এই ভূখন্ডে আমাদের ভবিষ্যত কি – দলে দলে গ্রেপ্তার হচ্ছে। রাস্তায় মোবাইল চেক হচ্ছে। ঘরের দরজায় হঠাৎ টোকা দিয়ে জানতে চাওয়া হচ্ছে, “এখানে কি ছাত্র আছে?” কেউ দরজা না খুললে দরজায় মার্কার দিয়ে suspended শব্দ লিখে রাখা হচ্ছে। আপনাকে আমি গাজ্জার ঘটনা শোনাচ্ছি না। কাশ্মীরের ঘটনাও নয়। আরাকানের ঘটনাও নয়। এমনকি আতঙ্কে বছর পার করা উইঘুর মুসলমানদের ঘটনাও নয় এটি।
এই ঘটনা সবুজ শ্যামল একটি দেশের। যেটি কার্যত বহির্বিশ্বের মুসলিমবিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন একটি মুসলিম দেশ। যার চারিদিকে নেই কোনো মুসলিম ভূখন্ড। তিনদিনে ভারত। একদিকে বিক্ষুব্ধ সাগর। বাংলাদেশ।
যদিও বর্তমানে এই ঘটনার সূচনা কিছুদিন আগ থেকে দেখা হচ্ছে। কিন্তু আমরা আরো পেছন থেকে শুরু করতে চাই।
২০০৯ সাল। বাংলাদেশের ক্ষমতার মঞ্চে আসে আওয়ামীলীগ। স্বাধীনতাযুদ্ধে যাদের অবদানের কথা প্রায় সকলেই স্বীকার করেন।
ক্ষমতার চেয়ারের মেয়াদ কয়েকমাস যেতে না যেতেই গ্রেপ্তার করা হলো মুফাসসির, আলেম ও ইসলামপ্রিয় তরুণ, বৃদ্ধ, যুবকসহ অনেককে।
দেশে তখন হঠাৎ করে বেশ কিছু বিরোধের জোরে বিদ্রোহ করে বসে বিডিআর। রাস্তায় ট্যাঙ্ক নামে। গোলাগুলির শব্দে কেঁপে উঠছে শহরের বিভিন্ন কোণ।
পরবর্তীতে এই বিদ্রোহীরা অস্ত্র সমর্পণ করে। বিডিআর বদলে বিজিবি হয়। নিহত হয় বড় বড় মেজর ও জেনারেল।
“তিনি ভারতের কাছে সাহায্য চেয়েছেন…এবং সেই জন্যই আমরা বিমানঘাঁটিতে অবস্থান নিয়েছিলাম,” নতুন নির্দেশের জন্য অপেক্ষা করছিলাম। আর ঢাকায় অবতরণের পর যেকোনো পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম।”- ২০০৯ সালের বিডিআর বিদ্রোহ প্রসঙ্গে ভারতীয় সেনাবাহিনীর প্যারাশ্যুট রেজিমেন্টের অগ্রবর্তী দলের অধিনায়ক মেজর কমলদীপ সিং সাধু উপরের কথাগুলো বলেন।
কিন্তু কেন? কারণ, বিডিআর বিদ্রোহ হওয়ার পর সরকার চাপে পড়ে যায়। তাই ভারত চেয়েছিল তাকে নিরাপদে সরিয়ে নিতে।
২০১১/১২ সালের দিকে দেশে নাস্তিকদের আনাগোনা বেড়ে যায়। ইন্টারনেটের বিভিন্ন জনপ্রিয় ব্লগে লেখালেখি শুরু করে ইসলাম বিদ্বেষীরা।
নবীজিকে গালি-গালাজ, আল্লাহর বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ তোলার দুঃসাহস দেখায় তারা। ঈদ মোবারককে “ইট মোবারক” বলে কটাক্ত করে ব্লগে লেখে নাস্তিক রাজিব।
মুসলিম বীর পুরুষেরা তাকে জাহান্নামে পাঠালে কান্নায় বুক ভাসায় ক্ষমতাশীন দল। ‘দ্বিতীয় মুক্তিযুদ্ধের প্রথম শহীদ (!)’ বলে ঘোষণা দেওয়া হয় নাস্তিক রাজিবকে। ভাবা যায়!
