রাসূলের ইন্তিকালের সময় ওমর ফারুক রাঃ

রাসূলের ইন্তিকালের সময় – নবম হিজরীতে বিদায় হজ্জ্বের পরে রাসূল সা. অসুস্থ হয়ে পড়েন। প্রথম প্রথম এই অসুস্থতাকে স্বাভাবিক কোনো রোগ মনে হলেও কিছুদিন পর প্রকট আকার ধারণ করলো।

একটা সময় রাসূল সা. পুরোপুরি অসুস্থ হয়ে পড়েন। তিনি মসজিদে যেতেন কোনো সাহাবীর কাধে ভর দিয়ে। কিছুদিন পর মসজিদে যেতেও সক্ষম থাকলেন না।

রাসূলের অসুস্থতা থাকাকালীন অবস্থা – রাসূলের ইন্তিকালের সময়

আব্দুল্লাহ ইবনে যামআ রা. বলেন, যখন রাসূল সা. অসুস্থ হয়ে পড়েন তখন বেলাল রা. কোনো এক ওয়াক্তের নামাজের জন্য ডাকতে এলেন।

নবীজি অসুস্থতার কারণে উঠতে পারছিলেন না। তাই বেলালকে বললেন, অন্য কাউকে নামাজ পড়াতে বলো।

এরপর বেলাল রা. বের হয়ে আবু বকর রা. কে খুঁজতে লাগলেন। কিন্তু তাকে পাওয়া গেল না। তখন উমর রা. মসজিদে উপস্থিত ছিলেন।

আব্দুল্লাহ ইবনে যামআ রা. তখন উমরের নিকট উপস্থিত হয়ে বললেন, উমর উঠে এসো। লোকজনকে নামাজ পড়াও। এরপর ওমর রা. উঠে দাঁড়ালেন ও তাকবীর দিলেন।

তার গলার আওয়াজ ছিল খুব বেশি। ফলে রাসূল সা. ঘরে থেকে উমরের কণ্ঠের আওয়াজ শুনলেন। তখনই রাসূল সা. জিজ্ঞাসা করলেন,

আবু বকর কোথায়? মুসলমানরা তো তাকে ছাড়া অন্য কাউকে গ্রহণ করবে না। নবীজি তখনই আবু বকর রা. কে ডাকতে লোক পাঠালেন।

এদিকে আবু বকর রা. উপস্থিত হওয়ার পূর্বেই ওমর রা. এর নামাজ শেষ হয়ে যায়।

নামাজ শেষ হওয়ার পর যখন তিনি রাসূলের কথোপকথনের ব্যাপারে জানতে পারেন তখন ইবনে জামআকে বললেন,

তুমি ধ্বংস হও ইবনে যামআ। তুমি এটা কি করলে? আমি তো ভেবেছিলাম যে, রাসূল সা. আমাকে নামাজ পড়াতে বলেছেন?

তা না হলে আমি কখনোই নামাজ পড়াতাম না। ইবনে যামআ রা. বললেন, রাসূল সা. নির্দেশ দেন নি।

তবে আবু বকরকে না পাওয়ায় আমার নিকট তোমাকেই সবচেয়ে যোগ্য মনে হয়েছে।

রাসূলের দিক-নির্দেশনার ব্যাপারে ওমরের বক্তব্য

হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. বর্ণনা করেছেন, নবীজি সা. এর ব্যাথা যখন তীব্রতর হয়ে উঠলো তখন তিনি বললেন,

আমার নিকট কিছু কাগজ নিয়ে এসো। আমি কিছু লিখে দেই। যাতে তোমরা পথভ্রষ্ট হয়ে না যাও। হযরত ওমর সেখানে উপস্থিত ছিলেন।

তিনি বললেন, নবীজি এখন কষ্ট পাচ্ছেন। আমাদের নিকট আল্লাহর কিতাবই যথেষ্ঠ। এরপর উপস্থিত সাহাবীদের মধ্যে তর্ক শুরু হয়ে গেল।

