না ধরলে তা মেনে নেওয়া হবে না। যেকোনো কিছুই যুক্তিতে খাটতে হবে। যুক্তি বা আকলে না ধরলে তা বাতিল বলে পরিত্যাজ্য হবে।

এই মূলকথাগুলোকে সামনে রেখে আরও বিভিন্ন আইডিয়া তৈরি হয়। আরও বিভিন্ন ধারণা গড়ে উঠে। সেগুলোকেও মেনে নেওয়া হয় মাথা পেতে। যেমন,

  • স্বর্গীয় জ্ঞানের (আসমানি কিতাব) উপর মানব জ্ঞান প্রাধান্য পাবে।
  • সার্বভৌমত্বের উৎস হবে জনগণ। স্রষ্টা নয়।
  • জ্ঞানের প্রধান উৎস হবে যুক্তি (বিজ্ঞান), ওয়াহি নয়।
  • রাষ্ট্র ও ধর্ম আলাদা হবে। কেউ কারো অংশে হস্তক্ষেপ করবে না।

উপর্যুক্ত ধারণাগুলো নাস্তিক নাস্তিক শোনালেও এনলাইটেনমেন্টের দার্শনিকদের মাঝে সবাই নাস্তিক ছিল না।

অধিকাংশ আস্তিকই ছিল। কিন্তু ক্যাথলিক চার্চের বেধে দেওয়া ঈশ্বরের ধারণায় তারা বিশ্বাসী ছিল না।

এনলাইমেন্টে দার্শনিকদের প্রভাব

পুরো আন্দোলনটি গড়ে উঠেছিল দার্শনিক, লেখক, বুদ্ধিজীবী, বিজ্ঞানী ও নতুন প্রজন্মের যাজকদের হাত ধরে। এই দার্শনিকদের মধ্যেও দুইটা গ্রুপ ছিল। যাদের বিবরণ নিচে তুলে ধরা হলো।

র‌্যাডিকেল: ধর্ম সমাজ থেকে বাতিল। এটা ইহুদি দার্শনিক স্পিনোজার দর্শন থেকে উৎপত্তি ঘটে।

এটা বিদ্যমান কাঠামো পুরোপুরি উচ্ছেদ করে গণতন্ত্র, ব্যক্তিস্বাধীনতা, ধর্মীয় কর্তৃপক্ষের পুরোপুরি বিলোপ করার পক্ষে।

এমনকি তারা নৈতিকতা থেকেও ধর্মকে পৃথক রাখার পক্ষে। তাদের নিকট নৈতিকতার কোনো মানদণ্ড নেই।

মডারেট: তারা তৎকালীন সময়ের কাঠামোর সংস্কার চেয়েছিল। তবে পুরোপুরি কাঠামোকে উৎখাত করতে চায় নি। তারা যুক্তির আলোকে বিশ্বাসের পক্ষে ছিল।

ইউরোপের নবজাগরণ মানুষকে ধর্ম থেকে পৃথক করে ফেলে। এভাবেই গড়ে উঠে নতুন এক সভ্যতা। যাকে নামকরণ করা হয় পশ্চিমা সভ্যতা বা পাশ্চাত্য সভ্যতা নামে।

হিউম্যানিজম, বস্তুবাদ, পুঁজিবাদ, ভোগবাদ ও ধর্মনিরপেক্ষতাই হলো এদের মূল চাবিকাঠি। মূল আকিদা ও মূল বিশ্বাস।

তথ্যসূত্র

অবাধ্যতার ইতিহাস

ইন্টারনেট


[1] ওয়েস্টফেলিয়া চুক্তি বলা হয় ১৬৪৮ সালে জার্মানির ওয়েস্টফেলিয়া অঞ্চলে স্বাক্ষরিত দুটি চুক্তিকে। এর মাধ্যমে ত্রিশ বছরের যুদ্ধ শেষ হয়। এটি ইউরোপে রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠা করে, যার মাধ্যমে একটি রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে অন্য রাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ নিষিদ্ধ হয়। চুক্তিতে ধর্মীয় সহনশীলতা (লিবারিলিজম) এবং খ্রিষ্টান ধর্মের বিভিন্ন মতবাদকে সমান অধিকার দেওয়া হয়। এ ছাড়া ইউরোপের সীমানা পুনর্নির্ধারণ হয়। যেমন ফ্রান্স, সুইডেন এবং নেদারল্যান্ডসের কিছু এলাকা লাভ করে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top