আবু বকর সিদ্দিক

খলিফা হযরত আবু বকর সিদ্দিক রা. ছিলেন নবী সা. এর অন্যতম সঙ্গী ও মুসলমানদের প্রথম খলিফা। তিনি রাসূল সা. এর দুই বছর পরে মক্কা নগরীতে জন্মগ্রহণ করেন।

আবু বকর সিদ্দিক রা. জন্মগ্রহণ করেন কুরাইশদের বিখ্যাত বনু তাইম গোত্রে। শৈশবে আবু বকর সিদ্দিক এর নাম রাখা হয়েছিল আব্দুল কা’বা। যার বাংলা অর্থ হলো কা’বার গোলাম।

ইসলাম গ্রহণ করার পর হুজুর সা. তার নাম পরিবর্তন করে আব্দুল্লাহ রাখেন। পরবর্তীতে তাকে সিদ্দীক ও আতীক শব্দ উপাধী হিসেবে দেয়া হয়।

এই লেখায় যা যা থাকছে :

পিতা

আবু বকরের পিতা হযরত আবু কুহাফা রা. এর মূল নাম হলো, উসমান ইবনে আমের আল তাইমী আল কুরাইশী।

উসমান ইবনে আমের আল কুহাফা জন্মগ্রহন করেন ১ জুলাই ৫৪২ খৃষ্টাব্দে। তার জন্মস্থান হলো, আরবের অন্যতম উল্লেখযোগ্য শহর মক্কায়।

আবু কুহাফা রা. মক্কা বিজয়ের দিন ইসলাম গ্রহণ করেন। তিনি প্রায় ৯৭ বছর হায়াত পেয়েছিলেন।

খলিফা ওমর রা. যামানায় তিনি ইন্তিকাল করেন।

অর্থাৎ তার ছেলে আবু বকর সিদ্দিক রা. তার আগে ইন্তিকাল করেন। যখন আবু কুহাফা তার ছেলে আবু বকরের মৃত্যুর সংবাদ পেলেন তখন তিনি বললেন,

এটা তো বড় একটি বিপর্যয়। এখন তার পরে কে খলিফা হয়েছে? লোকেরা বললো, ওমর খলিফা হয়েছে। তখন আবু কুহাফা বললেন, সে আবু বকরের সঙ্গী ছিল।

মা

সালমা বিনতে সাখর রা. ছিলেন বিখ্যাত সাহাবী আবু বকর সিদ্দিক রা. এর মা।

তিনি মক্কার গুরুত্বপূর্ণ মহিলাদের একজন ছিলেন। লোকেরা তাকে উম্মুল খায়ের নামে চিনতো।

তিনি আবু কুহাফার বড় ভাইয়ের মেয়ে ছিলেন। সালমা বিনতে সাখর রা. ইসলাম গ্রহণ করেন ইসলামের সূচনালগ্নেই।

হযরত আবু কুহাফা রা. এর মতো সালমা বিনতে সাখরও দীর্ঘ হায়াত লাভ করেন। সালমা বিনতে সাখর ১৩ হিজরীতে ইন্তিকাল করেন।

সে সময় খলিফা ছিলেন আবু বকর সিদ্দিক রা.। অন্য এক একটি মত অনুযায়ী তিনি ওমর রা. এর খেলাফতকালে ইন্তিকাল করেন।

আবু বকর সিদ্দিক রা. এর স্ত্রী-সন্তানগণ

তিনি বিয়ে করেছিলেন ৪ টি। তার সন্তান ছিল মোট ছয়জন। তাদের মধ্যে তিনজন ছেলে এবং তিনজন মেয়ে।

তার স্ত্রীগণ হলেন,

১. কাতিলা বিন আব্দুল ওজ্জা (তালাকপ্রাপ্ত)

২. উম্মে রুমান বিন আমের রা.

৩. আসমা বিনতে উমায়েস রা.

৪. হাবিবা বিনতে খারিজা রা.

তার সন্তানগণ হলেন,

আব্দুর রহমান বিন আবু বকর সিদ্দিক রা.

আব্দুল্লাহ বিন আবু বকর সিদ্দিক রা.

মুহাম্মাদ বিন আবু বকর সিদ্দিক রা.

আসমা বিনতে আবু বকর সিদ্দিক রা.

আয়েশা বিনতে আবু বকর সিদ্দিক রা.

উম্মে কুলসুম বিনতে আবু বকর সিদ্দিক রা.

জ্ঞানী ব্যক্তি হিসেবে আবু বকর সিদ্দিক রা.

জাহিলিয়্যাতের যুগ থেকেই আবু বকর সিদ্দিক রা. মক্কার সম্রান্ত নেতৃত্বস্থানীয় ব্যক্তিদের একজন ছিলেন।

তিনি বংশ তালিকার জ্ঞান তথা ইলমুল আনসাব বিষয়ে পূর্ণ জ্ঞানের অধিকারী ছিলেন।

মানুষ যখন সম্পদ বন্টনের সময় বংশ তালিকা প্রয়োজন পড়তো প্রাচীন আরবের নীতি অনুযায়ী,

আবু বকর সিদ্দিক রা. এর নিকট আসলে তিনি তাদের বংশ পরিচয় বলে দিতেন।

তিনি যখন বংশের ব্যাপারগুলো উল্লেখ করতেন তখন অন্যান্য কবি-সাহিত্যিকদের ন্যায় বংশের খারাপ ব্যক্তিদের হেয়-প্রতিপন্ন করতেন না।

ব্যবসায়ী হিসেবে আবু বকর সিদ্দিক রা.

ইসলাম আসার পূর্বে আরবের লোকেরা ব্যবসার মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করতো। আরবের প্রতিটি গোত্রই কোনো না কোনোভাবে ব্যবাসার সাথে জড়িত ছিল।

হযরত আবু বকর সিদ্দিক রা. ইসলাম গ্রহণের পূর্বে ছিলেন একজন খ্যাতিমান ব্যবসায়ী।

তিনি ব্যবসার জন্য শাম, বসরাসহ আরো বিভিন্ন স্থানে পণ্য নিয়ে যেতেন।

তিনি কাপড়ের ব্যবসা করতেন। সে সময় মক্কার খ্যাতিমান ব্যবসায়ীদের সাথে তার উঠাবসা ছিল।

হযরত খাদীজা রা. যেই মহল্লায় বসবাস করতেন আবু বকর সিদ্দিক ও সেই মহল্লায় বসবাস করতেন।

আবু বকর সিদ্দিক ব্যবসার পুঁজি ছিল ৪০ হাজার দিরহাম। যা বর্তমান বাংদেশের বাজার মূল্য হিসেবে ১৫,৬০০,০০০ টাকা।

জাহেলী যুগ থেকে তিনি মেহমানদারিতে প্রসিদ্ধ ছিলেন। গরীব-অসহায়দের জন্য তিনি উদারচিত্তে খরচ সম্পদ খরচ করতেন।

আবু বকর সিদ্দিক রা. এর ইসলাম গ্রহণ

ইসলামের শুরুর দিকেই আবু বকর সিদ্দিক রা. ইসলাম গ্রহণ করেন।

৪০ বছর বয়সে নবীজি ওহীপ্রাপ্ত হওয়ার পর সর্বপ্রথম তিনি তার স্ত্রী খাতিজা রা. কে ইসলামের দাওয়াত দেন। খাদিজা রা. সাথে সাথে ইসলাম গ্রহণ করেন।

পরবর্তীতে নবীজি তার বিশ্বস্ত বন্ধু আবু বকর সিদ্দিক রা. কে দাওয়াত প্রদান করেন।

তিনিও সাথে সাথে ইসলাম গ্রহণ করে নেন। কোনো প্রশ্ন করেন নি।

সিরাতের কিতাবে এই ঘটনা এভাবে উল্লেখ আছে, নবীজি আবু বকর সিদ্দিককে দাওয়াত দেন এভাবে,

আমি আল্লাহর নবী। আমাকে আল্লাহ এই দাওয়াত দিয়ে পাঠিয়েছেন যে, কেবল আল্লাহর ইবাদত করো। তার সঙ্গে কাউকে শরীক করো না।

তিনি ব্যতীত কারো ইবাদত করো না এবং তার আনুগত্য করো ও তার উপর ভালোবাসা স্থাপন করো।

তখন আবু বকর সিদ্দিক রা. কোনো কথা না বলে সাথে সাথে ইসলাম গ্রহণ করে নেন।

আবু বকর সিদ্দিক রা. এর দাওয়াতি কার্যক্রম

ইসলাম গ্রহণের পর আবু বকর সিদ্দিক রা. দাওয়াতি কাজে নেমে পড়লেন।

তিনি তার আশেপাশের বন্ধুদের ও ব্যবসায়ীদের ইসলামের দাওয়াত প্রদান করেন।

তখন তার দাওয়াতে যুবায়ের ইবনে আওয়াম রা., উসমান ইবনে আফফান রা., তালহা বিন উবায়দুল্লাহ রা., সাদ বিন আবি ওয়াক্কাস রা., আবু উবায়দা ইবনে জাররাহ রা., উসমান ইবনে মাজউন রা., আব্দুর রহমান ইবনে আউফ রা., আবু সালামা ইবনে আবদিল  আসাদ রা, আরকাম রা, প্রমুখ সাহাবারা ইসলাম গ্রহণ করেন।

কাফেরদের নির্যাতন

মক্কায় যখন চুপি চুপি ইসলামের দাওয়াতি কার্যক্রম চলতে লাগলো তখনই মুসলমাদের উপর শুরু হলো নির্যাতন।

চির পরিচিত ধর্মকে ত্যাগ করে আল্লাহর একত্ববাদে বিশ্বাসীরা মক্কার মূর্তিপূজকদের নিকট ছিল পথভ্রষ্ট এবং স্ব-ধর্মত্যাগী।

হযরত আবু বকর সিদ্দিক রা. নবীজির নিকট আবেদন করেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমাদেরকে প্রকাশ্যে দাওয়াতের অনুমতি দিন।

নবীজির নিকট বারবার পীড়াপীড়ি করার কারণে তিনি অনুমতি দেন।

নবীজি তখন সাহাবাদের নিয়ে কা’বার চত্বরে যান। এরপর স্ব স্ব গোত্রের নিকট বসেন।

তখন আবু বকর সিদ্দিক রা. দাঁড়িয়ে ভাষণ দেয়া শুরু করলেন।

তিনি মানুষকে নিরাকার আল্লাহর পথে ডাকছিলেন। মূর্তিপূজা ত্যাগ করে মানুষকে ইসলামের পথে আহবান করছিলেন।

এই বক্তব্য শুনে মূর্তিপূজক কাফেররা ক্ষিপ্ত হয়ে আবু বকর সিদ্দিক এবং উপস্থিত সাহাবাদের উপর হামলা করে।

তারা আবু বকর সিদ্দিককে এমনভাবে লাথি মারতে থাকে যে, তার নাক ফেঁটে রক্ত ঝরছিল।

আবু বকর সিদ্দিক রা. এর এমন অবস্থা দেখে বনু তাইমের লোকেরা দৌঁড়ে আসলো। তারা আবু বকর সিদ্দিককে বাড়িতে নিয়ে যায়।

আবু বকর সিদ্দিক রা. তখন অজ্ঞান হয়ে পড়ে ছিলেন। তার হুশ ছিল না।

উরওয়া ইবনে যুবায়ের রা. বলেন,

আমি একবার আব্দুল্লাহ ইবনে আমর ইবনে আসকে প্রশ্ন করি, রাসূলের সঙ্গে মুশরিকদের সবচেয়ে ধৃষ্টতাপূর্ণ অসদাচরণ কি ছিল?

জবাবে তিনি বললেন, একবার রাসূল সা. কা’বার প্রাঙ্গনে নামাজ পড়ছিলেন। এ সময়ে উকবা ইবনে আবু মুইত সেখানে আসে।

সে তার কাপড় রাসূলের গলায় পেঁচিয়ে অত্যন্ত কঠিনভাবে টেনে ধরে। সে সময় হঠাৎ আবু বকর সিদ্দিক রা. সেখানে উপস্থিত হন।

তিনি উকবাকে রাসূলের নিকট হতে দূরে সরিয়ে দেন। আর বলেন,

তোমরা কি একটি লোককে কেবল এই কারণে হত্যা করতে চাচ্ছ যে সে বলে, আমার রব আল্লাহ।

মুসলমানদের জন্য আবু বকর সিদ্দিক রা. এর সম্পদ ব্যয়

দিন দিন ইসলাম মানুষের নিকট আরো সমাদৃত হতে লাগলো। মক্কার মূর্তিপূজকরা যখন দেখলো,

গরীব এবং অসহায় গোলামরা দলে দলে ইসলামে প্রবেশ করছে তখন তারা ভয় পেয়ে যায়।

তাই সর্বদা গরীব ও অসহায়দের ইসলাম ত্যাগ করার জন্য চাপ প্রয়োগ করতো।

হযরত বেলাল রা.

তিনি ছিলেন একজন হাবশী সাহাবী। তিনি কোনো স্বাধীন পুরুষ ছিলেন না। ছিলেন একজন গোলাম বা দাস।

তার মুনিব ছিল কট্টরপন্থি কাফের উমাইয়া ইবনে খালফ।

উমাইয়া ইবনে খালফ ছিল একজন কট্টর মুর্তিপূজক। কখনো যে কেউ মূর্তির বিরুদ্ধে কথা বলবে, এটা সে সহ্য করতে পারতো না।

সে বেলাল রা. কে ইসলাম ত্যাগ করার বিনিময়ে লোভনীয় অফার করলো। তিনি ঘৃণাভরে তা প্রত্যাখ্যান করলেন। শুরু হলো তার উপর নির্যাতনের স্ট্রীম রোলার।

উমাইয়া ইবনে খালফ অন্য গোলামদের হুকুম দিলেন, বেলালকে পাথরচাপা দিয়ে রাখ। তখন গোলামরা বেলালকে ধরে পাথরচাপা দিয়ে রাখলো।

উমাইয়া ইবনে খালফ এগিয়ে এসে বললো, যতক্ষণ না তুমি লাত ও উজ্জার পূজা না করবে ততক্ষণ পর্যন্ত তুমি এই শাস্তি ভোগ করতে থাকবে।

একদিন আবু বকর সিদ্দিক রা. রাস্তার পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন। বেলালকে এমন দুরবস্থায় দেখে উমাইয়া ইবনে খালফকে বললেন,

এই লোকটির ব্যাপারে কি সৃষ্টিকর্তাকে ভয় করবে না? আর কত এই লোকটিকে নির্যাতন করবে?

উমাইয়া ইবনে খালফ বলে, তোমরাই তো তাকে পথভ্রষ্ট করেছ। তাই মন চাইলে তাকে কিনে নাও।

আবু বকর সিদ্দিক রা. তৎক্ষণাৎ বেলাল রা. কে কিনে আজাদ করে দিলেন।

আর উমাইয়া ইবনে খালফকে এর মূল্য বাবদ দিয়েছিলেন ৪০ উকিয়া স্বর্ণ। যার বর্তমান বাজারমূল্য ৬ লাখ ২৪ হাজার টাকা।

আবিসিনিয়ায় আবু বকর সিদ্দিক রা. এর হিজরত

হযরত আয়েশা রা. বর্ণনা করেন, আমার বাবা অর্থাৎ আবু বকর সিদ্দিক রা. হিজরতের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়েন। তিনি বারকুল গিমাদ পর্যন্ত চলে গিয়েছিলেন।

বারকুল গিমাদ বর্তমানে সৌদি আবরের জেদ্দা শহরের একটি এলাকার নাম।

সেখানে তার সাথে কারাহ গোত্রের সরদার ইবনে দাগানার সাথে দেখা হয়। অনেক ইতিহাসবিদ ইবনে দাগানার মূল নাম হিসেবে উল্লেখ করেছেন,

হারিস ইবনে ইয়াজিদ। আবার কেউ বলেছেন তার নাম মালিক। কতক ঐতিহাসিক লিখেছেন,

তার নাম রাবিআ বিন রাফি। আর কারাহ গোত্র হলো (হাওন ইবনে খুজাইমা) খুজাইমা গোত্রের শাখা গোত্র।

ইবনে দাগানা তাকে জিজ্ঞাসা করেন, হে আবু বকর সিদ্দিক! আপনি এত প্রস্তুত হয়ে কোথায় যাচ্ছেন?

