মদীনায় আবু বকর এর হিজরত

মদীনায় আবু বকর এর হিজরত – মক্কায় কাফেরদের নির্যাতন ক্রমে ক্রমেই বাড়তে লাগলো। প্রায় ৭০ জনের মতো মুসলমান কাফেরদের নির্যাতন থেকে মুক্তিলাভের আশায় হাবশা তথা ইথিওপিয়ায় হিজরত করেন।

কিছু মুসলমান মক্কায় অবস্থান করছিলেন। কেউ বা মক্কার আশেপাশে অবস্থান করছিলেন। হযরত আবু বকর রা. একবার হাবশায় হিজরত করতে গিয়েও ফিরে এসেছেন।

কিন্তু ফিরে আসার পর কাফেরদের নির্যাতন আগের চেয়েও বেড়ে গেল। তিনি নবীজিকে বললেন, হে আল্লাহর রাসূল!

আমাকে অন্যান্য সাহাবীর মতো মদীনায় হিজরতের অনুমতি দিন।

রাসূল সা. তখন তাকে বললেন, তাড়াহুড়ো করো না। সম্ভবত আল্লাহ তোমাকে আমার সঙ্গে হিজরতের সৌভাগ্য দান করবেন।

মদীনায় আবু বকর এর হিজরত

মদীনায় হিজরতের অনুমতি

হযরত আয়েশা রা. তখনকার ঘটনাটা বিস্তারিত বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, রাসূল সা. সকাল কিংবা সন্ধায় একবার হলেও আমাদের বাসায় আসতেন।

কিন্তু যেদিন তিনি আল্লাহর পক্ষ থেকে হিজরতের অনুমতিপ্রাপ্ত হন সেদিন দুপুরেই চলে আসেন আমাদের বাসায়

অসময়ে আবু বকর রা. নবীজিকে আসতে দেখে বলে উঠলেন,

নিশ্চয় বড় কোনো ঘটনা ঘটে গেছে। নবীজি ঘরে প্রবেশ করার পর আবু বকর রা. খাট থেকে নেমে যান।

তখন সেই ঘরে আবু বকর, আয়েশা এবং আসমা রা. ছিল

রাসূল সা. আবু বকরকে বললেন, তুমি ছাড়া বাকিদেরকে অন্য ঘরে যেতে বলো। আবু বকর রা. বললেন, হে আল্লাহর রাসূল!

ব্যাপার কি? এখানে তো কেবল আমার মেয়েরাই আছে। নবীজি তখন বললেন, হিজরতের অনুমতি পাওয়া গেছে। আর তুমি আমার সাথে যাবে।

এই সূসংবাদ শুনে আবু বকর রা. কেঁদে ফেললেন।

আয়েশা রা. এই ঘটনা বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন, আনন্দে যে কেউ কখনো ক্রন্দন করে, তা আগে জানতাম না।

এরপর আবু বকর রা. দুইটি উট নিয়ে এসে নবীজিকে দিয়ে বললেন, এর একটি আপনার। নবীজি তখন বললেন, আমি পারিশ্রমিক আদায়ের শর্তে নিতে রাজী আছি।

প্রস্তুতি

মদীনায় আবু বকর এবং নবীজির হিজরত – হযরত আবু বকর রা. এর পরিবার সফরের মালসামানা প্রস্তুত করেন। কিভাবে এবং কোন রাস্তা ধরে অতিক্রম করবেন, সেটাও ভেবে নেন তারা।

বনু আদি গোত্রের অন্যতম শাখা হলো বনু দাইল। এই দাইল গোত্রের আব্দুল্লাহ ইবনে উরাইকিত নামক এক ব্যক্তিকে পারিশ্রমিকের বিনিময়ে পথপ্রদর্শক হিসেবে নিযুক্ত করা হয়।

সে ছিল মূলত মূর্তিপূজক। কিন্তু বিশ্বস্ত ছিল। কিভাবে কখন এবং কোন জায়গা থেকে সে আবু বকর এবং নবীজিকে ‍নিয়ে মদীনার উদ্দেশ্যে গমন করবে, তা আগেই ঠিক করা হয়।

এরপর কাঙ্খিত মূহুর্তে নবীজি এবং আবু বকর রা. বেরিয়ে পড়েন। তারা মক্কা থেকে তিন মাইল দক্ষিণ পূর্বে সাওর পাহাড়ের গুহায় অবস্থান করেন।

এই পাহাড়ের উচ্চতা হলো, সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৭৪৮ মিটার। নবীজি এবং আবু বকর রা. প্রায় তিনদিন এই পাহাড়ে আত্মগোপন করে থাকেন।

আত্মগোপন থাকাকালীন অবস্থা

একদিন হঠাৎ কাফেররা দেখতে পেল, নবীজি এবং আবু বকর কেউই মক্কায় নেই। অনেক খোঁজাখুজি করেও তাদের পাওয়া যাচ্ছে না। শুরু হলো তাদের তল্লাশী।

হযরত আবু বকর রা. এর সন্তান আব্দুর রহমান রাতের আধাঁরে সাওর গুহায় চলে যেতেন আবার ভোরের আলো ফোঁটার পূর্বেই মক্কায় চলে আসতেন।

