হযরত ওমর রাঃ এর জীবনী

গাজ্জার জন্য অনুদান

৭ অক্টোবর ২০২৩ তারিখে তুফানুল আকসা যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকেই ফিলিস্তিনের গাজ্জায় অসংখ্য মানুষ আহত ও শহীদ হয়েছে। বহু মানুষ নিজেদের ঘর-বাড়ী হারিয়েছে। এছাড়াও বর্তমানে গাজ্জার ৯৮% মানুষ অনাহারে জীবন-যাপন করছে। গাজ্জার মানুষের এই দুঃসময়ে আমরা যদি তাদের পাশে না দাঁড়াই তাহলে কে দাঁড়াবে?

আর-রিহলাহ ফাউন্ডেশন তুফানুল আকসা যুদ্ধের শুরু থেকেই ফিলিস্তিনের গাজ্জার জন্য ডোনেশন সংগ্রহ করে আসছে। এই মহান কাজে আপনিও আমাদের সাথে যুক্ত হতে পারেন।

অনুদান দিন

হযরত ওমর রাঃ ছিলেন ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা এবং রাসূল সা. এর শক্তিশালী সাহাবীদের একজন। তার ব্যাপারে রাসূল সা. বলেছেন,

যদি আমার পরে কেউ নবী হতো তাহলে সে হতো ওমর।

কারণ, ওমর রাঃ এর অনেক সিদ্ধান্তের পক্ষে আল্লাহ তা’আলা কুরআনের আয়াত নাজিল করেন।

এই লেখায় যা যা থাকছে :

কবে হযরত ওমর রাঃ জন্মগ্রহণ করেন

হযরত ওমর রাঃ হাতি সনের ১৩ বছর পরে জন্মগ্রহণ করেন।

হাতি সন হলো, আবরাহা কর্তৃক মক্কা আক্রমণের বছর। ওমর নবীজির থেকে ১৩ বছরের ছোট ছিলেন।

হযরত ওমর রাঃ এর শারীরিক গঠন

তার গায়ের রং ছিল লাল আভাময় সাদা। সুন্দর গাল, নাক ও চোখের অধিকারী এবং তার হাত-পা ছিল বড়সড়।

তিনি ছিলেন পৌরুষদীপ্ত, দীর্ঘদেহী একজন শক্তপোক্ত মানুষ।

তিনি স্বাভাবিকের তুলনায় দীর্ঘদেহী ছিলেন। তাকে দেখলে মনে হতো যেন কোনো বাহনের উপর বসে আছেন। ওমর রাঃ খুব শক্তিশালী ছিলেন।

তাকে দেখলে দুর্বল মনে হতো না। তিনি তিনি মেহেদী ব্যবহার করতেন। খুব দ্রুত হাঁটতেন এবং কথা বলতেন স্পষ্টভাবে।

ওমর রাঃ এর নাম এবং বংশপরিচয়

হযরত ওমর রাঃ এর নাম ছিল উমর ইবনে খাত্তাব। তিনি কুরাইশের অন্যতম শাখা গোত্র বনু আদি এর সদস্য ছিলেন।

তার বংশধারা হলো,

ওমর ইবনে খাত্তাব ইবনে নুফায়েল ইবনে আব্দুল ওজ্জা ইবনে রিয়াহ ইবনে আব্দুল্লাহ ইবনে কুরুত ইবনে রাযাহ ইবনে আদি ইবনে কাব ইবনে লুআঈ।

রাসূল সা. এর বংশের সাথে কাব ইবনে লুআঈ এর সাথে গিয়ে মিলিত হয়।

হযরত ওমরের উপনাম বা ডাকনাম ছিল, আবু হাফস।

তাছাড়া তিনি প্রকাশ্যে ইসলাম প্রচারের কারণে আল ফারুক নামেও পরিচিত ছিলেন। আল্লাহ তার মাধ্যমে সত্য-মিথ্যার মাঝে পার্থক্য তৈরি করে দিয়েছেন।

হযরত ওমর রাঃ এর পিতা

হযরত ওমরের এর পিতার নাম ছিল, খাত্তাব বিন নুফায়েল। তিনি তৎকালীন আরবের অন্যতম জাঁকজমকপূর্ণ অনুষ্ঠান ওকাজ মেলায় কুরাইশদের দূত হিসেবে কর্মরত ছিলেন।

তিনি বাগ্মিতায় ছিলেন স্পষ্টবাদী। খাত্তাব বিন নুফায়েলের জন্ম হয় আনুমানিক ৫৬০ খৃষ্টাব্দে। আর মৃত্যু হয় আনুমানিক ৬০০ খৃষ্টাব্দে।

হযরত ওমরের ইসলাম গ্রহণের পূর্বেই তিনি ইন্তিকাল করেন। তার সন্তান-সন্তুতি ছিল ৩ জন। তার তিনজনেই পরবর্তীতে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছেন।

হযরত ওমর রাঃ এর মা

ওমরের মা হাতমাহ্ বিনতে হিশাম ছিলেন বনু মাখজুম গোত্রের মেয়ে। সে বিখ্যাত কাফের আবু জাহলের চাচাতো বোন ছিল।

তিনি জন্মগ্রহণ করেন মক্কায় এবং মৃত্যুবরণ করেও হয়তো মক্কায়। তার ব্যাপারে তেমন বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায় নি।

ওমর রাঃ এর স্ত্রী সন্তানগণ

হযরত ওমর রাঃ জাহিলিয়্যাতের যুগে উসমান ইবনে মাযউনের বোন যায়নাব বিনতে মাযউনকে বিয়ে করেন। এই ঘরে ৩ সন্তানের জন্ম হয়।

যায়নাব বিনতে মাযউনের গর্ভে আব্দুল্লাহ, বড় আব্দুর রহমান এবং হাফসার জন্ম হয়। ওমর রাঃ এর আরেকজন স্ত্রী ছিলেন।

নাম হলো, মালিকা বিনতে জারওয়াল। মালিকা বিনতে জারওয়ালের গর্ভে উবায়দুল্লাহর জন্ম হয়। হুদাইবিয়ার সন্ধির সময় মালিকার সাথে ওমর রাঃ এর বিবাহ বিচ্ছেদ হয়।

এরপর আবু আল জাহম এর সাথে মালিকা বিনতে জারওয়ালের বিবাহ হয়।

ওমর রাঃ এর আরেকজন স্ত্রী ছিলেন। নাম হলো, কুরাইবা নিতে আবি উমাইয়া। তাকেও হুদাইবিয়ার সময় ওমর রাঃ তালাক দেন।

পরবর্তীতে কুরাইবার সাথে আবু বকর রাঃ এর সন্তান আব্দুর রহমান বিন আবু বকরের সাথে বিয়ে হয়।

সিরিয়া যুদ্ধে যখন ইরকিমা বিন আবু জাহল রাঃ শহীদ হন তখন তার স্ত্রী উম্মে হাকীম বিনতে হারিসের সাথে ওমর রাঃ বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন।

এই ঘরে ফাতেমা নামক এক সন্তানের জন্ম হয়। এরপর হযরত ওমর রাঃ আওস গোত্রের জামিলা বিনতে আসিম রাঃ কে বিয়ে করেন।

পরবর্তীতে ওমর রাঃ আতিকা বিনতে যায়েদ রাঃ কেও বিয়ে করেছিলেন। ওমর রাঃ এর শাহাদাতলাভের পর তিনি জুবায়ের ইবনে আওয়াম রাঃ এর সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন।

তিনি হযরত ফাতেমা ও আলী রাঃ এর কন্যা উম্মে কুলসুমকে বিয়ে করেছিলেন। উম্মে কুলসুমের গর্ভে জায়েদ ও রুকাইয়ার জন্ম হয়।

ওমর রাঃ লুহাইয়া নামক ইয়ামেনী নারীকে বিয়ে করেছিলেন। তার গর্ভে জন্মলাভ করে ছোট আব্দুর রহমান।

ওমর রাঃ এর স্ত্রী-গণ

১. যায়নাব বিনতে মাযউন

২. মালিকা বিনতে জারওয়াল (তালাকপ্রাপ্ত)

৩. কুরাইবা বিনতে আবি উমাইয়া (তালাকপ্রাপ্ত)

৪. জামিলা বিনতে সাবিত

৫. আতিকা ইবনে যায়েদ

৬. উম্মে হাকিম বিনতে হারিস (তালাকপ্রাপ্ত)

৭. উম্মে কুলসুম বিনতে আলী

ওমর রাঃ এর সন্তানগণ

১. আবদুল্লাহ ইবনে উমর

২. আব্দুর-রহমান ইবনে উমর

৩. জায়েদ ইবনে উমর

৪. উবাইদুল্লাহ ইবনে উমর

৫. আসেম ইবনে উমর

৬. আব্দুর রহমান “মধ্যম” (আবু-মুজাব্বার) ইবনে উমর

৭. আইয়াদ ইবনে উমর

৮. আব্দুর রহমান “ছোট” ইবনে উমর

৯. জায়েদ “বড়” ইবনে উমর

১০. হাফসা বিনতে উমর

১১. ফাতিমা বিনতে উমর

১২. রুকাইয়া বিনতে উমর

১৩. জয়নব বিনতে উমর

পরিবার সম্পর্কে ওমর রাঃ এর মন্তব্য

হযরত ওমর রাঃ বলেন, আমি কখনো বাসনা চরিতার্থ করার জন্য এতগুলো বিয়ে করি নি। আমার যদি সন্তানলাভের আকাঙ্খা না থাকতো তাহলে কখনো আমি নারীদের দিকে ফিরেও তাকাতাম না।

ইসলাম গ্রহণের পূর্বে ওমর

ইসলাম গ্রহণের পূর্বে ওমর রাঃ এর অর্ধেক জীবন অতিবাহিত হয়ে যায়। তিনি অন্য দশটা কুরাইশী ছেলের মতন বেড়ে উঠেছিলেন।

তবে তার সাথে অন্যান্য শিশুদের কিছুটা পার্থক্য ছিল। তিনি জাহেলী যুগেই তার পিতা খাত্তাবের অধীনে লেখাপড়া শিখেছিলেন।

সে সময় সাক্ষরতার হার ছিল অনেক কম। মানুষ লেখাপড়া জানতো না। কারণ, তারা লেখাপড়া শেখার প্রয়োজনবোধ করে নি।

মক্কায় তখন হাতেগোনা কয়েকজন ব্যক্তি লেখাপড়া জানতেন। তাদের মধ্যে হযরত ওমর রাঃ অন্যতম।

ওমর রাঃ এর কাঁধে দায়িত্ব অর্পন

খুব ছোট থাকতেই হযরত ওমর রাঃ এর কাঁধে পরিবারের দায়িত্ব এসে পড়ে। ফলে তিনি ভোগবিলাসিতায় লিপ্ত থাকতে পারেন নি।

অর্থনৈতিকভাবে তিনি মারাত্মক সংকটে পতিত হন। এ প্রসঙ্গে আব্দুর রহমান ইবনে হাতিব বলেছেন,

আমি ওমর বিন খাত্তাবের সাথে দাজনান নামক শহরে ছিলাম।

এ কথা বলার সময় ওমর রাঃ পাশেই ছিলেন। তিনি তখন আব্দুর রহমানকে বললেন,

তখন আমি আমার বাবার গবাদিপশু সেখানে চড়াতে যেতাম।

বাবা যে কি কঠোর ছিল! কখনো আমি পশু চরাতাম আবার কখেনো জ্বালানি কাঠ সংগ্রহ করতাম। আরো বিভিন্ন কাজে আমাকে লিপ্ত থাকতে হতো।

অতীতকে স্মরণ

হযরত ওমর রাঃ ইসলাম গ্রহণের পর কখনো অহংকার করতেন না। তিনি সর্বদা অতীতকে স্বরণ করতেন।

একবার হজ্জ্বে গমনের সময় দাজনান এলাকায় অবস্থান করেন।

তখন তিনি বলেন, আল্লাহ কত মর্যাদাশীল। তিনি যাকে ইচ্ছা সম্মান দান করেন। যাকে ইচ্ছা বেজ্জতি করেন।

এক সময় আমি এই উপত্যকায় গবাদিপশু চড়াতাম।

আমার পিতা খাত্তাব অতি নিষ্ঠুর ছিল। গাটাতে খাটাতে আমাকে বিধ্বস্ত করে ফেলতো।

আবার যদি কোনো কাজ ঠিকমতো না করতাম তাহলে আবার শুরু করতো মারধর।

অথচ এখন আমার দিকে তাকিয়ে দেখ, আল্লাহ আমাকে সম্মানিত করেছেন। সে সময় শুধু আমার বাবার নয়, আমাদের খালাদেরও গবাদিপশু চরাতে হতো।

জাহেলী যুগে ব্যবসায়ী হিসেবে ওমর রাঃ

যুবক বয়সে তিনি ব্যবসা-বানিজ্যে খুব উন্নতি করেছিলেন। এক সময় তিনি মক্কার অন্যতম ধনী এবং প্রভাবশালী ব্যক্তিকে পরিণত হয়েছিলেন।

তিনি ব্যবসায়িক সফর করতেন ইয়ামেন এবং সিরিয়ায়। জাহেলী যুগের বিভিন্ন ঘটনায় তিনি কার্যকরী ভূমিকা পালন করেছেন।

তার দাদা নুফায়েল বিন আব্দুল ওজ্জা মক্কার বিচারক ছিলেন। সে হিসেবে তাদের পরিবার মক্কার সম্মানিত পরিবারগুলোর একটি ছিল।

জ্ঞানী ব্যক্তিদের একজন হিসেবে ওমর রাঃ

জাহিলিয়্যাতের যুগ থেকেই হযরত ওমর রাঃ ছিলেন একজন বাকপটু, জ্ঞানী, স্পষ্টভাষী, শক্তিশালী এবং অভিজাতসম্পূন্ন ব্যক্তি।

তিনি তার পিতার মতো কুরাইশদের মুখপাত্র বা দূত ছিলেন। যখনই কুরাইশদের সাথে অন্য কোনো গোত্রের যুদ্ধ বেঁধে যেত তখনই কুরাইশরা তাকে দূত হিসেবে প্রেরণ করতো।

অন্য পক্ষ যতই অহমিকা প্রদর্শন করুক না কেন, ওমর রাঃ এর সদয় আচরণের সামনে তারা টিকতে পারতো না। তারা সন্ধি করতে বাধ্য হতো।

তিনি তার গোত্রকে সম্মান করতেন। তিনি ভাবতেন, গোত্র হলো অন্যতম একটি ঐতিহ্য। যদি এই ঐতিহ্য ঝরে পড়ে তাহলে সমাজব্যবস্থা ধ্বংস হয়ে যাবে।

এ জন্যই তিনি ইসলামের সূচনালগ্নে ইসলামের বিরোধিতা করেছিলেন। তিনি ভেবেছেন, ইসলাম এই গোত্রের বন্ধনগুলো ভেঙ্গে দিচ্ছে। তাই তিনি কয়েকজন মুসলমানের উপর জুলুমও করেছিলেন।

ইসলাম গ্রহণ করায় জনৈক খাদেমকে মারধর

ইসলাম গ্রহণের পূর্বে ওমর কতটা কঠোর ছিলেন। উদাহরণ দেয়া যাক,

একবার জাহেলী যুগে তার এক খাদেম ইসলাম গ্রহণ করে। যখন এটা তিনি জানতে পারেন তখন সেই খাদেমকে বেধড়ক মারধর করেন।

একটা সময় ক্লান্ত হয়ে তিনি বসে পড়লেন। সেখান দিয়ে হযরত আবু বকর রাঃ যাচ্ছিলেন। তিনি খাদেমের উপর এমন অত্যাচার দেখে তাকে কিনে আজাদ করে দেন।

হযরত ওমরের ইসলাম গ্রহণ

মক্কার কাফেরদের অত্যাচারে একজন নির্যাতিত মুসলিম নারী নিজের মাতৃভূমি ত্যাগ করে দূরদেশে পাড়ি জমাচ্ছিল।

এই দুশ্য ওমর রাঃ এর অন্তরে ইসলামের আলো ছড়ায়। সেদিন তার বিবেকে প্রচন্ড নাড়া দিয়েছিল। তিনি ভাবতে লাগলেন,

তারা তো শুধু ধর্ম ত্যাগ করেছে। আর কিছু তো নয়। তাই তাদের সাথে এমন কঠোর আচরণ করা নিতান্তই অনুচিত।

তখন থেকে ওমর রাঃ মুসলমানদের সাথে নম্র আচরণ করতে লাগলেন। হযরত উম্মে আব্দুল্লাহ বিনতে হানতামা রাঃ হতে বর্ণিত,

আমরা যখন আবিসিনিয়ায় হিজরতের জন্য বের হয়ে গিয়েছিলাম তখন ওমর আমাদের সামনে এসে হাজির হলো। কি নির্দয়ভাবে সে আমাদের উপর অত্যাচার করতো!

