ডলারময় বিশ্বব্যবস্থার অশনি সংকেত – ২০০১ এর হঠাৎ করেই যখন টুইন টাওয়ারে হামলা হলো তখন এই হামলার পরিকল্পনাকারী উসামা বিন লাদেন বলেছিলেন, “এটা আমেরিকার পতনের সূচনাকাল। আমেরিকান পতন অনিবার্য।” কয়েক দশক আগে এই সমর বিশারদের এই উক্তিটি বোঝে না আসলেও এখন এটি পানির মতো পরিষ্কার। ১৯৭১ সালে আমেরিকার নিক্সন সরকারের হাত ধরে স্বর্ণমুদ্রার পতন হয়। এরপর থেকে শুরু হয় ডলারের রাজত্ব। ডলারকে টিকিয়ে রাখার পেছনে মধ্যপ্রাচ্যের আরব রাষ্ট্রগুলোর অবদান (!) অনেক। সৌদির সাথে হওয়া আমেরিকার বিখ্যাত সেই চুক্তিটি নিয়ে প্রায়ই আলোচনা হয়। “সৌদি একমাত্র ডলারে তেল বিক্রি করবে। বিনিময়ে আমেরিকা সৌদ রাজবংশকে নিরাপত্তা দেবে”। ইতিহাসে এটা পেট্রোডলার চুক্তি নামে প্রসিদ্ধ।
পরবর্তী সময়ে ওমান, কাতার, কুয়েত, বাহরাইন, ইরাক ও ইরান ও একমাত্র আমেরিকান ডলারে তেল বিক্রি শুরু করে। ফলে বাড়তে থাকে ডলারের চাহিদা। ডলারের মূল্যমান বেড়ে যায় হুঁ হুঁ করে। ডলারের প্রভাব যত বাড়তে থাকল তত বেশি আমেরিকা আকাশে উড়া শুরু করল। বিশ্বে একমাত্র তারাই পরাশক্তি হিসেবে আবির্ভূত হলো।
পূর্বে সোভিয়েত ইউনিয়ন ছিল খুবই শক্তিধর একটি রাষ্ট্র। আমেরিকার সাথে তাদের শীতল যুদ্ধের ইতিহাস দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকেই। ১৯৭৯ সালে প্রবল প্রতাপের সাথে সোভিয়েত ইউনিয়ন আফগানিস্তানে প্রবেশ করে। তারা ভেবেছিল, ১ সপ্তাহের মধ্যে আফগানিস্তান দখল করে নেবে। কিন্তু তারা জানত না, আফগানিস্তান আক্রমণ ই ছিল তাদের পতনের সূচনা।
১৯৭৯-১৯৮৯ সাল পর্যন্ত ১০ বছর রুশ-আফগানিস্তান যুদ্ধ হয়। ফলাফল সোভিয়েত ইউনিয়ন ন্যক্কারজনকভাবে হেরে যায়। ১৯৯২ সালে দেশটি ভেঙে ১১টি নতুন রাষ্ট্রের উদয় হয়। সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর আমেরিকা পরিপূর্ণভাবে প্রকাশ্যে চলে আসে। তাদের অর্থনীতি, সমরনীতিতে টেক্কা দেওয়ার আর কেউ রইল না। এই কঠিন সময়ে যখন আমেরিকা নিজেদের খোদার আসনের অধিকারী মনে করতে লাগল তখন ই আফগানিস্তানের জালালাবাদে পাহাড়ে বসে “কীভাবে আমেরিকার ধ্বংস ডেকে আনা যায়” তা ভাবতে লাগলেন। ১৯৯৬ সালে তালেবান ইমারতে ইসলামিয়া ফি আফগানিস্তান কায়েম করলে তখন গ্লোবাল মুজাহিদরা নতুন এক পরিকল্পনা গ্রহণ করেন। এই সময়ে ময়দান ছিল খুবই কম।
আফগানিস্তান, বসনিয়া, চেচনিয়া, সোমালিয়া সহ বেশ কিছু দেশে মুজাহিদরা জিহাদরত থাকলেও প্রকৃতপক্ষে আফগানিস্তানেই শুধুমাত্র শরীয়াহ শাসন কায়েম হয়েছিল। ফলে মুজাহিদরা আমেরিকাকে আফগানিস্তানের চোরাবালিতে আটকে ফেলার পরিকল্পনা করেন। এই মহান লক্ষ্যে গাজওয়ায়ে ম্যানহাটন সংগঠিত হয় ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর। আমেরিকা-আফগান যুদ্ধ প্রায় ২০ বছর স্থায়িত্ব হয়েও শেষ পর্যন্ত ন্যক্কারজনকভাবে হেরে যায় মার্কিনিরা। ফলে ডলারের রাজ্যে আরও একবার আঘাত আসে। মার্কিনিদের প্রভাবশালী সেনাবাহিনী ও অস্ত্রের দৌড় জেনে যায় বিশ্ববাসী।
২০২৩ সালে মুহাম্মাদ দেইফ, ইয়াহইয়া সিনওয়ার ও আবু উবায়দাদের শুরু করা তুফানুল আকসার লাল আভাতেও ছিল আমেরিকার পতনের সুর। বোমার বিকট আওয়াজ যখন গাজ্জার হৃদয়কে ছিন্ন করে দিয়েছে, মার্কিনিদের পতনধ্বনি ততই স্পষ্টভাবে শোনা গিয়েছে। বিশ্বের যেকোনো স্থানে মুসলমানদের উপর একটি গুলিও যদি ছোড়া হয় তাহলেও সেটার পেছনে পরোক্ষভাবে আমেরিকার হাত থাকে। আমেরিকা এই জামানার সবচেয়ে বড়ো তাগুত, সবচেয়ে বড়ো দাজ্জাল।
শিয়া ইরানের সাথে তাদের আঞ্চলিক ও ভূরাজনীতি কেন্দ্রিক যে-ই মারামারি শুরু হলো, এটি সেই পূর্বের পতনের সুরকে আরও ত্বরান্বিত করেছে। দীর্ঘ কয়েক দিনের যুদ্ধের ফলে যখন ইরান হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেয় তখন সারা বিশ্ব একসাথে তেল সংকটে পড়ে যায়। পেট্রোল পাম্পে গাড়ি ও মোটরসাইকেলের দীর্ঘ লাইন মনে করিয়ে দেয়, যতই আমোদ ফুর্তি করো, আধুনিকতা দিনশেষে ধোঁকা।
অবশেষে যুদ্ধবিরতির পর হরমুজ প্রণালি থেকে টোল আদায়ের ক্ষেত্রে ইরান ঘোষণা দিয়ে বসল, তারা তাদের নিজস্ব কারেন্সিতে টোল নেবে। ডলারে নেবে না। বিশ্বব্যবস্থা থেকে আরও একবার ডলার মাইনাস হলো। এভাবেই একদিন ডলারের মান শূন্যে গিয়ে ঠেকবে। মানুষ তাদের ডলার ওয়ালেটগুলো ওপেন করে দেখবে, অ্যাপসটি আর ওপেন হচ্ছে না। পকেটে থাকা কাগুজে নোটটি নিয়ে যখন পণ্য ক্রয় করতে যাবে, তখন বলা হবে, “স্যার! এই নোটটি অচল। এটি পালটিয়ে দিন।”