২
২০১৩ সাল। পর পর ঐতিহাসিক কয়েকটি ঘটনা ঘটে বাংলাদেশে। শাহবাগে জনজাগরণ মঞ্চ বানিয়ে রাজাকারের ফাঁসির দাবীতে আন্দোলনে নামে বামপন্থী শিক্ষার্থী ও সমর্থকরা। তীব্র শব্দদূষণ ও বীর্যদূষণের সাথে চলে বিরিয়ানি বিতরণ এবং আন্দোলন।

একটা সময় এই আন্দোলন রাজাকারের ফাঁসির বদলে ইসলামবিদ্বেষী আন্দোলনে রূপ নেয়। শুরু হয় নাস্তিকদের ইসলামবিদ্বেষ চর্চা।
নাস্তিক ব্লগারদের শাস্তির দাবীতে বৃদ্ধ আশেকে রাসূল ডাক দেন ঐতিহাসিক লংমার্চ। জনসমাগম দেখে হতবাক দেশবাসী। “এত মানুষ একজন আলেমের ডাকে রাস্তায় আসে?” এমনটাই ভাবছিলেন তারা।

কোটি লোকের উপস্থিতিতে এবং ১৩ দফা দাবী জানিয়ে শেষ হয় লংমার্চ। এই লংমার্চ ছিল এক অশনি সংকেত ক্ষমতাসীনদের জন্য।
১ মাস পর ঢাকা অবরোধ কর্মসূচি দিয়ে আবারও রাস্তায় নেমে আসেন বৃদ্ধ মাওলানা। মূল পরিকল্পনা অনুযায়ী সব ঠিকঠাক চলছিল।

কিন্তু বিপদ বুঝতে পেরে ক্ষমতাসীনরা নেতাপর্যায়ের কিছু ব্যক্তিদের হাত করে আন্দোলনকারীদেরকে মূল পয়েন্ট থেকে সরিয়ে মতিঝিল শাপলা চত্ত্বরে নিয়ে আসে।
অন্য দিনের মতো সেদিনও রাত নামে। পাখিরা নীড়ে ফিরে যায়। রাস্তার পাশের ট্রাফিক লাইটগুলো জ্বলে উঠে। আন্দোলনরত ভাইয়েরা তখনো রাস্তায় অবস্থান করছেন।
কোটি কোটি মানুষ মতিঝিল ও এর আশেপাশে। গভীর রাত। ট্রাফিক লাইটগুলো একে একে বন্ধ হয়ে যায়।
পুরো এলাকার কারেন্ট বন্ধ করে দেওয়া হয়। শুরু হয় ভারত-বাংলাদেশ বাহিনীর যৌথ অভিযান।
এলোপাথারি গুলি ছুঁড়তে শুরু করে পুলিশ। শুরু হয় হাহাকার। আহত হয়ে পড়ে যাচ্ছে কেউ। দৌঁড়ে পালানোর চেষ্টা করছে অনেকে।
বিল্ডিংয়ের নিচে, ছাদে লুকিয়ে আছে কেউ কেউ ভয়ে। সমানতালে লাশ পড়ছে শাপলার পাশে। রক্তে রঞ্জিত হচ্ছে যমিনের মাটি।
এত লাশ, এত মৃতদেহ কোথায় যাবে? কে বহন করবে? কিছু মৃতদেহ স্থানীয় বা পরিচিতরা সরিয়ে নিল। বাকী দেহগুলো পড়ে রইলো রাস্তার কোণে, ডাস্টবিনের পাশে। সিঁড়ির কিনারায়।

সকল লাশ নিজেরাই নিয়ে গেল বন্দুরধারী লোকেরা। শোনা যায়, তা এসিড দিয়ে গলিয়ে ফেলা হয়েছে।
প্রমাণ লোপাট করা হয়েছে। প্রায় ৩০০ এর অধিক লাশ অজ্ঞাতনামা হিসেবে দাফন করে আঞ্জুমানে মুফিদুল ইসলাম সেবা সংস্থা।
এদিকে আহত হয়ে আছে হাজার হাজার মানুষ। তাদেরকে হাসপাতালে প্রবেশ করতে দিচ্ছে না। গ্রেপ্তার করা হচ্ছে। অপদস্থ করা হচ্ছে। গালি-গালাজ করা হচ্ছে।
৩
ছোট ছোট মাদ্রাসার ছেলেরাও আহত হয়েছিল এই নারকীয় হত্যাকাণ্ডে। ছোট একটি মাদ্রাসা। মুহতামিমকে ডাকা হলো। জেরা করা শুরু হলো গালি-গালাজের মাধ্যমে।
-এই হুজুর! হেফাজতে গিয়েছিলি? তোর সাথে কে কে গিয়েছিল তালিকা কই?