ওমর তখন বললো, হে উম্মে আব্দুল্লাহ, তোমরা কি চলে যাচ্ছ? আমি বললাম, হ্যাঁ। আপনি আমাদের উপর জুলুম করেছেন, নির্যাতন করেছেন।

আল্লাহর কসম! যতক্ষণ না আপনারা এটা বন্ধ না করবেন ততক্ষণ আমরা দেশে ফিরবো না। ‍উমর বললেন, আল্লাহ তোমাদের সহায় হোন।

উম্মে আব্দুল্লাহ তখন এই ঘটনা আমির ইবনে রাবিয়াকে বললেন। আমির বললো, তোমার কি মনে হয়, ওমর ইসলাম গ্রহণ করবে?

উম্মে আব্দুল্লাহ বললেন, হ্যাঁ।

মক্কার কাফেররা যখন নির্যাতনের মাত্রা বাড়িয়ে দিল তখন ইসলামকে শক্তিশালী করার জন্য কিছু শক্তিশালী প্রভাবসম্পূন্ন ব্যক্তি প্রয়োজন ছিল।

তাই রাসূল সা. তখন দোয়া করেছিলেন যে, হে আল্লাহ! আবু জাহল কিংবা ওমর বিন খাত্তাবের মধ্য থেকে যাকে আপনি পছন্দ করেন তার মাধ্যমে ইসলামকে সাহায্য করুন।

এই দুইজনের মধ্য ওমর ছিলেন আল্লাহর নিকট অধিক পছন্দনীয়।

কুরাইশদের রাসূল সা. কে হত্যা চেষ্টা

একবার কুরাইশরা মুহাম্মাদকে নিয়ে আলোচনায় বসলো। যেহেতু আবু তালিব নবীজিকে ইসলাম প্রচার থেকে বাঁধা দিচ্ছিল না, তাই তারা তাকে হত্যা করার ইচ্ছা করলো।

কুরাইশরা তখন বললো, কে মুহাম্মাদকে হত্যা করতে পারবে? ওমর বললেন, আমি পারবো। তারা শুনে খুশি হয়ে ওমরকে উৎসাহ দিল।

সেদিন দুপুরবেলায় তরবারি নিয়ে রাসূল সা. ও তার সাহাবীদের খোঁজে ওমর বের হলেন। তখন নবীজি নিরাপত্তা দিতে আবু বকর, হামজা ও আলী রাঃ সর্বদা রাসূলের সাথে থাকতেন।

তারা অন্যদের সাথে আবিসিনিয়া হিজরত করেন নি। ওমর তখন জানতে পারেন যে, তারা সাফা পাহাড়ের পাশে দারুল আরকামে অবস্থান করছেন।

ওমর তখন সেখানে যাওয়ার জন্য হনহনিয়ে চলতে লাগলেন। পথিমধ্যে তার সাথে নুআইম ইবনে আব্দুল্লাহর সাথে দেখা হলো।

সে ওমরকে তরবারি হাতে নিয়ে যেতে দেখে বললো, কোথায় যাচ্ছ ওমর?

ওমর বললেন, আমি মুহাম্মাদকে খুঁজছি। সে কুরাইশদের বিভক্ত করে ফেলেছে। সে আমাদের দেব-দেবীকে তাচ্ছিল্য করে। আমি তাকে হত্যা করবো।

নুআইম বিন আব্দুল্লাহ তখন বললেন, ওমর, তুমি তো ভুল পথে যাচ্ছ? আল্লাহর কসম! তুমি বোকা হয়ে গেছ। নিজেকে বিপদে ফেলছো।

তোমার ভুলের কারণে বনু আদি ধ্বংস হয়ে যাবে। তুমি কি মনে করো যে, মুহাম্মাদকে হত্যা করার পর বনু আবদে মানাফ তোমাকে ছেড়ে দিবে?

ওমর তখন বললো, আমার মনে হয় তুমিও ধর্মত্যাগ করেছ। যদি আমি তোমার ধর্মত্যাগ করার ব্যাপারে জানতে পারি, তাহলে প্রথমে তোমাকে হত্যা করবো।

নুআইম বিন আব্দুল্লাহ রাঃ বুঝতে পারলেন যে, ওমরকে এভাবে থামানো যাবে না। তাই তিনি বললেন, তোমার বোন এবং তোমার ভগ্নিপতি মুসলমান হয়ে গেছে।

তারা তোমার দেবদেবীর উপসনা ছেড়ে আল্লাহর উপাসনা শুরু করেছে। তুমি তো ভুল পথে আছ।

বোনের বাড়িতে ওমরের হামলা

নুআইম রাঃ এর নিকট এই কথা শোনার পর উমর তার বোনের বাড়িতে হাজির হলেন। দরজায় করাঘাত করার পর ভেতর থেকে বললো, কে?

ওমর বললেন, আমি খাত্তাবের পুত্র। দরজা খোল।

তার বোন এবং ভগ্নিপতি একটি কাগজে কুরআন পড়ছিলেন। তারা যখন বুঝতে পারেন যে, ওমর এসেছে। তখন তারা উক্ত কাগজটি লুকিয়ে রাখলেন।

ওমর ঘরে প্রবেশের পরেই বললেন, তোমরা কি পড়ছিলে? আমি বাড়িতে প্রবেশের সময় শুনতে পেয়েছি।

তারা তখন বললেন, আমরা তো নিজেদের মধ্যে কথা বলছিলাম। উমর তখন উত্তেজিত হয়ে বললেন, সম্ভবত তোমরা ধর্ম পরিবর্তন করেছ।

তখন উমরের ভগ্নিপতি বললেন, হে ওমর! যদি আপনার ধর্ম ব্যতিত অন্য ধর্মে সত্য লুকিয়ে থাকে তাহলে কি হবে?

ওমর তখন তার ভগ্নিপতি সাইদের উপর আক্রমণ করেন। উমর ছিলেন প্রচণ্ড শক্তিশালী। তিনি সাঈদকে ধরাশয়ী করে ফেললেন।

ওমরের বোন স্বামীর বেহাল অবস্থা দেখে স্বামীকে বাঁচানোর জন্য এগিয়ে আসলেন। কিন্তু ওমর তাকে ঢাক্কা দিয়ে দূরে সরিয়ে দিলেন।

আঘাত লেগে ফাতিমা বিন খাত্তাব রাঃ এর মুখ থেকে রক্ত বের হচ্ছিল। ফাতিমা তখন রেগে চিৎকার করে বললেন, হে আল্লাহর শত্রু!

আমরা একমাত্র আল্লাহর উপর ঈমান এনেছি বলে কি তুমি আমাদের উপর অত্যাচার করছো? ওমর বললেন, হ্যাঁ।

তখন ফাতিমা রাঃ বললেন, তাহলে তোমার যা ইচ্ছা করো। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ছাড়া কোনা ইলাহ নেই। আর মুহাম্মাদ সা. আল্লাহর রাসূল।

ওমর রাঃ এই কথা শুনে অনুতপ্ত হলেন। তিনি তার ভগ্নিপতিকে ছেড়ে দিলেন। তখন বললেন, তোমরা যেই কাগজ থেকে পড়ছিলে তা আমাকে দেখাও।

ফাতিমা বিন খাত্তাব রাঃ বললেন, তুমি অপবিত্র হয়ে আছ। যারা পাক-পবিত্র, তারাই সেটা ধরতে পারবে।

ওমরের কুরআন পড়া

ওমর রাঃ তখন বাহির থেকে হাত-মুখ ধুয়ে আসলেন। এরপর বোনের হাত থেকে কাগজটি নিয়ে পড়তে লাগলেন,

طٰهٰ. مَاۤ اَنۡزَلۡنَا عَلَیۡکَ الۡقُرۡاٰنَ لِتَشۡقٰۤی.  اِلَّا تَذۡکِرَۃً لِّمَنۡ یَّخۡشٰی. تَنۡزِیۡلًا مِّمَّنۡ خَلَقَ الۡاَرۡضَ وَ السَّمٰوٰتِ الۡعُلٰی اَلرَّحۡمٰنُ عَلَی الۡعَرۡشِ اسۡتَوٰی. لَهٗ مَا فِی السَّمٰوٰتِ وَ مَا فِی الۡاَرۡضِ وَ مَا بَیۡنَهُمَا وَ مَا تَحۡتَ الثَّرٰی.  وَ اِنۡ تَجۡهَرۡ بِالۡقَوۡلِ فَاِنَّهٗ یَعۡلَمُ السِّرَّ وَ اَخۡفٰی. اَللّٰهُ لَاۤ اِلٰهَ اِلَّا هُوَ ؕ لَهُ الۡاَسۡمَآءُ الۡحُسۡنٰی

ত্ব-হা-। তোমাকে কষ্ট দেয়ার জন্য আমি তোমার প্রতি কুরআন অবতীর্ণ করিনি। বরং যে আল্লাহকে ভয় করে তার জন্য উপদেশ হিসেবে অবতীর্ণ করেছি। যিনি পৃথিবী ও সুউচ্চ আকাশ সৃষ্টি করেছেন তাঁর নিকট হতে এই কুরআন নাযিল হয়েছে। পরম দয়াময় আল্লাহ আরশে সমাসীন আছেন। যা অবস্থিত আসমানসমূহ ও যমীনের মধ্যবর্তী স্থানে ও ভূগর্ভে আর এই সকল কিছু শুধুমাত্র তা তাঁরই। আর যদি তুমি উচ্চস্বরে কথা বল তবে তিনি গোপন ও অতি গোপন বিষয় জানেন। আল্লাহ, তিনি ব্যতীত সত্যিকারের কোন ইলাহ নেই। তার জন্য রয়েছে সুন্দর সুন্দর নামসমূহ।

সূরা তহা। আয়াত ১-৯

ওমর রাঃ এর ইসলাম সম্পর্কে আগ্রহ প্রকাশ

উপরোক্ত আয়াত তেলওয়াত করার পর ওমর বললেন, এই জিনিষ থেকেই কি কুরাইশরা পালিয়ে বেড়াচ্ছে? এরপর তিনি আরো তেলওয়াত করলেন,

اِنَّنِیۡۤ اَنَا اللّٰهُ لَاۤ اِلٰهَ اِلَّاۤ اَنَا فَاعۡبُدۡنِیۡ ۙ وَ اَقِمِ الصَّلٰوۃَ لِذِکۡرِیۡ. اِنَّ السَّاعَۃَ اٰتِیَۃٌ اَکَادُ اُخۡفِیۡهَا لِتُجۡزٰی کُلُّ نَفۡسٍۭ بِمَا تَسۡعٰی. فَلَا یَصُدَّنَّکَ عَنۡهَا مَنۡ لَّا یُؤۡمِنُ بِهَا وَ اتَّبَعَ هَوٰىهُ فَتَرۡدٰی

‘নিশ্চয় আমি আল্লাহ, আমি ছাড়া কোন (সত্য) ইলাহ নেই; সুতরাং আমার ইবাদাত কর এবং আমার স্মরণার্থে সালাত কায়েম কর’। ‘নিশ্চয় কিয়ামত আসবে; আমি তা গোপন রাখতে চাই যাতে প্রত্যেককে স্বীয় চেষ্টা-সাধনা অনুযায়ী প্রতিদান দেয়া যায়’। অতএব যে ব্যক্তি তার প্রতি ঈমান রাখে না এবং স্বীয় প্রবৃত্তির অনুসরণ করে সে যেন কিছুতেই ঈমান আনয়নে তোমাকে বাধা দিতে না পারে; অন্যথায় তুমি ধ্বংস হয়ে যাবে।

ওমর রাঃ এই আয়াত পড়ার পর মুহাম্মাদ সা. এর নিকট যেতে আগ্রহ প্রকাশ করলেন।

নবীজির নিকট ওমরের আগমন

ওমর রাঃ তখন নবীজির নিকট দারুল আরকামে উপস্থিত হলেন। তার হাতে তখনো তলোয়ার ছিল। ওমর রাঃ দরজায় করাঘাত করার পর সাহাবারা দরজা খুলতে ইতস্ততবোধ করছিল।

তখন হামজা রাঃ বললেন, তোমাদের কি হয়েছে? তাকে আসতে দাও। যদি ভালো উদ্দেশ্যে আসে, তাহলে তো ভালোই। অন্যথায় তার তরবারি দিয়ে তাকেই হত্যা করা হবে।

রাসূল সা. তখন ওমরকে দেখে জিজ্ঞাসা করলেন, হে খাত্তাবের পুত্র! কোন জিনিষ তোমাকে এখানে টেনে আনলো? আল্লাহর কসম! তোমার উপর গজব পতিত না হওয়া পর্যন্ত মনে হয় তুমি থামবে না।

ওমর রাঃ তখন বললেন, হে আল্লাহর রাসূল, আমি আপনার প্রতি ঈমান এনেছি। আর আপনি যা এনেছেন, তার প্রতিও ঈমান এনেছি। রাসূল সা. তখন খুশীতে আল্লাহু  আকবার বলে তাকবীর দিলেন।

সাহাবরাও অত্যন্ত খুশী হলেন। রাসূল সা. এর দোয়া ওমর রাঃ এর উপর কবুল হলো।

ওমর এর ইসলামের দাওয়াত

নবুয়তের ৬ষ্ঠ বছরে হযরত ওমর রাঃ ইসলাম গ্রহণ করেন। তখন তার বয়স ছিল ২৭ বছর। তিনি হামজা রাঃ এর মুসলিম হওয়ার তিনদিন পর ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন।

ইসলাম ধর্ম গ্রহণের পর হযরত ওমর রাঃ আবু জাহলের বাড়িতে গেলেন। দরজায় টোকা দেয়ার পর আবু জাহল বের হয়ে বললো,

স্বাগতম খাত্তাবের বেটা! হঠাৎ কি মনে করে এলে? ওমর রাঃ তখন বললেন, আমি ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছি। এ কথা শুনে জাহল বললো, আল্লাহ তোমাকে ধ্বংস করুন।

এরপর সে ওমরের মুখের উপর দরজা লাগিয়ে দিল। ওমর রাঃ মুসলমান হওয়ার পর কুরাইশরা তা জানতো না।

ওমর রাঃ তখন একজনকে জিজ্ঞাসা করলেন, মক্কাবাসীদের মধ্যে কথা ছড়িয়ে দিতে কে বেশি পটু?