আবু বকর সিদ্দিক রা. জবাব দিলেন, আমার জাতি আমাকে দেশ থেকে বের করে দিয়েছে। আমি এমন কোথাও চলে যেতে চাই, যেখানে আমি স্বাধীনভাবে আমার রবের ইবাদত করতে পারবো।

এটা শুনে ইবনে দাগানা আঁতকে উঠলেন। বললেন, কোনো প্রয়োজন নেই।

আপনি তো অসহায়দের সাহায্য করেন। আত্মীয়দের খেয়াল রাখেন। আপনাকে আমি নিরাপত্তা দিচ্ছি। আপনি আমার সাথে মক্কায় চলুন।

পূনরায় মক্কায় প্রত্যাবর্তন

আবু বকর সিদ্দিক রা. ইবনে দাগানার সাথে মক্কায় ফিরে আসেন। ইবনে দাগানা তখন কুরাইশদের নেতৃবর্গের সাথে সাক্ষাৎ করে বললেন,

তোমরা কি আবু বকরের মতো এমন একজন গুণধর ব্যক্তিকে তাড়িয়ে দিচ্ছ, যিনি অভাবীদের সাহায্য করে এবং আত্মীয়দের খেয়াল রাখে?

যিনি অন্যের বোঝা উঠিয়ে নেন এবং বিপদগ্রস্তদের সহায়তা করেন?

কুরাইশরা তখন ইবনে দাগানার নিরাপত্তার প্রস্তাব মেনে নেয়। তবে তারা শর্ত জুড়ে দেয় যে, তিনি ঘরের বাহিরে কোনোরূপ ইবাদত করতে পারবেন না।

আবু বকরের কা’বার প্রাঙ্গনে আসা নিষেধ। মানুষকে তিনি তার ধর্মের দিকে আহবান করতে পারবেন না।

কারণ, আমরা আশংকা করি, তার ইবাদত দেখে অথবা তার কথায় আমাদের যুবক, নারী এবং বৃদ্ধরা মূর্তিপূজা ত্যাগ করবে।

হযরত আবু বকর সিদ্দিক রা. এর কার্যক্রম

 আবু বকরের নিকট ইবনে দাগানা এই সংবাদ পৌঁছে দিলে তিনি ঘরেই ইবাদত করতে লাগলেন। ঘর থেকে বের হন না।

তখন তিনি বুদ্ধি করে তার বাড়ির আঙ্গিনায় একটি ছোট ইবাদতখানা নির্মাণ করেন। সেখানে তিনি নামাজ এবং কুরআন তেলওয়াত করতে লাগলেন।

কুরাইশদের যুবক, নারী-পুরুষরা সেখানে দাঁড়িয়ে তেলওয়াত শ্রবণ করতো। কুরাইশরা এই পরিস্থিতি দেখে ভীত হয়ে গেল।

তারা ইবনে দাগানাকে বললো, আমরা আপনার কারণে আবু বকর সিদ্দিককে তার অবস্থার উপরে ছেড়ে দিয়েছিলাম। শর্ত ছিল,

তিনি তার ঘরে নামাজ বা তেলওয়াত করবেন। কিন্তু তিনি শর্ত ভঙ্গ করে ঘরের বাহিরে ইবাদতখানা বানিয়ে সেখানে নামাজ এবং তেলওয়াত করছেন।

এর ফলে অনেকেই বিভ্রান্ত হয়ে যাচ্ছে। যদি সে এমন করতে থাকে তাহলে আপনি তার নিরাপত্তা উঠিয়ে নিন।

আবু বকরের নিকট ইবনে দাগানা এই কথা বলার পর আবু বকর সিদ্দিক বললেন,

ঠিক আছে। আপনি জিম্মাদারী উঠিয়ে নিন। আল্লাহর নিকট আমি নিরাপত্তা কামনা করছি।

নিরাপত্তা উঠিয়ে নেয়ার পর

ইবনে দাগানা নিরাপত্তা উঠিয়ে নেয়ার পর একবার কা’বার প্রাঙ্গনে গেলেন। তখন কুরাইশদের একজন ব্যক্তি আবু বকরের মাথায় মাটি ঢেলে দেয়।

তখন আবু বকরের পাশ দিয়ে ওয়ালিদ ইবনে মুগিরা অতিক্রম করছিল। আবু বকর সিদ্দিক তাকে বললেন, দেখুন সে কি কাজটি করলো!

ওয়ালিদ ইবনে মুগিরা বললো, এটা তো তোমার কর্মফল। তখন আবু বকর সিদ্দিক এই কথা বলতে বলতে চলে গেলেন, আমার সৃষ্টিকর্তা কতই না ধৈর্যশীল!

মদীনায় আবু বকর সিদ্দিক রা. এর হিজরত

হযরত আয়েশা রা. তখনকার ঘটনাটা বিস্তারিত বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, রাসূল সা. সকাল কিংবা সন্ধায় একবার হলেও আমাদের বাসায় আসতেন।

কিন্তু যেদিন তিনি আল্লাহর পক্ষ থেকে হিজরতের অনুমতিপ্রাপ্ত হন সেদিন দুপুরেই চলে আসেন আমাদের বাসায়।

অসময়ে আবু বকর সিদ্দিক রা. নবীজিকে আসতে দেখে বলে উঠলেন,

নিশ্চয় বড় কোনো ঘটনা ঘটে গেছে। নবীজি ঘরে প্রবেশ করার পর আবু বকর সিদ্দিক রা. খাট থেকে নেমে যান।

তখন সেই ঘরে আবু বকর সিদ্দিক, আয়েশা এবং আসমা রা. ছিল।

রাসূল সা. আবু বকর সিদ্দিককে বললেন, তুমি ছাড়া বাকিদেরকে অন্য ঘরে যেতে বলো। আবু বকর সিদ্দিক রা. বললেন, হে আল্লাহর রাসূল!

ব্যাপার কি? এখানে তো কেবল আমার মেয়েরাই আছে। নবীজি তখন বললেন, হিজরতের অনুমতি পাওয়া গেছে। আর তুমি আমার সাথে যাবে।

এই সূসংবাদ শুনে আবু বকর সিদ্দিক রা. কেঁদে ফেললেন।

আয়েশা রা. এই ঘটনা বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন, আনন্দে যে কেউ কখনো ক্রন্দন করে, তা আমি আগে জানতাম না।

এরপর আবু বকর সিদ্দিক রা. দুইটি উট নিয়ে এসে নবীজিকে দিয়ে বললেন, এর একটি আপনার। নবীজি তখন বললেন, আমি পারিশ্রমিক আদায়ের শর্তে নিতে রাজী আছি।

প্রস্তুতি

হযরত আবু বকর সিদ্দিক রা. এর পরিবার সফরের মালসামানা প্রস্তুত করেন। কিভাবে এবং কোন রাস্তা ধরে অতিক্রম করবেন, সেটাও ভেবে নেন তারা।

বনু আদি গোত্রের অন্যতম শাখা হলো বনু দাইল। এই দাইল গোত্রের আব্দুল্লাহ ইবনে উরাইকিত নামক এক ব্যক্তিকে পারিশ্রমিকের বিনিময়ে পথপ্রদর্শক হিসেবে নিযুক্ত করা হয়।

সে ছিল মূলত মূর্তিপূজক। কিন্তু বিশ্বস্ত ছিল। কিভাবে কখন এবং কোন জায়গা থেকে সে আবু বকর সিদ্দিক এবং নবীজিকে ‍নিয়ে মদীনার উদ্দেশ্যে গমন করবে, তা আগেই ঠিক করা হয়।

এরপর কাঙ্খিত মূহুর্তে নবীজি এবং আবু বকর সিদ্দিক রা. বেরিয়ে পড়েন। তারা মক্কা থেকে তিন মাইল দক্ষিণ পূর্বে সাওর পাহাড়ের গুহায় অবস্থান করেন।

এই পাহাড়ের উচ্চতা হলো, সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৭৪৮ মিটার। নবীজি এবং আবু বকর সিদ্দিক রা. প্রায় তিনদিন এই পাহাড়ে আত্মগোপন করে থাকেন।

আত্মগোপন থাকাকালীন অবস্থা

একদিন হঠাৎ কাফেররা দেখতে পেল, নবীজি এবং আবু বকর সিদ্দিক কেউই মক্কায় নেই। অনেক খোঁজাখুজি করেও তাদের পাওয়া যাচ্ছে না। শুরু হলো তাদের তল্লাশী।

হযরত আবু বকর সিদ্দিক রা. এর সন্তান আব্দুর রহমান রাতের আধাঁরে সাওর গুহায় চলে যেতেন আবার ভোরের আলো ফোঁটার পূর্বেই মক্কায় চলে আসতেন।

এতে মনে হতো, তিনি মক্কায় অবস্থান করছেন। তিনি নবীজিকে এবং আবু বকর সিদ্দিককে সারাদিন মক্কায় ঘটে যাওয়া সংবাদগুলো বলতেন।

রাত কিছুটা গভীর হলে আবু বকর সিদ্দিক রা. এর গোলাম আমির বিন ফুহাইরা বকরির পাল নিয়ে সাওর গুহায় চলে যেতেন। সেখানে তারা বকরির দুধ পান করে নিজেরেদ ক্ষুধা নিবরণ করতেন।

মুশরিকরা আবু বকর সিদ্দিক এবং নবীজিকে হন্যে হয়ে খুঁজতে থাকে। তাদের একটি দল সাওর গুহার নিকটে চলে আসে। কিন্তু তারা ধোঁকায় পড়ে যায়।

আবু বকর সিদ্দিক রা. তখন কম্পিত কণ্ঠে বললেন, কাফেররা যদি তাদের পায়ের দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ করে তাহলে আমাদের সহজেই দেখে ফেলবে।

নবীজি তখন বললেন, ভয় পেয়ো না। আল্লাহ আমাদের সাথে আছেন।

মদীনায় যাত্রা

অবশেষে কাফেররা নিরাশ হয়ে ফিরে গেল। তিনদিন পর আব্দুল্লাহ ইবনে উরাইকিতের সাথে নবীজি এবং আবু বকর সিদ্দিক সফরে বেরিয়ে পড়েন।

সে মক্কা থেকে মদীনায় যাওয়ার পরিচিত পথে না গিয়ে অপরিচিত একটি পথ ধরে অগ্রসর হয়েছে। অবশেষে নবীজি এবং আবু বকর সিদ্দিক রা. মদীনায় পৌঁছলেন।

বদরের যুদ্ধে আবু বকর সিদ্দিক রা.

মদীনায় হিজরতের পর সর্বপ্রথম যুদ্ধ ছিল বদরের যুদ্ধ। এই যুদ্ধের মাধ্যমেই প্রথম কাফেরদের সাথে মুসলমানদের যুদ্ধ হয়।

যেখানে মুসলমান সৈন্য ছিল মাত্র ৩১৩ জন। আর কাফেরদের সৈন্য ছিল ১০০০ জন।

রাসূল সা. তখন আল্লাহর কাছে দোয়া করতে লাগলেন।

যদি আজ মুসলমানদের পরাজয় হয় তাহলে ইসলাম এখানেই ধুলিস্যাত হয়ে যাবে। নবী কারীম সা. যুদ্ধের ময়দান বিন্যাস করলেন।

বদরের যুদ্ধে আবু বকর সিদ্দিক রা. ছিলেন  নবীজির দেহরক্ষী।

যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর যেই কাফেরই নবীজির নিকটবর্তী হতো তাকেই শেষ করে দিতেন আবু বকর সিদ্দিক রা.।

ওহুদ যুদ্ধে আবু বকর সিদ্দিক রা.

বদর যুদ্ধে পরাজয় বরণ করার পর মক্কার কাফেররা ক্রোধে অন্ধ হয়ে গিয়েছিল। তারা শপথ করলো, মুসলমানদের এক এক করে হত্যা করবে।

বদর যুদ্ধে কাফেরদের সৈন্য সংখ্যা ছিল এক হাজার আর মুসলমানদের মাত্র তিনশত তেরো জন। এই যুদ্ধে আবু জাহল, উতবা, শায়বার মতো কট্টরপন্থি কাফেরদের সলীল সমাধি ঘটলো।

ওহুদের যুদ্ধের জন্য মক্কার কাফেররা পূর্বের থেকেও বড় প্রস্তুতি গ্রহণ করলো। এই যুদ্ধে তাদের সৈন্য সংখ্যা ছিল তিন হাজার। অর্থাৎ পূর্বের থেকেও আরো তিনগুণ।

কাফেরদের যুদ্ধের প্রস্তুতি

কাফেররা বদর যুদ্ধে পরাজয় বরণ করার পর মক্কায় গিয়েই শুরু করলো যুদ্ধের প্রস্তুতি। প্রায় পূর্ণ এক বছর তারা যুদ্ধের প্রস্তুতি গ্রহণ করে।

এই সময়ে তারা প্রয়োজনীয় অস্ত্র, সৈন্য, খাদ্য ও নানাপ্রকার রণসামগ্রী সংগ্রহ করে তৃতীয় হিজরীর শাওয়াল মাসে মদীনায় আক্রমণের জন্য যাত্রা শুরু করে।

এই যুদ্ধে ৩০০০ হাজার সৈন্যের পাশাপাশি অংশগ্রহণ করে বহু কবি-সাহিত্যিক ও নারীরা। তাদের কাছ ছিল, নিস্তেজ হয়ে পড়া সৈন্যদের মনোবল জাগ্রত করা।

মুসলমানদের প্রস্তুতি

রাসূল সা. যখন জানতে পারলেন মক্কায় তারা যুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছে তখন তিনিও মুসলমানদের যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হতে বললেন।

রাসূল সা. একটি পরামর্শসভা ডাকলেন। সেখানে তিনি বললেন, যুদ্ধ কোথায় অবস্থান করে করলে ভালো হবে? তখন নবী সা. মতামত দিলেন যে, আমার মতে মদীনায় থেকেই আমরা যুদ্ধ করি।

এতে আমরা মদীনায় সকলে মিলে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারবো। আমরা তাদের উপর পাথর নিক্ষেপ করে হলেও মোকাবেলা করতে পারবো।

কিন্তু তখন এমন অনেক মুসলমান ছিল, যারা বদর যদ্ধে অংশগ্রহণ করেন নি। তাই তারা পীড়াপীড়ি করতে লাগলেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমরা মদীনা থেকে বের হয়েই যুদ্ধ করি।

রাসূল সা. শেষ পর্যন্ত সাহাবাদের কথায় মদীনার বাহিরে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুতি নিলেন। কিন্তু তিনি এতে সন্তুষ্টি ছিলেন না।

দিনটি ছিল শুক্রবার। নবীজি জুমআর নামাজ পড়ে যুদ্ধের পোশাক পরিধান করলেন। তারপর সকলকে যুদ্ধের জন্য বের হতে নির্দেশ দিলেন।

বিজ্ঞ সাহাবারা পরষ্পর বলাবলি করতে লাগলো, রাসূল তো মদীনায় থেকেই যুদ্ধ করতে চেয়েছিলেন।

কিন্তু আমরা বাধা সৃষ্টি করলাম। এখন কোন বিপদ হয়, আল্লাহই ভালো জানেন।

শেষে সাহাবারা বললো, হে আল্লাহর রাসূল! আপনি মদীনাতেই থাকুন। আমরা মদীনাতেই আপনার পাশে থেকে যুদ্ধ করবো।

রাসূল সা. বললেন, কোনো নবী যখন যুদ্ধের পোশাক পরিধান করে ফেলে তখন সেখান থেকে ফিরে আসা শোভনীয় নয়।

আমি তো তোমাদেরকে আগেই বলেছিলাম, তোমরা রাজী হলে না। এখন তোমরা ধৈর্যধারণ করো এবং তাওবা করো।

ওহুদ যুদ্ধে মুসলিম সৈন্যসংখ্যা

বদর যুদ্ধে মুসলমানরা ছিল মাত্র ৩১৩ জন। ওহুদ যুদ্ধে প্রথমে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করে ১০০০ জন। এই যুদ্ধে মুনাফিক আব্দুল্লাহ ইবনে উবাই ও ছিল।

কিছুদূর গিয়ে সে তার ৩০০ অনুসারীকে নিয়ে পিছুটান নেয়। তারা দলত্যাগ করে চলে যায়।

শেষ পর্যন্ত মুসলমানরা ছিল মাত্র ৭০০ জন। তাদেরকে নিয়েই রাসূল সা. ওহুদের ময়দানে পৌছেন।

যুদ্ধ

যুদ্ধের শুরুতেই আবু বকর সিদ্দিক রা. রাসূলের দেহরক্ষী হিসেবে নিজেকে নিযুক্ত করেন। এই যুদ্ধে রাসূল সা. এর নির্দেশ অমান্য করার কারণে বড় একটা বিপর্যয় সৃষ্টি হয়।

তখন চারিদিকে এই গুজব ছড়িয়ে পড়ে যে, মুহাম্মাদ সা. নিহত হয়েছেন। সাহাবারা এটা শুনে সম্পূর্ণ নিস্তব্ধ হয়ে যায়। তারা যেন চোখে শর্ষেফুল দেখতে থাকে।

তখন আবু বকর সিদ্দিক রা. কাফেরদের বেষ্টনি অতিক্রম করে রাসূলের নিকট পৌছে যান।

এরপর আবু উবায়দা ইবনে জাররাহ রা., আলী রা., যুবায়ের রা., তালহা রা., উমর রা., হারিসা ইবনে সাম্মাহ রা., প্রমুখ সাহাবারা রাসূলের নিকট এসে রাসূলকে কাফেরদের থেকে নিকট থেকে সরিয়ে ফেলেন।

এই সাহাবারা রাসূলের চারিপাশে বেষ্টনির ন্যায় অবস্থান করছিল। রাসূলের নিরাপত্তায় সবচেয়ে বেশি ভূমিকা রেখেছেন তালহা রা.।

তিনি মুশরিকদের চারপাশ থেকে আক্রমণ করছেন। কখনো ডাকদিক থেকে বা কখনো বামদিক থেকে। আবু বকর সিদ্দিক রা. বলেন, আমি এই সুযোগটা সম্পূর্ণ হারিয়েছি। যদি তালহার জায়গায় আমি হতাম!

