ভারতে ওয়াকফ সম্পত্তি দখল

ভারতে ওয়াকফ সম্পত্তি দখল – মুসলিমবিশ্বে খিলাফাহ ও ইমারাহ থাকাকালে “ওয়াকফ” ছিল খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রচলন। ধনী মুসলমানরা অথবা সুলতান মসজিদের জন্য এবং পড়াশোনার জন্য বিভিন্ন মাদরাসায় ও মুসাফিরদের জন্য বসবাসের জায়গা দান করতেন।

এর ফলে বহু ওয়াক্ফকৃত জমি থাকত মসজিদ, মাদরাসা ও অন্যান্য ধর্মীয় কাঠামোর অধীনে। এখান থেকেই উক্ত প্রতিষ্ঠানের অর্থনীতির চাকা সচল থাকত।

ভারতবর্ষে যখন ইংরেজরা এসে দখলদারিত্ব কায়েম করে তখন তাদের চোখ যায় এই ওয়াক্ফকৃত জমিজমার দিকে।

ইংরেজদের প্রধান লক্ষ্য ছিল মুনাফা অর্জন। কিন্তু তারা দেখতে পেল, দেশের অর্ধেকের বেশি জমিজমা থেকে কোনো রাজস্ব আসছে না।

কারণ, সেগুলো ওয়াক্ফকৃত জমি। তাই ব্রিটিশরা পরিকল্পনা করে উক্ত ওয়াক্ফকৃত জমিগুলো দখল করে নেওয়ার।

কিন্তু এভাবে হঠাৎ করে দখল করতে গেলে তো হিতে বিপরীত হতে পারে। তাই তারা আইনের মারপ্যাঁচ খেলে এই অভিসন্ধি বাস্তবায়ন করল।

ব্রিটিশ আইন ও ওয়াকফের অবমাননা

ব্রিটিশরা ভারতে আসার পর ওয়াকফকে তাদের ইংরেজি Common Law-এর পরিপন্থি মনে করে। সম্পত্তির চিরস্থায়ী দান তাদের দৃষ্টিতে অবৈধ বলে বিবেচিত হয়। কারণ, এর দ্বারা অর্থনৈতিক উপকার হাসিল করা যায় না।

তাই ১৮৯৪ সালে Abul Fata vs Rasamaya Dhur Chowdhury মামলার রায়ে বলা হয়, পারিবারিক উপকারের জন্য (সওয়াব হাসিলের জন্য) ওয়াকফ অবৈধ।

যদিও পরবর্তীতে Mussalman Wakf Validating Act, 1913 দ্বারা এই রায় বাতিল হয়, ততদিনে ভারতবর্ষের বহু ওয়াকফ জমি বেহাত হয়ে যায়।

১৮৯৪ সালের Land Acquisition Act ওয়াক্ফকৃত সম্পদসমূহ দখলের আরেকটি হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়।

‘জনস্বার্থে’ জমি অধিগ্রহণের নামে অসংখ্য ওয়াকফ জমি সরকার দখল করে নেয়। আর সেগুলোর কোনো মূল্যও ইংরেজরা প্রদান করেনি। এই সময়ে ভারতবর্ষে বিভিন্ন স্থানে ভয়াবহ চিত্র পরিলক্ষিত হয়।

বাংলা অঞ্চলের মধ্যে কলকাতা, মুর্শিদাবাদ, নদিয়া, হুগলি অঞ্চলে বহু ওয়াকফ জমি সরকারি কাজে অধিগ্রহণ করা হয়।

কিছু জমিতে গড়ে ওঠে স্কুল, আদালত ও প্রশাসন-ভবন। অনেক জায়গায় রেকর্ডস ধ্বংস বা গায়েব হয়ে যায়।

কলকাতার ওয়াকফ সম্পদের তালিকা এখনও অসম্পূর্ণ। যে-ই বাংলাদেশে ৮০ হাজার মাদরাসা থাকার কথা ইতিহাসে পাওয়া যায়, সেই ৮০ হাজার মাদরাসার ওয়াক্ফকৃত সম্পদ এখন কোথায়? নাই। অধিকাংশই দখল হয়ে গেছে।

দিল্লিতে বহু ঐতিহাসিক মসজিদ ও দরগাহের ওয়াকফ জমি ১৮৫৭ সালের বিপ্লব পরবর্তী সময়ে ব্রিটিশরা দখল করে নেয়।

