আসিফা বানু থেকে মৌমিতা

আসিফা বানু থেকে মৌমিতা – পশ্চিম বাংলায় একটি ঘটনা পুরো এশিয়ার ভীত নাড়িয়ে দিয়েছে। সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে দুর্নীতি যখন চড়াও হয়, তখন এমনটা যে ঘটবে, তা প্রত্যাশিত।

মৌমিতাতে ধর্ষণ করা হয়েছে। ধর্ষণের আগে তাকে হত্যা করা হয়েছে। মাথা থেতলে দেওয়া হয়েছে। এমনটাই করেছে দুর্নীতিবাজ ভারতের উগ্র হিন্দুরা।

আজ মৌমিতার ঘটনায় পুরো পশ্চিমবঙ্গ উত্তাল। বাংলাদেশের সোসাল মিডিয়াতে এটি নিয়ে আলোচনা চলছে। প্রশ্ন উঠছে, নারীর নিরাপত্তা কোথায়? এই প্রশ্নটির আমরা একটু পোস্টমর্টেম করে পর্যালোচনা করবো ইনশাআল্লাহ।

নারীবাদী সংগঠন ও এনজিও

বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তানসহ এশিয়ার এই দেশগুলোতে নারীবাদী সংগঠনের অভাব নেই।

বৃটিশ ল’ মান্য করা এবং বৃটিশদের গোলামী করে নিজেরা স্বাধীন হওয়ার পরও কখনো তারা নিজ বুদ্ধিতে কিছুই করতে পারে নি।

ইংরেজরা তাদেরকে যেই আইন দিয়ে গিয়েছিল, সেই আইনেই তারা চলছে। হিন্দু অধ্যুষিত ভারত নিয়ে আমার কোনো কথা নেই। কারণ, হিন্দুধর্ম হলো কালচারভিত্তিক ধর্ম।

অথচ পাকিস্তান-বাংলাদেশে সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমান। শুরুতে এই দেশদ্বয় শুধুমাত্র ইসলামের ভিত্তিতেই আলাদা হয়েছিল।

ইসলাম হলো ফিতরাতের ধর্ম। একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা। কিন্তু আজ পর্যন্ত কি এই দেশদ্বয়ে ইসলামী আইন বাস্তবায়ন হয়েছে? হয় নি। কারণ, এলিট গোলামরা গোলামীতেই অভ্যস্ত।

নারীবাদী সংগঠনগুলো এবং এনজিওগুলো নিজেদের ভিশন ছাড়া কাজ করে না। তাদের কার্যক্রমের পেছনে অর্থকড়ি দেয় পশ্চিমাবিশ্ব। আর এই টাকা এমনি এমনিই দেয় না। বরং পশ্চিমা আদর্শ বাস্তবায়নের জন্য তারা দেয়।

এজন্য দেখবেন, এত এত নারী প্রতিদিন ধর্ষণের শিকার হচ্ছে, এটি নিয়ে কোনো শব্দ করবে না নারীবাদীরা। যেন নারীদের সম্ভ্রমের কোনো মূল্য তাদের নিকট নেই।

নারীবাদীরা কখনোই নারীদের অধিকার নিয়ে উদ্বিগ্ন হয় না। বরং তারা উদ্বিগ্ন হয় নারীদের সম্মান রক্ষা করার জন্য কেউ কাজ করলে।

কথাটা একটু ভিন্নরকম মনে হতে পারে। তবে ব্যাখ্যা করছি। ইসলামে নারীদের সম্মান রক্ষার্থে যেই অধিকারগুলো দিয়েছে তা হলো, শরীয়াহ নির্দেশিত পন্থায় পরিপূর্ণ পর্দা করা। সহশিক্ষা ব্যতিত শিক্ষা অর্জন করা। যিনা-ব্যাভিচারের শাস্তি নিশ্চিত করা।

এই তিনটা ঠিকমতো মানতে পারলেই নারীদের প্রতি নির্যাতন ৯৫% বন্ধ করা সম্ভব।

পরিপূর্ণ পর্দা যে করবে, সে কখনোই অবৈধ সম্পর্কে লিপ্ত হবে না। সহশিক্ষা ব্যতিত যে শিক্ষা অর্জন করবে, সে কখনোই আত্মমর্যাদাহীন হবে না।

