নিরপরাধ জনগণ – বেসামরিক/নিরপরাধ জনগণের মৌলিক সংজ্ঞা কি? এটা নির্ণয়ে ভাষাবিদরাও বোধ হয় অপারগ।
রাষ্ট্রের জনগণ যখন সরকারকে পুরোপুরি সাপোর্ট করে সরকারি কর্মযজ্ঞে, দেশি-বিদেশি নীতিনির্ধারণে তখন কি জনগণ রাষ্ট্রের বিরোধী শক্তি? মনে হয় না।
জনগণ সরকারপক্ষের পক্ষপাতিত্ব করে। এই সময় সরকারের সাথে কারও যদি সংঘাত হয় আর উক্ত সংঘাতের হাওয়া যদি সাপোর্টার জনগণের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে তাহলে কি বলা যায়, এরা নিরপরাধ জনগণ?
সামরিক, বেসামরিক নির্ণয় হয় হাতে অস্ত্র থাকা ও না থাকা নিয়ে।
কিন্তু কখনো কখনো হাতে অস্ত্র না থাকলেও অস্ত্র থাকার চেয়েও বড়ো অপরাধ করা যায়। যেমন সাইবার অ্যাটাক। তাই বলে বেসামরিক ব্যক্তি কি দুধে ধোয়া তুলসীপাতা?
এই পৃথিবীতে কিছু জিনিস শুধুমাত্র অভিধানেই সুপ্ত থাকে। বাস্তবিক অর্থে এর কোনো অস্তিত্ব নেই।
যেমন স্বাধীনতা, নিরপরাধ, সমতা, অধিকার, ন্যায় ইত্যাদি।
এই প্রতিটা জিনিসেই দুইজন ব্যক্তি একই সংজ্ঞার উপর একমত হবে না। একজন মুসলমানের নিকট স্বাধীনতা মানে আল্লাহর প্রতি আত্মসমর্পণ, বিপরীতে একজন লিবারেল ব্যক্তির নিকট স্বাধীনতা মানে ভোগবাদের প্রতি আত্মসমর্পণ।
সমতার ক্ষেত্রেও একই কথা। ন্যায়ের ক্ষেত্রে তো এটা দৈনিক আলাপে স্পষ্ট।
যুদ্ধ মানে ধোঁকা। কথাটি প্রসিদ্ধ। যুদ্ধের ময়দানে অনেক কিছুই বৈধতা পায়।
আমরা যুদ্ধকে যেমন দুই পক্ষের মুখোমুখি অবস্থানে থেকে কল্পনা করি, বাস্তবিক যুদ্ধ তেমনটা নয়।
আধুনিক পৃথিবীতে যুদ্ধের পরিধি বিস্তৃত। এখানে একটা রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে অন্য রাষ্ট্রের দাঁড়ানোর প্রয়োজন নেই।
গুটিকয়েক ব্যক্তি মিলেই একটি রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত হতে পারে।
এখন এই যুদ্ধের ফলে অপরাধী কারা হবে, এটা নির্ণয় করতে হলে উভয় দলের দৃষ্টিভঙ্গিকে আমলে নিতে হবে।
দেশের বিপরীতে গুটিকয়েক ব্যক্তি অপরাধী, কেননা তারা দেশে আক্রমণ করেছে।
গুটিকয়েক ব্যক্তির বিপরীতে দেশ অপরাধী, কেননা দেশ গুটিকয়েক ব্যক্তির অধিকার দিচ্ছে না।
এখন দেশের সাধারণ জনগণের কি হবে? তাদেরকে অবশ্যই যেকোনো একটি পক্ষ বেছে নিতে হবে।
হয় তারা দেশের পক্ষে থেকে গুটিকয়েক ব্যক্তির বিরুদ্ধে সরকারকে সাহায্য করবে, অথবা তারা গুটিকয়েক ব্যক্তির পক্ষে গিয়ে দেশের সরকারের বিরুদ্ধে যাবে।
তাহলে এটা স্পষ্ট যে, এখানে নিরপেক্ষ থাকার কোনো সুযোগ নেই। হয় মারো, নয়তো মরো।
2
দারুস সালাম ও নাইরোবি হামলা থেকে নিয়ে ৯/১১, ইরাক যুদ্ধ থেকে নিয়ে সোমালিয়ার যুদ্ধ, ফিলিস্তিন যুদ্ধ থেকে নিয়ে কাশ্মীর যুদ্ধ, সবখানেই বিষয়টা স্পষ্ট।
আপনাকে যেকোনো একপক্ষে অবস্থান করতেই হবে। এই পৃথিবীতে নিরপেক্ষতার কোনো সুযোগ নেই।
যখন পক্ষ নির্ণয় হয়ে যাবে, তখন আসবে সামরিক/বেসামরিক ব্যক্তিদের আলাপ। আগে নয়।
= আমেরিকার জনগণ আমেরিকার সরকারকে ট্যাক্স দেয়, ভোট দেয়, মিডিয়ায় প্রচারণা চালায়। কাদের পক্ষ হয়ে?