এরইমধ্যে জনৈক কাফেরের আঘাতে রাসূলের দাঁত ভেঙ্গে গেল। তার চেহারায় রক্ত লাল হয়ে গেছে।

মাথায় পরিধান করা শিরস্ত্রাণ ভেঙ্গে গালের ভেতর ঢুকে পড়েছিল।

রাসূল এই কঠিন পরিস্থিতিতেও বলছিলেন, তালহার কি খবর, তার খবর নাও।

আবু বকর সিদ্দিক রা. বলেন, তখন আমরা রাসূলের চেহারা ঢুকে যাওয়া লোহার টুকরো বের করতে উদ্যত হলাম।

তখন আবু উবায়দা রা. বললেন, আল্লাহর দোহাই, এই কাজটি আমাকে করতে দিন।

আবু উবায়দা রা. দাঁত দিয়ে কামড়ে লোহার একটা টুকরো বের করলেন। লোহাকে দাঁত নিয়ে বের করার কারণে তার একটি দাঁত ভেঙ্গে গেল।

দ্বিতীয় লোহাটি আমি বের করতে চাইলে এবারও আবু উবায়দা রা. আমাকে বাধা দিয়ে তিনি কাজটি করতে চাইলেন। ফলে আবু উবায়দা রা. এর দুইটি দাঁত ভেঙ্গে গেল।

হুদাইবিয়ার দিন আবু বকর সিদ্দিক রা.

রাসূল সা. তখন মক্কায় ওমরাহ করবেন বলে ঘোষণা করে দিলেন। অনেক সাহাবারাই ইতস্তত করছিলেন, কারণ মক্কা কাফেরদের দখলে।

ইতোমধ্যেই রাসূল সা. প্রস্তুতি নিয়ে নিলেন। মদীনার ভারপ্রাপ্ত হিসেবে আব্দুল্লাহ ইবনে উম্মে মাকতূম রা. কে নিয়োগ দেয়া হলো।

এই ঘটনা সংগঠিত হয় ৬ষ্ঠ হিজরীর ১ যিলকদ তারিখে। এই দিন তিনি মক্কা অভিমুখে যাত্রা শুরু করলেন। এই সফরে রাসূলের সাথে ছিলেন উম্মুল মুমিনীন হযরত উম্মে সালামা রা.।

রাসূলের সাথে এই সফরে লোকসংখ্যা ছিল প্রায় ১৪০০ জন। তবে ইবনে কাসীর রহ. তার বিখ্যাত গ্রন্থ আল বিদায়ায় উল্লেখ করেছেন, লোকসংখ্যা ছিল ৭০০ জন।

এই সফরে ভারী কোনো যুদ্ধাস্ত্র ছিল না মুসলমানদের সাথে। তাদের নিকট অন্যান্য মুসাফিরদের ন্যায় শুধুমাত্র আত্মরক্ষার জন্য কোমরে তরবারি ছিল।

কুরাইশদের বাধা

এদিকে কুরাইশরা এই খবর শুনে অগ্নিশর্মা হয়ে ওঠে। তারা প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয় যে, মুহাম্মাদ যেন মক্কায় প্রবেশ করতে না পারে। এরপর মক্কাবাসীরা নবীজির নিকট দূত পাঠায়।

রাসূল সা. আগেই এই ইচ্ছা পোষণ করেছেন, যদি তারা স্বাভাবিক কোনো দাবী উত্থাপন করে তাহলে মক্কাবাসীদের সাথে অটুট সম্পর্ক রক্ষায় মেনে নেয়া হবে।

তবে আল্লাহর বিরুদ্ধে যায় বা ইসলামের বিরুদ্ধে যায়, এমন আইন মানা হবে না।

সন্ধির আলোচনা

সর্বপ্রথম কুরাইশদের দূত হিসেবে আগমন করে বনু খুজআর সদস্য বুদাইল ইবনে ওয়ারাকা। তিনি রাসূল কেন এসেছেন, জেনে ফিরে যান।

এরপর পর্যায়ক্রমে আরো কয়েকজন আসেন। তাদের মধ্যে একজন ছিলেন উরওয়া ইবনে মাসউদ। উরওয়ার সাথে রাসূলের আলোচনা শুরু হয়।

উরওয়া তখন মুসলমানদের মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করে তোলার জন্য বলে, হে মুহাম্মাদ! এই অভদ্র (রাসূলের সাহাবারা) লোকগুলো তো তোমার সর্বনাশ করে ছাড়বে।

মনে রেখ, কুরাইশদের সকলেই যুদ্ধের পূর্ণ প্রস্তুতি নিয়ে এবং যুদ্ধের জন্য উৎকৃষ্ট বাহন নিয়ে তোমাদের জন্য অপেক্ষা করছে। তারা এই শপথ করেছে যে, তোমাকে কিছুতেই মক্কায় প্রবেশ করতে দেয়া হবে না।

আর তোমার সাথে থাকা এই গুটিকয়েক লোকেরা তো কুরাইশদের ভয়ে তোমাকে রেখে পালিয়ে যাবে। তুমি তখন নিঃসঙ্গ হয়ে পড়বে।

আবু বকর সিদ্দিক রা. উরওয়ার এই কথা শুনে নিজেকে স্থির রাখতে পারেন নি। উরওয়াকে বললেন, তুমি ‍গিয়ে তোমার প্রতিমার কাছে বসে থাক। আমরা কি রাসূলকে যুদ্ধের ময়দানে রেখে পালিয়ে যাব?

জেনে রাখো, কখনো এমন হবে না কখনই না।

উরওয়া তখন বললো, এই লোকটি কে? নবী সা. বললেন, আবু বকর সিদ্দিক।

উরওয়া বললো, সে পূর্বে আমার উপর অনুগ্রহ করেছে। তাই তাকে কিছু বললাম না।

মক্কা বিজয়ের দিন আবু বকর সিদ্দিক রা.

মক্কা বিজয়ের দিন যখন নবী সা. সাহাবাদের নিয়ে মক্কার নিকটবর্তী হলেন তখন আবু বকর সিদ্দিকও রাসূলের পাশে ছিলেন।

নবীজি দেখতে পেলেন, নারীরা মুসলমানদের ঘোড়াগুলোর দিকে হতাশ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। নবীজি তখন আবু বকরের দিকে তাকিয়ে বললেন,

হাসসান (হযরত হাসসান বিন সাবেত রা.। একজন বিখ্যাত কবি ছিলেন তিনি) কি যেন বলেছিল?

কবিতাটি তখন আবু বকর সিদ্দিক রা. আবৃতি করলেন,

যদি আমাদের অশ্বারোহীদের ধূলি উড়িয়ে কিদার দিকে যেতে না দেখ,

তাহলে তোমরা ধ্বংস হয়ে যাও।

বর্শা চালাতে আমরা পুরোপুরিভাবে মোকাবেলা করছি,

তাদের কাঁধে রয়েছে তীর ও তরবারী।

আমাদের ঘোড়াগুলো দ্রুততায় পরষ্পরের প্রতিযোগী,

মহিলারা ওড়না দিযে ঘোড়ার ধূরের দূলি থেকে নিজের রক্ষা করে।

নবীজি তখন বললেন, হাসসান যেই দিকের কথা বলেছে, সেদিক দিয়ে মক্কায় প্রবেশ করো। অর্থাৎ কিদা এলাকা নিয়ে মক্কায় প্রবেশ করো।

মক্কা বিজয়ের দিন আবু বকর সিদ্দিক রা. এর পিতা আবু কুহাফা ইসলাম গ্রহণ করেন।

তাবুক যুদ্ধ ও আবু বকর সিদ্দিক রা.

নবী সা. নাবতীদের মাধ্যমে জানতে পারেন যে, রোমানরা মদীনা আক্রমণের প্রস্তুতি নিচ্ছে। নবীজি রোমান খৃষ্টানদের এই অগ্রযাত্রার কথা শুনে চিন্তিত হন।

মদীনাবাসীরা পূর্ব থেকেই রোমানদের আক্রমণের আশঙ্কা করতো। এই খবর শুনে তারাও বিচলিত হয়ে পড়ে।

৯ম হিজরীর ৩ রজব রোজ বৃহষ্পতিবার রাসূল সা. ৩০ হাজার সাহাবার বিশাল এক বাহিনী নিয়ে রোমানদের মোকাবেলার জন্য শামের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হন।

যখন মুসলিম বাহিনী সানিয়াতুল বিদা উপত্যকায় আসেন তখন নবীজি পুরো বাহিনীকে পরিচালনার সুবিধার্থে বিভিন্ন প্লাটুনে অধিনায়ক ও পতাকা নির্ধারণ করেন।

তখন সবচেয়ে বড় এবং মর্যাদা সম্পূর্ণ পতাকাটি ছিল আবু বকর সিদ্দিক রা. এর হাতে।

রাসূল সা. তাবুক নামক স্থানে ২০ দিন অবস্থান করলেন। মদীনা থেকে তাবুকে আসা-যাওয়া মিলিয়ে প্রায় এক মাস সময় ব্যয় হয়েছে।

নবীজির জীবদ্দশায় এই তাবুক যুদ্ধ ই ছিল তার শেষ স্বশরীরে জিহাদে যাত্রা।

আবু বকর সিদ্দিক রা. এর খেলাফতে আরোহণ

রাসূল সা. এর ইন্তিকালের পর আনসার সাহাবারা একত্রিত হলেন। তারা তখন পরষ্পর বলাবলি করতে লাগলেন, কে এখন মুসলিম উম্মাহর দায়িত্ব নিবে?

তখন আনসারদের এই আলোচনাসভার কথা হযরত আবু বকর সিদ্দিক রা. এর কানে গেল। তিনি সে সময় মসজিদে ননবীতে বসে ছিলেন।

তিনি তখন উমর রা. ও আবু উবাইদা রা. কে নিয়ে উক্ত আলোচনাসভায় উপস্থিত হলেন। এরপর তিনি সকলকে উদ্দেশ্য করে ইসলামের সূচনাকাল থেকে নিয়ে তখন পর্যন্ত দ্বীনের জন্য সকলের ত্যাগ তিতিক্ষা বর্ণনা করলেন।

সে সময় তিনি রাসূলের বর্ণিত ছোট ছোট হাদীসগুলোও তিনি বর্ণনা করেন।

তিনি তখন উপস্থিত জনতাকে স্মরণ করিয়ে দিলেন যে,

এ সময়ে কুরাইশদের হাতেই নেতৃত্ব অর্পন করার মাঝে কল্যান নিহিত আছে। কারণ রাসূল সা. সা’দ বিন উবাদা রা. এর উপস্থিতিতেই বলেছিলেন,

“নেতৃত্বের দায়িত্ববান হলো কুরাইশরা। ভালো লোকেরা তাদের ভালো লোকদের পেছনেই চলতে পছন্দ করে। আর মন্দরা মন্দদেরকেই অনুসরণ করে।”

তখন সা’দ বিন উবাদা রা. বলেন, আপনি সঠিক বলেছেন। আমরা পরামর্শদাতা হবো আর আপনারা শাসক হবেন।

বশির বিন সা’দ রা. এর ভাষণ

সে সময় আনসারদের মধ্য হতে হযরত বশির বিন সাদ রা. বললেন,

হে আনসার সম্প্রদায়! নিঃসন্দেহে আমরা মুশরিকদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের ময়দানে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছি।

যার পেছনে আমাদের মূল লক্ষ্য ছিল আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন ও রাসূলের আনুগত্য প্রদর্শন।

তাই এটা আমাদের জন্য মোটেও শোভনীয় হবে না যে, আমরা তুচ্ছ পদ-পদবী নিয়ে ঝগড়া বিবাদ করবো। নিঃসন্দেহে রাসূল কুরাইশ বংশের ছিলেন। তাই তার নায়েব বা প্রতিনিধি ও তার বংশ থেকে হওয়া উত্তম।

এতে খলিফা নিযুক্ত হওয়ার বিষয়টি সহজ হয়ে যায়। তখন উক্ত মসলিসে এটা চূড়ান্ত হয় যে, খলিফা একজনই হবেন এবং সেটা কুরাইশদের মধ্য থেকেই নিযুক্ত হবে।

তাই আবু বকর সিদ্দিক রা. উপস্থিত ব্যক্তিদের বললেন, তাহলে এর পরবর্তী বিষয়টারও সমাধান হয়ে যাক। তাই তিনি বললেন, তোমরা উমর অথবা আবু উবায়দার হাতে বাইয়াত হয়ে যাও।

ওমর রা. এর খলিফা হতে অস্বীকৃতি

আবু বকর সিদ্দিক রা. ওমর ও আবু উবাইদা রা. এর নাম এ জন্য উল্লেখ করেছেন যে, উক্ত মসলিসে আবু বকর সিদ্দিক ব্যতিত এই দুজনই শ্রেষ্ঠ সাহাবী ছিলেন।

একদিক থেকে তারা কুরাইশ বংশের। অন্যদিক থেকে তারা জান্নাতের সুসংবাদপ্রাপ্ত সাহাবী।

হযরত ওমর রা. তখন উপস্থিত লোকদের বললেন, তোমরা তো ভালো করেই জানো, রাসূল সা. ইন্তিকালের পূর্বে আবু বকর সিদ্দিককে নামাজের ইমাম বানিয়েছিলেন। আর তিনি নবীজির সবচেয়ে কাছের সাহাবী।

তার মর্যাদাও আমাদের থেকে উঁচু। তাই এমন কে আছে যে আবু বকরের বর্তমানে তার চাইতেও বড় হতে চায়?