নবীজি তখন বললেন, তোমরা আমার নিকট হতে সরে যাও। এখন আমার সামনে তর্ক করো না। আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস বলতে বলতে বের হলেন,

রাসূল সা. এর বক্তব্য বাধা দেয়া হলো। এ আমাদের জন্য চরম দুর্ভাগ্য। তবে এখানে বাধা দেয়াতে কোনো অন্যায় হয় নি।

কারণ আল্লাহ কুরআনে সূরা আনআমের ৩৮ নং আয়াতে বলেছেন,

……… مَا فَرَّطۡنَا فِی الۡکِتٰبِ مِنۡ شَیۡءٍ ……………

আমি কিতাবে কোন বিষয়ই লিপিবদ্ধ করতে বাদ রাখি নি।

আবার অন্যত্র সূরা মায়েদার ৩ নং আয়াতে আল্লাহ বলেছেন,

……………….. اَکۡمَلۡتُ لَکُمۡ دِیۡنَکُمۡ وَ اَتۡمَمۡتُ عَلَیۡکُمۡ نِعۡمَتِیۡ وَ رَضِیۡتُ لَکُمُ الۡاِسۡلَامَ دِیۡنًا …………………..

আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীন তথা ধর্মকে পরিপূর্ণ করলাম এবং তোমাদের উপর আমার নেআমত সম্পূর্ণ করলাম ও তোমাদের জন্য দ্বীন হিসেবে পছন্দ করলাম ইসলামকে।

রাসূলের ইন্তিকালের সময় ওমর রা.

১২ রবিউল আউয়াল ১০ হিজরীতে যখন রাসূল সা. ইন্তিকাল করলেন তখন মুসলমানদের মধ্যে নেমে এলো শোকের ছায়া।

এমন সংবাদ অনেক সাহবীকে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করে দিয়েছিল। হযরত ওমর রা. এমন ঘটনা মেনে নিতে পারছিলেন না।

তিনি তরবারি নিয়ে দাঁড়িয়ে গেলেন এবং  বলতে লাগলেন, মুনাফিকেরা দাবী করছে যে, রাসূল সা. ইন্তিকাল করেছেন।

তিনি ইন্তিকাল করেন নি; বরং আল্লাহর সাথে দেখা করতে গিয়েছেন। যেমন গিয়েছিল নবী মুসা আ.।

যে বলবে রাসূল ইন্তিকাল করেছেন আমি তার হাত-পা কেঁটে ফেলবো।

আবু বকর রা. সে সময় মদীনার বাহিরে ছিলেন। এমন সংবাদ পাওয়ার পর তিনি তাড়াতাড়ি রাসূলের ঘরে আসলেন।

এরপর গেলেন আয়েশার ঘরে। সেখানে রাসূল সা. বিছানায় শোয়া। তাকে একটি ইয়ামেনী চাদর দিয়ে ডেকে রাখা হয়েছিল।

আবু বকর রা. চাদর সরিয়ে রাসূলের চেহারা মোবাকরে চুমু দিলেন। আর বললেন, আমার বাবা-মা আপনার জন্য কুরবান হোক।

আল্লাহ আপনার জন্য যেই মৃত্যু নির্ধারণ করে রেখেছেন, তার স্বাদ আপনি পেয়ে গেছেন। এরপরে আপনার আর কোনো মৃত্যু হবে না।

রাসূলের ইন্তিকালের পর আবু বকরের ভাষণ

এরপর আবু বকর রা. বাহিরে বের হয়ে দেখলেন ওমর রা. তখনো কথা বলে যাচ্ছেন। তিনি তাকে বললেন, শান্ত হও ওমর।

আবু বকর রা. মসজিদের মিম্বারে উঠলেন। এরপর বলতে শুরু করলেন, হে লোকসকল! যারা মুহাম্মাদের ইবাদত করতো তারা জেনে রাখ, তিনি মারা গেছেন।