=তালিকা তো নেই।
-হুজুর মিথ্যা বলেন কেন?
=মিথ্যা বলার প্রশ্নই আসে না। মিথ্যা বলবো কেন?
-তালিকা কই?
=আসুন মাদ্রাসার দফতরে আসুন। ওখানে গিয়ে কথা বলি
-আরে রাখ তো চোতমারানির দফতর!
একটু পর আরেকজন আসলো। উপরের জালিমের থেকেও বড় পর্যায়ের। হয়তো নেতাগোছের কেউ। সরাসরি প্রশ্ন করলো,
-এই হুজুর! গতকালের ডাকাতি করা স্বর্ণ কী করছস? সোনা কই রাখছস ক? কে আছিস, পুরো মাদ্রাসায় দেখে আয় বাইতুল মোকাররম থেইক্কা লুট করা স্বর্ণ কোনহানে রাখছে।
আরেক পণ্ডিত আসলো মাদ্রাসায়। জিজ্ঞাসা করলো,
-ইসলাম কার?
=আল্লাহর।
-আল্লাহর ধর্ম আল্লায় রক্ষা করবো। তুই কোন বাল ফালাইতে গিয়েছিলি?
আরেকজন প্রশ্ন করলো,
-শফী হেরে কয় লাখ টেহা দিছে জিগান!
– হেফাজত কত টাকা দিছে আপনাদের? জনপ্রতি কত করে? আমি তো শুনেছি দুইলাখ দিছে। ত্রিশ হাজার অন্যরারে দিয়া বাকিটা আপনি মেরে দিচ্ছেন? কই চেকবই কই দেহি? (আগ বাড়িয়ে কথাগুলো বললো একজন)
এভাবেই বিভিন্ন মাদ্রাসায় গিয়ে ক্ষমতাসীন দলের চোকরা নেতা-চামচারা বেয়াদবী ও উষ্কানীমূলক কথা বলছিল মাদ্রাসার মুহতামিমদের।
উপরের ঘটনা থেকেও ভয়ঙ্কর ঘটনা ঘটেছে অনেক জায়গায়। কিছু মাদ্রাসা তো বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। কোথাও জেলে নেওয়া হয়েছিল ছাত্র-শিক্ষকদের। রেহাই পাই নি মক্তবের শিশুটাও।
৫ ই মে ২০১৩। বাংলার বালাকোট। বাংলার ইন্তিফাদা। বাংলা কারবালা।
লাখো জনতার উপর আক্রমণ চালিয়ে ১ রাতের মধ্যে যৌথ বাহিনী দিয়ে হত্যা করে লাশ গুম করা হয়। পরিবারকে ভয় দেখানো হয়। থানায় মামলা করতে বাঁধা দেওয়া হয়।
সেদিন সত্য প্রচারের কারণে বন্ধ করে দেওয়া হয় স্যাটেলাইট টিভি চ্যানেল। ইসলামিক বিভিন্ন চ্যানেল।
প্রকাশনা বন্ধ করে গ্রেপ্তার করে নিয়ে যাওয়া হয় প্রিন্ট মিডিয়ার সময়ের ত্যাগী ও সাহসী সংবাদিকদের।
শাপলার সেদিনের ঘটনা আজ কতজনে পুরোপুরি জানেন?