উপস্থিত সাহাবারা তখন বললেন, আল্লাহ আমাদের ক্ষমা করুন।

বাইয়াত গ্রহণ

উমর রা. আবু বকর সিদ্দিক রা. কে সম্বোধন করে বললেন, আমরা সকলে আপনার নিকট বাইয়াত হবো।

কারণ, আপনি আমাদের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ এবং সম্মানিত ও সর্বোত্তম ব্যক্তি এবং আপনি রাসূল সা. এর প্রিয় বন্ধু।

তিনি আবু বকর সিদ্দিক রা. বাইয়াত নিতে অস্বীকৃতি জানালেন। তখন হযরত বশির বিন সাদ রা. সর্বাগ্রে আবু বকর সিদ্দিক রা. এর হাতে বাইয়াত হয়ে নিলেন।

এরপর উপস্থিত সাহাবারাও আবু বকর সিদ্দিক রা. এর বাইয়াত গ্রহন করলো।

রোমানদের বিরুদ্ধে উসামা রা. এর বাহিনী প্রেরণ

রাসূল সা. ইন্তিকালের সময় ওসামা রা. এর নেতৃত্বে একটি বাহিনী প্রস্তুত করেছিলেন। যারা রোমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবো। হযরত আবু বকর সিদ্দিক রা. খেলাফতে আরোহনের পরেই তাদেরকে রোমানদের বিরুদ্ধে পাঠিয়ে দিলেন।

হযরত আবু বকর সিদ্দিক রা. উসামার বাহিনীর মনোবল বৃদ্ধির জন্য তাদের সাথে চলতে থাকেন। আব্দুর রহমান ইবনে আউফ রা. খলিফার বাহন নিয়ে অগ্রসর হচ্ছিলেন।

উসামা রা. তখন ঘোড়ার উপর বসে ছিলেন। তিনি তখন বললেন, হে আল্লাহর রাসূলের খলিফা! আমি সওয়ারিতে আরোহণ করুন। অন্যথায় আমরা পায়ে হেঁটে চলবো।

আবু বকর সিদ্দিক রা. তখন জবাবে বললেন, তোমারও ঘোড়া থেকে নামা দরকার নেই। আমারও ঘোড়া থেকে উঠা দরকার নেই।

এতে কোনো অসুবিধা নেই। আমি আমার পা আল্লাহর রাস্তায় ধুলোমলিন করতে চাই।

হযরত উসামা রা. তার বাহিনী নিয়ে মদীনা ত্যাগ করার পর মদীনার সামরিক শক্তি কমে যায়।

এ কারণে মুরতাদরা মদীনার আশেপাশে একত্রিত হতে থাকে।

মদীনার উত্তর দিক থেকে আবস ও জুবইয়ান গোত্র, উত্তর-পূর্বদিক থেকে বনু ফাযারা গোত্র, দক্ষিণ-পূর্ব থেকে বনু গাতফানের মুরতাদরা মদীনার দিকে ধেয়ে আসে।

আবু বকর সিদ্দিক রা. তখন প্রয়োজনীয় প্রতিরক্ষা গ্রহণ করেন। তিনি শহরের প্রবেশপথ বন্ধ করে দেন এবং মদীনাবাসীকে প্রস্তুত থাকার নির্দেশ দেন।

মুরতাদের আতঙ্ক

উসামা রা. এর বাহিনী শামের সীমান্ত দিয়ে অতিক্রম করছিল। এখানে একটা গোত্র মুরতাদ হওয়ার চিন্তা-ভাবনা করছিল।

তারা যখন এত বড় মুসলিম বাহিনী দেখে তখন ভড়কে  যায়।

তারা বিদ্রোহের চিন্তা পরিত্যাগ করে।

এই অঞ্চলে আসার পর উসামা রা. অশ্বারোহীদের ছড়িয়ে দেন। নবী সা. এই নির্দেশ করেছিলেন। আল্লাহর রহমতে মুসলিম বাহিনী বিজয় লাভ করে। এই অভিযানে ৪০ দিন অতিবাহিত হয়।

রোম সম্রাটের পলায়ন

রোম সম্রাট হিরাক্লিয়াস নবীজির মৃত্যু সংবাদ এবং উসামার বাহিনীর ধেয়ে আসার খবর একসাথে পায়। এ কথা শুনে সে বিস্ময়ের সাথে বলতে থাকে,

এরা কেমন মানুষ? একদিকে তাদের প্রধান ইন্তিকাল করেছে অন্যদিকে তারা আমাদের উপর চড়াও হতে আসছে? এরপর হিরাক্লিয়াস আক্রমণের উদ্দেশ্যে পরিত্যাগ করে শহরেরে দিকে পলায়ন করে।

হিরাক্লিয়াস পালিয়ে যাওয়ার পর উসামা রা. বাহিনী নিয়ে মদীনায় যাত্রা করেন।

উসামার বিজয়ের সংবাদ শুনে মদীনার আশেপাশে থাকা মুরতাদরা মদীনা আক্রমণের ইচ্ছা পরিত্যাগ করে ভেগে গেল।

জাকাত আদায়ে অস্বীকারকারীদের সঙ্গে জিহাদ

নবীজির ইন্তিকালের পর একদল লোক নেসাব পরিমাণ সম্পদ থাকার পরও জাকাত আদায় করতে অস্বীকার করে।

এমনকি তারা খেলাফতের মূল স্তম্ভ মদীনায় প্রতিনিধিদল ও পাঠায়।

তারা এই দাবী পেশ করে যে, তাওহীদ রিসালাতসহ ইসলামের অন্যান্য সকল বিধি-বিধান তারা মান্য করবে। কিন্তু জাকাত আদায় করতে পারবে না।

যেন তাদের জিম্মা থেকে জাকাত মাফ করে দেয়া হয়।

কিছু কিছু সাহাবী এমনকি হযরত ওমর রা. ও এই নাজুক পরিস্থিতিতে খলিফা আবু বকর সিদ্দিক রা. কে তাদের আবদার মেনে নেয়ার অনুরোধ করেন।

কিন্তু আবু বকর সিদ্দিক রা. তাদের এই আবদার মানলেন না। তিনি এই লোকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করলেন।

হযরত ওমর রা. আবু বকর সিদ্দিক রা. কে বললেন, যারা লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ পড়ে তাদের বিরুদ্ধে কি আপনি যু্দ্ধ করতে চাচ্ছেন?

আবু বকর সিদ্দিক রা. এসব কথাকে উপেক্ষা করে ইসলামকে মূল রূপে রাখতে প্রত্যয়ী হন। এ কারণে তিনি বলেন, আল্লাহর শপথ!

যে ব্যক্তি জাকাতকে নামাজের মতো গুরুত্ব না দিবে, আমি অবশ্যই তার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবো।

রাসূলের যামানায় যে ব্যক্তি জাকাতের জন্য একটা বকরির বাচ্চা প্রদান করতো,

এখন যদি সে তা প্রদান না করে তাহলে আমি তার বিরুদ্ধে তরবারি হাতে নিব।

অনেকেই এটা ভেবে ভুল করে থাকেন যে, কি দরকার ছিল আবু বকরের এই যুদ্ধ ঘোষণা করার। অথচ নবীজি বলেছেন,

আমি মানুষের জন্য লড়াই করতে আদিষ্ট হয়েছি যতক্ষণ না তারা বলে যে, আল্লাহ ব্যতিত কোনো ইলাহ নেই এবং তারা নামাজ কায়েম করে ও জাকাত প্রদান করে।

(সহিহ মুসলিম। হাদীস নং ১৩৮)

মুরতাদদের বিরুদ্ধে জিহাদ

নবীজির ইন্তিকালের পর অনেক ব্যক্তি ইসলাম ত্যাগ করে মুরতাদ হয়ে যায়। তারা ভেবেছে, মুহাম্মাদ যেহেতু মৃত্যুবরণ করেছে, তাই ইসলামও শেষ হয়ে গেছে।

তাদের বিরুদ্ধে আবু বকর সিদ্দিক রা. যুদ্ধ শুরু করেন। সাহাবাদের বড় বড় দলকে তাদের নিকট পাঠিয়ে দেন। এদের মধ্য থেকে কেউ ইসলাম গ্রহণ করে ফিরে আসে।

কেউ বা ইসলামকে অস্বীকার কবে মুসলমানদের বিরুদ্ধে তরবারি উঠিয়ে নেয়। তবে তারা বেশিদিন টিকতে পারে নি। সাহাবারা এই ফেতনা থামিয়ে দিতে সক্ষম হন।

আবু বকর সিদ্দিক রা. মুরতাদদের খবর শুনে তাদেরকে দমন করার জন্য বাহিনী প্রস্তুত করলেন। এই মুরতাদদের মধ্যে আরেকটি দল ছিল, যারা ইসলামের কিছু কিছু বিধানকে অস্বীকার করতো।

মদীনার নিরাপত্তা ব্যবস্থা

মুরতাদরা মদীনার আশেপাশে একত্রিত হতে থাকে। তাদের ইচছা, তারা মদীনা দখল করে সেখানে রাজত্ব কায়েম করবে।

এদিকে হযরত উসামা বিন যায়েদ রা. কে রাসূলের নির্দেশে আবু বকর সিদ্দিক রা. রোমানদের বিরুদ্ধে পাঠিয়ে দিয়েছেন।

ফলে মদীনায় পুরুষের সংখ্যা নিতান্তই কম। এত কম ব্যক্তির উপর যদি হামলা করা হয় তাহলে নির্ঘাত মদীনার পতন হবে।

আবু বকর সিদ্দিক রা. তখন মদীনাবাসীরা রাতে মসজিদে অবস্থানের নির্দেশ দেন, যাতে প্রতিরোধ করার জন্য দ্রুত প্রস্তুতি গ্রহণ করা যায়।

মদীনার বিভিন্ন পথে নিরাপত্তারক্ষী বাহিনী তিনি মোতায়েন করেন। তাদের দায়িত্ব ছিল, তারা রাত্রীযাপন সেখানেই করবে। কোনো আক্রমণ হলে সেখানেই প্রতিরক্ষা গড়ে তুলবে।

প্রতিটি নিরাপত্তা দলে একজন করে আমির নির্দিষ্ট করে দেন। আমিররা ছিলেন, আলী, তালহা বিন উবায়দুল্লাহ,

যুবায়ের ইবনে আওয়াম, সা’দ বিন আবি ওয়াক্কাস, আবদুর রহমান ইবনে আউফ এবং আব্দু্ল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. প্রমুখ।

আবু বকর সিদ্দিক রা. মদীনার আশেপাশে থাকা গোত্রগুলোকে জিহাদের প্রস্তুতির নির্দেশ দেন। তারাও সন্তুষ্টিচিত্তে জিহাদে অংশগ্রহণ করে।

আবু বকর সিদ্দিক রা. মদীনা থেকে দুরবর্তী এলাকাগুলোর গভর্নরদের নিকট পত্র প্রেরণ করেন। যাতে তারা তাদের এলাকায় মুরতাদদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলে।

মদীনায় মুরতাদদের হামলা

মুরতাদরা মদীনায় একটা প্রতিনিধিদল প্রেরণ করে। তারা হযরত আবু বকর সিদ্দিক রা. এর নিকট আবেদন করে, যেন তাদের যাকাত মওকুফ করে দেয়া হয়।

আবু বকর সিদ্দিক রা. সরাসরি তা প্রত্যাখ্যান করলেন। ফলে তারা ক্রুদ্ধ হয়ে মদীনা ত্যাগ করলো। আবু বকর সিদ্দিক রা. উপস্থিত ব্যক্তিদর বললেন, এরা অচিরেই মদীনায় হামলা করবে।

এই প্রতিনিধিদল মদীনা ত্যাগ করার পর পরই একরাতে আচমকা বনু আসাদ, গাতফান, আবস, জুবইয়ান ও বকর গোত্রের লোকজন মদীনায় হামলা করে।

তারা কয়েকজন মুসলমানকে বন্দী করে যুহাসা নামক স্থানে আটক করে রাখে। মদীনার প্রহরীরা এটা জানার পর তারা আবু বকর সিদ্দিককে অবহিত করেন।

আবু বকর সিদ্দিক রা. তখন মসজিদে অবস্থিত মুজাহিদদের নিয়ে মুরতাদদের উদ্দেশ্যে বের হলেন। তারা তখন মুসলমানদের উটগুলোকে বিভ্রান্ত করার জন্য পদ্ধতি অবলম্বন করে।

ফলে উটগুলো এদিক ওদিক ছুটে পালিয়ে যেতে থাকে। আরোহীরা উটগুলোকে ভালোভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে পারছিল না।

আবু বকর সিদ্দিক রা. তখন আর যুদ্ধ না বাড়িয়ে মদীনায় চলে আসলেন। শত্রুরা ভাবলো, আবু বকর সিদ্দিক ভয় পেয়েছে। তারা এটা নিয়ে কবিতা রচনা করলো।

মুরতাদদের বিরুদ্ধে ঝটিকা আক্রমণ

প্রায় ৪০ দিন পর হযরত উসামা রা. তার বাহিনী নিয়ে মদীনায় আসেন।

আবু বকর সিদ্দিক রা. তখন উসামাকে মদীনার স্থলাভিষিক্ত করে মুজাহিদদের নিয়ে রওয়ানা হন মুরতাদদের বিরুদ্ধে।

সাহাবারা তখন আবু বকর সিদ্দিক রা. কে অনুরোধ করেন মদীনায় থাকতে। কিন্তু তিনি নিজের সিদ্ধান্তে অবিচল থাকেন।

একদিন ভোরের আলো ফোঁটার পূর্বেই আবু বকর সিদ্দিক রা. নিজের বাহিনী নিয়ে মদীনার পার্শ্ববর্তী মুরতাদদের বিরুদ্ধে আক্রমণ করেন।

মুরতাদরা ঘুণাক্ষরেও টের পায় নি এই বাহিনীর আগমণের কথা। সূর্য উদয় হতে হতেই মুজাহিদরা বিজয়লাভ করেন।

এরপর আবু বকর সিদ্দিক রা. মদীনা থেকে ১২ মাইল দূরে অবস্থিত যুলকাসসা নামক স্থানে শিবির স্থাপন করেন। এখানে তিনি মুজাহিদ বাহিনীকে ১১ টি ভাগে বিন্যস্ত করেন।

প্রতিটি ভাগে একজন করে অভিজ্ঞ আমির নিযুক্ত করেন। এরপর আবু বকর সিদ্দিক রা. যুদ্ধের পরিকল্পনা গ্রহণ করে এই ১১ বাহিনীকে আরব উপদ্বীপে ছড়িয়ে দেন।

এই একেকটি বাহিনী একেক গোত্রের মুরতাদদের উপর চড়াও হয়।

মিথ্যা নবুয়তের দাবীদারদের বিরুদ্ধে আবু বকর সিদ্দিক রা. এর অভিযান

হযরত আবু বকর সিদ্দিক রা. এর যুগে আরবের বিভিন্ন দিক থেকে মিথ্যা নবুয়তের দাবী করার হিড়িক পড়ে যায়। মানুষ ইসলাম সম্পর্কে অজ্ঞতার কারণে তাদেরকে নবী হিসেবে মান্য করা শুরু করে।

আবু বকর সিদ্দিক রা. এই সংবাদ পেয়ে তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেন। তিনি সাহাবাদের দল গঠন করে তাদের বিরুদ্ধে প্রেরণ করেন।

আসওয়াদ আনাসি এর ফেতনা

আসওয়াদ যখন শুনতে পায় নবীজি অসুস্থ হয়ে পড়েছেন, তখনই সে নবুয়তের দাবী করে বসে। সে নিজেকে রাহমানুল  ইয়ামান বলে দাবী করতো।

সে বলতো, নবী সা. ও নবী। আমিও নবী। তার নিকট নাকি সাহিক ও শাকিক নামে দুজন ফেরেশতা আসতো।

প্রথমদিকে সে নবুয়তের দাবী গোপন রেখে লোকজনকে নিজের পাশে জড়ো করে। যখনসে বুঝতে পারে যে,

এখন যথেষ্ঠ জনসমর্থন আছে, তখনই সে নবুয়তের দাবী করে বসে।

সে ছিল আনাস গোত্রের সদস্য। সর্বপ্রথম আনাস গোত্রের যুবকরা তার ডাকে সাড়া দেয়। এরপর আশেপাশের আরো অনেক গোত্র তাকে সমর্থন করে।

আসওয়াদ আনাসির ডাকে যারা সাড়া দিয়েছিল, তারা নামে মুসলমান হলেও তারা মূলত সন্তুষ্টিচিত্তে মুসলমান হয় নি।

তারা ইসলামের এমন উত্থান দেখে নিজেদের নিরাপত্তার জন্য মুসলমান হয়।

রাসূলের যামানায় ইয়ামেনের রাজধানী সানাআর গভর্নর ছিল, শাহার বিন বাজান রা.। সানাআয় আসওয়াদ আনাসির সাথে শাহার রা. এর তুমুল যুদ্ধ হয়।

যুদ্ধে শাহার রা. শাহাদাতবরণ করেন। সানাআবাসী পরাজিত হয়।

আসওয়াদ আনাসির সাথে যুদ্ধ

ইয়ামানে তখন মুসলিম সেনাপতিরা একত্রিত হলো। তারা নবীজির দেয়া নির্দেশনা অনুযায়ী মুরতাদদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে।

অবশেষে যুদ্ধে মুসলমানরা জয়লাভ করে পুনরায় ইসলামের আলো ছড়িয়ে দেয়।

হযরত ফিরোজ দাইলামি রা. একরাতে আসওয়াদের ঘরে প্রবেশ করে তাকে হত্যা করেন। এই খবর আল্লাহ তা’আলা ওহীর মাধ্যমে নবীজিকে জানিয়ে দিলেন।

তখন তিনি উপস্থিত লোকদের সুসংবাদ জানিয়ে বললেন, বরকতময় ঘরের বরকতময় ব্যক্তি আসওয়াদকে হত্যা করেছে।

নবীজিকে তখন জিজ্ঞাসা করা হয়, কে তিনি?