সমাজে যিনা-ব্যাভিচারের শাস্তি মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হলে কেউ এই অশ্লীল কাজ করার দুঃসাহস করবে না।

অথচ এই তিনটা জিনিষ বাস্তবায়ন করতে গেলেই নারীবাদী এবং এনজিওগুলো তেড়ে আসবে। নারীর অধিকার নষ্ট হচ্ছে বলে মুখে ফেনা তুলবে।

কারণ, তারা নারীর অধিকার নিয়ে কাজ করে না। বরং তারা নারীকে পণ্য বানানোর জন্য কাজ করে।

তারা নারীর লোভনীয় শরীর দেখিয়ে বিজ্ঞাপন প্রচার করতে আগ্রহী। এতেই নাকি নারীরা উন্নতির শিখরে পৌঁছাবে।

ধর্ষণের ফিলোসফি

ভোগবাদী পৃথিবী হলো অন্ধের মতো। এখানে জলজ্যান্ত প্রমাণকেও নাচক করে পাল্টা প্রশ্ন ছুঁড়ে দেওয়া হয়। অনেক নারীদের একটা কমন প্রশ্ন, পুরুষ কেন ধর্ষণ করে?

এই প্রশ্নের বহু উত্তর আছে। এর মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি হলো, বিকৃত রুচি ও নারীর শরীরের আকর্ষণ।

পুরুষদের মস্তিষ্ক এমন যে, তার শারিরিক উত্তেজনার জন্য কোনো নারীর চেহারা দেখাটা জরুরি নয়।

সে নারীর শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ দেখেও উত্তেজিত হয়। এটা অস্বীকার করার কোনো সূরত নেই।

সমাজে যত ধর্ষণ হয়, এর অধিকাংশ হলো নারীর শরীর দেখার মাধ্যমে। আবার কিছু ধর্ষণ তো এমনও আছে, যাকে সমাজের ভাষায় ধর্ষণ না বলে তারা বলে, “সম্মতি”।

যেমন, বিয়ে বহির্ভূত জিনা-ব্যাভিচার। এটি বর্তমানে যুবক-যুবতিদের মধ্যে কমন হয়ে গেছে।

বিকৃত রুচির কারণেও ধর্ষণের শিকার হয় নারী। তখন পুরুষের এই বিকৃত ‍রুচির শিকার হয় ছোট্ট মেয়ে থেকে শুরু করে ৮০ বছরের বৃদ্ধা পর্যন্ত।

এই বিকৃত রুচির পেছনে দায়ী হলো সমাজ, রাষ্ট্র ও দেশের আইনব্যবস্থা।

দেশের আইনে ধর্ষক, যৌন উত্তেজনামূলক সিনেমা, নাটক, ড্রামা, বিলবোর্ড, পোস্টার, বিজ্ঞাপনের ব্যাপারে কোনো বিধি-নিষেধ বা আইন নেই। আর যেই আইন আছে, তা হলো হাস্যকর।

তাই তো সমাজে বিশেষ করে ভারতে, বাংলাদেশে, পাকিস্তানে প্রতিদিন কেউ না কেউ ধর্ষণের শিকার হয়।

ভারতে ধর্ষণের আরো একটি কারণ হলো, কোনো জবাবদিহিতার ভয় না থাকা।

আসাম, সিকিম, কাশ্মীরে যত হাজার মা-বোন ধর্ষণের শিকার হয়েছে সরকার সমর্থিত বাহিনীর দ্বারা, তার কোনো হিসাব আদৌ কেউ রেখেছে? কোনো বিচার হয়েছে?