লোকেরা তাকে জামিল ইবনে মুআম্মারের নাম বললো। তখন ওমর রাঃ তার নিকট গেলেন। ওমর তখন তাকে বললেন,

জামিল শোনো, আমি মুসলিম হয়ে গেছি। লোকটি তখন কিছু না বলে উঠে দাঁড়ালো। তারপর কাপড় টেনেটুনে ঠিক করে কাবার নিকট গিয়ে বলতে লাগলো,

হে কুরাইশগণ! খাত্তাবের বেটা ওমর মুসলমান হয়ে গেছে। সে স্বধর্ম ত্যাগ করেছে। ওমর পাশেই দাঁড়ানো ছিলেন।

তিনি তখন বললেন, সে মিথ্যা বলছে। আমি আল্লাহর প্রতি ও তার রাসূলের প্রতি ঈমান এনেছি।

লোকেরা তখন ওমরের উপর আক্রমণ করে বসলো। ওমর রাঃ ও পাল্টা আক্রমণ করলেন। ওমর উতবা বিন রাবিয়ার উপর চেপে বসলেন।

তিনি উতবার চোখে খোঁচাতে লাগলেন। এতে উতবা ব্যাথায় কঁকিয়ে উঠলো। তখন লোকেরা ভয়ে উতবার ওমরের নিকট হতে সরে গেল।

ওমর রাঃ তখন উঠে দাঁড়ালেন। জাহিলিয়্যাতের সময় যাদের সাথে ওমর উঠাবসা করেছেন,

তাদের নিকট গিয়ে হাজির হলেন। তাদেরকে জানালেন ইসলাম গ্রহণের কথা।

আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাঃ বলেন, ওমর মুসলিম হওয়ায় আমরা গর্ভবোধ করতাম। কারণ, তিনি মুসলিম হওয়ার আগ পর্যন্ত আমরা কা’বা ঘর তওয়াফ বা কা’বায় নামাজ পড়তে পারছিলাম না।

এরপর থেকে আমরা কা’বা ঘর তওয়াফ করতাম এবং নামাজ পড়তাম।

ওমর রাঃ এর হিজরত

রাসূল সা. মদীনায় হিজরতের অনুমতি প্রদানের পর হযরত ওমর রাঃ হিজরত করার উদ্যোগ গ্রহণ করেন। আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাঃ বর্ণনা করেছেন,

আলী রাঃ আমাকে বলেছেন যে, একমাত্র ওমর রাঃ প্রকাশ্যে হিজরত করেছেন। এছাড়া সকলেই লুকিয়ে হিজরত করেছেন।

যখন হযরত ওমর রাঃ হিজরতের সিদ্ধান্ত নিলেন তখন তিনি তরবারী কোষবদ্ধ করে, কাঁধে তীর-ধনুক নিয়ে কাবার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হন।

কুরাইশরা তখন কাবার প্রাঙ্গনে অবস্থান করছিল। হযরত ওমর রাঃ ধীরে সুস্থে কা’বা ঘর তাওয়াফ করেন।

তারপর মাকামে ইবরাহিমের সামনে গিয়ে নামাজ পড়লেন।

এরপর তিনি একে একে সকলের সামনে গিয়ে বললেন, তোমরা ধ্বংস হয়ে যাও। আল্লাহ তোমাদের মর্যাদাকে ধূলায় মিশিয়ে দিবেন।

যে তার মাকে সন্তানহারা, তার সন্তানকে এতিম ও তার স্ত্রীকে বিধবা করতে চায় সে যেন এই উপত্যকার পেছনে আমার সাথে মোকাবেলা করতে আসে।

হযরত ওমর রাঃ রাসূল সা. এর মদীনায় হিজরত করার পূর্বেই নিজে মদীনায় হিজরত করেন। তখন হযরত ওমরের সাথে পরিবারের সদস্যরা ছিল।

তার ভাই জায়েদ বিন খাত্তাব, সুরাকা বিন মুতামিরের দুই ছেলে আমর ও আব্দুল্লাহ, তার মেয়ে হাফসার স্বামী খুনায়েস ইবনে হুজাইফা আস সাহমী রাঃ সহ আরো অনেকে।

হযরত বারা ইবনে আযিব রাঃ বলেছেন, মুসআব ইবনে উমাইর রাঃ সবার আগে মদীনায় আগমন করেন। তিনি আমাদেরকে কুরআন শিক্ষা দিতেন।

এরপর বিলাল, সাদ, আম্মার বিন ইয়াসির রাঃ মদীনায় আসেন। এরপরই ওমর রাঃ প্রায় ২০ জনের কাফেলা নিয়ে মদীনায় আগমন করেন।

ওমর রাঃ এর পরেই আবু বকর ও রাসূল সা. মদীনায় হিজরত করেন। এতে মদীনাবাসী অত্যন্ত খুশী হয়েছিল।

রাসূল সা. ওমর রাঃ কে উয়াইম ইবনে সাইদা ও উতবান ইবনে মালিক এবং মুআয ইবনে আফরা রাঃ এর সাথে ভ্রাতৃত্বের বন্ধন গড়ে দিলেন।

বদরের যুদ্ধে ওমর রাঃ

বদর যুদ্ধ শুরু হওয়ার পূর্বে হযরত ওমর রাঃ রাসূল সাঃ এর সাথে আলোচনাসভায় বসলেন। আলোচনাসভার শুরুতে আবু বকর রাঃ সারগর্ভ ভাষণ দেন।

এরপর ওমর রাঃ দাঁড়িয়ে হৃদয়গ্রাহী বক্তব্য দেন এবং কাফেরদের সাথে যুদ্ধের আহবান জানান। যুদ্ধে ওমর রাঃ এর আজাদকৃত গোলাম মিহজা মুসলমানদের প্রথম শহীদ হন।

যুদ্ধে ওমর রাঃ তার মামা আস বিন হিশামকে হত্যা করেন। তার নিকট ঈমানের দায়বদ্ধতার তুলনায় আত্মীয়তার সম্পর্ক খুব নগণ্য ছিল।

এ নিয়ে তিনি গর্ববোধ করতেন। ফলে যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর নবীজি মুশরিক যুদ্ধবন্দীদের কি করা হবে, তা নিয়ে আলোচনায় বসলেন।

যুদ্ধবন্দীদের ব্যাপারে ওমর রাঃ এর সিদ্ধান্ত

যখন বদরের সময় যুদ্ধবন্দী হিসেবে নবীজির চাচা আব্বাস যুদ্ধবন্দী হলেন তখন ওমর রাঃ খুব করে চাচ্ছিলেন যে, তিনি যেন মুসলিম হয়ে যান।

তিনি বললেন, আব্বাস তুমি মুসলমান হয়ে যাও। আল্লাহর কসম! যদি তুমি মুসলমান হও তাহলে সেটি আমার নিকট খাত্তাবের মুসলমান হওয়ার চাইতেও বেশি ভালো লাগবে।

কারণ, আমি আল্লাহর রাসূল সা. কে দেখেছি তিনি চাচ্ছেন – যেন তুমি মুসলিম হয়ে যাও।

বদর যুদ্ধবন্দীদের মধ্যে কুরাইশদের বক্তা বা মুখপাত্র সুহায়েল বিন আমর ছিলেন। উমর রাঃ বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ!

সুহাইলের সামনের দাঁত ভেঙ্গে দেই? এতে তার জিহ্বা বের হয়ে যাবে। তখন আর সে কোথাও দাঁড়িয়ে আপনার বিরুদ্ধে কথা বলতে পারবে না।

তখন নবীজি বললেন, আমি নবী হওয়া সত্ত্বেও তা করবো না। কারণ, যদি সে আমার অঙ্গহানী করতো তাহলে আমি বদলাস্বরুপ তার অঙ্গহানি করতাম।

যেহেতু সে আমার অঙ্গহানি করে নি, তাই আমিও তার অঙ্গহানি করবো না। হয়তো এমন একদিন আসবে, যেদিন তুমি তার সমালোচনা করবে না। তাকে উত্তম মানুষ হিসেবে পাবে।

নবীজির এই কথা সত্য হলো। সুহাইল বিন আমর এক সময় ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করলেন। নবীজির মৃত্যুর পর মক্কার কিছু লোক ইসলাম ত্যাগ করতে চাইছিল।

তাদের তৎপরতার কথা জানতে পেরে সুহাইল রাঃ লোকজনকে একত্রিত করলেন। এরপর বললেন,

কেউ যদি কখনো ইসলামের ক্ষতি করতে চায়, তাহলে ইসলামের তাতে কোনো ক্ষতি হয় না। উল্টো লাভ হয়।

উপস্থিত লোকদের মধ্যে কেউ যদি ইসলামের ক্ষতি করার চেষ্টা করে, তাহলে আমি তার গর্দান নামিয়ে দিব।

ফলে লোকজন বিদ্রোহ করা ও ইসলাম ত্যাগ করার ইচ্ছা থেকে সরে আসে।

ওহুদ যুদ্ধে ওমর রাঃ

জিহাদের ময়দানে হযরত ওমর রাঃ থাকতেন সামনের সারিতে। তিনি কখনো যুদ্ধ দেখতে পিছুটান নিতেন না। পরাজয় নিশ্চিত জানলেও লক্ষ্যে অবিচল থেকে এগিয়ে যেতেন।

ওহুদের যুদ্ধেও ওমর রাঃ এর এই গুণের প্রতিফলন ঘটেছিল। এই যুদ্ধ ছিল রাসূল সা. এর সাথে তার দ্বিতীয় যুদ্ধ। প্রথম যুদ্ধ ছিল বদরের যুদ্ধ।

ওহুদের যুদ্ধে মুসলমানদের ছোট একটি ভুলের কারণে প্রায় পরাজয় হতে যাচ্ছিল। তখন ওমর রাঃ রাসূলকে রক্ষার জন্য ঢাল হয়ে তার পাশে দাঁড়িয়ে যান।

আবু সুফিয়ানের হুংকার

ওহুদ যুদ্ধের শেষে আবু সুফিয়ান ডাক দিয়ে বলছিল, মুহাম্মাদ – আবু বকর – ওমর এই তিনজনের কোনো একজন কি বেঁচে আছে?

নবীজি তখন বললেন, তার কথার জবাব দিও না। পরপর তিনবার আবু সুফিয়ান এভাবে হুংকার দিয়ে বললো। শেষে ওমর রাঃ আর চুপ থাকতে পারলেন না।

তিনি উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, হে আল্লাহর শত্রু! তোমার কথা সত্য নয়। আল্লাহ তা’আলা তোমাকে অপমানিত করেছেন।

তখন আবু সুফিয়ান বললো, হুবল (আরবের এক প্রতিমা) বিজয়লাভ করেছে।

নবীজি তখন বললেন, এখন আবু সুফিয়ানের কথার জবাব দাও। সাহাবারা জিজ্ঞাসা করলেন, আমরা তাহলে কি বলবো?

নবীজি তখন বললেন, তোমরা বলো যে আল্লাহ সর্বশক্তিমান এবং অধিক মহিমান্বিত।

আবু সুফিয়ান সাহাবীদের এই কথা শুনে বললো, উজ্জা (জাহেলিয়্যাতের সময়ের এক মূর্তির নাম) আমাদের। তোমাদের নয়।

নবীজি তখন সাহাবীদের বললেন, তার কথার জবাব দাও। সাহাবারা আবার বললেন, আমরা কি বলবো?

নবীজি বললেন, তোমরা বলো যে আল্লাহ আমাদের অভিভাবক। আর তোমরা অভিভাবকহীন।

আবু সুফিয়ান তখন রাগে ক্ষোভে বললো, বদরের এক দিনের বদলা একদিন, যুদ্ধ এখনো শেষ হয় নি। তখন ওমর রাঃ বলেছিলেন,

আমাদের নিহত ব্যক্তিরা জান্নাতে আর তোমাদের নিহত ব্যক্তিরা জাহান্নামে রয়েছে। তখন ওমর রাঃ কে আবু সুফিয়ান বললো,

আমরা কি মুহাম্মাদকে হত্যা করতে পেরেছি? ওমর বললেন, না। বরং তিনি এখন তোমার কথা শুনতে পাচ্ছেন।

এই ঘটনা প্রমাণ করে যে, মুহাম্মাদ সা. এবং আবু বকর রাঃ ও ওমর রাঃ ছিলেন ইসলামের সবচেয়ে শক্তিধর ব্যক্তি।

কাফেরদের নিকট এই তিনজন মাথাব্যাথার কারণ ছিল। তারা চাইতো যে, যেভাবেই হোক এই তিনজনকে যেন হত্যা করা যায়। কিন্তু তাদের উদ্দেশ্য কখনো সফল হয় নি।

হুদাইবিয়ার সন্ধি ও ওমর রাঃ

রাসূল সা. ওমরা করার ইচ্ছা পোষণ করেন তখন তিনি সাহাবাদেরকে নিয়ে মক্কা অভিমুখে রওয়ানা হন। পথিমধ্যে হুদাইবিয়া নামক এলাকায় তারা যাত্রা বিরতি দেন।

সে সময় ওমর রাঃ কে রাসূল সা. ডেকে পাঠান। রাসূল সা. তাকে মক্কার কুরাইশ নেতাদের নিকট গিয়ে তাদের এখানে আসার উদ্দেশ্য ব্যক্ত করে আসতে বললেন।

তখন ওমর রাঃ বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! কুরাইশ নেতারা আমাকে হত্যা করতে পারে বলে আমি আশংকা করছি। কারণ, আমাকে তাদের হাত থেকে রক্ষা করার জন্য বনু আদি গোত্রের কেউ মক্কায় নেই।

তবে এক ব্যক্তি আছে, যিনি এই কাজটি করতে সক্ষম হবে। তিনি হলেন ওসমান ইবনে আফফান রাঃ। কারণ, মক্কায় তার পরিবার ও গোত্রের লোকজন আছে।

রাসূল সা. তখন হযরত ওসমান বিন আফফান রাঃ কে ডাকলেন। তিনি তখন মক্কার কুরাইশদের নিকট গিয়ে বললেন,

আমরা যুদ্ধ করতে আসি নি। আমরা শুধু কা’বা তাওয়াফ করতে এসেছি। কুরাইশরা প্রথমে মানতে রাজি হয় নি। কিন্তু এরপর তারা বেশ কিছু শর্তের ভিত্তিতে রাজী হলো।

এই শর্তগুলোর মধ্যে কিছু শর্ত এমন ছিল যে, যেগুলো বাহ্যিকভাবে মনে হচ্ছিল মুসলমানদের জন্য অপমানজনক। তাই সাহাবারা সন্ধিতে আগ্রহ হারিয়ে ফেললেন।

হযরত ওমর রাঃ এবং বিখ্যাত সাহাবী ও আওস গোত্রের নেতা উসায়েদ বিন হুদায়ের ও খাযরাজ গোত্রের নেতা সাদ বিন উবাদা রাঃ এই সন্ধির বিরোধিতা করলেন।

ওমর রাঃ এর বক্তব্য

হযরত ওমর রাঃ তখন রাসূল সা. এর নিকট গিয়ে বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আপনি কি আল্লাহর রাসূল নন? নবীজি বললেন, হ্যাঁ।

ওমর রাঃ বললেন, আমরা কি মুসলিম নই? নবীজি বললেন, হ্যাঁ। আমরা মুসলিম।

ওমর রাঃ তখন আবারো বললেন, তাহলে তারা কি মুশরিক নয়? নবীজি বললেন, হ্যাঁ। তারা মুশরিক। তখন ওমর রাঃ বললেন, তাহলে আমরা কেন এমন অপমানজনক চুক্তি মেনে নিচ্ছি?