নবীজি বললেন, ফিরোজ।

এই ঘটনার কিছুদিন পর নবীজি ইন্তিকাল করেন। আর নবীজি এটা ওহীর মাধ্যমে জেনেছিলেন। কোনো লোক মারফতে নয়।

তাই এই খবর বাহিরের তেমন কেউ জানতো না। হযরত আবু বকর সিদ্দিক রা. খেলাফতের মসনদে আরোহণের পর সর্বপ্রথম ইয়ামেন থেকে দূত এসে আসওয়াদ আনাসির হত্যার বিস্তারিত সুসংবাদ দেয়।

তাই আবু বকর সিদ্দিক রা. এর নিকট এটাই ছিল সর্বপ্রথম সুসংবাদ।

তুলায়হা আসাদি এর ফেতনা

নবী কারীম সা. এর ইন্তিকালের পূর্বে সে একদল প্রতিনিধিসহ রাসূলের নিকট আসে। মদীনায় পৌছে সে রাসূল সা. কে সালাম দেয়।

এরপর সে অনুগ্রহ প্রকাশ করতে গিয়ে বলে, আমরা নিজে থেকে আপনার খেদমতে এসেছি।  আমরা সাক্ষ্য দিচ্ছি, আল্লাহ ব্যতিত কোনো মাবুদ নেই এবং আপনি তার বান্দা ও রাসূল।

কিন্তু আল্লাহ আমাদের কাছে কাউকে পাঠান নি। আমরা আমাদের পেছনে থাকা লোকদের জন্য যথেষ্ঠ।

এরপরেই আল্লাহ তা’আলা সূরা হুজরাতের ১৭ নং আয়াত অবতীর্ণ করেন,

یَمُنُّوۡنَ عَلَیۡکَ اَنۡ اَسۡلَمُوۡا ؕ قُلۡ لَّا تَمُنُّوۡا عَلَیَّ اِسۡلَامَکُمۡ ۚ بَلِ اللّٰهُ یَمُنُّ عَلَیۡکُمۡ اَنۡ هَدٰىکُمۡ لِلۡاِیۡمَانِ اِنۡ کُنۡتُمۡ صٰدِقِیۡنَ

“তারা ইসলাম গ্ৰহণ করে আপনাকে ধন্য করেছে মনে করে। বলুন, তোমরা ইসলাম গ্ৰহণ করে আমাকে ধন্য করেছ মনে করো না। বরং আল্লাহই ঈমানের দিকে পরিচালিত করে তোমাদেরকে ধন্য করেছেন। যদি তোমরা সত্যবাদী হও।”

এরপর তুলায়হা প্রতিনিধিদল নিয়ে নিজ এলাকায় ফিরে আসে এবং একটা সময় সে নবুয়তের দাবী করে বসে। কিন্তু এবার সে ফাঁদে পড়ে যায়।

তুলায়হা বুঝতে পারে, মুসলমানদের সঙ্গে তার সংঘাত অনিবার্য। সে তখন সামিরা অঞ্চলকে নিজের ঘাঁটি বানিয়ে নেয়।

সাধারণ মানুষের নিকট সে তার নবুয়তের দাবী ছড়াতে থাকে। অনেকেই তার ফাঁদে পা দিযে বসে।

মানুষকে বিভ্রান্ত করার জন্য সে ভেলকিবাজি প্রদর্শন করতো।

তুলায়হার বিরুদ্ধে আবু বকর সিদ্দিক রা. এর অভিযান

হযরত আবু বকর সিদ্দিক রা. তুলায়হার বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনার জন্য সেনাপ্রধান হিসেবে খালিদ বিন ওয়ালিদ রা. কে নির্বাচন করেন।

তুলায়হা তখন তার বাহিনীর সাথে বুযাখ নামক স্থানে অবস্থান করছিল। হযরত আবু বকর সিদ্দিক রা. খালিদকে পাঠানোর সময় এই নির্দেশ দেন যে,

“তুমি প্রথমে তায়ী গোত্রের নিকট যাবে। এরপর বুযাখের দিকে যাত্রা করবে। এই দায়িত্ব শেষ করার পর বিতাহে বনু তামিমের মালেক বিন নুয়াইরার খরব নিবে।

এরপর আমার নির্দেশ আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করবে।” আবু বকর সিদ্দিক রা. এই নির্দেশের ফলে খালিদ রা. প্রথমে তায়ী গোত্রের সাথে যোগাযোগ করেন।

তারা তখনো ইসলামের উপর প্রতিষ্ঠিত ছিল। তাদের কিছু লোক বিভ্রান্ত হয়ে তুলায়হার অনুসারী হয়েছিল।

বনু তায়ীর সরদার আদি বিন হাতেম খালিদ রা. এর নিকট তিনদিন সময় চান। এই সময়টায় আদি রা. তার গোত্রকে সঠিক পথে আনার চেষ্টা করেন।

শেষ পর্যন্ত আদি বিন হাতেম রা. এর প্রচেষ্টায় তার গোত্র তুলায়হার সঙ্গ ছেড়ে দিয়ে খালিদ রা. এর বাহিনীতে যোগদান করে।

হযরত আবু বকর সিদ্দিক রা. এর নির্দেশ অনুযায়ী কাজ করার সফলতা ছিল এটা। দেখা যায়, যুদ্ধ শুরু করার পূর্বে শত্রুসারিতে ভীতি ছড়িয়ে যায়।

তুলায়হার সাথে খালিদ রা. এর যুদ্ধ

বুযাখা নামক স্থানে উভয় বাহিনী মুখোমুখি হয়। জায়গাটি ছিল মদীনা থেকে ৪০০ কি.মি. দূরে।

তুলায়হা আসাদি তখন চাদর মুড়ি দিয়ে মুরাকাবার সূরতে এমনভাবে বসে, যেন মনে হচ্ছে তার উপর ওহী নাযিল হবে।

তার বাহিনীর সেনাপ্রধান ছিল উয়াইনা বিন হিসিন। তার অধীনে বনু ফাযারার ৭০০ যোদ্ধা ছিল। মুসলমানদের উপর তুলায়হার বাহিনী আক্রমণ করে বসে।

উয়াইনা মুসলমানদের আক্রমণ দেখে ভড়কে যায়। সে বুঝতে পারে, খালিদ রা. কে হারানো বেশ কঠিন।

সে তখন তুলাইহার নিকট এসে জিজ্ঞাসা করে,

জিবরাইল কি কোনো বার্তা নিয়ে এসেছে? তুলাইহা বললো, আসে নি। আস্তে আস্তে উয়াইনা পরাজয়ের রক্তিম আভা দেখতে থাকে।

তখন সে তুলায়হার নিকট এসে বলে, তোর বাপের মৃত্যু হোক। এতক্ষণ লাগে জিবরাইলের আসতে?

তুলাইহা বললো, জিবরাইল না এলে আমি কি করবো?

উয়াইনা তার বাহিনীকে যুদ্ধে ব্যস্ত রাখে। কিন্তু তারা ময়দানে দৃঢ়ভাবে দাঁড়াতে পারছিল না। তারা দলে দলে মৃত্যুবরণ করছিল।

উয়াইনা এবার পাগলের মতো ছুটে এসে তুলায়হাকে ধমক দিয়ে জিজ্ঞাসা করে, এবার কি আসছে?

তুলাইহা বললো, হ্যাঁ এসেছিল। উয়াইনা উচ্ছ্বাসিত হয়ে জিজ্ঞাসা করলো, কি বললো তিনি?

উয়াইনা তখন মনগড়া একটা আয়াত বলে, “তোমার ভাগ্যে তার মতো একটি চাক্কি নসিব হবে।

তোমার অবস্থা এমন হবে যে, ‍তুমি চিরকাল তা স্মরণ রাখবে।”

এমন উল্টাপাল্টা কথা শুনে উয়াইনা বুঝে যায়, সে মিথ্যা নবুয়তের দাবীদার। তখন সে বাহিনীর নিকট এসে ঘোষণা দিয়ে বললো,

লোকসকল, তোমরা পালিয়ে যাও। এই লোক একটা মিথ্যুক এবং ধোঁকাবাজ। সে মিথ্যা নবুয়তের দাবী করেছে।

তখন উয়াইনার লোকজন পলায়ন করতে থাকে। মুরতাদরা পরাজয়বরণ করে। হযরত খালিদ রা. উয়াইনাকে গ্রেপ্তার করেন।

মিথ্যা নবুয়তের দাবীদার উয়াইনা আগে থেকেই পরিস্থিতি সামাল দেয়ার জন্য ঘোড়া তৈরি করে রেখেছিল।

সে তার স্ত্রীকে নিয়ে ঘোড়ায় চড়ে পলায়ন করে শামে চলে যায়।

তুলাইহার তওবা

এরপর তুলায়হা আসাদি কিছুদিন এদিক সেদিক ঘুরাঘুরি করে অবশেষে সে হযরত আবু বকর সিদ্দিক রা. এর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করে দ্বিতীয়বার ইসলাম গ্রহণ করে।

আবু বকর সিদ্দিক রা. তার তওবা করা দেখে সাদরে গ্রহণ করে নেন। এরপর তুলায়হা আসাদি ইরাকে একজন মুসলিম যোদ্ধা হিসেবে জীবন অতিবাহিত করে।

এদিকে তুলাইহার সেনাপতি উয়াইনাও তওবা করে ‍ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে নেয়। তাকেও ক্ষমা করে দেয়া হয়।

মুসায়লামাতুল কাজ্জাব এর ফেতনা

নবীজির জীবদ্দশাতেই নবুয়তের দাবীদাদের মধ্যে সবচেয়ে বড় ফেতনাবাজ ছিল মুসায়লামা। সে ছিল বনু হানিফা গোত্রের সদস্য।

তার পূর্ণ নাম, মুসায়লামা ইবনে সুমামা ইবনে কাবির ইবনে হাবিব হানাফি। তার ডাকনাম আবু শামাহ। মুসায়লামা জন্মগ্রহণ করে ইয়ামামায়। সেখানেই সে বেড়ে উঠে।

ইয়ামামার অবস্থান আধুনিক সৌদি আরবের দক্ষিণ-পূর্ব নজদের একটি ঐতিহাসিক অঞ্চল, বা কখনও কখনও আরও নির্দিষ্টভাবে বলা যায় যে,

আল- খার্জের নিকটে জাউ আল-ইয়ামামাহের অধুনা-বিলুপ্ত প্রাচীন একটি গ্রাম। যা পরবর্তীতে আশেপাশের অঞ্চলও এই নামে প্রসিদ্ধলাভ করে।

রাসূলের নিকট মুসায়লামার দূত

দশম হিজরীতে রাসূল সা. যখন অসুস্থ পড়ে পড়লেন তখন মুসায়লামা নবীজির নিকট দূত প্রেরণ করে।

সে এই পত্রটি উবাদা ইবনে হারিস হানিফীর মাধ্যমে পাঠায়। পত্রটিকে বলা হয়েছিল, মুহাম্মাদুর রাসূলের নিকট আল্লাহর রাসূল মুসায়লামার পক্ষ থেকে।

অর্ধেক ভূ-খণ্ড আমাদের। অর্ধেক ভূ-খণ্ড কুরাইশদের। কিন্তু কুরাইশরা আমাদের সঙ্গে ইনসাফ করছে না।

নবীজি তখন প্রত্রের জবাব দেন এভাবে, আল্লাহর নবী মুহাম্মাদের পক্ষ থেকে মুসায়লামা কাজ্জাবের নিকট,  জমিন আল্লাহর। তিনি তার বান্দাদের মধ্যে যাকে ইচ্ছা এর উত্তরাধিকারী বানিয়ে থাকেন।

নবীজি তখন দূতকে জিজ্ঞাসা করলো, তোমরা কি বলো?

দূত জবাব দেয়, মুসায়লামা যা বলে আমরাও তাই বলি।

নবীজি তখন বললেন, যদি আমি দূত হত্যা করা সঠিক মনে করতাম তাহলে তোমার ঘাড় মটকে দিতাম।

মুসায়লামাতুল কাজ্জাবের নিকট রাসূলের দূত

রাসূল সা. মুসায়লামার নিকট হযরত হাবিব ইবনে জায়েদ রা. কে প্রেরণ করেন। মুসায়লামাতুল কাজ্জাব তখন তাকে জিজ্ঞাসা করে, তুমি কি বিশ্বাস করো মুহাম্মাদ আল্লাহর রাসূল?

হাবিব রা. বললেন, হ্যাঁ। আমি বিশ্বাস করি।

এরপর মুসায়লামা বললো, তুমি কি এটা বিশ্বাস করো যে, আমি আল্লাহর রাসূল?

তখন হাবিব রা. না বুঝার ভান করে বললেন, আমি কিছু শুনতে পাচ্ছি না।

মুসায়লামাতুল কাজ্জাব তখন হাবিব রা. এক একটি অঙ্গ কেঁটে তাকে হত্যা করে।

মুসায়লামার বিরুদ্ধে সেনাবাহিনী গঠন

হযরত আবু বকর সিদ্দিক সিদ্দিক রা. খেলাফতের মসনদে আরোহনের পর মুসায়লামাকে দমন করার জন্য প্রথম ইকরিমা বিন আবু জাহেল রা. এর নেতৃত্বে পাঠান।

কিছুদিন পর দ্বিতীয়তে হযরত শুরাহবিল বিন হাসানা রা. এর নেতৃত্বে আরো একটি বাহিনী প্রেরণ করেন। হযরত আবু বকর সিদ্দিক রা. ইকরিমা রা. কে নির্দেশ দেন যে,

যতক্ষণ না শুরাহবিল তোমার নিকট না পৌছবে ততক্ষণ তুমি যুদ্ধ শুরু করবে না। কিন্তু ইকরিমা রা. এই নির্দেশনার উপর কাজ না করে নজদে পৌছেই আক্রমণ করে বসেন।

মুসায়লামাতুল কাজ্জাব এর বাহিনী ছিল যুদ্ধবাজ বাহিনী। তারা হযরত ইকরিমা রা. এর বাহিনীকে পরাজিত করে পিছু হটতে বাধ্য করে।

আবু বকর সিদ্দিক রা. এর নিকট ইকরিমা রা. এই সংবাদ পাঠান। তখন আবু বকর সিদ্দিক রা. শুরাহবিল বিন হাসানা রা. কে থামিয়ে দেন।

তাদেরকে বললেন, তোমরা খালিদ বিন ওয়ালিদের বাহিনী আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করো।

আবু বকর সিদ্দিক রা. মুসায়লামার সামরিক শক্তি সম্পর্কে অবগত ছিলেন। এদিকে খালিদ রা. তুলাইহা ফেতনা দমন করে মদীনায় আসেন।

হযরত আবু বকর সিদ্দিক রা. তৎক্ষণাৎ তাকে মুসায়লামাতুল কাজ্জাবের বিরুদ্ধে সেনাপ্রধান করে পাঠান।

ইয়ামামার যুদ্ধ

হযরত আবু বকর সিদ্দিক রা. খালিদ বিন ওয়ালিদ রা. কে পাঠালেন ইয়ামামার ময়দানে। মুসায়লামার হাতে শহীদ হওয়া হযরত হাবিব বিন যায়েদ রা. এর মা উম্মে উমামা রা. ও নিজের আরেক সন্তান আব্দুল্লাহ বিন যায়েদের সাথে এই বাহিনীতে যোগদান করলেন।

মুসলিম বাহিনীর আগমনের সংবাদ শুনে বনু হানিফার ৪০ হাজার যোদ্ধা আকরাবা ময়দানে সারিবদ্ধ হয়ে অপেক্ষা করতে থাকে।

ইয়ামামার অনেক যাযাবর গোত্র সে সময় ইসলাম থেকে বের হয়ে গিয়েছিল। খালিদ বিন ওয়ালিদ রা. তাদেরকে পুনরায় ইসলামে পথে আনার চেষ্টা করেন।

তাদের মধ্য থেকে কেউ সেচ্ছায় ইসলাম গ্রহণ করে আর কেউ বা সাম্প্রদায়িতার উষ্কানীতে যুদ্ধ করতে প্রস্তুত হয়।

খালিদ রা. তাদেরকে উচিৎ শিক্ষা দিয়ে সামনে অগ্রসর হন।

মুসায়লামাতুল কাজ্জাব আকরাবা ময়দানে বাহিনী প্রস্তুত করে। মুসায়লামা তার বাহিনীর ডানে ও বামে যথাক্রমে মুহকাম ইবনে তুফায়েল এবং রাজ্জাল ইবনে উনফুয়াকে সেনাপতি নিযুক্ত করে।

এদিকে খালিদ রা. এর অগ্রবাহিনীতে প্রধান হিসেবে ছিলেন শুরাহবিল বিন হাসানা রা. ।

আর সেনাবাহিনীর ডানে ও বামে ছিলে যায়েদ বিন খাত্তাব রা. ও আবু হুজাইফা ইবনে উতবা ইবনে রাবিআ রা.।

ইয়ামামার চূড়ান্ত যুদ্ধক্ষেত্র

দুই বাহিনীতে তুমুল যুদ্ধ শুরু হয়। বনু হানিফার লোকেরা সাম্প্রদায়িক উন্মাদনার কারণে মিথ্যাবাদী নবীর জন্য অসম্ভব আগ্রহ উদ্দীপনার সাথে লড়াই করতে থাকে।

মুসলমানগণ ইতিপূর্বে এমন মারাত্মক আক্রমনের শিকার হন নি। কয়েকজন প্রসিদ্ধ সাহাবী এক এক করে শহীদ হয়ে যান।

