কোকাকোলা কেন বয়কট করা উচিৎ

কোকাকোলা কেন বয়কট করা উচিৎ – তুফানুল আকসা শুরু হওয়ার পর থেকেই কোকাকোলা, পেপসি, ম্যাকডোনাল্ডস, স্টারবার্কসহ আরো বিভিন্ন আমরিকান পণ্য বয়কটের ডাক দেওয়া হয় মুসলিমবিশ্ব ও সচেতন বিশ্ববাসীর পক্ষ হতে।

বাংলাদেশে কোকাকোলা কোম্পানী প্রায় একচেটিয়াভাবেই ব্যবসা করে যাচ্ছে দশকের পর দশক ধরে।

বয়কটের ডাক দেওয়ার পর গত অক্টোবরে বহু দোকান থেকে কোকাকোলা সরিয়ে ফেলা হয়।

সচেতন মানুষ এই পানীয় পান করা থেকে বিরত থাকা শুরু করে।

তীব্র বয়কটের ফলে গত ফেব্রুয়ারী ২০২৪ এ বাংলাদেশের কোকাকোলা কোম্পানীকে তুরষ্কের কোকাকোলা কোম্পানী কিনে নেওয়ার আলোচনা শুরু হয়। [1]

সময়ের তালে তালে দেশের মানুষ ফিলিস্তিনের নির্যাতিতদের কথা ভুলে যেতে থাকে। এদিকে সুযোগ বুঝে কোকাকোলা তাদের প্রোডাকশন বাড়াতে থাকে।

ঢাকার শহরের অধিকাংশ দোকানে কোকাকোলা বা পেপসি কোম্পানীর কোনো না কোনো পণ্য থাকবেই। [2]

শহরের উন্নতির শীর্ষে থাকা এলাকাগুলোর দিকে তাকালে মনে হয়, তারা বয়কট তো করেই নি, উল্টো আরো ভালোভাবে আঁকড়ে ধরেছে।

এখানেই একটা প্রশ্ন সামনে আসে, কোকাকোলা ও পেপসি হলো আমরিকান কোম্পানী।

তাহলে ইসরাইলের হামলায় এই কোম্পানীর ব্যাপারে বয়কটের ডাক কেন উঠছে?

বিজ্ঞপনের ক্ষেত্রে কোকাকোলার ধৃষ্টতা প্রকাশ

কোরবানী ঈদের আগে এই সময়ে কোকাকোলা বাংলাদেশ একটি বিজ্ঞপন প্রচার করে। যেখানে তারা ধৃষ্টতার সাথে বলছে,

কোকাকোলা নিয়ে যা বলা হচ্ছে তা হলো গুজব। আর ফিলিস্তিনে তো কোকাকোলার ফ্যাক্টরি আছে!

এই ঘটনার পর তীব্রভাবে ফুঁসে উঠে দেশের বিবেকবান মুসলমানরা। তারা প্রতিবাদ করতে থাকে একের পর এক।

ঠিক কেন আমরা কোকাকোলা বয়কট করছি, এ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা উচিৎ বলে মনে করছি।

জায়োনিজম বা জায়োনবাদ হলো উগ্র ইহুদিদের বিশ্বাসের সাথে সম্পৃক্ত একটি বিষয়। আর এই উগ্র ইহুদিদের সহায়তা করে খৃস্টানবিশ্বসহ সমস্ত কুফরী শক্তি।

জায়োনিস্টদের বিশ্বাস হলো, ফিলিস্তিনে ইহুদি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা এবং মসজিদে আকসা ভেঙ্গে সেখানে হাইকালে সোলায়মানি নামক কল্পিত ভবন নির্মাণ করা।

জায়োনিস্ট ইহুদিরা গত ১০০ বছর যাবৎ ফিলিস্তিনের ভূমিগুলো একটু একটু করে দখল করে নিয়েছে। খন্ড খন্ড যুদ্ধ ও তীব্রতর যুদ্ধ সর্বদাই চালু ছিল।

ইসরাইল রাষ্ট্র সামনে আসার পর থেকে শহীদ ইজ্জউদ্দিন আল কাসসাম রহ. এর প্রতিরোধ থেকে শুরু হয়ে ইন্তিফাদা আন্দোলন এবং হাল আমলের তুফানুল আকসা যুদ্ধের উদ্দেশ্য একটাই, জায়োনিস্ট দখলদার রাষ্ট্রের বিলুপ্তি।

আর প্রতিবারই ইহুদিরা এবং তাদের সহযোগী ইউরোপ ও আমেরিকা ফিলিস্তিনের অসহায় নারী-শিশু, বৃদ্ধদের উপর হামলা করেছে। বোমা নিক্ষেপ করেছে। বাস্তুচ্যুত মানুষদের তাঁবুতে মিসাইল নিক্ষেপ করে রক্তের বন্যা বয়ে দিয়েছে।

কোকাকোলার সাথে ইসরাইলের সম্পর্ক কি?