এতে মনে হতো, তিনি মক্কায় অবস্থান করছেন। তিনি নবীজিকে এবং আবু বকরকে সারাদিন মক্কায় ঘটে যাওয়া সংবাদগুলো বলতেন।

রাত কিছুটা গভীর হলে আবু বকর রা. এর গোলাম আমির বিন ফুহাইরা বকরির পাল নিয়ে সাওর গুহায় চলে যেতেন। সেখানে তারা বকরির দুধ পান করে নিজেরেদ ক্ষুধা নিবরণ করতেন।

মুশরিকরা আবু বকর এবং নবীজিকে হন্যে হয়ে খুঁজতে থাকে। তাদের একটি দল সাওর গুহার নিকটে চলে আসে। কিন্তু তারা ধোঁকায় পড়ে যায়।

আবু বকর রা. তখন কম্পিত কণ্ঠে বললেন, কাফেররা যদি তাদের পায়ের দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ করে তাহলে আমাদের সহজেই দেখে ফেলবে।

নবীজি তখন বললেন, ভয় পেয়ো না। আল্লাহ আমাদের সাথে আছেন।

মদীনায় যাত্রা

অবশেষে কাফেররা নিরাশ হয়ে ফিরে গেল। তিনদিন পর আব্দুল্লাহ ইবনে উরাইকিতের সাথে নবীজি এবং আবু বকর সফরে বেরিয়ে পড়েন।

সে মক্কা থেকে মদীনায় যাওয়ার পরিচিত পথে না গিয়ে অপরিচিত একটি পথ ধরে অগ্রসর হয়েছে। অবশেষে নবীজি এবং আবু বকর রা. মদীনায় পৌঁছলেন।

মদীনায় আনন্দের জোয়ার বয়ে গেল। মানুষ দলে দলে বের হয়ে সম্ভাষণ জানাতে লাগলো। ছোট্ট শিশুরা গাইতে লাগলো,

طلع البدر علينا

পূর্ণিমার চাঁদ আমাদের উপর(কাছে) এসেছে

من ثنيات الوداع

ওয়া’দা‘ উপত্যকা থেকে (যে উপত্যকা দিয়ে হযরত মুহাম্মদ (দ.) মদিনায় প্রবেশ করেন)

وجب الشكر علينا

এবং তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা আমাদের অবশ্য কর্তব্য

ما دعى لله داع

যতদিন আল্লাহকে ডাকার মত কেউ থাকবে

أيها المبعوث فينا

ওহ, আমাদের পথ প্রর্দশক আজকে আমাদের মধ্যে

جئت بالأمر المطاع

যিনি (আল্লাহর পক্ষ থেকে )আদেশ/উপদেশ নিয়ে এসেছেন যার প্রতি আমাদের কর্ণপাত করতে হবে।

جئت شرفت المدينة

আপনি এই শহরের জন্য প্রশংসা/মর্যাদা বয়ে নিয়ে এসেছেন

مرحبا يا خير داع

স্বাগতম আপনাকে, যিনি আমাদের সঠিক পথ দেখাবেন/সঠিক পথ সম্বন্ধে বলবেন

তথ্যসুত্র

১. আবু বকর সিদ্দিক রা.। আলী সাল্লাবী। পৃষ্ঠা ৭৯-৮৫

২. আবু বকর রা. এর জীবনী। পৃষ্ঠা ৫৭-৬৮

৩. আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া। ইসলামিক ফাউন্ডেশন। খণ্ড ৩। পৃষ্ঠা ৩২৫-৩৫৭

৪. আর রাহিকুল মাখতুম। খাদিজা আখতার রেজায়ী। পৃষ্ঠা ১৭৩-১৮৩

(বিশেষ দ্রষ্টব্য: যদি কেউ বিস্তারিত পড়তে আগ্রহী হন, উপরোক্ত কিতাবগুলোর নির্ধারিত পৃষ্ঠাগুলো অধ্যায়ন করলে জানতে পারবেন ইনশাল্লাহ।)

FAQ

মদীনায় হিজরতের সময় আবু বকর এবং নবীজি কোথায় তিনদিন অবস্থান করেন?

সাওর পাহাড়ের গুহায়।

হিজরতের সময় পথপদর্শক কে ছিল?

আমির বিন ফুহাইরা

কেন নবীজি হিজরত করলেন?

কাফেররা নবীজিকে হত্যার পরিকল্পনা করেছিল। তাই আল্লাহ নবীজিকে হিজরত করতে বললেন।

আমি একজন ইসলামিক আলোচক, লেখক। ছোটবেলায় পড়ালেখা করেছি কওমী মাদ্রাসায়। পরবর্তীতে সাইন্স বিভাগ থেকে এসএসসি পরীক্ষা দিয়ে কৃতিত্বের সাথে পাশ করি। বর্তমানে আমি ডিপ্লোমা ইন মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং এ অধ্যায়নরত। অবসরে আমি বই পড়তে পছন্দ করি। নতুন কিছু শিখতে, নতুন কিছু জানতে ভালোবাসি। আমার ইচ্ছা, ভালো মানুষ হয়ে সমাজকে সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজে বিরত রাখার চেষ্টা করা।

https://www.arhasan.com