ধামাচাপা দেওয়া হয় এই গণহত্যার। সংসদে দাঁড়িয়ে, লাখো মাদ্রাসার ছাত্রদের সামনে দাঁড়িয়ে গর্ব করে বলা হয়, “সেদিন কেউ মারা যায় নি। রং মেখে তারা রাস্তায় শুয়ে ছিল।”
কেউ এগিয়ে আসে নি। কোনো দল, কোনো সংগঠন, কোনো সংস্থা, কোনো বিশ্ববিদ্যালয়, কোনো এনজিও, কোনো বিদেশী সত্য প্রচারের সাংবাদিক! নাহ্ কেউ নয়।
তদন্ত করতে বাঁধা দেওয়া হলো এই হত্যাকান্ডের। কলাম লেখায় গ্রেপ্তার করা হলো বিশ্লেষকদের। জঙ্গী বলে নাস্তিকদের পক্ষালম্বন করা হলো।
আজও ধোঁয়াশায় আছে মানুষ। এখনো অনেকে বিষ্মিত হয়ে বলে, “সত্যিই কি সেদিন কেউ মরছিল?”
৪
২০১৮ সাল। সকাল থেকেই একে একে মিছিল বের হতে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। কোটা সংস্কার আন্দোলন।
হেলমেট বাহিনীর হামলা, ডিফেন্সলীগের হামলার মাধ্যমে এটাও একটা সময় সমঝোতায় আসে। কোটাপ্রথা বাতিল হয়।
এই বছরেরই আরেকটি স্নিগ্ধ দিন। স্কুল-কলেজের ছেলেটা রাস্তায় বের হয় নিরাপদ সড়কের দাবীতে। আঁটকিয়ে দেওয়া হয় লাইসেন্স বিহীন গাড়ি। পুলিশের গাড়ি। সেনাবাহিনীর গাড়ি।
এখানেও হামলা হয়। আহত হয় স্কুলের ছাত্ররা। একটা সময় মেনে নেওয়া হয় দাবী। ফিটনেসবিহীন গাড়ির লাইসেন্স বাজেয়াপ্ত করা হয়। কিন্তু এই নিয়ম কই দিন রইলো?
পৃথিবী বদল হলো। সময়ের পাল্লায় নতুন হাওয়া লাগলো। করোনা এসে পৃথিবীকে থমকে দিল। আমাদের রাস্তা রয়ে গেল আগের মতোই। নিরাপদহীন।
৫
কোটাবিরোধী আন্দোলন আবার শুরু হলো। ৩০% কোটা মুক্তিযোদ্ধাদের সন্তান ও নাতি-নাতনিদের। প্রতিবাদ শুরু হলো।
ক্ষমতাসীন দলের প্রধান বললো, “কোটা মুক্তিযোদ্ধারা পাবে না তো কি রাজাকারের সন্তানেরা পাবে?”
কোন রাজাকার? যেই রাজাকারের ছেলের সাথে প্রধানের মেয়ের বিয়ে হয়েছে! নাকি চেতনা ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধাচরণ করা রাজাকার?
“তুমি কে আমি কে, রাজাকার রাজাকার। কে বলেছে কে বলেছে, স্বৈরাচার স্বৈরাচার” – স্লোগানে ফুঁসে উঠলো বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা।
হল থেকে লীগের ছানাদের পিটিয়ে বের করা হলো। নিষিদ্ধ করা হলো। কেউ ভয়ে, অনুতাপে, সুবিধার জন্য লীগ ত্যাগ করে স্টাট্যাস দিল।
বিভিন্ন জেলায় আস্তে আস্তে ছাত্ররা ফুঁসে উঠতে শুরু করে। ডিফেন্সলীগের গুলিতে নিহত হলো অনেকজন।
স্বৈরাচারের গোলামদের অস্ত্রের সামনে লাইভ রেকর্ডে বুক পেতে মারা গেল আবু সাঈদ। একে একে মারা গেল ওয়াসিম, শান্ত, তাহমিদ, তানভিন, মুগ্ধ, দীপ্ত, রুদ্রসহ আরো অনেকে।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাহিরে যাওয়া শুরু করলো। ভারত-বাংলাদেশ যৌথ বাহিনীর মাধ্যমে অভিযান পরিচালনা শুরু হলো। সারাদেশে ইন্টারনেট বন্ধ করা হলো। সেনা কারফিউ জারি করা হলো।