  • কোকাকোলা কোম্পানী বহু বছর আগ থেকেই এই জায়োনিজমের ঘোরতর সমর্থক।
  • ফিলিস্তিনের দখলকৃত ভূমিতে ইসরাইলকে সহায়তার জন্য ফ্যাক্টরি বানিয়েছে কোকাকোলা। এ কারণে ১৯৬৭ থেকে ১৯৯১ পর্যন্ত আরব লীগ আনুষ্ঠানিকভাবে কোকাকোলা বয়কট করেছিল।
  • ইসরাইলি দখলদারিত্ব এবং অবৈধ স্থাপনা থেকে মুনাফা লাভ করার কারণে কোকাকোলা-কে কালো তালিকাভুক করেছিল খোদ জাতিসঙ্ঘ নিজেই। [3]
  • কোকাকোলার সবচেয়ে বড় শেয়ারহোল্ডার ওয়ারেন বাফেট। সে পৃথিবীর সবচেয়ে প্রভাবশালী জায়োনিস্টদের অন্যতম। নিজের বিপুল অর্থ ব্যবহার করে সে নানাভাবে ইসরাইলকে সমর্থন দিয়ে আসছে। [4]
  • ১৯৬৬ সাল থেকে টানা কয়েক দশক অর্থনৈতিকভাবে ইসরাইলকে সমর্থন যুগিয়ে আসার কারণে ১৯৯৭ সালে ইসরাইল সরকার এর ইকোনমিক মিশন কোকাকোলা-কে সম্মাননা প্রদান করে।
  • আমেরিকান-ইসরাইল চেম্বার অফ কমার্স নামের একটি প্রতিষ্ঠান, ইসরাইলি অর্থনীতিতে সর্বাধিক অবদান রাখা কোম্পানিগুলিকে সম্মানিত ও পুরস্কৃত করে। এসব পুরস্কারের অর্থায়ন করে কোকাকোলা।
  • অ্যাইপ্যাক (AIPAC)-কে মনে করা হয় আমেরিকার সবচেয়ে প্রভাবশালী লবি। গবেষকদের মতে, অ্যামেরিকার পররাষ্ট্রনীতি, বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্য কেন্দ্রিক নীতিকে অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণ করে এই প্রতিষ্ঠান। অ্যামেরিকার প্রধান দুই দলের প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থীদেরও ওপর ব্যাপক প্রভাব অ্যাইপ্যাকের। সোজা বাংলায় অ্যাইপ্যাক হল পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী জায়োনবাদী প্রতিষ্ঠান। এই অ্যাইপ্যাকের সাথে ঘনিষ্ট সম্পর্ক আছে কোকাকোলার। ২০০৯ সালে ইসরাইল গাযাতে আগ্রাসন ও হত্যাযজ্ঞ চালানোর সময় জাতিসঙ্ঘ অবিলম্বে যুদ্ধবিরতির আহবান জানিয়েছিল। অ্যাইপ্যাক-এর সুপারিশ আর লবিয়িং এর ফলে মার্কিন সেনেট জাতিসঙ্ঘের এই আহ্বান প্রত্যাখ্যান করে। ইস্রাইলে সামরিক আগ্রাসন অব্যাহত রাখার পক্ষে অবদান রাখার জন্য অ্যাইপ্যাক-কে পুরস্কার দেয়া হয়। আর সেই পুরস্কারের অর্থায়ন করে কোকাকোলা।
  • ২০০৯ সালে, ইসরাইলি সামরিক বাহিনীর সাবেক বিগ্রেডিয়ার জেনারেল, এবং ইস্রাইলের সাবেক প্রতিরক্ষা মন্ত্রী বিন ইয়ামিন বেন-ইলিযারকে তাদের সদর দপ্তরে বিশেষ সংবর্ধনা প্রদান করে কোকাকোলা। এই লোকের তত্ত্ববধানে সংঘটিত হয় জেনিন গণহত্যা, যেখানে নির্বিচারে খুন করা  হয় অসংখ্য ফিলিস্তীনি নারীশিশু ও বৃদ্বকে।

কোকাকোলা কেন বয়কট করা উচিৎ ? কারণ, কোকাকোলা অর্থনৈতিকভাবে ইস্রাইল রাষ্ট্রকে সহায়তা করে আসছে।

অ্যাইপ্যাকের পৃষ্ঠপোষকতার মাধ্যমে রাজনৈতিকভাবে যায়োনবাদকে শক্তিশালী করছে এবং, ফিলিস্তিনিদের উপর ইস্রাইলে সামরিক আগ্রাসনকে পুরস্কৃত করছে।

কোকাকোলা গণহত্যার সহযোগী, এবং  দখলদারিত্ব থেকে মুনাফা অর্জনকারী।

আসুন আমরা এখনই শপথ করি!