তখন আল্লাহর রাসূল সা. বললেন, আমি আল্লাহর রাসূল। আর আমি আল্লাহর নির্দেশ অমান্য করতে পারবো না।

তখন ওমর রাঃ বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আপনি কি আমাদেরকে নিয়ে তাওয়াফ করার কথা বলেন নি? নবীজি তখন বললেন,

হ্যাঁ বলেছি। কিন্তু আমি কি বলেছি যে আমাদের এই বছরই তাওয়াফ করতে হবে? ওমর রাঃ বললেন, না। এরপর ওমর রাঃ আবু বকর রাঃ এর নিকট গিয়ে একই কথা বললেন,

তখন আবু বকর বললেন, ওমর! নবীজির কথা মেনে নাও। এতেই উপকার রয়েছে।

মক্কা বিজয়ের দিন ওমর রাঃ

৮ হিজরীতে মক্কার কুরাইশরা মুসলমানদের সাথে করা চুক্তি ভঙ্গ করে। তারা বনু বকরকে এক গোত্রের বিরুদ্ধে উস্কানী দেয়।

উক্ত গোত্র মুসলমানদের পক্ষে চুক্তিতে শরীক ছিল। বনু বকর সেই গোত্রের উপর হামলা করে লুটপাট করে। তখন উক্ত গোত্রের একব্যক্তি নবীজির নিকট এসে অভিযোগ দায়ের করে।

নবীজি তখন কুরাইশদের নিকট জনৈক সাহাবীতে দূত হিসেবে প্রেরণ করেন। উক্ত সাহাবী মক্কার কাফেরদের নিকট দুইটি প্রস্তাব পেশ করে।

প্রথমত: এই হামলার সাথে কুরাইশদের কোনো সম্পর্ক নেই।

দ্বিতীয়ত: চুক্তি বাতিল করা।

মক্কার কাফেররা আত্মগৌরবে চুক্তি বলে করে দেয়। মদীনায় এসে উক্ত সাহাবী নবীজিকে এই কথা জানান দেন। মক্কার কুরাইশদের নেতা আবু সুফিয়ানের টনক নড়ে।

আবু সুফিয়ানের মদীনায় আগমন

আবু সুফিয়ান তখন মদীনায় এসে নবীজির সাথে সাক্ষাৎলাভ করে চুক্তিতে পূনরায় বহাল রাখতে চায়। কিন্তু নবীজি তাদের উপর অনেক ক্রুদ্ধ ছিলেন। তাই তিনি মুখ ফিরিয়ে নিলেন।

এরপর আবু সুফিয়ান আবু বকরের নিকট গিয়ে চুক্তির মেয়াদ বাড়ানোর জন্য অনুরোধ করে। নবীজির মতো তিনিও তা প্রত্যাখ্যান করেন।

ওমর রাঃ এর নিকটও আবু সুফিয়ান এসে চুক্তির ব্যাপারে কথা বলে। কিন্তু উমর রাঃ ও তাকে তাড়িয়ে দেন। আবু সুফিয়ান তখন খালি হাতে মক্কায় চলে যায়।

মক্কা বিজয়ের প্রস্তুতি

এরপর নবীজি সাহাবীদেরকে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হতে বললেন। আবু বকর রাঃ নবীজির ঘরে এসে দেখেন যে, আয়েশা রাঃ আটা পিষছেন।

আবু বকর রাঃ তখন মেয়েকে নবীজির যুদ্ধের স্থান সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলেন। কিন্তু আয়েশা রাঃ কিছুই বললেন না।

কারণ, নবীজির একটা যুদ্ধনীতি ছিল যে, সাহাবীদেরকে তিনি আগে যুদ্ধের স্থান সম্পর্কে জানাতেন না। তিনি অভিযানে বের হওয়ার পর তাদেরকে জানাতেন।

কিছুক্ষণ পর নবীজি ঘরে আসলেন। আবু বকর রাঃ তখন বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আপনি কাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছেন? রোমানদের বিরুদ্ধে নাকি ইহুদীদের বিরুদ্ধে?

নবীজি তখন বললেন, কুরাইশদের বিরুদ্ধে। আবু বকর রাঃ বললেন, কিন্তু তাদের সাথে তো আমাদের চুক্তি আছে। নবীজি তখন বললেন, তুমি কি জান না যে, তারা চুক্তিভঙ্গ করেছে?

মক্কা বিজয়ের দিন ওমর ও হাতিব ইবনে আবু বালতা’ রাঃ

হাতিব ইবনে বালতা’ রাঃ ছিলেন একজন মুহাজির সাহাবী। তার আত্মীয়-স্বজনরা মক্কায় ছিল। তিনি নবীজির সাথে মদীনায় থাকতেন।

যখন তিনি মক্কা বিজয় সম্পর্কে জানতে পারলেন যে, নবীজি কুরাইশদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছে। তখন তিনি তার পরিবারের ব্যাপারে শঙ্কা অনুভব করলেন।

তিনি তখন একজন নারীর মাধ্যমে গোপনে একটি চিঠি লিখলেন তার পরিবারের নিকট। নবীজি সা. আগেই দোয়া করেছিলেন,

যেন মক্কার কাফেররা মুসলমানদের এই অভিযানের কথা জানতে না পারে।

হাতিব রাঃ যখন এই চিঠি মক্কায় পাঠালেন তখনই ওহীর মাধ্যমে নবীজি তা জানতে পারলেন।

তখনই আলী রাঃ ও মিকদাদ রাঃ কে উক্ত মহিলাকে পাকড়াও করার জন্য পাঠালেন।

মদীনা থেকে ১২ মাইল দূরে ওই মহিলাকে তারা গ্রেপ্তার করলেন।

উক্ত মহিলাকে তখন তল্লাশী করা হবে বলে হুমকি দিলে সে চিঠিটি বের করে দেয়। নবীজি তখন হাতিব রাঃ কে ডেকে পাঠান।

হাতিব রাঃ তখন তার পরিবারের জন্য কাজটি করেছেন বলে উল্লেখ করেন। রাসূল সা. তখন বললেন, সে সত্য বলেছে।

উমর রাঃ মতামত দিলেন যে, হাতিবের যেন শিরচ্ছেদ করা হয়। নবীজি তখন তাকে তিরষ্কার করে বললেন, সে তো বদরের যুদ্ধে অংশ নিয়েছিল।

আর আল্লাহ তাদের ব্যাপারে ক্ষমা ঘোষণা করে দিয়েছেন। তাহলে কিভাবে হাতিবকে শাস্তি দেয়া যায়?

মক্কা বিজয়ের দিন ওমর এর বাহিনীর সাথে মক্কায় গমন

রাসূল সা. দশ হাজার সাহাবীকে নিয়ে মক্কা অভিমুখে রওয়ানা হন। পথিমধ্যেই নবীজির চাচা আব্বাস রাঃ এর সাথে দেখা হয়।

তিনি তখন হিজরত করে মদীনায় যাচ্ছিলেন। আব্বাস রাঃ ও তখন সেই অভিযানে শরীক হলেন। কাফেলা মক্কার নিকটবর্তী স্থানে যাত্রাবিরতি করলো।

আবু সুফিয়ানসহ মক্কার ব্যক্তিরা এই খবর পেয়ে শঙ্কিত হয়ে ‍উঠলো।

আবু সুফিয়ান তখন রাতের বেলা মুসলিম বাহিনীর তথ্য সংগ্রহের জন্য গা-ঢাকা দিয়ে আসলেন।

কিন্তু তিনি আব্বাসের সামনে পড়ে যান। আব্বাস রাঃ তাকে নিরাপত্তা দিয়ে নবীজির নিকট নিয়ে আসলেন।

আসার সময় লোকেরা আব্বাসের সাথে এই ব্যক্তিকে দেখে জিজ্ঞাসা করতে লাগলো, ইনি কে?

তখন তারা রাসূল সা. এর বাহনে আবাসকে দেখে সরে গেল। ওমর রাঃ তখন আবু সুফিয়ানকে দেখলেন তখন তিনি বললেন,

আল্লাহর দুশমন আবু সুফিয়ান! আল্লাহর প্রশংসা যে, কোনো চুক্তি ছাড়াই তোমাকে আল্লাহ আমাদের হাতের মুঠোয় এনে দিয়েছেন।

অতঃপর ওমর রাঃ রাসূল সা. এর নিকট এসে বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমাকে এই দুশমনকে হত্যা করার অনুমতি দিন।

আব্বাাস রাঃ বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমি তাকে নিরাপত্তা দিয়েছি। ওমর রাঃ তখন রাসূল সা. কে পীড়াপীড়ি করতে লাগলেন।

তখন আব্বাস বললেন, হে ওমর! থামুন। আবু সুফিয়ান বনু আবদে মানাফের বলে তুমি এমন করছো। যদি সে বনু আদ গোত্রের হতো তাহলে এমন করতে না।

ওমর রাঃ এটা শুনে বললেন, আল্লাহর কসম! আপনি যেদিন মুসলিম হলেন সেদিন যদি আমার পিতা খাত্তাবও মুসলিম হতেন তাহলে আমার নিকট আপনার মুসলিম হওয়ার ঘটনাটিই আনন্দদায়ক হতো।

কারণ, আমি জানি যে আপনার ইসলাম গ্রহণ করা আমার পিতা খাত্তাবের ইসলাম গ্রহণ করার চাইতেও অধিক প্রিয় রাসূলের নিকট।

পরে আবু সুফিয়ান রাসূল সা. এর নিকট মুসলমান হলো। মুসলমানরা শৌর্য-বীর্যের সাথে মক্কায় প্রবেশ করলেন। রাসূল সা. তখন মক্কার মানুষের নিরাপত্তার জন্য ঘোষণা দিলেন, যেই ব্যক্তি আবু সুফিয়ানের ঘরে প্রবেশ করবে, সে নিরাপদ।

যেই ব্যক্তি মসজিদুল হারামে অবস্থান করবে, সে নিরাপদ। সে নিজের ঘরের দরজা আটঁকিয়ে বসে থাকবে, সে নিরাপদ।

রাসূলের ইন্তিকালের সময় হযরত উমর রাঃ

নবম হিজরীতে বিদায় হজ্জ্বের পরে রাসূল সা. অসুস্থ হয়ে পড়েন। প্রথম প্রথম এই অসুস্থতাকে স্বাভাবিক কোনো রোগ মনে হলেও কিছুদিন পর প্রকট আকার ধারণ করলো।

একটা সময় রাসূল সা. পুরোপুরি অসুস্থ হয়ে পড়েন। তিনি মসজিদে যেতেন কোনো সাহাবীর কাধে ভর দিয়ে। কিছুদিন পর মসজিদে যেতেও সক্ষম থাকলেন না।

আব্দুল্লাহ ইবনে যামআ রাঃ বলেন, যখন রাসূল সা. অসুস্থ হয়ে পড়েন তখন বেলাল রাঃ কোনো এক ওয়াক্তের নামাজের জন্য ডাকতে এলেন।

নবীজি অসুস্থতার কারণে উঠতে পারছিলেন না। তাই বেলালকে বললেন, অন্য কাউকে নামাজ পড়াতে বলো।

এরপর বেলাল রাঃ বের হয়ে আবু বকর রাঃ কে খুঁজতে লাগলেন। কিন্তু তাকে পাওয়া গেল না। তখন উমর রাঃ মসজিদে উপস্থিত ছিলেন।

আব্দুল্লাহ ইবনে যামআ রাঃ তখন উমরের নিকট উপস্থিত হয়ে বললেন, উমর উঠে এসো। লোকজনকে নামাজ পড়াও। এরপর ওমর রাঃ উঠে দাঁড়ালেন ও তাকবীর দিলেন।

তার গলার আওয়াজ ছিল খুব বেশি। ফলে রাসূল সা. ঘরে থেকে উমরের কণ্ঠের আওয়াজ শুনলেন। তখনই রাসূল সা. জিজ্ঞাসা করলেন,

আবু বকর কোথায়? মুসলমানরা তো তাকে ছাড়া অন্য কাউকে গ্রহণ করবে না। নবীজি তখনই আবু বকর রাঃ কে ডাকতে লোক পাঠালেন।

এদিকে আবু বকর রাঃ উপস্থিত হওয়ার পূর্বেই ওমর রাঃ এর নামাজ শেষ হয়ে যায়।

নামাজ শেষ হওয়ার পর যখন তিনি রাসূলের কথোপকথনের ব্যাপারে জানতে পারেন তখন ইবনে জামআকে বললেন,

তুমি ধ্বংস হও ইবনে যামআ। তুমি এটা কি করলে? আমি তো ভেবেছিলাম যে, রাসূল সা. আমাকে নামাজ পড়াতে বলেছেন?