আর যারা আল্লাহর ইবাদত করতো তারা জেনে রাখ, আল্লাহ চিরঞ্জিব। তার কোনো মৃত্যু নেই।

এরপর তিনি সূরা আলে ইমরানের ১৪৪ নং আয়াত তেলওয়াত করলেন,

وَ مَا مُحَمَّدٌ اِلَّا رَسُوۡلٌ ۚ قَدۡ خَلَتۡ مِنۡ قَبۡلِهِ الرُّسُلُ ؕ اَفَا۠ئِنۡ مَّاتَ اَوۡ قُتِلَ انۡقَلَبۡتُمۡ عَلٰۤی اَعۡقَابِکُمۡ ؕ وَ مَنۡ یَّنۡقَلِبۡ عَلٰی عَقِبَیۡهِ فَلَنۡ یَّضُرَّ اللّٰهَ شَیۡئًا ؕ وَ سَیَجۡزِی اللّٰهُ الشّٰکِرِیۡنَ

আর মুহাম্মাদ তো কেবল একজন রাসূল। তার পূর্বে নিশ্চয় অনেক রাসূল বিগত হয়েছে। যদি সে মারা যায় অথবা তাকে হত্যা করা হয়, তবে তোমরা কি তোমাদের পেছনে ফিরে যাবে ? আর যে ব্যক্তি পেছনে ফিরে যায়, সে কখনো আল্লাহর কোন ক্ষতি করতে পারে না। আর আল্লাহ অচিরেই কৃতজ্ঞদের প্রতিদান দেবেন।

হযরত আবু হুরায়রা রা. বলেন, এই আয়াত শোনার পর আমাদের মনে হলো এমন আয়াত যেন আমরা জানতাম না। মাত্র নাজিল হয়েছে।

আর ওমর রা. বললেন, আল্লাহর কসম! আবু বকর যখন এই আয়াত তেলওয়াত করলেন তখন আমার মাথা ঘোরাতে লাগলো।

আমার পা নিয়ন্ত্রণ হারালো। আমি জমিনে পড়ে গেলাম। তখনই আমার বিশ্বাস হলো যে, রাসূল সা. এর ইন্তিকাল হয়েছে।

তথ্যসুত্র

জীবন ও কর্ম: ওম রা.। খন্ড ১। পৃষ্ঠা ১৩৭-১৮২

বিশেষ দ্রষ্টব্য: আমাদের লেখাগুলো সূচিপত্র অনুযায়ী দেখুন www.subject.arhasan.com এই ওয়েবসাইটে। আমরা কোন প্রকাশনীর বই রেফারেন্স হিসেবে ব্যবহার করি তা জানতে ভিজিট করুন www.arhasan.com/book এই ওয়েবসাইটে। আমাদেরকে গুগল নিউজে ফলো করতে পারেন এই লিংক থেকে। আমাদের ইউটিউব চ্যানেল ভিজিট করুন এই লিংক থেকে। এই লেখার লেখক সম্পর্কে আরো জানুন এই লিংক থেকে

রাসূল সা. কবে ইন্তিকাল করেন

১২ রবিউল আউয়াল ১০ হিজরী। আর আমরা এই দিনটি আনন্দের সাথে পালন করি। এটা খুবই গর্হিত কাজ

আবু বকর রা. কোন আয়াত তেলওয়াত করেন নবীজির ইন্তিকালের পর

সূরা মায়েদার ১৪৪ নং আয়াত

আমি একজন ইসলামিক আলোচক, লেখক। ছোটবেলায় পড়ালেখা করেছি কওমী মাদ্রাসায়। পরবর্তীতে সাইন্স বিভাগ থেকে এসএসসি পরীক্ষা দিয়ে কৃতিত্বের সাথে পাশ করি। বর্তমানে আমি ডিপ্লোমা ইন মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং এ অধ্যায়নরত। অবসরে আমি বই পড়তে পছন্দ করি। নতুন কিছু শিখতে, নতুন কিছু জানতে ভালোবাসি। আমার ইচ্ছা, ভালো মানুষ হয়ে সমাজকে সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজে বিরত রাখার চেষ্টা করা।

https://www.arhasan.com