যুদ্ধের ময়দানের অবস্থা ছিল খুবই নাজুক। একবার মুসলমানরা বিজয়ী হতো আরেকবার কাফেররা। একবার মুসলমানদের পা উপড়ে যায়।

মুসায়লামার বাহিনী তাদেরকে তাড়াতে তাড়াতে তাবু পর্যন্ত নিয়ে আসে। হযরত সাবেত বিন কায়েস রা. মুসলমানদের এই অবস্থা দেখে চিৎকার করে বললেন,

হে আল্লাহ আমি মুসলমানদের পক্ষ থেকে আপনার নিকট ক্ষমা চাচ্ছি। এরপর তিনি ময়দানে ঝাঁপিয়ে পড়েন। এক পর্যায়ে তিনি যুদ্ধ করতে করতে শহীদ হয়ে যান।

একে একে হযরত সালেম, হযরত আবু হুফায়ফা, হযরত যায়েদ বিন খাত্তাব রা. প্রত্যেকেই শহীদ হয়ে যান।

হযরত খালিদ রা. মুসলিম বাহিনীকে নতুনভাবে বিন্যস্ত করেন। তারপর প্রবলবেগে আক্রমণ করেন। এতে শত্রুদের অবস্থান নড়বড়ে হয়ে যায়।

মিথ্যা নবীর অনুসারীরা তখন দিগইবদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে পলায়ন করতে থাকে। যুদ্ধের ময়দান থেকে অল্প কিছু দূরেই একটা বাগান ছিল।

তারা বাগানে পলায়ন করে মোর্চা তৈরি করে। হযরত বারা বিন মালিক রা. বারবার বলতে থাকেন, যেন তাকে বাগানে নিক্ষেপ করা হয়।

যাতে তিনি সেখানে গিয়ে ভেতর থেকে দরজা খুলতে পারেন। তার ইচ্ছানুযায়ী তা করা হয়। এর মধ্যেই তার শরীরে আশির অধিক আঘাত লাগে।

মুসলমানরা বাগানে প্রবেশ করতে সক্ষম হন। এই স্থানে বিখ্যাত বদরী সাহাবী হযরত আবু দুজানা রা. শহীদ হয়ে যান।

উম্মে উমারা ও তার ছেলে আব্দুল্লাহ বিন যায়েদ রা. ভেতরে প্রবেশ করেন। এক ব্যক্তি উম্মে উমারার হাত কেঁটে ফেলে।

তা সত্ত্বেও তিনি ময়দানে সাহসীকতার সাথে লড়াই করে যান।

শেষ পর্যন্ত শত্রুরা বাগান থেকেও পলায়ন করতে থাকে। তারা ছত্রভঙ্গ হয়ে এদিক ওদিক চলে  যায়। মুসায়লামাতুল কাজ্জাব ও তখন পলায়ন করতে থাকে।

মুসায়লামাতুল কাজ্জাবের মৃত্যু

হযরত ওয়াহশি বিন হারব রা. আগে থেকেই তার বর্শা নিয়ে ওৎ পেতে ছিলেন।

তিনি তার বর্শা নিজস্ব ভঙ্গিতে এমনভাবে ছুড়ে মারেন যে, মুসালমার পিঠ দিয়ে ঢুকে বুক দিয়ে বেরিয়ে যায়।

সেখানেই সে নেতিয়ে পড়ে। এ সময় উম্মে উমারা ছেলে আব্দুল্লাহ বিন যায়েদ রা. তরবারির মাধ্যমে তার মাথা আলাদা করে ফেলেন।

এই প্রলয়ঙ্কারী যুদ্ধে মদীনার মুহাজির ও আনসার মিলিয়ে ৩৬০  জন সাহাবী শাহাদাতলাভ করেন। যাদের মধ্যে ৩৫ জন কুরআনের হাফেজ ছিল।

অন্যদিকে মুসায়লামার বাহিনীর সাত হাজার সৈন্য ময়দানে ও সাত হাজার সৈন্য বাগানে মৃত্যুবরণ করে। আর বাকীরা এদিক ওদিক পালিয়ে যায়।

সর্বপ্রথম কুরআন সংকলনের উদ্যোগ

ইয়ামামার যুদ্ধে প্রায় ৩৫ জনের অধিক হাফেজ শাহাদাতলাভ করেন। এত বিপুল সংখক হাফেজের ইন্তিকালে আবু বকর সিদ্দিক রা. পেরেশান হয়ে যান।

তখন পর্যন্ত কুরআন শরীফ লিখে রাখার প্রচলন চালু হয় নি। সে সময় মানুষ শুনে শুনে কুরআন মুখস্ত করতো।

হযরত আবু বকর সিদ্দিক রা. এত সংখক হাফেজের শাহাদাতের কারণে কুরআন মাজিদ বিনষ্ট হয়ে যাওয়ার আশংকা করতেন।

এ জন্য তিনি সর্বপ্রথম কুরআন মাজিদ লিখিত আকারে একত্রিত করার ইচ্ছাপোষণ করেন। প্রথমে তিনি ওমর রা. এর নিকট এই মত পেশ করেন।

হযরত আবু বকর সিদ্দিক রা. কুরআন মাজিদ সংকলনের জন্য অন্যতম আনসারি সাহাবী হযরত যায়েদ বিন সাবেত রা. কে দায়িত্ব প্রদান করেন।

হযরত যায়েদ রা. ছিলেন একজন কাতেবে ওহী। তিনি রাসূলের যামানায় কুরআন মাজিদ লিখে রাখতেন।

পাশাপাশি জ্ঞান-গরিমায় তিনি ছিলেন অতুলনীয় একজন ব্যক্তি।

হযরত যায়েদ বিন সাবেত রা. এই সকল লিখিত উপকরণ এবং হাফেজদের স্মৃতি কাজে লাগিয়ে কুরআন শরীফের সর্বপ্রথম পূর্ণাঙ্গ কপি তৈরি করেন।

এরপর সেই কপি যায়েদ বিন সাবেত রা. আবু বকর সিদ্দিক রা. এর নিকট হস্তান্তর করেন। হযরত আবু বকর সিদ্দিক রা. এর এই কপি সংরক্ষণ করা হয়।

কুরআন মাজিদের সংকলনকৃত এই কপিটি আবু বকর সিদ্দিক রা. এর পর ওমর রা. এর নিকট আসে।

হযরত ওমর রা. এর শাহাদাতলাভের পর উম্মুল মুমিনীন হযরত হাফসা রা. এর নিকট কপিটি সংরক্ষিত থাকে।

আবু বকর সিদ্দিক রা. এর শাসনামলে পারস্য অভিযান

খলিফা আবু বকরের সময় পারস্যের রাজনৈতিক ময়দানে ধস নামে। এর ফলে তাদের সেনাব্যবস্থা নড়বড়ে হয়ে যায়।

পারস্যের পাশে উক্ত আরব সীমান্তের অধিবাসীদের মধ্যে একজন ছিলেন হযরত মুসান্না বিন হারিসা রা.।

তিনি নবম হিজরীতে ইসলাম গ্রহন করেন। সে সময় সীমান্তের আবররা পারস্যের উপর গেরিলা আক্রমন করতো।

হযরত আবু বকর সিদ্দিক রা. এসব কর্মকাণ্ডের ব্যাপারে অবগত হলেন।

তখন থেকে তিনি সীমান্ত এলাকার খোঁজ খবর নিতে লাগলেন। মুসান্না বিন হারিসা রা. আবু বকর সিদ্দিককে বললেন,

আমাকে কিছু সৈন্য দিন। কারণ, পারস্যের শক্তি শেষ হয়ে গেছে।

তখন মুসান্না বিন হারিসা ভাবলেন, এখন যদি বড় একটা বাহিনী গঠন করা যায়, তাহলে পারস্য জয় করাটা তেমন কঠিন কিছু নয়।

তাই তিনি নিজেই মদীনায় এসে পারস্য আক্রমনের অনুমতি প্রার্থনা করলেন। পাশাপাশি তিনি মুজাহিদ বাহিনীও চাইলেন।

আবু বকর সিদ্দিক রা. তখন আট হাজার মুজাহিদ দিয়ে মুসান্না বিন হারিসাকে সাহায্য করেন।

খালিদ বিন ওয়ালিদ রা. কে সেনাপতি নিযুক্তকরণ

হযরত আবু বকর সিদ্দিক রা. অনুভব করলেন, পারস্যের মতো এক বড় এক সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য একজন দক্ষ ও যোগ্যতা সম্পূর্ণ সেনাপ্রধান দরকার।

তখন তার দৃষ্টি হযরত খালিদ বিন ওয়ালিদ রা. এর উপর পড়ে।

হযরত খালিদ বিন ওয়ালিদ রা. খতমে নবুয়ত অস্বীকারকারীদের বিরুদ্ধে অসাধারণ সফলতার সাথে জিহাদ পরিচালনা করেছিলেন।

আবু বকর সিদ্দিক রা. তখন তাকে পারস্য অভিমূখে তার বাহিনী নিয়ে অগ্রসর হতে বললেন।

খালিদ বিন ওয়ালিদ রা. নিজের সাহাযের জন্য অন্য কাউকে পাঠাতে বললেন। তখন আবু বকর সিদ্দিক রা. কা’কা বিন আমর রা. কে তার সহায়তায় পাঠান।

কা’কা বিন আমর রা. ছিলেন সে সময়ের বিখ্যাত দূত ও যুদ্ধের ময়দানে সঠিক সিদ্ধান্ত নেয়া ব্যক্তিদের মধ্যে একজন।

খালিদ রা. এর হুমকি

খালিদ রা. হরমুজকে চিঠি লিখে বলে, তোমার সামনে তিনটা পথ খোলা আছে। হয় তুমি ইসলাম গ্রহন করবে। কিংবা তুমি জিজিয়া কর দিয়ে আমাদের নিরাপত্তায় চলে আসবে।

অন্যথায় যুদ্ধের ময়দানে আমাদের সাথে শক্তি পরীক্ষায় নামতে হবে।

আর তোমাকে হত্যা করার জন্য আমার নিকট এমন এক বাহিনী আছে, যারা আল্লাহকে ভালোবাসে। যেমনটা তুমি মদপান করতে ভালোবাসো।

হরমুজের প্রতিক্রিয়া

হরমুজ খালিদ রা. এর চিঠিটি পাওয়ার পর সেটা পারস্যের রাজধানী মাদায়েনে পাঠিয়ে দেয়। তখন পারস্যের সম্রাট ছিল আরদশির।

এরপর হরমুজ তখন বিশাল বড় সেনাবাহিনী নিয়ে মুসলমানদের বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য বের হয়।

সাথে ছিল পারস্যের প্রসিদ্ধ শাহজাদা ও নামকরা পালোয়ানরা। হরমুজ তার সৈন্যদের পায়ে শেকল বেঁধে দেয়। যাতে তারা যুদ্ধের ময়দান থেকে পলায়ন না করে।

এই যুদ্ধটি ছিল আবরদের সাথে অনাবরদের প্রথম যুদ্ধ। তাই বেশ ঘটা করেই প্রস্তুতি নেয়া হয়।

যাতুস সালাসিল যুদ্ধ

যুদ্ধের সারিতে দাঁড়ানোর পর হযরত খালিদ রা. ময়দানের মাঝখানে এসে মল্লযুদ্ধের আহবান জানান। হরমুজ তখন এগিয়ে আসে।

যখন হরমুজ ও খালিদ রা. পরষ্পর সামনাসামনি যুদ্ধে লিপ্ত ছিলেন তখনই দুই বাহিনীর মধ্যে ঘোরতর যুদ্ধ শুরু হয়ে যায়।

কাফেরদের একটা অংশ হযরত খালিদ রা. এর উপর আক্রমণ করার জন্য উদ্যত হয়। সে সময় হযরত কা’কা বিন আমর রা. তাদেরকে পিছু হটিয়ে দেন।

দীর্ঘক্ষণ মল্লযুদ্ধ হওয়ার পর হযরত খালিদ রা. হরমুজকে হত্যা করেন। তাকে হত্যার পর পরই কাফেরদের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি হয়ে যায়। তারা পলায়ন করতে থাকে।

তাদের পালোয়ানরা ও সৈন্যরা পায়ের শেকল ভেঙ্গে ভেগে যেতে থাকে। মুসলিমরা তাদের পিছু নিয়ে অসংখ্য সৈন্যদের হত্যা করেন।

এটি হলো ১২ হিজরীর শুরুর দিকের ঘটনা। এই যুদ্ধের নামকরণ করা হয় যাতুস সালাসিল নামে। অকল্পনীয় এই বিজয়ে পুরো মুসলিম বিশ্বে আনন্দের জোয়ার বয়ে যায়।

ছান্নির যু্দ্ধ

হরমুজের সৈন্যরা পলায়ন করতে করতে ছান্নি নামক স্থানে চলে যায়। সেখানে তখন পারস্যের অন্যতম জেনারেল কারিন অবস্থান করছিল।

সে যখন জানতে পারে, হরমুজ পরাজিত হয়েছে তখন সে ছান্নির ময়দানে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হয়ে যায়।

হযরত খালিদ রা. অগ্রসর হয়ে ছান্নির নিকটে চলে আসেন। সেখানে আবার কাফেরদের সাথে যুদ্ধ হয়।

এই যুদ্ধে জেনারেল কারিন নিহত হয় এবং প্রায় ত্রিশ হাজার কাফের সৈন্য নিহত হয়।

অলাজার যুদ্ধ

পর পর দুইটি পারসিক বাহিনীর পরাজয়ের সংবাদ পৌছে পারস্যের রাজদরবারে।

বেদনায়, হতাশায় আচ্ছন্ন হয়ে যায় তারা। তখন আন্দারযাগর ও বাহমান জাদাবিয়া বিশাল সৈন্য নিয়ে মুসলমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের জন্য বের হয়। এটা ১২ হিজরীর সফর মাসের ঘটনা।

হযরত খালিদ রা. নিজের বাহিনীর এক তৃতীয়াংশ সৈন্য রণাঙ্গনের পাশে ঝোপঝাড়ে লুকিয়ে রাখেন।

যখন উভয় পক্ষ যুদ্ধ করতে করতে ক্লান্ত হয়ে যায়, তখন খালিদ রা. লুকিয়ে রাখা বাহিনীকে সামনে আনেন।

তাদের দৃঢ় আক্রমণে পারসিক বাহিনী দিশেহারা হয়ে পলায়ন করতে থাকে। পারসিক বাহিনীর প্রধান আন্দারযাগর প্রচণ্ড পিপাসায় মৃত্যুবরণ করে।

আমগিশিয়ার গণিমত

অলাজারদের সাথে মুসলমানদের যুদ্ধ চলাকালে ইরাক সীমান্তে বসবাসকারী খ্রিষ্টানরা অলাজারদের সহায়তা করে।

খালিদ রা. তাদেরকে উচিৎশিক্ষা দেয়ার জন্য ফুরাত নদীর দিকে অগ্রসর হলেন।

খালিদ রা. শহরে পৌছে তাদের মল্লযুদ্ধের আহবান জানায়। সেখানকার খ্রিস্টান যোদ্ধা মালিক বিন কায়েস তার মোকাবেলায় এগিয়ে আসে। খালিদ রা. তার শরীর থেকে মাথা আলাদা করে ফেলেন। এরপর ব্যাপক যুদ্ধ শুরু হয়।

এই যুদ্ধে ৭০ হাজার পারসিক সৈন্য ও অসংখ্য আরব খ্রিস্টান নিহত হয়। বেঁচে থাকা সৈন্যরা ঘোড়া, গাধা, ধন-সম্পদ রেখেই পলায়ন করে। এরপর এই গণিমতের এক পঞ্চমাংশ তিনি মদীনায় পাঠিয়ে দেন।

আবু বকর সিদ্দিক সিদ্দিক রা. বলেন, কোনো মা খালিদের মতো বীর সন্তান জন্ম দিতে পারবে না।

হিরা বিজয়

ফুরাত নদীর তীরে আবর খ্রিস্টানদের পুরাতন একটা কেন্দ্র ছিল। মুসলিম বাহিনী অগ্রসর হয়ে সেটা ঘেরাও করে।

শহরের বাসিন্দারা তাদের মোকাবেলা করতে অক্ষম হয়ে পড়ে। তারা তখন তাদের নেতা আমর বিন আব্দুল মাসিহকে সন্ধির জন্য পাঠায়।

খালিদ রা. তাকে জিজ্ঞাসা করলেন, যুদ্ধ চাও নাকি শান্তি চাও?

সে বললো, শান্তি চাই।

খালিদ রা. আমরের হাতে বিষ দেখে বললেন, তুমি হাতে করে বিষ এনেছ কেন?