ফতেপুরি মসজিদ, জামা মসজিদের জমি পর্যন্ত দীর্ঘদিন সরকারের দখলে ছিল। পরবর্তীতে কোর্টের নির্দেশে অনেক পরে মুসলমানদের কাছে তা ফিরিয়ে দেওয়া হয়।

অযোধ্যার নবাবরা শিক্ষা ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান নির্মাণে বিপুল পরিমাণ ওয়াকফ জমি দান করতেন। ইংরেজ আমলে এর বড়ো অংশ দখল হয়ে যায় এবং ব্যক্তিগত মালিকানায় পরিণত হয়।

বর্তমানে বহু জমি নিয়ে মামলা চলছে এবং ওয়াকফ বোর্ডগুলোর সীমিত ক্ষমতা এই সমস্যার সমাধানে বারবারই ব্যর্থ হচ্ছে।

নিজামের আমলে গঠিত হায়দ্রাবাদ ছিল ওয়াকফ সম্পদের দিক থেকে সমৃদ্ধতম অঞ্চল।

২০১১ সালের সরকারি রিপোর্ট অনুযায়ী, প্রায় ৭৭,৫০০ একর জমি ওয়াকফ হিসেবে তালিকাভুক্ত থাকলেও তার বড়ো অংশ বেসরকারি বা সরকারি দখলে চলে গেছে। বর্তমানেও বহু প্রতিষ্ঠান এ সকল জমির ওপরে ব্যবসা-বাণিজ্য পরিচালনা করছে।

ওয়াকফকৃত জমি দখলের সুদূরপ্রসারী ক্ষতি

মুসলমানদের ওয়াক্ফকৃত সম্পদ দখল করার মাধ্যমে শুধুমাত্র কিছু ভূমি আর কাঠামোই দখল হয় না, এর ফলে বিপর্যয় দেখা দেয় ধর্মীয় বিভিন্ন ক্ষেত্রে।

যেমন ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর আয় সংকুচিত হয়ে যায়। মাদরাসা ও শিক্ষাকেন্দ্রগুলো বন্ধ হয়ে যায় বা সীমিত হয়ে পড়ে।

দরিদ্র সহায়তা কার্যক্রমে ব্যাঘাত ঘটে। মুসলিম সমাজের শিক্ষা ও স্বাস্থ্যখাতে অবনতি ঘটে। একটি সম্প্রদায়ের দানের ঐতিহ্য ও আত্মবিশ্বাস ভেঙে পড়ে।

ভারত সরকার ১৯৫৪ সালে প্রথম ওয়াকফ আইনের মাধ্যমে এই সম্পদের রক্ষণাবেক্ষণের উদ্যোগ নেয়।

১৯৯৫ সালের সংশোধিত আইনে রাজ্য ভিত্তিক ওয়াকফ বোর্ড ও কেন্দ্রীয় ওয়াকফ কাউন্সিল গঠন করা হয়।

কিন্তু আজও দুর্নীতি, রাজনৈতিক প্রভাব ও প্রশাসনিক অক্ষমতার কারণে বহু ওয়াকফ সম্পদ উদ্ধার হয়নি।

ভারতে ওয়াকফ আইন সংশোধন এবং নতুন করে শঙ্কা

ভারত স্বাধীন হওয়ার পর আরও কয়েকবার ওয়াকফ আইন তৈরির কাজ হয়। যার মধ্যে ১৯৯৫ সালের ওয়াকফ আইন উল্লেখযোগ্য।

নতুন ওয়াকফ আইন সংশোধনী বিল ২০২৫ সালের ৩ এপ্রিল ভারতের লোকসভায় ১২ ঘণ্টার দীর্ঘ বিতর্ক শেষে ২৮৮-২৩২ ভোটে পাস হয়।

এরপর এটি রাজ্যসভায় অনুমোদিত এবং এবং রাষ্ট্রপতির স্বাক্ষরের মাধ্যমে আইনে পরিণত হয়েছে।

নতুন আইনের মাধ্যমে সকল ওয়াকফ সম্পত্তি সরকারি মালিকানায় এসেছে, বৈধ কাগজপত্র ছাড়া কোনো সম্পত্তি ওয়াকফ বলে গণ্য হবে না।

এ ছাড়া, বিরোধের ক্ষেত্রে সরকারের সিদ্ধান্তই হবে চূড়ান্ত, অমুসলিমদেরও বোর্ডে রাখা যাবে, আদালতের মাধ্যমে হস্তক্ষেপ সম্ভব হবে এবং ওয়াকফ সম্পত্তির নিবন্ধন বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।