তা না হলে আমি কখনোই নামাজ পড়াতাম না। ইবনে যামআ রাঃ বললেন, রাসূল সা. নির্দেশ দেন নি।

তবে আবু বকরকে না পাওয়ায় আমার নিকট তোমাকেই সবচেয়ে যোগ্য মনে হয়েছে।

রাসূলের দিক-নির্দেশনার ব্যাপারে ওমরের বক্তব্য

হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাঃ বর্ণনা করেছেন, নবীজি সা. এর ব্যাথা যখন তীব্রতর হয়ে উঠলো তখন তিনি বললেন,

আমার নিকট কিছু কাগজ নিয়ে এসো। আমি কিছু লিখে দেই। যাতে তোমরা পথভ্রষ্ট হয়ে না যাও। হযরত ওমর সেখানে উপস্থিত ছিলেন।

তিনি বললেন, নবীজি এখন কষ্ট পাচ্ছেন। আমাদের নিকট আল্লাহর কিতাবই যথেষ্ঠ। এরপর উপস্থিত সাহাবীদের মধ্যে তর্ক শুরু হয়ে গেল।

নবীজি তখন বললেন, তোমরা আমার নিকট হতে সরে যাও। এখন আমার সামনে তর্ক করো না। আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস বলতে বলতে বের হলেন,

রাসূল সা. এর বক্তব্য বাধা দেয়া হলো। এ আমাদের জন্য চরম দুর্ভাগ্য। তবে এখানে বাধা দেয়াতে কোনো অন্যায় হয় নি।

কারণ আল্লাহ কুরআনে সূরা আনআমের ৩৮ নং আয়াতে বলেছেন,

مَا فَرَّطۡنَا فِی الۡکِتٰبِ مِنۡ شَیۡءٍ

আমি কিতাবে কোন বিষয়ই লিপিবদ্ধ করতে বাদ রাখি নি।

আবার অন্যত্র সূরা মায়েদার ৩ নং আয়াতে আল্লাহ বলেছেন,

اَکۡمَلۡتُ لَکُمۡ دِیۡنَکُمۡ وَ اَتۡمَمۡتُ عَلَیۡکُمۡ نِعۡمَتِیۡ وَ رَضِیۡتُ لَکُمُ الۡاِسۡلَامَ دِیۡنًا

আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীন তথা ধর্মকে পরিপূর্ণ করলাম এবং তোমাদের উপর আমার নেআমত সম্পূর্ণ করলাম ও তোমাদের জন্য দ্বীন হিসেবে পছন্দ করলাম ইসলামকে।

১২ রবিউল আউয়াল ১০ হিজরীতে যখন রাসূল সা. ইন্তিকাল করলেন তখন মুসলমানদের মধ্যে নেমে এলো শোকের ছায়া।

এমন সংবাদ অনেক সাহবীকে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করে দিয়েছিল। হযরত ওমর রাঃ এমন ঘটনা মেনে নিতে পারছিলেন না।

রাসূলের ইন্তিকালের পর উমর রাঃ

উমর রাঃ তরবারি নিয়ে দাঁড়িয়ে গেলেন এবং  বলতে লাগলেন, মুনাফিকেরা দাবী করছে যে, রাসূল সা. ইন্তিকাল করেছেন।

তিনি ইন্তিকাল করেন নি; বরং আল্লাহর সাথে দেখা করতে গিয়েছেন। যেমন গিয়েছিল নবী মুসা আ.।

যে বলবে রাসূল ইন্তিকাল করেছেন আমি তার হাত-পা কেঁটে ফেলবো।

আবু বকর রাঃ সে সময় মদীনার বাহিরে ছিলেন। এমন সংবাদ পাওয়ার পর তিনি তাড়াতাড়ি রাসূলের ঘরে আসলেন।

এরপর গেলেন আয়েশার ঘরে। সেখানে রাসূল সা. বিছানায় শোয়া। তাকে একটি ইয়ামেনী চাদর দিয়ে ডেকে রাখা হয়েছিল।

আবু বকর রাঃ চাদর সরিয়ে রাসূলের চেহারা মোবাকরে চুমু দিলেন। আর বললেন, আমার বাবা-মা আপনার জন্য কুরবান হোক।

আল্লাহ আপনার জন্য যেই মৃত্যু নির্ধারণ করে রেখেছেন, তার স্বাদ আপনি পেয়ে গেছেন। এরপরে আপনার আর কোনো মৃত্যু হবে না।

রাসূলের ইন্তিকালের পর আবু বকরের ভাষণ

এরপর আবু বকর রাঃ বাহিরে বের হয়ে দেখলেন ওমর রাঃ তখনো কথা বলে যাচ্ছেন। তিনি তাকে বললেন, শান্ত হও ওমর।

আবু বকর রাঃ মসজিদের মিম্বারে উঠলেন। এরপর বলতে শুরু করলেন, হে লোকসকল! যারা মুহাম্মাদের ইবাদত করতো তারা জেনে রাখ, তিনি মারা গেছেন।

আর যারা আল্লাহর ইবাদত করতো তারা জেনে রাখ, আল্লাহ চিরঞ্জিব। তার কোনো মৃত্যু নেই।

এরপর তিনি সূরা আলে ইমরানের ১৪৪ নং আয়াত তেলওয়াত করলেন,

وَ مَا مُحَمَّدٌ اِلَّا رَسُوۡلٌ ۚ قَدۡ خَلَتۡ مِنۡ قَبۡلِهِ الرُّسُلُ ؕ اَفَا۠ئِنۡ مَّاتَ اَوۡ قُتِلَ انۡقَلَبۡتُمۡ عَلٰۤی اَعۡقَابِکُمۡ ؕ وَ مَنۡ یَّنۡقَلِبۡ عَلٰی عَقِبَیۡهِ فَلَنۡ یَّضُرَّ اللّٰهَ شَیۡئًا ؕ وَ سَیَجۡزِی اللّٰهُ الشّٰکِرِیۡنَ

আর মুহাম্মাদ তো কেবল একজন রাসূল। তার পূর্বে নিশ্চয় অনেক রাসূল বিগত হয়েছে। যদি সে মারা যায় অথবা তাকে হত্যা করা হয়, তবে তোমরা কি তোমাদের পেছনে ফিরে যাবে ? আর যে ব্যক্তি পেছনে ফিরে যায়, সে কখনো আল্লাহর কোন ক্ষতি করতে পারে না। আর আল্লাহ অচিরেই কৃতজ্ঞদের প্রতিদান দেবেন।

হযরত আবু হুরায়রা রাঃ বলেন, এই আয়াত শোনার পর আমাদের মনে হলো এমন আয়াত যেন আমরা জানতাম না। মাত্র নাজিল হয়েছে।

আর ওমর রাঃ বললেন, আল্লাহর কসম! আবু বকর যখন এই আয়াত তেলওয়াত করলেন তখন আমার মাথা ঘোরাতে লাগলো।

আমার পা নিয়ন্ত্রণ হারালো। আমি জমিনে পড়ে গেলাম। তখনই আমার বিশ্বাস হলো যে, রাসূল সা. এর ইন্তিকাল হয়েছে।

আবু বকর রাঃ খেলাফতকালে উমর রাঃ

নবীজি সাঃ এর মৃত্যুতে সাহাবায়ে কেরাম মারাত্মকভাবে ভেঙ্গে পড়লেন। সকলের নিকট মনে হচ্ছিল, এই বুঝি পৃথিবী থমকে গেছে।

কয়েকজন সাহাবী মুসলমানদের ভবিষ্যৎ কিভাবে পরিচালিত হবে, তা নিয়ে চিন্তিত হয়ে পড়লেন। তারা মদীনার বিখ্যাত গোত্রপতি সা’দ বিন আবু উবাদা রাঃ এর বাড়ির বৈঠকখানায় একত্রিত হলেন।

মুসলমানদের ভবিষ্যৎ প্রধান কে হবে, সেটা তাদের আলোচনায় চলে আসে। সকলেই চাচ্ছিলেন, এমন একজন দায়িত্ব গ্রহণ করুক, যিনি এর যোগ্য।

পূর্বে আরবদের মধ্যে সংখ্যাগরিষ্ঠতার মাধ্যমে ক্ষমতালাভ করা প্রচলিত ছিল। আর মদীনায় যেহেতু আনসার সাহাবীরা সংখ্যাগরিষ্ঠ ছিলেন, তাই তারা নেতৃত্ব নিয়ে আলোচনায় বসলেন।

সে সময় জনৈক আনসার সাহাবী বললেন, যদি  মুহাজিররা আমাদের প্রস্তাব না মানে তাহলে আমরা প্রস্তাব দিব, আমীর দুইজন হবে।

এই প্রস্তাব শুনে খাযরাজ গোত্রের সরদার সা’দ বিন উবাদা রাঃ বললেন, এখান থেকেই তাহলে মুসলিম উম্মাহর মাঝে ফাঁটল সৃষ্টি হবে। এমন প্রস্তাব মানা অসম্ভব।

হযরত আবু বকর রাঃ তখন মসজিদে নববীতে বসে ছিলেন। তখন তার নিকট সংবাদ পৌঁছালো যে, বনু সাকিফার বৈঠকখানায় আনসার সাহাবারা একত্রিত হয়ে আলোচনায় বসেছেন।

তিনি বুঝতে পারলেন, এ সময় যদি ‍মুসলিম উম্মাহর মাঝে ফাঁটল সৃষ্টি হয় তাহলে উম্মাহর বিভক্তি সৃষ্টি হতে বিলম্ব হবে না।

তাই তিনি ওমর রাঃ ও আবু উবায়দা উবনে জাররাহ রাঃ কে নিয়ে বনু সাকিফার বৈঠকখানায় উপস্থিত হলেন। তিনি দেখতে পেলেন,

আনসার সাহাবারা জাহেলিয়্যাতের যুগের ন্যায় গোত্রের শ্রেষ্ঠত্বের বর্ণনা দিচ্ছেন। আবু বকর রাঃ তাদেরকে এমন বক্তৃতা দিতে নিষেধ করলেন।

তারপর তিনি সেখানে নবীজির ইসলাম প্রচার, হিজরত ও মুহাজির ও আনসার সাহাবীদের ভ্রাতৃত্ববোধসহ আরো অনেক বিষয় নিয়ে আলোচনা করলেন।

যেহেতু উক্ত মসলিস ছিল উন্মুক্ত পরামর্শসভা, তাই তারা একে অন্যের কথাবার্তা শুনছিলেন। সকলেই এই কামনা করছিলেন,

যেন নবীজির অবর্তমানে মুসলমানদের এই ভ্রাতৃত্ববোধ ক্ষতিগ্রস্থ না হয়। নবীজি সাঃ এর পর এটাই ছিল সর্ববৃহৎ পরামর্শসভা, সেখানে শুরাভিত্তিক ব্যবস্থাপনাকে প্রাধান্য দেয়া হয়েছে অথবা শুরাভিত্তিক ব্যবস্থাপনার প্রধান ভিত্তি এটি।

কে আমীর বা রাষ্ট্রপ্রধান হবেন

মদীনায় তখন অনেক বড় বড় আনসার সাহাবী ছিলেন। যারা সকলেই নেতৃত্বের জন্য যোগ্য ব্যক্তি। যেহেতু আনসাররা পূর্বের আরবের নীতির ন্যায় নিজেরা শাসনব্যবস্থার সাথে যুক্ত হতে চাচ্ছিলেন,

তাই তাদের মধ্য থেকে কে আমীর হবে, এ নিয়ে আলোচনা-পর্যালোচনা চলতে থাকে। কিন্তু তারা কোনো ঐক্যমতে পৌঁছাতে পারছিলেন না।

কারণ, আওস গোত্রের কাউকে আমির নিযুক্ত করলে খাযরাজ গোত্রের লোকেরা নারাজ আর খাযরাজ গোত্রের কাউকে আমীর নিযুক্ত করলে আওস গোত্রের লোকেরা নারাজ।

নবীজি জীবদ্দশাতেই এই সমস্যার সমাধান করে গিয়েছিলেন। সে সময় হয়তো তাদের হাদীসগুলো মনে ছিল না বা পৌঁছায় নি।

তখন আবু বকর রাঃ কুরাইশদের নেতৃত্ব বিষয়ক হাদীসগুলো বর্ণনা করলেন। যেখানে নবীজি বলেছিলেন, কুরাইশরাই নেতৃত্বের অধিক হকদার।

এরপর তিনি আনসারী সাহাবীদের দ্বীনি কার্যক্রম, ত্যাগ-তিতিক্ষা ও অবদানের কথা উল্লেখ করেন এবং তাদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।

এরপর আবু বকর রাঃ নেতৃত্ব বিষয়ক আলোচনা করেন। যেখানে নবীজি বলেছিলেন, কুরাইশরাই ক্ষমতার হকদার। এরপর আবু বকর রাঃ সাদ বিন উবাদা রাঃ কে লক্ষ্য করে বলেন,

নবীজি আপনার সামনেই বলেছিলেন, নেতা হবে কুরাইশদের মধ্য থেকে আর মন্ত্রী হবে আনসারদের মধ্য থেকে।

(আস সুনানুল কুবরা। ইমাম বাইহাকি রহ.। হাদীস নং ১১৯২৩)

সা’দ বিন উবাদা রাঃ এর মনে পড়ে যায় সেই কথা। তখন তিনি বললেন, আপনি ঠিকই বলেছেন। আমরা মন্ত্রী হবো আর নেতৃত্ব আপনাদেরই থাকবে।

বশির রাঃ এর ভাষণ ও আনসারদের ক্ষমতা গ্রহণে অনাগ্রহ

আনসার সাহাবীদের মধ্যে হযরত বশির বিন সা’দ রাঃ দাঁড়িয়ে গেলেন। নিজ গোত্রের লোকদেরকে সম্মোধন করে বললেন,

হে আনসার সম্প্রদায়! নিঃসন্দেহে আমরা মুশরিকদের বিরুদ্ধে লড়াই করেছি। যার পেছনে আমাদের মূল লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন।

এটা আমাদের জন্য মোটেও শোভনীয় হবে না যে, আমরা আমাদের ধর্মীয় কর্মকান্ডের বিনিময়ে দুনিয়ার তুচ্ছ ক্ষমতা গ্রহণ করবো।

এটা আমাদের জন্য মোটেও শোভনীয় হবে না। নিঃসন্দেহে আল্লাহর রাসূল কুরাইশ বংশের ছিলেন।

তাই তারা প্রতিনিধি তথা আমাদের আমীর ও কুরাইশদের মধ্য থেকে নির্বাচিত হবে।

গোটা আনসার সম্প্রদায় এই আহ্বানে লাব্বাইক বলে সাড়া দেয়। তখন উক্ত মজলিসে দুইটি সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হয়। এক: খলিফা একজন হবেন। দুই: খলিফা কুরাইশদের মধ্য থেকে হবেন।

এরপর আবু বকর রাঃ উপস্থিত ব্যক্তিদের উদ্দেশ্য করে বললেন, তাহলে তোমরা উমর ফারুক অথবা আবু উবায়দার হাতে বাইয়াত হয়ে যাও।

ওমর রাঃ ও আবু উবাইদা রাঃ এর খেলাফতের দায়িত্ব গ্রহণে অনাগ্রহ প্রকাশ

হযরত ওমর রাঃ ও আবু উবাইদা রাঃ উভয়েই ছিলেন সম্মানিত ব্যক্তি। তারা দুজনেই আশারায়ে ‍মুবাশশারার অন্তর্ভুক্ত ছিলেন।

আবু উবাইদা রাঃ আবু বকর রাঃ এর প্রস্তাব থেকে স্ববিনয়ে সরে আনেন। তিনি নিজের অক্ষমতা জানান।

হযরত ওমর রাঃ তখন লোকদের বললেন, তোমরা তো জানো যে, রাসূল সা. এর জীবদ্দশায় আবু বকর রাঃ ইমমতি করেছেন। নবীজি তাকে আগে বাড়িয়ে দিয়েছেন।

লোকেরা বললো, আপনি ঠিক বলেছেন। রাসূল এমনটা করেছেন।

এরপর ওমর রাঃ বললেন, তাহলে তোমাদের মধ্য থেকে কে আছে, যে আবু বকর রাঃ এর বর্তমানে তার চাইতেও বড় হতে চায়?