সে উত্তর দেয়, যদি সন্ধির আলোচনা করতে আমি ব্যর্থ হই তাহলে নিজ সম্প্রদায়কে কিভাবে মুখ দেখাবো? এর চেয়ে বিষ পান করা উত্তম।

খালিদ রা. তখন বিষের কৌটাটি হাতে নিয়ে বললেন, যতক্ষণ পর্যন্ত তোমার সময় না হবে ততক্ষণ তুমি জীবিত থাকবে।

এরপর তিনি নিম্নোক্ত দোয় পড়ে বিষ পান করলেন,

بسم الله خير الأسماء، رب الارض والسماء، الذي ليس يضر مع اسمه داء، الرحمن الرحيم

অর্থ: ‘সর্বোত্তম নামের অধিকারী আল্লাহর নামে পান করছি, যিনি আকাশ এবং পৃথিবীর প্রতিপালক, যার অনুমতি ব্যতিত কোনো রোগ ক্ষতি করতে পারে না, যিনি পরম দয়ালু ও মেহেরবান।”

আমর বিন আব্দুল মাসিহ এই দৃশ্য দেখে হতবাক হয়ে যায়। সে বলে ওঠে,

যতদিন পর্যন্ত মুসলমানদের মধ্যে তোমার মতো ব্যক্তিরা থাকবে ততদিন তোমাদের কেউ বাধা দিতে পারবে না।

এরপর হিরার অধিবাসীরা বার্ষিক এক লক্ষ নব্বই হাজার দিরহামের বিনিময়ে সন্ধি চুক্তি করে।

আইনে তামামার যুদ্ধক্ষেত্র

পারস্যের মধ্যে তখন ক্ষমতা দিয়ে দ্বন্দ্ব চলছিল। কিন্তু যখনই মুসলমানরা তাদের উপর আক্রমণ করলো তখন তারা একজোট হয়ে হামলা পরিচালনা করলো।

সে সময় মিহরান সৈন্য নিয়ে ইরাকের উত্তর দিকে আইনে তামারে শিবির স্থাপন করে।

তার সাহায্যের জন্য খ্রিষ্টান আরব সরদার উকবা বিন আবু উকবা নিজের গোত্রের সৈন্যদের নিয়ে অগ্রসর হয়।

যুদ্ধের শুরুতেই খালিদ রা. প্রবল আক্রমণ করে উকবাকে জাহান্নামে পাঠিয়ে দেন।

এটা দেখে শত্রুরা আর নয়া উদ্যমে ঝাঁপিয়ে পড়ার হিম্মত করে নি। তারা তখন নিজের জীবন বাঁচানোর জন্য পালিয়ে একটা দুর্গে আশ্রয় নেয়।

পারসিক বাহিনীর সেনাপ্রধান মিহরান ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে পালিয়ে যায়। খালিদ রা. তখন দুর্গটি অবরোধ করে, সেটিও জয় করে নেন।

আরব খ্রিষ্টানদের যুদ্ধ প্রস্তুতি

আইনে তামামার যুদ্ধ শেষ হতে না হতেই আরব খ্রিষ্টান গোত্রগুলো মুসলমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের প্রস্তুতি নিতে থাকে।

তাদের মধ্যে বনু গাসসান, বনু তানুখ, বনু কালব অন্যতম।

আবু বকর সিদ্দিক রা. তাদেরকে দমন করার জন্য হযরত ইয়াজ বিন গনাম রা. কে পাঠান।

কিন্তু তিনি একা এতগুলো গোত্রকে মোকাবেলা করতে পারছিলেন না। তাই তিনি খালিদ রা. নিকট সাহায্য চান।

খালিদ রা. কালক্ষেপণ না করেই সেখানে পৌছে গেলেন। খ্রিষ্টান আবরবা খালিদকে আসতে দেখে ঘাবড়ে যায়।

খ্রিস্টানদের নেতা উকাইদির বিন মালিক খালিদ রা. এর সাহসিকতা পারস্য এর বাহিনীর বিরুদ্ধে আগেই প্রত্যক্ষ করেছিল। তাই সে সন্ধি করতে আগ্রহী হয়।

কিন্তু তার গোত্র ও অন্যান্য খ্রিষ্টানরা যুদ্ধ করতে আগ্রহী ছিল।

পরিশেষে খালিদ বিন ওয়ালিদ রা. এর সাথে ঘোরতর যুদ্ধ হয়। এই যুদ্ধে খ্রিষ্টানরা পরাজিত হয়ে দুর্গে আশ্রয় গ্রহন করে। খালিদ রা. শেষ পর্যন্ত দুর্গও বিজয় করে নেন।

ফিরাজের যুদ্ধ

খালিদ রা. ইরাকে ইসলামের বিজয় পতাকা উড়িয়ে আরব গোত্রগুলোকে অনুগত করিয়ে নেয়ার পর ফিরাজ নামক এলাকার দিকে যাত্রা শুরু করেন।

এলাকাটি ছিল শাম, ইরাক ও জাজিরার সীমান্তবর্তী। এ অভিযানের উদ্দেশ্য ছিল নিজের পিঠ আক্রমণ থেকে নিরাপদ রাখা।

মুসলমানরা তখন ফিরাজ নামক এলাকায় সৈন্য সমাবেশ ঘটালো। এখানে তারা সেনাছাউনি স্থাপন করলো। কিন্তু মুসলমানদের ফিরাজে সৈন্য সমাবেশ ঘটাতে দেখে রোমানরা ক্ষিপ্ত হয়ে উঠে।

রোমানদের যুদ্ধ প্রস্তুতি

মুসলমানদের ঠেকাতে রোমানরা পারসিক যুবকদের সাহায্য কামনা করে। পাশাপাশি তারা আরব খ্রিষ্টানদেরকেও মুসলমানদের বিরুদ্ধে লেলিয়ে দেয়।

রোমান সৈন্য, পারসিক যুবক ও আরব খ্রিষ্টানদের সম্মিলিত বাহিনী এসে ফুরাত নদীর তীরে ছাউনী স্থাপন করে।

মুসলিম বাহিনী এবং রোমান বাহিনীর মধ্যে শুধুমাত্র ফুরাত নদী প্রতিবন্ধক ছিল।

রোমানরা বললো, তোমরা নদী পার হয়ে আসো। অথবা আমাদের নদী পার হওয়ার সুযোগ দাও।

হযরত খালিদ রা. বললেন, তোমরাই নদী পার হয়ে এপারে চলে আসো। তখন রোমানরা বললো, তাহলে তোমরা পিছনে সরে যাও।

খালিদ রা. বললেন, তা হবে না। তোমরা নদীর নিকটস্থ নিচু ভূমিতে অবস্থান করতে পার। এই ঘটনা সংগঠিত হয় ১২ হিজরীর ১৫ জিলকদ মাসে।

যুদ্ধ

রোমান ও পারসিকরা নদী পার হওয়ার আগে বলছিল, নিজ দেশকে বাঁচাও। এই ব্যক্তি দ্বীনের জন্য লড়ছে এবং সে খুবই মেধাবী। আল্লাহর শপথ! এই ব্যক্তি বিজয়ী হবে আর আমরা অপমানিত হবো।

এরপরও তারা নদী পার হয়ে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হয়ে যায়। শুরু হয় তুমুল যুদ্ধ।

হযরত খালিদ বিন ওয়ালিদ রা. মুসলমানদের বললেন, তাদের উপর হামলা করো এবং তাদেরকে কোনো অবকাশ দিও না।

এই যুদ্ধের শেষের দিকে রোমান ও পারসিকরা মনোবল হারিয়ে ফেলে। তারা পালাতেও পারছিল না। তাদের পেছনে নদী।

ফলে সম্মিলিত বাহিনীর প্রায় সকল সৈন্যই ইন্তিকাল করে। যুদ্ধে শত্রু বাহিনীর সৈন্য সংখ্যা ছিল প্রায় ১ লক্ষ।

খালিদ রা. ফিরাজে ১০ দিন অবস্থান করেন। এরপর মুসলিম বাহিনীকে হিরায় চলে যাওয়ার নির্দেশ দেন।

এভাবেই মুসলমানরা সর্বপ্রথম দুই পরাশক্তি এবং আরবদের যৌথ হামলা মোকাবেলা করেন। আল্লাহ মুসলমনাদের যুদ্ধে বিজয় দান করেন।

বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের সাথে যুদ্ধ

আবু বকর সিদ্দিক রা. এর খেলাফতকালে খালিদ বিন সাঈদ রা. সতর্কতার সাথে একটা বাহিনী নিয়ে রোমান সেনাপতি বাহানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করেন।

হযরত খলিদ বিন সাঈদ রা. অত্যন্ত সাহসিকতার সাথে এই যুদ্ধে লড়াই করলেন। কিন্তু তিনি বুঝতে পারলেন, আমাদের নিকট সৈন্য সংখ্য খুব কম। তাই আরো সৈন্য দরকার।

খালিদ বিন সাঈদ রা. খেলাফতের দরকারে হযরত আবু বকর সিদ্দিক রা. কে বিষয়টা জানালেন। আবু বকর সিদ্দিক রা. তৎক্ষণাৎ নতুন বাহিনী তৈরি করেন।

নতুন বাহিনী

আবু বকর সিদ্দিক রা. স্বেচ্ছাসেবক সংগ্রহ শুরু করেন। এক পর্যায়ে ইয়ামান, তিহামা, ওমান, বাহরাইন থেকে লোক আসতে লাগলো। আব বকর রা. তাদেরকে ইকরিমা বিন আবু জাহলের নেতৃত্বে একত্র করে শামে পাঠিয়ে দেন।

কিন্তু এতেই প্রয়োজন পুর্ণ হয়ে যায় নি।

সেখানে আরো বড় বাহিনীর প্রয়োজন ছিল। যার প্রস্তুতি ও নেতৃত্বের ক্ষেত্রে প্রবীণ সাহাবায়ে কেরামই একমাত্র উপযুক্ত ছিলেন।

তাই আবু বকর সিদ্দিক রা. রাসূলের যামানা থেকে যাকাত উসূলকারী হযরত আমর ইবনে আ’স রা. কে জাকাত উত্তোলনের দায়িত্ব থেকে অব্যহতি দিয়ে তাকে যুদ্ধের ময়দানে নিয়ে আসলেন।

তার দায়িত্বে আরেকটি স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী অর্পণ করেন। তারপর তাকে ফিলিস্তিন অভিমূখে পাঠিয়ে দেয়া হয়।

এদিকে আরো একটি বাহিনী গঠন করা হয়। যার দায়িত্ব ওয়ালিদ বিন উকবা রা. কে দেয়া হয়। তাকে জর্দান অভিমুখে প্রেরণ করা হয়।

আবু বকর সিদ্দিক রা. এর অসিয়ত

এরপর আরো একটি বাহিনী গঠন করা হয়। তার দায়িত্ব প্রদান করা হয় হযরত ইয়াজিদ বিন আবু সুফিয়ান রা. কে।

তিনি ছিলেন মুয়াবিয়া রা. এর বড় ভাই। এই বাহিনীকে আবু বকর সিদ্দিক রা. গুরুত্বের সাথে বিদায় জানান।

এই বাহিনীর আমিরকে হযরত আবু বকর সিদ্দিক রা. বলেন, আমি তোমাকে নেতৃত্ব প্রদান করেছি, যাতে তুমি নিজের যোগ্যতার বহিঃপ্রকাশ ঘটাতে পার।

যদি তুমি সাফল্য অর্জনে ব্যর্থ হও তাহলে তোমাকে পদচ্যুত করা হবে। আর তোমাকে আল্লাহর প্রতি ভয়ের ব্যাপারে অসিয়ত করছি।

যখন তোমার নিকট শত্রুপক্ষের দূত আসবে, তখন তার সাথে বেশিক্ষণ অবস্থান করবে না।

তার নিকট কোনো গোপন কথা প্রকাশ করবে না এবং এমন কোনো কাজ করবে না, যার দ্বারা সে তোমাদের গোপন রহস্য বুঝে ফেলে।

প্রথম পরাজয় ও উত্থান

খালিদ বিন সাঈদ রা. সীমান্তে সাহায্যের জন্য অপেক্ষা করছিলেন।

যখনই তিনি মুসলিম বাহিনীর আগমণের সংবাদ জানতে পারলেন তখন তিনি শামের সীমান্তে পদক্ষেপ নেয়া শুরু করলেন। তিনি ফিলিস্তিনের মারজুস সুফফার নামক স্থানে পৌঁছেন।

এখানে রোমানদের এক বাহিনী প্রস্তুত ছিল। রোমানরা খালিদ বিন সাঈদ রা. এর বাহিনীর উপর আক্রমণ করে।

এই আক্রমণে খালিদ বিন সাঈদ রা. পরাজয় বরণ করেন। তার ছেলে ও আরো অনেক মুজহিদ নিহত হয়।

এরপর তিনি মদীনায় চলে আসেন। আবু বকর সিদ্দিক রা. তাকে মদিনায় রেখে শুরাহবিল বিন হাসানা রা., আবু সুফিয়ান রা. ও আবু উবায়দা রা. কে রোমানদের সাথে যুদ্ধ করার জন্য  শামের উদ্দেশ্যে প্রেরণ করেন।

যুদ্ধরীতি অনুযায়ী প্রতিটি বাহিনী ভিন্ন ভিন্ন স্থানে অবস্থান করতে থাকে।

মুসলমানদের তখন এই সম্মিলিত বাহিনী মিলে প্রায় একুশ হাজার সৈন্য ছিল।

রোমান বাদশাহ যখন মুসলমানদের এই সুবিন্যস্ত অভিযান জানতে পারলেন তৎক্ষণাৎ সে মার্চ করে রাজধানী হিমসে চলে যায়। এরপর সে কয়েকটা ইউনিট গঠন করে তাদেরকে ভিন্ন ভিন্ন জায়গায় পাঠিয়ে দেয়।

যাতে মুসলমানরা একত্রে লড়াই করতে না পারে।

রোমানদের এই ইউনিটগুলোর সম্মিলিত হিসাব প্রায় ১ লাখ ৪০ হাজারের মতো।

মুসলিম সেনাপতিরা পরষ্পর যোগাযোগ করে সিদ্ধান্ত নিলেন যে, তারা যেভাবেই হোক একত্রিত হয়েই যুদ্ধ করবেন।

তখন আবু বকর সিদ্দিক রা. তাদেরকে ইয়ারমুকে এসে শিবির স্থাপনের নির্দেশ দেন।

শামে খালিদ বিন ওয়ালিদ রা. এর আগমন

এ সময় হযরত আবু বকর সিদ্দিক রা. খালিদ বিন ওয়ালিদ রা. কে ইরাকের দায়িত্ব মুসান্না বিন হারিসা রা. এর নিকট অর্পণ করে তার সৈন্য নিয়ে দ্রুত শামে যাওয়ার নির্দেশ দিলেন।

শামে তখন সাহাবাদের ইউনিটগুলো একত্রিত হতে লাগলো। এর মধ্যে রোমানরা ও আসা যাওয়া করতে লাগলো।

এমন কঠিন মুহুর্তে রোমানদের ফাঁকি দিয়ে ইরাক থেকে শামে যাওয়াটা অনেক কঠিন ছিল।

কিন্তু তারপর ও তিনি আল্লাহর উপর ভরসা করে এবং রোমানদের সাথে যুদ্ধ করার জন্য ৯ হাজার মুজাহিদ নিয়ে হিরা থেকে উত্তর-পশ্চিম দিকে মার্চ করা শুরু করেন।

এদিকটা ছিল একটা মরুভূমি অঞ্চল। এখানে ছিল না কোনো পানি, ছিল না কোনো গাছ-পালা।

এই মরুভূমিটি কিরকুক থেকে সুয়া পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। কিরকুক হলো উত্তর ইরাকের দজলা নদীর পূর্ব পাশে।

এই মরুভূমিতে পথপ্রদর্শক ছিলেন রাফে বিন উমাইয়া রা.। তিনি তখন খালিদ রা. কে বললেন,

একজন দ্রুতগামী অশ্বারোহীও তো এই মরুভূমি সহজে পাড়ি দিতে পারবে না। আর আপনি পুরো দল নিয়ে এখান দিযে পাড়ি দেয়ার চিন্তা করছেন?