ভারতের হিন্দুত্ববাদী প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এই বিলকে “একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত” বলে উল্লেখ করে এক্সে লেখেন, ওয়াকফ ব্যবস্থা এতদিন জবাবদিহিতার বাইরে ছিল, এখন তা নিয়ন্ত্রণে আসবে।

কিন্তু আমরা দেখছি এটিকে ভয়াবহ হস্তক্ষেপ হিসেবে। বিশেষত, মুসলিম ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও ঐতিহাসিক ওয়াকফ ভূমি—যেমন দারুল উলূম দেওবন্দ, দিল্লি জামে মসজিদসহ ভারতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা মসজিদ-মাদ্রাসাসমূহ—এখন ঝুঁকির মধ্যে পড়তে পারে।

মুসলিম নেতারা যেমন আসাদউদ্দিন ওয়াইসি এই বিলের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টে চ্যালেঞ্জ জানিয়েছেন।

ওয়াকফ আইন বাস্তবায়নের পর পুরো ভারত যেন নরক হয়ে উঠেছে। মুর্শিদাবাদ, উত্তরপ্রদেশসহ বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভ হয়েছে। এসব বিক্ষোভে মোদির লেলিয়ে দেওয়া পুলিশের গুলিতে শহীদ হয়েছে অসংখ্য মুসলমান। ওদিকে বিভিন্ন মসজিদ-মাদ্রাসা দখল করে নিচ্ছে উগ্র হিন্দুত্ববাদীরা।

এই আইনের পেছনে হিন্দুত্ববাদী চিন্তাধারার ছাপ স্পষ্ট। তবে অনেক হিন্দু নেতা এর বিরোধিতাও করেছে বটে।

কিন্তু মূল বিষয় হলো, সেগুলো এখানে টিকবে না। কেননা হিন্দুত্ববাদী সরকার তাদের ফর্মূলাই এখানে বাস্তবায়িত করবে।

আর যে-ই হিন্দুরা মুসলমানদের পক্ষে বলবে, তাদেরও গোপন এজেন্ডা থাকতে পারে। যেমন মুসলিম সিম্প্যাথি কুড়ানো, লোকসভা সহ আইনকে জবাবদিহিতার মধ্যে দেখানো ইত্যাদি।

ভারতীয় মুসলমানদের  জন্য আগামী দিনগুলো আরও ভয়াবহ হতে যাচ্ছে। আমরা আছি ভারতের পেটের মধ্যে।

আমাদের অবস্থাও চূড়ান্ত পরিণতির দিকে যাচ্ছে। যদিও আমরা হেসেখেলেই দিন পার করছি। সময় থাকতে আমাদের সতর্ক হওয়া উচিত।

অন্যথায় এই ভূমিতে আমরা গাজ্জা, উইঘুরের থেকেও ভয়াবহভাবে অবরুদ্ধ হয়ে যাব হয়তো।

তথ্যসূত্র

Siddiqi, Mohammad Athar Ali. The Mughal Nobility under Aurangzeb. Oxford University Press, 1997.

Fisher, Michael H. A Short History of the Mughal Empire. Bloomsbury Publishing, 2015.

Alam, Muzaffar & Subrahmanyam, Sanjay. Writing the Mughal World: Studies on Culture and Politics. Columbia University Press, 2011.

Government of India. Report of the Sachar Committee (2006).

Waqf Properties Eviction Report, Central Waqf Council, 2011.

The Waqf Act, 1995 (as amended in 2013) – Ministry of Minority Affairs, Govt. of India.

“The Lost Waqf Properties of Hyderabad,” The Wire, 2019.

“Waqf in Bengal: A Historical Study”, Journal of Islamic History and Culture of India, Vol. 4, Issue 2, 2014.

India’s opposition says will challenge Muslim properties bill in top court – Al Jazeera

India passes controversial bill on Muslim properties after fierce debate – BBC

Waqf Amendment Bill, 2025: The History of Waqf in India

ভারতের লোকসভায় বিতর্কিত ওয়াকফ সংশোধনী বিল পাস – BDNews24

2 thoughts on “ভারতে ওয়াকফ সম্পত্তি দখল”

  1. যথা সময়ে আপনার লেখার হাতছানিতে উম্মাহ নতুন পথ খুঁজে পাবে, নতুন করে ভাবতে শিখবে ইনশাআল্লাহ

    1. আব্দুর রহমান আল হাসান

      আল্লাহ উত্তম পরিকল্পনাকারী

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top