সকলেই তখন বলে উঠলো, আল্লাহ আমাদের ক্ষমা করুন। আমাদের নিকট এটা ভালো লাগবে না যে,

আবু বকরের বর্তমানে তার থেকে কেউ বড় হতে চায়।

আবু বকর রাঃ এর হাতে বাইয়াত সম্পন্ন

হযরত ওমর রাঃ এরপর আবু বকর রাঃ কে সম্মোধন করে বললেন, সকলেই আপনার নিকট বাইয়াত গ্রহণে ইচ্ছুক।

আমরা আপনার হাতে বাইয়াত হবো। আবু বকর রাঃ অসম্মতি জানালেন। কিন্তু ওমর রাঃ পীড়াপীড়ি করতে লাগলেন।

তখন বশির বিন সা’দ রাঃ সর্বাগ্রে এসে আবু বকর রাঃ এর হাতে হাত রেখে বাইয়াত গ্রহণ করলেন।

এরপর সকলেই এক এক করে আবু বকর রাঃ এর নিকট বাইয়াত গ্রহণ করলো। এভাবে আবু বকর রাঃ প্রথম খলিফা হিসেবে দায়িত্বভার গ্রহণ করেন।

উসামার বাহিনী ও ওমরের মতামত

নবীজির ইন্তিকালের পর হযরত আবু বকর খেলাফতের দায়িত্বভার গ্রহণ করলেন।

এতদিন যেসব মুনাফিকরা লোক দেখানোর জন্য ইসলাম গ্রহণ করেছিল, তারা ভাবলো ইসলামের শক্তি শেষ হয়ে গেছে।

তাই তারা এক এক করে বিদ্রোহ করতে শুরু করলো। এই বিদ্রোহী শ্রেণীকে কয়েকভাগে ভাগ করা যায়।

প্রথমত: মিথ্যা নবুয়তের দাবী করা।

দ্বিতীয়ত: যাকাত আদায়ে অস্বীকৃতি জানানো।

তৃতীয়ত: ইরতিদাদ বা মুরতাদ হয়ে যাওয়া।

নবীজির ইন্তিকালের পূর্বেই হযরত যায়েদ বিন হারিসা রাঃ এর পুত্র উসামা বিন যায়েদ রাঃ এর নেতৃত্বে একদল বাহিনী গঠন করলেন।

তিনি এই বাহিনীকে রোমানদের বিরুদ্ধে পাঠানোর মনস্থ করলেন। যখন এই বাহিনীর রওয়ানা হওয়ার কথা ছিল তখনই নবীজি অসুস্থ হয়ে পড়েন।

হযরত উসামা রাঃ সেনাবাহিনী নিয়ে মদীনার বাহিরে অবস্থান করছিলেন এবং নবীজির সুস্থ হওয়ার অপেক্ষা করছিলেন।

এর মধ্যেই নবীজি সাঃ ১২ রবিউল আউয়ালে ইন্তিকাল করেন। এরপর খেলাফতের দায়িত্বভার গ্রহণ করেন হযরত আবু বকর রাঃ।

তিনি নবীজির ইচ্ছানুযায়ী, প্রথমেই উসামা রাঃ এর বাহিনীকে রোমানদের বিরুদ্ধে পাঠানোর মনস্থ করলেন। যখন আবু বকর রাঃ এই ঘোষণা দিলেন তখন বেশ কিছু সাহাবী ভিন্নমত পোষণ করলেন।

কারণ, তখন উসামা রাঃ এর বয়স ছিল ১৭ বছরের একটু বেশি। অনেকেই বলছিল, তার থেকে বড় ও অভিজ্ঞ কাউকে সেনাপ্রধান নিযুক্ত করতে।

সাহাবারা আবু বকর রাঃ এর প্রধান উপদেষ্টা ওমর রাঃ এর নিকট গিয়ে এই মত পেশ করলেন। আর তাকে আবু বকরের নিকট পাঠালেন।

হযরত আবু বকর রাঃ এই প্রস্তাব শুনে এতটাই রেগে গিয়েছিলেন যে, তিনি ওমর রাঃ এর দাঁড়ি ধরে বললেন,

হে খাত্তাবের পুত্র! রাসূল তো নিজেই উসামাকে সেনাপ্রধান নিযুক্ত করেছেন। আর তুমি কিনা রাসূলের নিযুক্ত সেনাপ্রধানকে পদচ্যুত করতে চাও?

হযরত ওমর রাঃ তখন অপমানিত হয়ে আবু বকর রাঃ এর নিকট হতে আসলেন। বাহিরে সাহাবারা ওমরের জন্য অপেক্ষা করছিল।

তারা জিজ্ঞাসা করলো, কিছু কি করতে পেরেছেন?

ওমর রাঃ তখন রেগে গিয়ে বললেন, যাও ভাগো এখান থেকে। তোমাদের জন্য আমি আল্লাহর রাসূলের খলিফার কাছে কিভাবেই না লজ্জিত হলাম!

ওসামা রাঃ এর বাহিনীর যাত্রা

আবু বকর রাঃ ওসামার বাহিনীকে  প্রস্তুত করলেন। তখন মদীনার চারপার্শ্বে বিদ্রোহীরা জোট করছিল। অনেকেই এই আশংকা করেছেন যে,

উসামার বাহিনী যাওয়ার পর মদীনা অরক্ষিত হয়ে পড়বে। তাই পরে প্রেরণ করা উচিৎ। আবু বকর রাঃ বুদ্ধিদ্বীপ্তভাবে এই সমস্যার সমাধান করলেন।

উক্ত বাহিনীকে প্রেরণের সময় আবু বকর রাঃ তাদের সাথে কিছুদূর পর্যন্ত গেলেন। তখন আবু বকর রাঃ পায়ে হেঁটে যাচ্ছিলেন।

সেনাপ্রধান ওসামা রাঃ ঘোড়ার পিঠে ছিলেন। উসামা রাঃ তখন বললেন, হে আল্লাহর রাসূলের খলিফা! আপনি বাহনে উঠুন। অন্যথায় আমি নেমে যাই।

আবু বকর রাঃ বললেন, না। তুমি বাহনেই থাক। আমি যদি তোমাদের সাথে অগ্রসর হই, তাহলে হয়তো আমি কিছুটা হলেও সওয়াবের ভাগিদার হবো।

উসামাকে ওমরকে রেখে যাওয়ার অনুরোধ

উক্ত বাহিনীতে হযরত রাঃ সাধারণ সৈন্য হিসেবে ছিলেন। তখন আবু বকর রাঃ উসামা রাঃ কে বললেন, যদি তুমি চাও তাহলে ওমরকে আমার কাছে রেখে যাও।

কারণ, তাকে আমার প্রয়োজন আছে। উসামা রাঃ তৎক্ষণাত অনুমতি দিয়ে দিলেন।

হিরাক্লিয়াসের নিকট সংবাদ ও তার পলায়ন

হিরাক্লিয়াস সে সময় শামের সীমান্তে বাহিনী নিয়ে অবস্থান করছিল। সে চাচ্ছিল, অতর্কিতভাবে মুসলমানদের উপর হামলা করে মদীনা দখল করে নেয়া।

উসামার বাহিনী শামের দিকে অগ্রসর হওয়ার হওয়ার পর গোয়েন্দাদের মাধ্যমে হিরাক্লিয়াস  একইসাথে নবীজির মৃত্যুর সংবাদ ও উসামার বাহিনীয় অগ্রসর হওয়ার কথা জানতে পারলেন।

হিরাক্লিয়াস তখন ভয় পেয়ে বললো, এরা কেমন লোক যে, একদিকে তাদের নবী ইন্তিকাল করেছে। অন্যদিকে তারা আমাদের দিকে তেড়ে আসছে?

হিরাক্লিয়াস তখনই তড়িগড়ি করে তার রাজ্যের মধ্যে পাালিয়ে যায়। উসামা রাঃ প্রায় ২০ দিন শামের সীমান্তে বাহিনী নিয়ে অবস্থান করেন।

এরপর তিনি বিজয়ীবেশে মদীনায় আগমন করেন। আবু বকর রাঃ তাকে অভ্যর্থনা জানান।

খলিফা হিসেবে উমর রাঃ

দুই বছর খলিফার দায়িত্ব পালন করার পর ১৩ হিজরীতে আবু বকর রাঃ খুব অসুস্থ হয়ে পড়েন। তার শারীরিক অবস্থার অবনতি হচ্ছিলো।

হযরত আবু বকর রাঃ বুঝতে পারলেন, তার আয়ু শেষ পর্যায়ে আছে। তিনি তখন উপস্থিত সাহাবাদেরকে বললেন, তোমরা আল্লাহর হুকুমে আমার বাইয়াত থেকে মুক্ত হয়ে গেছ।

এখন তোমাদের প্রতি আমার কোনো দায়বদ্ধতা নেই। তোমরা এখন যাকে ইচ্ছা খলিফা হিসেবে বেছে নাও। আমি বেঁচে থাকতেই তোমরা খলিফা নির্ধারণ করে নাও।

যাতে আমার মৃত্যুর পর তোমরা দ্বিধাবিভক্ত হয়ে না যাও।

কে পরবর্তী খলিফা হবেন তা নিয়ে সাহাবারা আলোচনায় বসলেন। যাকেই বলা হচ্ছিলো তিনিই নিজের বদলে অন্যকে প্রাধান্য দিচ্ছিলেন।

একটা সময়ে তারা কোনো সিদ্ধান্তে উপনীত হতে পারছিলেন না। ফলে তারা আবু বকর রাঃ কে বললেন,

হে আল্লাহর রাসূলের খলিফা! আমরা আপনার উপরই এই দায়িত্ব দিচ্ছি।

তখন আবু বকর রাঃ বললেন, তাহলে আমাকে একটু সময় দিতে হবে। আমাকে ভেবে দেখতে হবে,

কাকে আল্লাহ তা’আলা তার বান্দাদের জন্য বেশি পছন্দ করেন।

অভিজ্ঞ সাহাবাদের সাথে আবু বকর রাঃ এর পরামর্শ

আবু বকর রাঃ তখন অসুস্থ অবস্থায় এই দায়িত্ব আঞ্জাম দেয়ার জন্য উঠে দাঁড়ালেন। তিনি বিখ্যাত সাহাবী আব্দুর রহমান ইবনে আউফ রাঃ কে তলব করলেন।

তিনি উপস্থিত হওয়ার পর তাকে বললেন, আমাকে ওমর বিন খাত্তাব সম্পর্কে বলো।

এ কথা শুনে আব্দুর রহমান ইবনে আউফ রাঃ বললেন, আপনি যা জানতে চাচ্ছেন তা আমার চেয়ে আপনিই বেশি ভালো জানেন।

আবু বকর রাঃ বললেন, এর পরেও তুমি তোমার মতামত দাও।

তখন আব্দুর রহমান ইবনে আউফ রাঃ বললেন, আল্লাহর কসম! আপনি তাকে যেমন ভাবেন তার থেকেও তিনি উত্তম ব্যক্তি।

এরপর আবু বকর রাঃ নবীজির জামাতা উসমান রাঃ কে তলব করলেন। তিনি আসার পর তাকেও বললেন,  আমাকে ওমরের সম্পর্কে বলো।

উসমান রাঃ বললেন, তার সম্পর্কে আপনিই ভালো জানেন।

আবু বকর রাঃ বললেন, এর পরও তুমি বলো।

তখন ওসমান রাঃ বললেন, আল্লাহর কসম! তার প্রকাশ্য জীবনের তুলনায় তার অন্তর অনেক বেশি উত্তম। আমাদের মধ্যে তার সমকক্ষ কেউ নেই।

আবু বকর রাঃ বললেন, আল্লাহ তোমার প্রতি রহম করুন। ওমরের মতো ব্যক্তি যদি না থাকতো তাহলে আমি তোমাকেই মুসলমানদের অভিভাবক হিসেবে নিযুক্ত করতাম।

তারপর আবু বকর রাঃ বিখ্যাত আনসারী সাহাবী উসাইদ বিন হুদাইর রাঃ কে তলব করলেন। তাকেও একই প্রশ্ন করলেন।

তিনি বললেন, আপনার পরে আমাদের মধ্যে যদি কেউ উত্তম হয়ে থাকে, তবে তিনিই সেই ব্যক্তি। আল্লাহর অসন্তুষ্টিতে তার অসন্তুষ্টি।

আল্লাহর সন্তুষ্টিতে তার সন্তুষ্টি। তার প্রকাশ্য আচরণের তুলনায় তার অন্তর আরো বেশি উত্তম। তাই তার মতো যোগ্য আর কেউ নেই।

এ ছাড়াও আরো কয়েকজন সাহাবীকে আবু বকর রাঃ তলব করে উমরের ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করেছিলেন।

শুধুমাত্র তালহা বিন উবায়দুল্লাহ রাঃ ভিন্নমত পোষণ করেছিলেন।

তিনি উমর রাঃ এর রূক্ষ মেজাজ নিয়ে শঙ্কিত ছিলেন। তখন আবু বকর তালহাকে বললেন, আমাকে যদি আল্লাহ জিজ্ঞাসা করে, কাকে রেখে এসেছ?

তখন অন্তত বলতে পারবো, উমরকে রেখে এসেছি। এরপর আর তালহা রাঃ কিছু বলেন নি।

উমর রাঃ কে একান্তে উপদেশ

আবু বকর রাঃ উমরের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেয়ার পর সেনাপ্রধানের মাধ্যমে একটা ফরমান পাঠিয়ে দেন মদীনার অন্যান্য সাহাবাদের নিকট ও আনসারদের নিকট।

এরপর উমর রাঃ কে ডেকে তার আদেশের কথা জানান এবং মৃত্যুশয্যায় উমর রাঃ কে মূল্যবান নসিহত করেন। উমর রাঃ এমন গুরুদায়িত্ব নিতে অস্বীকার করেন।

এতে আবু বকর রাঃ তাকে শাসাতে বাধ্য হয়েছিলেন। শেষ পর্যন্ত তিনি আবু বকর রাঃ এর সিদ্ধান্ত মেনে নিলেন।

আবু বকর রাঃ তখন কষ্ট করে মসজিদে গিয়ে অন্যান্য সাহাবাদের সামনে আসলেন।

এরপর বললেন, উমরের ব্যাপারে আমি যেই সিদ্ধান্ত নিয়েছি, সেই সম্পর্কে তোমরা কি একমত?