খালিদ রা. বললেন, এ ছাড়া আমার আর কোনো পথ নেই।

খালিদ রা. এর বুসরা বিজয়

শামে পৌছে খালিদ রা. দেখলেন, রোমানদের সাথে যুদ্ধ করার  মুসলিম বাহিনীতে বড় ধরণের দুর্বলতা রয়েছে। দেখতে পেলেন এখন পর্যন্ত মুসলমানরা কোনো দুর্গ বা শহর জয় করে নি।

তাই তিনি যাত্রাপথে বুসরায় শিবির স্থাপন করেন। এরই মধ্যে অন্যান্য মুসলিম সেনাবাহিনীরা সাহায্য নিয়ে পৌছে যান। শহরবাসীরা জিজিয়া দেওয়ার শর্তে তরবারি ফেলে দেয়।

এভাবেই সন্ধির মাধ্যমে শহরটি মুসলমানদের হাতে চলে আসে।

আজনাদাইনের যুদ্ধ

হযরত খালিদ বিন ওয়ালিদ রা. ইরাকের দায়িত্ব হযরত মুসান্না বিন হারিসা রা. এর নিকট দিয়ে ইরাক ত্যাগ করে শামের উদ্দেশ্যে রওয়ানা দেন।

শামের সে সময় আরো বেশ কিছু মুসলিম সিপাহসালার নিজেদের বাহিনী নিয়ে চূড়ান্ত যুদ্ধের জন্য অপেক্ষা করছিরেন।

সর্বপ্রথম খালিদ রা. শামে পৌছে বসরা জয় করেন। এরপর তিনি অন্যান্য মুসলিম আমিরদের সাথে ময়দানে মিলিত হন।

যারা হলেন, হযরত আবু উবায়দা ইবনে জাররাহ রা.। হযরত শুরাহবিল বিন হাসানা রা.। হযরত ইয়াজিদ ইবনে আবু সুফিয়ান রা.।

রোমান সম্রাট হিরাক্লিয়াসের ভাই ৯০ হাজার সৈন্য নিয়ে ফিলিস্তিনের রামাল্লা ও বাইতে জিবরিনের মাঝামাঝি স্থানে অবস্থান করছিল।

এই সৈন্য শামে নিযুক্ত অন্য একজন মুসলিম সিপাহসালার হযরত আমর ইবনে আস রা. এর মোকাবেলার জন্য প্রস্তুত হয়ে ছিল।

যুদ্ধক্ষেত্র

মুসলিম বাহিনীগুলো আজনাদাইন নামক এলাকায় এসে উপস্থিত হলো। হযরত আমর ইবনে আস রা. ও নিজের বাহিনী নিয়ে এখানে উপস্থিত হলেন।

এ সময় মুসলমানদের সম্মিলিত বাহিনীর মুজাহিদদের সংখ্যা ছিল ৩০ হাজারের মতো। মুসলিম আমিরগণ একমত হয়ে খালিদ রা. কে যুদ্ধের আমির নির্বাচন করা হয়।

হযরত  আবু উবায়দা ইবনে জাররাহ, শুরাহবিল বিন হাসানা, আমর ইবনে আস ও ইয়াজিদ ইবনে আবু সুফিয়ান রা. তার অধীনে যুদ্ধ করছিলেন।

শেষ পর্যন্ত রোমানরা পরাজয় বরণ করে। হিরাক্লিয়াসের ভাই তাজারিক নিহত হয়। যুদ্ধের ময়দানে মুসলমানরা বিজয়লাভ করে।

এরপর খালিদ বিন ওয়ালিদ রা. এগিয়ে যান ইয়ারমুকের প্রাঙ্গনের দিকে।

মুসান্না বিন হারিসা রা. ও ইরাক

হযরত ‍মুসান্না বিন হারিসা রা. ইরাকের দায়িত্বভার গ্রহন করেন খালিদ রা. এর নিকট হতে। যখন হযরত খালিদ বিন ওয়ালিদ রা. রোমান বাহিনীর সাথে যুদ্ধের জন্য ইয়ারমুকে গমন করলেন তখন তিনি আবু বকর সিদ্দিক রা. এর নির্দেশে মুসান্না বিন হারিসার হাতে ইরাকের দায়িত্ব দিয়ে যান।

মুসান্না বিন হারিসা রা. তখন ইরাকের শহরগুলি রক্ষণাবেক্ষণের কাজে মনোনিবেশ করেন। সে সময়  খালিদ রা. এর ইরাক ত্যাগ ছিল খুবই অনাকাঙ্খিত। তখনও ইরানীরা পুরোপুরি পরাজয় বরণ করে নি।

বিভিন্ন স্থানে তারা ঘাপটি মেরে ছিল। সে সময় হযরত মুসান্না বিন হারিসা রা. এর হেডকোর্টার ছিল ইরাকের ঐতিহাসিক শহর হিরাতে।

আর খালিদ রা. এর সাথে নয় হাজার সৈন্যের ইরাক ত্যাগে পারসিকরা আরো শক্তিশালী হয়ে উঠলো। খালিদ রা. জানতেন, তিনি অনুপস্থিত থাকা অবস্থায় পারসিকরা আক্রমণ করতে পারে।

তাই তিনি অসুস্থ ও অসহায় ব্যক্তিদের মদীনায় পাঠিয়ে দেন। যেহেতু মুসান্না রা. কে আবু বকর সিদ্দিক রা. যুদ্ধের জন্যই ইরাকে পাঠিয়েছিলে। তাই তিনিও দায়িত্ব পাওয়ার পর সতর্ক থাকলেন।

ইরাকের আক্রমণ

ইরাকের সিংহাসনে তখন শাহরিয়ার ইবনে আর্দেশীর ক্ষমতায় বসেছে। সে মূলত পারস্যের রাজ বংশের কেউ নয়।

কিন্তু সে তার সময়কালের বড় যোদ্ধা ছিল।

তাই তার ক্ষমতা দখল করার সময় কেউ কিছু বলে নি।

যখন সে জানতে পারে, মুসলমানদের অর্ধেক সৈন্য ইরাক ত্যাগ করেছে তখনই সে মুসলমানদের হাত থেকে ইরাক উদ্ধারের জন্য যুদ্ধের প্রস্তুতি শুরু করলো।

তখন সে পারস্যের অন্যতম সেনাপতি হরমুজের নেতৃত্বে দশ হাজার সৈন্যের একটি বাহিনী প্রেরণ করলেন। তারা এসে হীরায় উপস্থিত হলো।

মুসান্না রা. তখন তাদেরকে হিরার সীমানা পর্যন্ত আসতে দেয়াটা উচিৎ মনে করলেন না।

তাই তিনি তার সেনাবাহিনী নিয়ে ইরাকের সীমান্ত এলাকা বাবেল নামক স্থানে ছাউনী স্থাপন করেন।

এরপর মুসান্না বিন হারিসা রা. এর সাথে যুদ্ধ শুরু হয় ইরানীদের। তারা দাঁড়ানোর ঠাঁই পর্যন্ত পাচ্ছিল না।

পরিশেষে তারা ময়দান থেকে পলায়ন করতে বাধ্য হয়।

যুদ্ধে মুসলিম বাহিনীকে ‍মুসান্না রা. সঠিকবাবে বিন্যস্ত করে।

মুজাহিদ বাহিনীর ডান দিকের দায়িত্ব মুআন্না রা. কে ও বাম দিকের দায়িত্ব মাসুদ রা. কে দেয়া হয়।

মুসান্না রা. তাদেরকে ধাওয়া করতে করতে পারস্যের রাজধানী পর্যন্ত পৌছে যান।

মদীনায় মুসান্না বিন হারিসা রা.

মুসান্না বিন হারিসা রা. হযরত বশির বিন ফাসামি রা. কে ইরাকে নিজের স্থলাভিষিক্ত করে মদীনার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হন।

মদীনায় পৌছার পর জানতে পারেন, আবু বকর সিদ্দিক রা. অসুস্থ। তখন মুসান্না রা. তার সাথে দেখা করেন।

আবু বকর সিদ্দিক রা. এর অন্তিম সময় ছিল সেটি। তিনি ইরাকের রণক্ষেত্রের অবস্থা সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করেন।

মুসান্না রা. ইরাকের অবস্থা জানিয়ে বললেন, আমার সাথে আরো কিছু সৈন্য দিন। যাতে আমরা পুরো ইরাক জয় করতে পারি।

এদিকে তখন মদীনায় তেমন একটা মানুষ ছিল না। যুবকরা ও নওমুসলিম স্বেচ্ছাসেবকরা অন্যান্য রণাঙ্গনে যুদ্ধরত ছিল। তাই তখন নতুন যোদ্ধা ব্যতিত এই অভিযান সম্ভব নয়।

তখন আবু বকর সিদ্দিক রা. ওমর রা. কে ডেকে বললেন, সম্ভবত এটি আমার জীবনের শেষ দিন।

যদি আমি আজ মৃত্যুবরণ করি তাহলে তুমি সন্ধা পর্যন্ত অপেক্ষা না করেই মুজাহিদ সংগ্রহ করে মুসান্নার সাথে পাঠিয়ে দিবে। আমার শোক যেন তোমাকে বাধাগ্রস্থ না করে।

আবু বকর সিদ্দিক রা. সেই রাতেই ইন্তিকাল করেন। দিনটি ছিল ২৮ আগষ্ট ৬৩৪ খৃষ্টাব্দ মোতাবেক ১৩ হিজরীর জুমাদাল আখিরাহ্ মাস।

জিহাদের জন্য আহবান

উমর রা. পরেরদিন মসজিদে এসে জিহাদের জন্য লোকদের আহ্বান করেন।

পরপর তিনদিন লোকদের আহ্বান করার পর সর্বপ্রথম বনু সাকিফের আবু উবায়েদ বিন মাসউদ জিহাদের জন্য নাম লিখান।

তাকে দেখার পর বনু সাকিফের আরো অনেকেই জিহাদের জন্য প্রস্তুত হয়ে যান।

এদিকে মুসান্না রা.ও মানুষকে জিহাদের পথে আহ্বান করতে থাকেন।

অবশেষে বড় একটি বাহিনী তৈরি হয়ে যায় জিহাদের জন্য। ওমর রা. তখন আবু উবায়েদ বিন মাসউদকে দলের আমির হিসেবে নির্ধারণ করেন।

মুসান্না রা. তো সেনাপ্রধান। তাই এটা যেন পাঠকের মনে সংশয় সৃষ্টি না করে।

সে সময় কেউ কেউ এই আপত্তি তোলে, এত এত সাহাবী উপস্থিত থাকতে একজন তাবেয়ীকে কেন আমির নির্ধারণ করা হলো?

ওমর রা. তখন বললেন, যে জিহাদের জন্য সর্বপ্রথম সাড়া দিয়েছে তাকেই আমি আমির বানাবো। অন্য কাউকে নয়।

খলিফা আবু বকর সিদ্দিক রা. এর মৃত্যু

১৩ হিজরীর জুমাদাল উখরা মাসে খলিফা আবু বকর সিদ্দিক রা. অসুস্থ হয়ে পড়েন। তার শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটতে থাকে। তিনি বুঝতে পারেন, তার সময় শেষ হয়ে আসছে। তখন তিনি উপস্থিত ব্যক্তিদের বলেন,

তোমরা আমার অবস্থা দেখতেই পাচ্ছ। আমার ধারণা, আমি সেরে উঠবো না। আল্লাহ আমার হাত থেকে তোমাদের বাইয়াত খুলে নিচ্ছেন।

সুতরাং তোমরা অন্য একজনকে আমির বানিয়ে নাও।

আবু বকর সিদ্দিক রা. এর স্থলাভিষিক্ত নির্ধারণ

নিজের ‍মৃত্যুর বিষয়টি অনুভব করার পর হযরত আবু বকর সিদ্দিক রা. বিখ্যাত সাহাবী আব্দুর রহমান ইবনে আউফ ও উসমান বিন আফফান রা. এর সাথে পরামর্শ করেন।

আবু বকর সিদ্দিক রা. পূর্ব থেকেই উমরকে খলিফা হিসেবে দেখতে চাচ্ছিলেন। তিনি আব্দুর রহমান ইবনে আউফ রা. কে বললেন, উমরের ব্যাপারে তোমার অভিমত কি?

তখন আব্দুর রহমান ইবনে আউফ রা. বলেন, আল্লাহর শপথ! তার ব্যাপারে আপনার সিদ্ধান্ত সবচেয়ে উত্তম।

এরপর আবু বকর সিদ্দিক রা. উসমান রা. কে ডেকে ওমর রা. সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলেন। তিনি বললেন, আমরা কেউ ই ওমরের সমকক্ষ নই। তিনি আমাদের থেকে অনেক উত্তম।

এরপর আবু বকর সিদ্দিক রা. উসায়েদ ইবনে হুজায়ের রা. কে এ ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করলেন। তিনিও প্রসংসামূলক বাক্য বললেন।

আবু বকর সিদ্দিক রা. হযরত তালহা রা. কে জিজ্ঞাসা করলে তিনি বলেন, ওমর তো লোকদের সাথে কঠোর আচরণ করে।

তখন আবু বকর সিদ্দিক রা. বললেন,

তা ঠিক হয়ে যাবে। এখন যদি আমি আল্লাহর সাথে সাক্ষাৎ করি তাহলে অন্তত দৃঢ়ভাবে বলতে পারবো যে, সর্বোত্তম ব্যক্তিকে খলিফা বানিয়েছি।

এরপর হযরত আবু বকর সিদ্দিক রা. অসিয়তনামা লেখার জন্য উসমান রা. কে ডাকলেন। তিনি লিখলেন,

আবু বকর সিদ্দিক বিন আবু কুহাফার পক্ষ থেকে মুসলমানদের প্রতি অসিয়ত।

এরপরই আবু বকর সিদ্দিক রা. অজ্ঞান হয়ে যান। উসমান রা. জানতেন যে, তিনি ওমরকে খলিফা বানাতে চাচ্ছেন। তাই তিনি শঙ্কা অনুভব করলেন,

যদি অজ্ঞান অবস্থায় খলিফার মৃত্যু হয়ে যায়! তাই তিনি এরপর লিখে দিলেন, আমি তোমাদের জন্য উমরকে খলিফা হিসেবে নির্ধারণ করছি।

এরপর আবু বকর সিদ্দিক রা. এর জ্ঞান ফিরে এলে তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, কি লিখেছ? তখন উসমান রা. তা পড়ে শোনান।

আবু বকর সিদ্দিক রা. বললেন, সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্য। তোমাকে মুসলমানদের পক্ষ থেকে উত্তম প্রতিদান দান করুন।

মৃত্যু

হযরত আবু বকর সিদ্দিক রা. ২২ জুমাদাল আখিরাহ ১৩ হিজরীতে মহান রবের ডাকে সাড়া দিয়ে দুনিয়া ত্যাগ করেন। আল্লাহ তাকে সর্বোত্তম প্রতিদান দান করুন।

আবু বকর সিদ্দিক রা. এর খেলাফতকাল ছিল সর্বোমোট ২ বছর ২ মাস।

তথ্যসুত্র

এই লেখাটি সংকলন করতে যেসব বইয়ের সাহায্য নেয়া হয়েছে,

মুসলিম উম্মাহর ইতিহাস। খন্ড ১-৩। মাকতাবাতুল ইত্তিহাদ

আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া। ইসলামিক ফাউন্ডেশন

আবু বকর সিদ্দিক সিদ্দিক। ড. আলী মুহাম্মাদ আস সাল্লাবী

আবু বকর সিদ্দিক রা. জীবনী। মীনা বুক হাউজ

এ ছাড়াও অনলাইনের বিভিন্ন ওয়েবসাইট এবং পিডিএফ

বিস্তারিত জানতে পড়ুন এই প্রবন্ধটি “আবু বকর

বিশেষ দ্রষ্টব্য: আমাদের লেখাগুলো সূচিপত্র অনুযায়ী দেখুন www.subject.arhasan.com এই ওয়েবসাইটে। আমরা কোন প্রকাশনীর বই রেফারেন্স হিসেবে ব্যবহার করি তা জানতে ভিজিট করুন www.arhasan.com/book এই ওয়েবসাইটে। আমাদেরকে গুগল নিউজে ফলো করতে পারেন এই লিংক থেকে। আমাদের ইউটিউব চ্যানেল ভিজিট করুন এই লিংক থেকে

আবু বকর রা. কবে জন্মগ্রহণ করেন

হস্তিঘটনার দুই বছর পর। ২৭ অক্টোবর ৫৭৩ খৃষ্টাব্দ

আবু বকর রা. কবে মৃত্যুবরণ করেন

২২ আগষ্ট ৬৩৪ তথা ২২ জুমাদাল আখিরাহ ১৩ হিজরী

আমি একজন ইসলামিক আলোচক, লেখক। ছোটবেলায় পড়ালেখা করেছি কওমী মাদ্রাসায়। পরবর্তীতে সাইন্স বিভাগ থেকে এসএসসি পরীক্ষা দিয়ে কৃতিত্বের সাথে পাশ করি। বর্তমানে আমি ডিপ্লোমা ইন মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং এ অধ্যায়নরত। অবসরে আমি বই পড়তে পছন্দ করি। নতুন কিছু শিখতে, নতুন কিছু জানতে ভালোবাসি। আমার ইচ্ছা, ভালো মানুষ হয়ে সমাজকে সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজে বিরত রাখার চেষ্টা করা।

https://www.arhasan.com