কাশ্মীরের আসিফা বানুর কথা মনে আছে তো? ছোট্ট একটি মেয়ে। বয়স ৮ হবে। সরকার সমর্থিত বাহিনী ও উগ্র হিন্দু পুরোহিত মিলে আসিফা বানুকে ধর্ষণ করে। একপর এক সপ্তাহ আটক করে রাখে। শেষ পর্যন্ত তাকে পাথর মেরে হত্যা করে। এই হত্যা করার পূর্বে আবার ধর্ষণ করে। আদৌ ভারতে এই ধর্ষণের বিচার হয়েছে কি? হয় নি। হবেও না।

২০১৮ সালে ঘটে যাওয়া এই ঘটনায় ভারতে কি উল্লেখযোগ্য কোনো প্রতিবাদ করেছিল? নাহ্ সেটিও হয় নি। কারণ, মেয়েটি মুসলিম। আর ধর্ষকরা উগ্র হিন্দু।

এর পেছনে কারণ হলো, ক্রমবর্তমান মুসলিমবিদ্বেষ ও বিকৃত রুচি লালন করা।

ধর্ষণের প্রতিরোধ কিভাবে হবে?

প্রশ্নটা যথার্থ। কিন্তু উত্তর জানার পর কেউ তা বাস্তবায়নে আগ্রহী হয় না। এটি হলো চরম বাস্তবতা। এর ফলে দেখা যায়, আবার ধর্ষণের শিকার হয় কোনো নারী অথবা শিশু।

সমাজে নারীদের যথাযথ মুল্যায়নের মাধ্যমেই ধর্ষণ প্রতিরোধ করা সম্ভব। আর এটি হবে একমাত্র ইসলামী বিধানের মাধ্যমে।

বর্তমানে নারীরা পশ্চিমা কালচারঘেঁষা হয়ে গেছে। তারা পশ্চিমাদের মতো গেঞ্জি, টি-শার্ট, টাইট জিন্স অথবা ওড়না ছাড়া জামা পরিধান করে ঘর থেকে বের হয়। এই সবগুলোই একথায় পরিত্যাজ্য।

পশ্চিমা সংস্কৃতির এবং দেশীয় সংস্কৃতির যত পোশাক আছে, কোনোটাই নারীকে ঘরের বাহিরে সুরক্ষা দিবে না। পরিপূর্ণ পর্দা একজন নারীকে সুরক্ষা দিতে পারবে।

সহশিক্ষা এই দেশগুলোর বহুল প্রচলিত সমস্যা। এর ফলে ধর্ষণ যেমন বাড়ে, সম্মতির ভিত্তিতে নিজের সতীত্বও বিলিয়ে দিতে পিছপা হয় না মেয়েরা।

তাই কিন্ডার গার্ডেন থেকে শুরু করে ভার্সিটি লেভেল পর্যন্ত, সবখানে সহশিক্ষা পরিবর্তন করে আলাদা আলাদা বিল্ডিংয়ে শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে।

সিনেমা, নাটক, ড্রামা, শর্ট, রিলস, টিকটক সব স্থানে বেহায়াপনা ছড়িয়ে পড়েছে।

এত পরিমাণে যৌন উত্তেজিত কন্টেন্ট প্রচারিত হয়, একজন মানুষের মানসিকতা নষ্ট করার জন্য এটিই যথেষ্ঠ।

এই স্থানগুলোতে কটোর সেন্সর আরোপ করা উচিৎ। এছাড়াও বিজ্ঞাপন, সুপার শপ, কল সেন্টারে মেয়েদেরকে ব্যবহার করা সম্পূর্ণরূপে বন্ধ করা উচিৎ।

ধর্ষণ, যিনা-ব্যাভিচারের ইসলামী আইন বাস্তবায়ন করতে হবে। এর শাস্তি নগদ মৃত্যুদণ্ড। এর কোনো মাফ নেই। যত বড় পীর-বুযুর্গ হোক।

এখন কথা হলো, গণতান্ত্রিক এই সিস্টেমে ইসলামী আইন বাস্তবায়ন হবে কিভাবে? আদৌ কি সম্ভব? এক কথায় উত্তর হলো, না।

তবে আমরা ব্যক্তি, সমাজ, এলাকাভিত্তিক  উদ্যোগে এর মধ্য হতে কিছু কিছু আইন বাস্তবায়ন করতে পারি। বিশেষ করে অনলাইনে অশালীন কন্টেন্ট এর ক্ষেত্রে।