  • আমরা আর কোকাকোলা-এর কোনো পণ্য কিনবো না।
  • আত্বীয়স্বজন, পরিবার বন্ধু বান্ধব সবাইকে কোকাকোলার পণ্য বয়কটের কাজে শরীক করব।
  • ইসরায়েলের দখলদারিত্ব ও গণহত্যায় কোকাকোলার জড়িত থাকার ব্যাপারে ব্যাপক জনসচেতনতা তৈরি করব।
  • ইস্রাইলি আগ্রাসন এবং গণহত্যা বন্ধ করার দাবিতে সম্ভব হলে প্রতিবাদ সমাবেশে অংশ নেব।
  • গাযার মুসলিমদের  প্রতি সংহতি প্রদর্শন করব।

জনসচেতনতা বয়কটের সাফল্যের মূল চাবিকাঠি। আপনি কি রক্তপান করতে আগ্রহী হবেন? মানুষের রক্তের স্বাদ গ্রহণ করতে চান?

কোকাকোলা, পেপসি, স্টারবার্ক, কেএফসিসহ আরো যত বড় বড় আমরিকান কোম্পানী আছে, সকল কোম্পানীর সাথেই ইসরাইলের সম্পর্ক বড়ই মধুর।

এই সকল কোম্পানী সর্বদা জায়োনিস্ট ইসরাইলকে মোটা অংকের ডলার দিয়ে থাকে অনুদান হিসেবে।

আর ইসরাইল এই অনুদানের টাকায় অস্ত্র বানিয়ে ফিলিস্তিন, লেবানন, সিরিয়ার নিরীহ মানুষদের উপর হামলা করে।

বর্তমানে গাজ্জা ভূখন্ডে ইসরাইলি আগ্রসনের ৮ মাস পার হয়ে গেছে।

৩৭,০০০+ শহীদ এবং ৮৪,০০০+ আহত মানুষদের রক্তের দাগ লেগে আছে এই আমরিকান কোম্পানীগুলোর হাতে।

এই সকল আমরিকান কোম্পানী যদি চাইতো তাহলে তারা ইসরাইলকে অনুদান না দিয়ে ইসরাইলের উপর চাপ সৃষ্টি করতে পারতো। কিন্তু তারা তা করে নি।

আপনি একজন বিবেকবান মানুষ হয়ে কিভাবে ফিলিস্তিনিদের রক্তভেজা এই সকল পানীয় পান করেন? আপনি কিভাবে একজন ব্যবাসায়ী হয়ে এই পণ্য বিক্রি করাকে হালাল মনে করছেন?

Boycott coca cola and pepsi campaign. Boycott All Israeli Product

তথ্যসুত্র

উপরোক্ত লেখাটির তথ্য আসিফ আদনান ভাইয়ের বয়কট কোকাকোলা ক্যাম্পেইনের লিফলেট বিতরণের জন্য লেখা থেকে নেওয়া হয়েছে।

[1] কোকা-কোলা বাংলাদেশকে কিনে নিল তুরস্কের কোম্পানি – আজকের পত্রিকা

[2] কোকাকোলা কোম্পানীর উল্লেখযোগ্য পণ্যের মধ্যে আছে – কোক, স্প্রাইট, ফান্টা, কিনলে (মিনারেল ওয়াটার)।

এছাড়া আরেক কোমল পানীয় কোম্পানি পেপসিকো-ও ইহুদিদের ঘোরতর সমর্থক। তাদের পণ্যের মাঝে রয়েছে- পেপসি, সেভেন আপ, মিরিন্ডা ও অ্যাকুয়াফিনা (মিনারেল ওয়াটার)।

[3] Coca-Cola, Teva on UN black’list of settlement – The Times Of Israel

[4] Coca-Cola (KO) Ownership – Who Owns Coca-Cola? ওয়ারেন বাফেটের শেয়ার মূল্য 400,000,000$। যা মোট শেয়ারের ৯.২৯%

লেখাটি শেয়ার করতে সর্ট লিংক কপি করুন

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top