সকলে বললেন, আমরা তার কথা শুনবো এবং মান্য করবো।

এরপর উসমান রাঃ আবু বকর রাঃ এর অসিয়তনামা পাঠ করলেন। এই অসিয়তনামায় উমর রাঃ এর নাম পরবর্তী খলিফা হিসেবে লিখিত ছিল।

সকলেই তখন উমর রাঃ এর হাতে বাইয়াত গ্রহণ করলেন। সেদিনই আবু বকর রাঃ ইন্তিকাল করেন।

ওমর রাঃ তার দায়িত্ব পালনে দেরী করেন নি।

তিনদিনের মধ্যেই সৈন্য সংগ্রহ করে মুসান্না বিন হারিসা রাঃ এর নেতৃত্বে ইরাকে জিহাদের জন্য দল পাঠিয়ে দিলেন।

ওমর রাঃ এর চরিত্র

খলিফা হওয়ার পর হযরত ওমর রাঃ এর চরিত্র ছিল ফুলের মতো। তিনি যেমন ছিলেন নম্র-ভদ্র। তেমনি ছিলেন দয়াশীল একজন ব্যক্তি।

খলিফা হওয়ার পর তিনি কখনো কাউকে নিজের প্রতিশোধবশে আক্রমণ করতেন না। তবে যদি কেউ ইসলামকে সঠিকরূপে পালন না করতো, তাহলে তাকে নসিহত করতেন বা শাসন করতেন।

তিনি অসহায় ব্যক্তিদের খোঁজ নিতেন। জনগণের বৃহত্তর স্বার্থে কাজ করার সময় ব্যক্তিগত সমস্যা নিয়ে আসতে নিষেধ করতেন।

একবার ওমর রাঃ জনগণের গুরুত্বপূর্ণ একটি কাজে ব্যস্ত ছিলেন। এমন সময় এক লোক এসে বললেন, হে আমীরুল মুমিনীন! আমার সাথে চলুন। আমার একটা কাজের সমাধা করে দিন।

ওমর রাঃ তখন তাকে হালকা আঘাত করে বললেন, যখন ওমর তোমাদের কাছে গিয়ে খোঁজ-খবর নেয় তখন তো পাত্তা দাও না। এখন কেন এসেছ?

লোকটি তখন গজগজ করতে করতে চলে গেল। পরে ওমর রাঃ লোকটিকে ডেকে আনলেন।

এরপর তার হাতে একটি লাঠি দিয়ে বললেন, লাঠিটি নাও। তোমাকে আমি যেভাবে আঘাত করেছি আমাকে সেভাবে আঘাত করো।

লোকটি তখন বললো, হে আমীরুল মুমিনীন! এটা হয় না। আমি আল্লাহর জন্য বিষয়টি ছেড়ে দিয়েছি। এরপর ওমর রাঃ লোকটির কাজটি করে দিলেন।

ইলিয়াস ইবনে সালামাহ তার পিতা থেকে বর্ণনা করেছেন, উমর রাঃ একবার বিশেষ কাজে কোথাও যাচ্ছিলেন। যথারীতি তার হাতে লাঠি ছিল।

ইলিয়াস ইবনে  সালামাহর পিতা তখন বাজারে। ওমর রাঃ বললেন, পথ ছেড়ে দাও সালামা। এরপর সালামাকে উমর রাঃ মৃদু আঘাত করলেন।

পরের বছর আবার বাজারে তার সাথে দেখা হলো। তখন ওমর রাঃ সালামাকে বললেন, হে সালামা! তুমি কি এ বছর হজ্জ্বের নিয়্যত করেছ?

সালামা রাঃ বললেন, জ্বি। আমিরুল মুমিনীন!

তখন ওমর রাঃ তাকে নিজের বাড়িতে নিয়ে গেলেন। এরপর তাকে ৬০০ দিরহামের একটি থলে দিয়ে বললেন, সালামা!

এটা থেকে খরচ করো। গত বছর তোমাকে যে আঘাত করেছিলাম, সেটা থেকে দিচ্ছি। তখন সালামা বললেন,

আমি তো এটা ভুলেই গিয়েছিলাম।

ওমর রাঃ বললেন, আমি এটা এখনো ভুলি নি।

ওমরের ধর্মানুরাগ

মাদান ইবনে আবু তালহা রাঃ বলেন, একবার ওমর রাঃ এর নিকট এক ধরণের মিষ্টান্ন খাবার পাঠানো হয়েছিল।

খাবারগুলো সবার মধ্যে বিলিয়ে দিতে নির্দেশ দিলেন এবং বললেন,

হে আল্লাহ! আপনি তো জানেন, আমি তাদের জন্য এগুলোর ব্যবস্থা করতে পারি নি। আর তাদের সাথে ভাগাভাগি না করে আমি কখনো এগুলো নিজের জন্য রাখতে যাব না।

আমার ভয় হয়, আপনি না আবার এই খাবারগুলো উমরের পেটের জন্য আগুন বানিয়ে দেন।

হযরত ওমর রাঃ সর্বদা ইসলামকে প্রতিটি ক্ষণে মান্য করার চেষ্টা করতেন। কখনো কোনো বিষয় জানা না থাকলে অন্য সাহাবীদের থেকে জেনে নিতেন।

তিনি ইসলামের বিধি-বিধানের ক্ষেত্রে নিজের পরিবারকেও কখনো ছাড় দিতেন না।

এবার আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর রাঃ কিছু পন্য খুব সস্তায় ক্রয় করলেন। এটা জেনে ওমর রাঃ খুব রাগান্নিত হলেন।

তিনি তাকে বললেন, লোকেরা তোমাকে খলিফার পুত্র জেনে কম দামে পন্য দিয়েছে। আমি কখনো এটা মেনে নিতে পারবো না।

উক্ত পন্যগুলো একজন কুরাইশ ব্যবসায়ী যেমন অনেক লাভে কারো নিকট বিক্রি করে তেমনি তোমার নিকট আমি সর্বোচ্চ লাভ রেখে বিক্রি করছি। চাইলে ক্রয় করো। বা পন্য তার মালিকদের নিকট ফেরৎ দাও।

হযরত ওমর রাঃ এর শাসন আমল

হযরত ওমর রাঃ এর যুগে মানুষের শিক্ষা-দীক্ষাকে প্রসারিত করার জন্য তিনি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করেন।

সেখানে তিনি অভিজ্ঞ সাহাবীদেরকে মানুষকে জ্ঞান শিক্ষা দেয়ার জন্য নিয়োগ দিতেন।

মদীনা, বসরা ও কূফায় তিনি আলাদা আলাদা বিদ্যাপীঠ প্রতিষ্ঠা করেন। আমরা নিচে এক এক করে তা বর্ণনা করছি।

হযরত ওমর রাঃ এর সময় রাজধানী ছিল ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ শহর মদীনা। এখান থেকেই ইলম চর্চার শুরু। ওমর রাঃ মদীনাকে আরো সমৃদ্ধ করেন।

রাসূল সাঃ এর গুরুত্বপূর্ণ সাহাবী এবং বিখ্যাত ওহী লেখক যায়েদ বিন সাবেত রাঃ কে মদীনায় রাখেন ইলম চর্চার জন্য।

হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর রাঃ বলেন, ওমর রাঃ অনেক সাহাবীকেই বিভিন্ন অঞ্চলে পাঠিয়েছিলেন।

কিন্তু যায়েদ রাঃ কে মদীনাবাসীদের জন্য রেখে দেন।

হুমায়েদ ইবনে আসওয়াদ রহঃ বলেন, যায়েদ রাঃ এর পরে হযরত ইমাম মালেক রহঃ ব্যতিত অন্য কারো মতামত মদীনাবাসীরা গ্রহণ করতে পারে নি।

রাসূল সাঃ নিজে যায়েদ রাঃ কে উত্তারিধারের জ্ঞান শিক্ষা দিয়েছেন। কিভাবে মৃত ব্যক্তির সম্পদ বন্টন করবে? কিভাবে সকলেই তার প্রাপ্য অংশ পাবে, ত শিখেছিলেন যায়েদ রাঃ।

এমনকি রাসূল সাঃ তার ব্যাপারে বলেছিলেন, উত্তরাধিকারের ব্যাপারে যায়েদ সবচেয়ে জ্ঞানী।

যায়েদ বিন সাবেত রাঃ এর সোহবতে যেসব তাবেয়ী ধন্য হয়েছিলেন,

সাঈদ ইবনে মুসাইয়িব রহঃ, উরওয়া বিন আয যুবায়ের রহঃ, কুবায়সা বিন যুহায়েদ রহঃ সহ আরো অনেকে।

বসরার বিদ্যাপীঠ

ওমর রাঃ এর নির্দেশে বিখ্যাত সাহাবী উতবা ইবনে গাযওয়ান বসরা নগরীর গোড়াপত্তন করেন। পূর্বে এটি একটি গ্রাম ছিল।

১৪ হিজরীতে তিনি এখানে একটি শহর নির্মাণের উদ্যোগ নেন। এরপর থেকে আস্তে আস্তে এটি অন্যতম ব্যস্ত নগরী হয়ে উঠে।

রাসূল সাঃ এর অনেক সাহাবী স্থায়ীভাবে বসরায় এসে বসবাস শুরু করেন। তাদের মধ্যে ছিলেন,

হযরত আবু মুসা আশআরী রাঃ, ইমরান ইবনে হুসাইন রাঃ সহ আরো অনেকে।

সর্বশেষ নবীজির খাদেম আনাস ইবনে মালেক রাঃ ও বসরায় এসে বসবাস শুরু করেন।

এসব সাহাবীদের মধ্যে আবু মুসা আশআরী রাঃ ও আনাস রাঃ সুপ্রসিদ্ধ ছিলেন।

ওমর রাঃ এর নির্দেশে মুসা আশআরী রাঃ বসরার শাসনভার গ্রহণ করেন। তিনি সেখানে বিচার ব্যবস্থা, স্বাধীনতচেতা মনোভাব সহ সকল ধরণের সুযোগ-সুবিধা তৈরি করেন।

আবু মুসা আশআরী রাঃ জনগণকে কুরআন শিক্ষা দিতেন। তার তেলওয়াত ছিল অত্যন্ত সুমধুর। ওমর রাঃ তার তেলওয়াতের প্রশংসা করতেন।

একবার তিনি ওমর রাঃ এর নিকট হঠাৎ আগমন করলেন। তখন সবেমাত্র নামাজ শেষ হয়েছে।

ওমর রাঃ জিজ্ঞাসা করলেন, কি বিষয়ে এসেছ?

আবু মুসা আশআরী রাঃ বললেন, ফিকহী বিষয়ে আলোচনা ছিল।

ওমর রাঃ তখন সেখানে বসে পড়েন। তার প্রায় দীর্ঘসময় ধরে মাসআলা-মাসায়েল নিয়ে আলোচনা করলেন। আলোচনা শেষে আবু মুসা রাঃ হেসে বললেন,

আমিরুল মুমিনীন! আমরা কিন্তু ইবাদতেই লিপ্ত ছিলাম।

একবার ওমর রঃ এর নিকট বসরা থেকে এক ব্যক্তি আসলো। তখন ওমর রাঃ তাকে জিজ্ঞাসা করলেন, আবু মুসা আশআরীকে কোন অবস্থায় দেখে এসেছ?

তিনি  বললেন, তাকে কুরআন শিক্ষাদানে দেখে এসেছি।

কুফার বিদ্যাপীঠ

হযরত ‍ওমর রাঃ কুফাবাসীদের নিকট চিঠি লিখে বলেছিলেন, হে কুফাবাসী! তোমরা আরবদের মাথা ও খুলি। তোমাদের নিকট আমি আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদকে পাঠালাম।

আমি তাকে তোমাদের জন্য পছন্দ করেছি। তোমরা তাকে মেনে চলো এবং তার আনুগত্য করো।

ওমর রাঃ কুফার প্রতি সর্বদা দৃষ্টি রাখতেন। একবার তিনি জানতে পারলেন, কুফার অধিবাসীরা তাদের আঞ্চলিক ভাষায় কুরআন পড়ে।

তখন তিনি তাদেরকে এভাবে পড়তে নিষেধ করলেন। বললেন, কুরআন কুরাইশদের ভাষায় নাজিল হয়েছে। এভাবেই শিক্ষা করা উচিৎ।

আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাঃ এমন এক প্রজম্ম তৈরি করতে চাচ্ছিলেন, যারা কুরআনের ধারক-বাহক হবে। তারা আল্লাহর আদেশ ছড়িয়ে দিবে।

আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাঃ এর জ্ঞান ওমর রাঃ নিজেও স্বীকার করতেন। আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাঃ সর্বদা ওমর রাঃ কে মান্য করতেন।

তার কোনো মত যদি ওমর রাঃ এর মতের সাথে না মিলতো তাহলে তিনি ওমর রাঃ এর মতামত গ্রহণ করার জন্য বলতেন।

সিরিয়া বিজয়ের পরে ইয়াজিদ ইবনে আবু সুফিয়ান রাঃ ওমর রাঃ এর নিকট চিঠি লিখে বললেন, সিরিয়ার মানুষ জ্ঞান আরোহনে আগ্রহী।

এখানে কয়েকজন দক্ষ ব্যক্তিকে পাঠিয়ে দিন। ওমর রাঃ তখন সিরিয়াতে মুআয বিন জাবাল রাঃ, ‍উবায়দা ইবনে সামিত রাঃ ও আবু দারদা রাঃ কে সিরিয়ায় পাঠান।

ওমর রাঃ তাদেরকে বললেন, হিমস শহর থেকে শিক্ষা দেয়া শুরু করবেন। সেখানে অনেক মানুষ রয়েছে, যারা দ্রুত জ্ঞান শিক্ষা করতে পারে।

এই সাহাবীরা আস্তে আস্তে সিরিয়া, ফিলিস্তিন ও দামেষ্কের মানুষদের জ্ঞান শিক্ষা দেন। জ্ঞানের আলো ছড়িয়ে পড়ে দিকে দিকে।

হযরত আমর ইবনে আস রাঃ রোমানদের সাথে জিহাদ করে মিসর জয় করেন। ইসলামের পতাকাতলে মানুষ দলে দলে আসতে লাগলো।

কিন্তু তাদের অধিকাংশই ইসলামের পূর্ণ জ্ঞান রাখতো না। আমর ইবনে আস রাঃ এর সাথে অনেক সাহাবী ছিলেন। উকবা উবনে নাফে রাঃ সহ আরো অনেক সাহাবীর পদচারণায় মিসর ধন্য হয়েছিল।

ওমর এর সময়ে রাষ্ট্রের সীমানা

হযরত ওমর রাঃ প্রায় ১০ বছর খেলাফতের দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি মুসলমানদের প্রধান ছিলেন। তার সময়ে ইসলামী রাষ্ট্রের সীমানাও বৃদ্ধি পেয়েছিল।

সে সময় রাষ্ট্রীয় সুবিধার্থে পুরো সাম্রাজ্য কয়েকটি প্রদেশে বিভক্ত ছিল। ওমর রাঃ এসব  প্রদেশে দক্ষ গভর্নর নিযুক্ত করে ইসলামী রাষ্ট্রকে আরো উপরে নিয়ে যান।

হযরত উমর রাঃ এর সময় মক্কার গভর্নর প্রথম ছিলেন মুহরিয ইবনে হারিসা রাঃ। পরবর্তীতে উমর রাঃ কুনফুজ ইবনে উমাইর রাঃ কে নিযুক্ত করেন।

এই দুইজন সাহাবীর ব্যাপারে তেমন কোনো তথ্য পাওয়া যায় না। পরবর্তীতে হযরত নাফে বিন হারিস রাঃ কে উমর রাঃ গভর্নর নিযুক্ত করেন।

নাফে বিন হারিস রাঃ মৃত্যুপর্যন্ত গভর্নর নিযুক্ত ছিলেন। আমরা তার গভর্নর থাকাকালীন সময়ের কিছু ঘটনা উল্লেখ করছি।

হযরত ওমর রাঃ একবার হজ্জের সময় মক্কায় আগমন করলেন। তখন তার সাথে মক্কার বাহিরে নাফে রাঃ এর সাক্ষাৎ হয়।

তিনি তাকে জিজ্ঞাসা করলেন, মক্কায় কাকে তোমার নায়েব নিযুক্ত করে এসেছ?