ছাত্রদের সাথে সংহতি জানিয়ে রাস্তায় নামলো সাধারণ মানুষ। দেশের মাটি রক্তে রঞ্জিত হলো।
৯০০+ শিক্ষার্থীসহ, কুলি, দিনমজুর, শ্রমিক, শিশু, নারী-পুরুষ মারা গেল এই কয়েকদিনের গণহত্যায়।
আহত হলো ২০,০০০+ এরও বেশি। গণগ্রেপ্তার হলো হাজার হাজার মানুষ। “সামনের ফাল্গুনে আমরা দিগুণ হবো” – স্লোগানে ভরে উঠলো সোস্যাল মিডিয়া।
৬
দেশের ভবিষ্যত কি? দেশের এই স্বৈরাচারের পতনই কি একমাত্র সমাধান? আমরা কি পুরো মুক্তো-স্বাধীন দীপ্ত বাঙালী হয়ে যাবো? এক কথায় উত্তর হলো, না।
এই ভূখন্ডে আমরা কিভাবে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলবো, এটা বুঝার জন্য আমাদের মানচিত্রে আগে চোখ বুলাতে হবে।
বাংলাদেশের অবস্থান ভৌগলিকভাবে কোথায় দেখুন। আমাদের আশেপাশে কোনো মুসলিম দেশ নেই।

আমরা এই ভূমিতে কাফেরদের দ্বারা অবরুদ্ধ হয়ে গেলে ফিলিস্তিন, ইরাকের চেয়েও খারাপ অবস্থা হবে।
দুঃখের সাথে বলতে হচ্ছে, আমরা সেই খারাপের দিকেই আস্তে আস্তে অগ্রসর হচ্ছি। ১০০ বছর আগের কথাগুলো একটু কল্পনা করুন!
খেলাফত ধ্বংস করা হলো। মুসলিম উম্মাহকে রুটির মতো কেঁটে কেঁটে জাতীয়তাবাদের স্লোগান দিয়ে আলাদা করে দেওয়া হলো। এতে লাভ হলো কার? খৃস্টান, ইহুদি, হিন্দু, নাস্তিকদের।
খৃস্টানরা শ্বেত সন্ত্রাসী কার্যক্রম শুরু করলো। ইহুদিরা নিরীহ মুসলমানদের হত্যা করতে লাগলো। সাপোর্ট হিসেবে আছে পুরো কাফিরবিশ্ব।
হিন্দুরা দাঙ্গা, দালাল, আক্রমণের মাধ্যমে মুসলিম ভূখন্ডে হামলে পড়লো। নাস্তিকরা সমাজতন্ত্রের আওয়াজ তুলে মুসলমানদের বন্দী করে ঈমান-আকিদা ধ্বংসের মিশনে নামলো।
এই কাফেরবিশ্বের এমন জোট বেঁধে হামলার সময় আমরা মুসলমানরা কি করলাম? পালিয়ে বেড়ালাম। সম্পদের মায়ায় ডুবে গেলাম। কণ্ঠস্বর রোধ করে দিলাম।
একটা প্রশ্ন করি। ভারত কেন পাকিস্তান থেকে আলাদা হতে বাংলাদেশকে সাহায্য করেছিল? ভারতের স্বার্থ কি? বন্ধুরাষ্ট্র বলে যারা আজ মুখে ফেনা তুলে, এরা হলো উকৃষ্ট গোলাম। তাদের মাথা এক্ষেত্রে কাজ করবে না।
বাংলাদেশ স্বাধীন করার পেছনে ভারতের সবচেয়ে বড় স্বার্থ ইকোনমি। এজন্যই দেখবেন, এই দেশের ফসলের জিআই নিয়ে যায় ভারত। বলার মতো সাহস নেই ক্ষমতাবানদের।
এদেশের সরকার পাঠায় আম, ইলিশ। আর দাদাবাবুরা পাঠায় ফেলানীর লাশ। খুলে দেওয়া বাঁধ।
আমরা দেই ট্রানজিট বন্দর, রেল। আর তারা দেয় দেশ দখলের হুমকি এবং সীমান্তে প্রতিদিনের ফুলকি।
৭
ভারত কেন এই দেশ দখল করে না? প্রশ্নটা অন্যভাবেও ভাবা যায়। আসলে দখল করবে কি, দখল করেই আছে। কিছু কারণে ভারত এই দেশ এখনই প্রত্যক্ষভাবে দখল করতে আগ্রহী নয়।