: আমেরিকার পক্ষ হয়ে।
= তাহলে তারা কি নিরপেক্ষ?
: না। তারা নিরপেক্ষ নয়।
= কিন্তু তারা তো কখনো কখনো আমেরিকার বিভিন্ন নীতি নির্ধারণের বিরোধিতাও করে বটে। তাই বলে কি তারা নিরপেক্ষ হবে না?
: না। শুধু বিরোধিতা করলেই নিরপেক্ষ হয় না, সে সরকারের একটা নীতির বিরোধিতা করছে ঠিক, কিন্তু আরও দশটা নীতিকে সমর্থন করছে। সে সরকারের যুদ্ধবিষয়ক ও আন্তর্জাতিক নীতির ক্ষেত্রে সমর্থন করছে কখনো কখনো। এ ছাড়াও সবচেয়ে বড়ো কথা হলো, সে সরকারের দৃষ্টিভঙ্গিকেই একমাত্র যৌক্তিক মনে করছে। তাকেই চিরসত্য মনে করছে।
= তার মানে কি, তাকে উভয় পক্ষের দৃষ্টিভঙ্গিকে আমলে নিতে হবে?
: হ্যাঁ। এরপর তাকে অবশ্যই যে-ই কোনো একপক্ষের শারীরিক অথবা মানসিকভাবে থাকতে হবে। এমনিতেও এই সময় মানুষ যেকোনো একপক্ষ অটোমেটিক বেছে নেয়। তাই যারা এক দলের পক্ষে থাকবে না, অটোমেটিক তারা অপর পক্ষের শত্রু হিসেবেই বিবেচিত হবে। এটাই তো মৌলিক সত্য।
আদর্শিক ক্ষেত্রে কখনোই নিরপেক্ষ থাকা যায় না। যেকোনো একটা পক্ষ বেছে নিতেই হয়। আদর্শচ্যুত ব্যক্তিকে পৃথিবীর কোনো মানুষই পছন্দ করে না।
শুধুমাত্র ‘ওখানে শিশুরা আছে, ওখানে নারীরা আছে, ওখানে বেসামরিক জনগণ আছে’ বলে যুদ্ধের বাস্তবতাকে অস্বীকার করা যায় না।
যুদ্ধক্ষেত্রে অনেক কিছুই নতুন সংজ্ঞায় আবির্ভূত হয়। বদলে যায় স্বাভাবিক জীবনের স্রোত।
তাইতো যুদ্ধকে কামনা করতে নিষেধ করা হয়েছে, আবার যুদ্ধ থেকে পলায়ন করতেও নিষেধ করা হয়েছে। উভয় নিষেধের প্রেক্ষাপট ভিন্ন, উদ্দেশ্য ভিন্ন।
প্রত্যেক ব্যক্তিরই একটা কাল্পনিক জগৎ থাকে। যা মৃত্যুর আগে কখনো বাস্তবায়িত হয় না। কিন্তু মুসলমানদের একটি নিজস্ব জগৎ রয়েছে।
যা পূর্বেও বাস্তবায়িত হয়েছে, ভবিষ্যতেও বাস্তবায়িত হবে। আমাদের দায়িত্ব হলো, সৈনিকের দায়িত্বপালন করা।