আমাদের ইসলামী শরীয়াহ বাস্তবায়নের জন্য দরকার খেলাফত ব্যবস্থা। ইমারাহ ব্যবস্থা।

এটি ছাড়া কখনোই এবং কোনো পন্থাতে ইসলাম কায়েম করা সম্ভব হবে না।

গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, ভোগবাদ, পুঁজিবাদ, উদারতাবাদ, মানবতাবাদ সহ যত ধরণের চিন্তাধারা ও সিস্টেম আছে, ইসলামের সামনে সবগুলোই পরিত্যাজ্য।

কারণ, এই সবগুলোই একটা সময় স্বৈরতন্ত্রে রূপান্তরিত হয় এবং তা হবেই। উদাহরণ দেওয়ার প্রয়োজন নেই। চোখের সামনে যথেষ্ঠ উদাহরণ আছে।

ভারতে চলমান সংকট

এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ভারতে প্রতিদিন গড়ে ৮৫ জনের বেশি ধর্ষণের শিকার হয়।

এই তথ্যগুলো পরিপূর্ণ কখনোই প্রকাশ করা হয় না। তাছাড়া উপরোক্ত তথ্যটা আরো ৪ বছর আগের। বর্তমানের অবস্থা কল্পনা করার চেষ্টা করুন!

উগ্র হিন্দুত্ববাদ এবং শিক্ষা-দীক্ষার অভাবের ফলে ভারতের অধিকাংশ মানুষের অবস্থা আইয়ামে জাহিলিয়্যাতের থেকেও নিকৃষ্ট।

সমকালীন একটি ছোট উদাহরণ দেই। কলকাতায় ধর্ষণের শিকার হয়ে মৃত্যুবরণ করা মৌমিতা দেবনাথের মৃত্যুর পর গুগল ট্রেন্ড এর তথ্যানুযায়ী,

গত ২৪ ঘন্টায় ভারতে সবচেয়ে বেশি সার্চ করা কিওয়ার্ড হলো, “Moumita Po*rn”!

আপনি কল্পনা করতে পারেন? একটা মেয়ে ধর্ষণের শিকার হয়ে মারা গেছে আরেকদিকে বড় একটি কমিউনিটি তার পর্ন ভিডিও খুঁজে বেড়াচ্ছে!

এটিই হলো ভারতের বাস্তব চিত্র। এই উগ্র হিন্দুদের থেকে তাদের নিজেদের মা-বোন পর্যন্ত নিরাপদ নয়। অন্য নারীর কথা বাদই দিলাম।

কাশ্মীর, আসাম, হায়দ্রাবাদ, কর্ণাটক, গুজরাট ও দিল্লিতে বহু মুসলিম নারী ও শিশু মেয়ে এই উগ্র হিন্দুদের দ্বারা ধর্ষণের শিকার হচ্ছে।

এই ভারতের জন্য আবার প্রয়োজন মুহাম্মাদ বিন কাসিম। আবার প্রয়োজন আওরঙ্গজৈব। তবেই এই ভারতের সামাজিক অবস্থা স্থিতিশীল হবে ইনশাআল্লাহ।

সামনের দিনগুলো নিয়ে আমাদেরকেই ভাবতে হবে। আমাদেরকে প্রস্তুত হতে হবে। নিজেদেরকে আশেপাশের লোকজনকে প্রস্তুত রাখতে হবে।

এই বাংলাদেশ আরেক কাশ্মীর, আরেক কাশগড় না হোক! আসিফা বানু থেকে মৌমিতা দেবনাথ, সকল ধর্ষিতার ধর্ষণকারীর একদিন বিচার হবে।

মহাপ্রলয়ের সেই দিন কেউ রক্ষা পাবে না। তাই বলে কি দুনিয়াতে তাদের শাস্তি আমরা মাফ করে দিব? প্রশ্নই আসে না!

লেখাটি শেয়ার করতে সর্ট লিংক কপি করুন

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top