বাংলাদেশ দখল করতে গেলেই যুদ্ধ শুরু হবে। যুদ্ধ মানে মৃত্যু। মিলিয়ন ডলার খরচ।
বড়ো ইকোনমি ধ্বস। এছাড়াও সেভেন সিস্টার্স, সিকিম, কেরালাসহ অনেক প্রদেশে বিদ্রোহ শুরু হতে পারে।
উপর দিয়ে ভারত যতই অখন্ড ভারতের কথা বলুক না কেন, এটা স্রেফ বাহানা। মনস্তাত্ত্বিক স্নায়ুযুদ্ধ।
বদৌলতে ভারত দেখতে পাচ্ছে, এখানে পাপেট সরকার রাখাটাই অধিক যুক্তিযুক্ত।
পাপেটরা গোলামের মতো সকল কাজ করবে। মাঝেমধ্যে কিন্তু পাপেটরাও স্বাধীন হওয়ার জন্য একটু নড়াচড়া করে।
এজন্য ব্যাকআপ হিসেবে তখন তাকে মিডিয়াতে বাটপার, সন্ত্রাস হিসেবে প্রচার করে। উদাহরণস্বরূপ, বেনজিরের ঘটনা। সিনহার ঘটনা।
ভারতে বর্তমানে মুসলমানের সংখ্যা ২০ কোটির বেশি। যা ভারতের মোট জনসংখ্যার প্রায় ১৩%।
এখন যদি ভারত বাংলাদেশ দখল করে তাহলে মোট মুসলমানের সংখ্যা হবে প্রায় ২১% থেকেও বেশি।
একটু চিন্তা করুন। এই দেশ দখল হলো। দেশের মানুষের বৃহৎ একটা অংশই এই পরাধীনতা মানবে না।
জিম্মি হলো। ৯১% মুসলিম এখানে। বর্ডার উঠিয়ে দেওয়ার কারণে বৃহত্তর ভারতের সকলের নিকট আসা-যাওয়া শুরু হলো।
ভারতীয় মুসলিমরা এমনিতেই পোঁড় খাওয়া জাতি। দীর্ঘদিন নির্যাতনে অবস্থা ভয়াবহ।
এর মধ্যে যখন তাদের সাথে আরো সাড়ে ১৫ কোটি মুসলমান আজাদি আন্দোলনে যুক্ত হবে, তখন এর ভয়াবহতা কেমন হবে?
হিন্দুদের যতই লাফাতে দেখেন না কেন, তারা মরতে ভয় পায়। আর মুসলিমকে যতই ভীরু দেখা যাক না কেন, সে আল্লাহর জন্য জীবন দিতে প্রস্তুত সঠিক সময়ে।
এই অগ্নিশিখা রোধ করার শক্তি ভারতের নেই। কখনো সম্ভব নয়। আপনি কখনোই ২১% মানুষকে দমাতে পারবেন না। যখন সর্বদাই এই ২১% বাড়তে থাকে।
আর হ্যাঁ, এটা ভুলবেন না, ভারত এই দেশ দখল করলে চীনও ভারতের উপর আক্রমণ করবে। কাশ্মীর দখল করে নিবে। কারণ, এই দেশে ট্রিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ আছে চীনের।
পাকিস্তানও হয়তো আক্রমণ করবে নতুন ভূমির লোভে। তারা ইমোশনালি বাঙ্গালীদের ব্লাকমেইল করে সহজেই ভারতের বিরুদ্ধে দাঁড় করাতে পারবে। যুদ্ধের পরিস্থিতি এমনই হয়।
৮
কিছু জিনিষ হয়তো আমরা বুঝতে পেরেছি, এই যে জাতীয়তাবাদের স্লোগান, ঘুণে ধরা গণতন্ত্রের স্লোগান, নাস্তিক-বামপন্থীদের সমাজতন্ত্রের স্লোগান, এনজিওদের হিউম্যানিজমের স্লোগান, এই সকল কিছুই পরিত্যাজ্য, পরিত্যাক্ত।
মুসলমানরা এবং বিশ্ব কখনোই এই আদর্শগুলোর মাধ্যমে শান্তি খুঁজে পাবে না। বর্তমানে আমরা তো ইতিহাস পড়িই না।
মুসলিম স্বর্ণযুগের কাহিনী আমরা কতজন জানি? আমাদের আশেপাশের কতজন জানে?
এই না জানার কারণেই অন্তরে বাড়তে থাকে হীনমন্যতা, গোলামী, পরাধীনতা। মুসলিম স্বর্ণযুগে কি গণতন্ত্র ছিল? নির্বাচন ছিল? হাতেগড়া আদালত ও সংবিধান ছিল? কিছুই ছিল না। এজন্যই তারা উন্নতি করতে পেরেছে।
সমস্যা টাকাতে নয়। সমস্যা আমাদের সিস্টেমে। টাকার কাগজগুলো আগের মতোই আছে। মুদ্রার নাম আগের মতোই আছে। নেই শুধুমাত্র আগের মতো মূল্যমান।
কারণ, আগের ক্যারিশমাটিক শাসনব্যবস্থায় দুর্নীতি হতো না। চুরি হতো না। অবাধ যৌনাচার ছিল না। বেহায়াপনা ছিল না। টাকা পাচার ছিল না।
এখন ব্যক্তি স্বাধীনতার নামে কি নেই? দুর্নীতি, চুরি, টাকা পাচার, ব্যাংক লুট, বেহানাপনা, অবাধ যৌনাচার, সমকামিতা ইত্যাদি।
তাই আগে ১ টাকায় ১৬ মণ চাউল পাওয়া গেলেও এখন ১ টাকায় একটা চকলেটও পাওয়া যায় না। তাহলে আমাদের শাসব্যবস্থা কিসের হবে?

খেলাফত আ’লা মানহাজিন নবুয়্যাহ। নবীজির পরবর্তী খলিফাদের শাসনামলের মতো খেলাফত আমাদের মুক্তি দিতে পারে। আশা দেখাতে পারে। স্বর্ণযুগ ফিরিয়ে দিতে পারে।
খেলাফতের শাসনব্যবস্থায় আপনি দেখবেন না, পুলিশ জনগণের দিকে গুলি ছুঁড়ছে। অবৈধ ট্যাক্স বসাচ্ছে। টাকা, নারী, মাদক পাচার হচ্ছে। আপনি খেলাফতের শাসনব্যবস্থায় দেখতে পাবেন, দেশের প্রধান স্বয়ং খলিফাকে অপরাধের জন্য আদালতের কাঠগঁড়ায় দাঁড় করানো হচ্ছে। প্রটোকল ছাড়াই সরকারের দায়িত্বশীলরা বের হচ্ছে। তাদের জীবনের নিরাপত্তা নিয়ে ভয় নেই। কেউ মাপে কম দিচ্ছে না। কেউ আপনাকে ঠকিয়ে দিচ্ছে না।
১ টাকায় ১৬ মণ কেন, আরো বেশি চাউল পাওয়া যেতে পারে তখন আবার। এই স্বর্ণযুগ আসবে। তবে এর জন্য রয়েছে প্রস্তুতি। পথ তৈরি।
যতদিন আপনি নিজেকে বাঙালী পরিচয়ের উর্ধ্বে গিয়ে নিজের আসল আত্মপরিচয় “আমি মুসলিম” ভুলে থাকবেন ততদিন আমরা পতনের দিকেই যাব।
ইসলামী ইতিহাস নিয়ে পূর্ণাঙ্গ ধারণা এবং আলেম ও প্রাজ্ঞ ব্যক্তিদের পরামর্শ আপনাকে নিয়ে যেতে পারে আরো বহু দূর।
এই পথ তৈরি করা আমাদের কর্তব্য। হয় আমাদের নিজেদের জন্য অথবা আমাদের পরবর্তী প্রজন্মের জন্য।
এই ভূখন্ডে আমাদের ভবিষ্যত নির্ধারণ হবে ইসলামের দ্বারা। অন্য সকল মাধ্যমেই ফ্যাসিবাদ ব্যতিত আর কিছু উপহার দিতে পারবে না।
লেখাটি শেয়ার করতে সর্ট লিংক কপি করুন