নাফে রাঃ বললেন, ইবনে আবযাকে।

ওমর রাঃ বললেন, ইবনে আবযা কে?

নাফে রাঃ তখন জবাব দিলেন, আমাদের একজন ক্রীতদাস সে।

ওমর রাঃ তখন অবাক হয়ে বললেন, মক্কাবাসীদের জন্য তুমি একজন ক্রীতদাসকে হাকিম নিযুক্ত করে এসেছ?

তখন নাফে রাঃ জবাবে বললেন, ইবনে আবযা একজন হাফেজে কুরআন ও আমিল। সে ফারায়েজ শাস্ত্রে বা ইসলামী উত্তরাধিকার শাস্ত্রে বেশ অভিজ্ঞ।

ওমর রাঃ তখন হেসে বললেন, রাসূল সা. সত্য বলেছেন যে, এই কুরআনের মাধ্যমে আল্লাহ বহু মানুষকে সম্মানিত করেছেন। আর বহু মানুষকে অপদস্ত করেছেন।

মদীনা

মদীনা ছিল ইসলামী রাষ্ট্রের কেন্দ্র। তাই মদীনার গভর্নর থাকতেন খলিফা নিজেই। কারণ, খলিফা মদীনাতেই অবস্থান করতেন।

ওমর রাঃ খলিফা হওয়ার পর যখন মদীনায় না থাকতেন তখন যোগ্য কাউকে তা নায়েব নিযুক্ত করে যেতেন। আর সেই নায়েব তখন নতুন কেসগুলো সমাধান করতেন।

ওমর রাঃ এর খেলাফতকালে তায়েফ ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ শহর। এখানে জিহাদী কার্যক্রমকে শক্তিশালী করার জন্য সেনাবাহিনী থাকতো।

রাসূল সাঃ এর যুগ থেকে এখানে গভর্নর ছিলেন উসমান ইবনে আবুল আস রাঃ। ওমর রাঃ এর খেলাফতকালে তিনি দুই বছর উক্ত পদে বহাল থাকেন।

তার অন্তরে জিহাদের আকাঙ্খা জাগ্রত ছিল। তাই তনি জিহাদে অংশগ্রহণ করতে ওমর রাঃ এর নিকট অনুমতি চান।

তখন উমর রাঃ বললেন, রাসূল সাঃ আপনাকে নিযুক্ত করেছেন। আপনাকে আমি অব্যাহত দিতে পারি না।

আপনি না চাইলে তায়েফবাসীর মধ্য থেকে তাদের একজন আমির নিযুক্ত করে দিন।

পরবর্তীতে উসমান ইবনে আবুল আস রাঃ কে বাহরাইনের গভর্নর নিযুক্ত করেছিলেন।

উসমান উবনে আবুল আস রাঃ এর পর তায়েফের গভর্নর হন সুফিয়ান ইবনে আব্দুল্লাহ সাকাফি রাঃ।

ইয়ামান

হযরত ‍উমর রাঃ যখন খেলাফতের মসনদে আরোহন করেন তখন ইয়ামেন অত্যন্ত নিরাপদ ও স্থিতিশীল অবস্থায় ছিল।

উমর রাঃ ইয়ামানে আবু বকর রাঃ এর নিযুক্ত আমীরদের বহাল রাখেন।

ইয়ালা ইবনে উমাইয়া রাঃ কে আবু বকর রাঃ ইয়ামেনের গভর্নর করে পাঠিয়েছিলেন।

উমর রাঃ এর খেলাফতকালেও তিনি ইয়ামানের গভর্নর ছিলেন। হযরত ওমর রাঃ এর যুগে তিনি ব্যপক সুনাম-সুখ্যাতি অর্জন করেন।

উমর রাঃ যখন খেলাফতের দায়িত্বভার গ্রহণ করেন তখন বাহরাইনের গভর্নর ছিলেন আলা ইবনে হাযরামি রাঃ। তিনি তার স্বপদেই বহাল থাকেন।

আলা ইবনে হাযরামি রাঃ পারস্যের বিভিন্ন এলাকায় সংগঠিত  যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। তিনি সেসব যুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন।

উমর রাঃ পরবর্তীতে আলা ইবনে হাযরামি রাঃ কে গভর্নরের দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দিয়েছিলেন। এর কারণ হিসেবে বলা হয়,

তিনি উমর রাঃ এর অনুমতি ব্যতিতই পারস্যের উপর নৌপথে আক্রমণ করেন। উমর রাঃ মুসলিম সেনাদের নৌপথে আক্রমণ পছন্দ করতেন না।

আলা ইবনে হাযরামি রাঃ কে অব্যাহতি দেয়ার কিছুদিন পর তার ইন্তিকাল হয়ে যায়।

পরবর্তীতে বাহরাইনের গভর্নর হিসেবে নিযু্ক্ত হন উসমান ইবনে আবুল আস রাঃ।

তিনি দায়িত্ব পাওয়ার পরই বাহরাইনের পার্শ্ববর্তী পারস্যের অন্তর্ভুক্ত এলাকাতে জিহাদি কার্যক্রম অব্যাহত রাখেন। উমর রাঃ তাকে বলেছিলেন,

সামরিক কর্মকান্ডে তুমি মুসা আশআরী রাঃ এর সাহায্য গ্রহণ করবে। পরবর্তীতে বাহরাইনের গভর্নর নিযুক্ত করা হয় আবু কুদামা রাঃ।

তার পরে সেখানের গভর্নর হন আবু হুরায়রা রাঃ।

মিসর

মিসরে ইসলামের দাওয়াত নিয়ে আগমন করেন সাহাবী আমর ইবনে আস রাঃ। বিজয়ের পর তাকেই সেখানের গভর্নর নিযুক্ত করেন উমর রাঃ।

আমর ইবনে আস রাঃ ওমর রাঃ পুরো সময়ে মিসরের নিযুক্ত গভর্নর ছিলেন।

মিসর যেহেতু অনেক বড় একটি প্রদেশ ছিল, তাই আমর ইবনে আস রাঃ সেখানে আরো কিছু আমীর নিযুক্ত করেন।

তারা হলেন, আব্দুল্লাহ ইবনে সা’দ রাঃ। আবু আসরাহ রাঃ।

আমর ইবনে আস রাঃ সর্বদা মানুষের যোগ্যতার মূল্যায়ন করতেন। তিনি দক্ষ ব্যক্তিদের কারিগরি কাজে নিযুক্ত করেন। এখানে তিনি কোনো ধর্মীয় ভেদাভেদ তৈরি করেন নি।

বর্তমানের শামের সীমানা আর তৎকালীন শামের সীমানা এক নয়। পূর্বে শাম বলতে সিরিয়া ও ফিলিস্তিন সহ আরো বেশ কিছু ভূমিকে বুঝানো হতো।

আবু বকর রাঃ এর সময়ে শামের সেনাপ্রধান ও দায়িত্বশীল ছিলেন খালিদ বিন ওয়ালিদ রাঃ।

হযরত ওমর রাঃ খেলাফতের দায়িত্ব গ্রহণের পর তাকে অবসর দেন।

যাতে মানুষ খালিদ রাঃ এর অধিক বিজয় অর্জনের কারণে আকীদাগতভাবে বিভ্রান্ত না হয়।

তাই ওমর রাঃ আবু উবায়দা রাঃ কে শামের প্রধান হিসেবে নিযুক্ত করেন।

আর খালিদা রাঃ কে জিহাদী কার্যক্রম অব্যাহত রাখতে বলেন। আবু উবায়দা রাঃ তখন শামের ব্যবস্থাপনাকে নতুনরূপে সজ্জিত করলেন।

আবু উবায়দা রাঃ তখন ইয়াজিদ ইবনে আবু সুফিয়ান রাঃ কে ফিলিস্তিনের গভর্নর নিযুক্ত করেন।

শুরাহবিল বিন হাসানা রাঃ কে জর্ডানের গভর্নর নিযুক্ত করেন।

দামেষ্কের গভর্নর বা প্রশাসক নিযুক্ত করেন খালিদ বিন ওয়ালিদ রাঃ কে। হিমসের গভর্নর নিযুক্ত করেন হাবিব ইবনে মাসলাম রাঃ কে।

ইরাক ও পারস্যের রাজ্য সমূহ

হযরত আবু বকর রাঃ এর যামানায় ইরাকে মুসলিম বিজয় শুরু হয়। তারপর থেকে শুরু হয় বিজয়ের এক নতুন ধারা।

এই বিজয়ের নেতৃত্বে ছিলেন হযরত মুসান্না বিন হারিসা রাঃ। তিনি তখন ছিলেন ইরাকের গভর্নর।

পরবর্তীতে খালিদ বিন ওয়ালিদ রাঃ ইরাকের দায়িত্ব গ্রহণ করেন।

খালিদ রাঃ যখন তার বাহিনী নিয়ে শামে যাত্রা শুরু করলেন তখন আবার ‍মুসান্না রাঃ কে গভর্নর নিযুক্ত করা হলো।

হযরত ওমর রাঃ এর খেলাফতকালে তিনি মুসান্না বিন হারিসা রাঃ কে অবসর দিয়ে দেন।

এরপর সেখানে নতুন গভর্নর নিযুক্ত করা হয় আবু উবাইদ ইবনে মাসউদ সাকাফি রাঃ।

মুসান্না বিন হারিসা রাঃ জিহাদ করতে পছন্দ করতেন।

তাই তিনি গভর্নরের দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি পাওয়ার পর জিহাদে শরীক হন। ওমর রাঃ এর নিযুক্ত গভর্নর আবু উবাইদ সাকাফি রাঃ এক হিজাদের ময়দানে শহীদ হন।

এরপর মুসান্না রাঃ কিছুদিনের জন্য আবার ইরাকের শাসনভার গ্রহণ করেন। এই দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি তিনি জিহাদের লিপ্ত থাকতেন।

ওমর রাঃ তখন নতুন একজনকে গভর্নর হিসেবে পাঠানোর জন্য মনস্থ করলেন। তিনি সাদ বিন আবি ওয়াক্কাস রাঃ কে ইরাকে পাঠালেন দায়িত্ব পালনের জন্য।

কিন্তু তিনি ইরাকে পৌছার পূর্বেই মুসান্না বিন হারিসা রাঃ ইন্তিকাল করেন। তার ইন্তিকালের পূর্বে জিসর নামক যুদ্ধে তিনি মারাত্মক আহত হন। সেই ক্ষতস্থানের থেকেই তার মৃত্যু ঘটে।

বসরা

উমর রাঃ বসরা আবাদযোগ্য হওয়ার পূর্বে সেখানে কুতাবা ইবনে কাতাদা রাঃ এর সাহায্যে সাদ ইবনে বকর গোত্রের শুরাইহ ইবনে আমের রাঃ কে পাঠিয়েছিলেন।

তারপর তাকেই বসরা ও তার আশপাশের গভর্নর নিযুক্ত করেন। পরবর্তী সময়ে তিনি কোনো এক জিহাদের ময়দানে শহীদ হন।

শুরাইহ ইবনে আমের রাঃ এর শাহাদাতের পর উমর রাঃ উতবা ইবনে গাজওয়ান রাঃ কে একটি সেনাদলের সঙ্গে সেখানকার আমির নিযুক্ত করলেন।

একবার হজ্জের সময়ে ‍উতবা রাঃ উমর রাঃ এর নিকট পদত্যাগপত্র জমা দিলে তিনি তা গ্রহণ করেন নি। উমর রাঃ বললেন,

আপনি ফিরে যান ও দায়িত্ব পালন করুন। ফেরার পথেই তিনি ইন্তিকাল করেন। উতবা রাঃ এর পরে মুগিরা ইবনে শুবা রাঃ কে গভর্নর নিযুক্ত করা হলো।

তিনি সর্বপ্রথম রেজিষ্টার করা চালু করেন। তিনি জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত নিষ্ঠার সাথে দায়িত্ব পালন করে যান।

কুফা

সর্বপ্রথম সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস রাঃ কুফা শহরের গভর্নর নিযুক্ত হন। পরবর্তীতে কূফার গভর্নরের দায়িত্ব পালন করেন আম্মার ইবনে ইয়াসার রাঃ।

তিনি প্রায় ১ বছর ৯ মাস দায়িত্ব পালনের পর ওমর রাঃ জুবাইর ইবনে মুতইম রাঃ কে কুফার গভর্নর হিসেবে দায়িত্ব প্রদান করলেন।

কিন্তু তার ছোট একটি ভুলের কারণে ওমর রাঃ তাকে দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি প্রদান করে অন্য একটি দায়িত্ব প্রদান করেন।

আর কুফার দায়িত্ব প্রদান করেন মুগিরা বিন শুবা রাঃ কে।

বুহাইব যুদ্ধ

জিসিরের যুদ্ধে পারসিকদের বিজয়ের কারণে তাদের সাহস বেড়ে গিয়েছিল। আর পরাজিত মুসলমানরা তখন লজ্জিত হয়ে পেরেশান হয়ে পড়লেন।

ওমর রাঃ তখন পারসিকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের জন্য আরো দক্ষ একটি সেচ্ছাসেবক বাহিনী তৈরি করলেন। মুহুর্তের মধ্যে বাহিনী তৈরি হয়ে যায়।

ওমর রাঃ তখন তাদেরকে মুসান্না বিন হারিসা রাঃ এর সাহায্যে পাঠিয়ে দেন। এদিকে আরবের অন্যতম গোত্র বাজিলা গোত্রের সরদার আব্দুল্লাহ বাজালি রাঃ নিজের গোত্রের বাহিনী নিয়ে ইরাকে পৌছে যান।

পারস্যের সেনাপ্রধান রুস্তম মুসলমানদের এমন প্রস্তুতির কথা শুনে ভাবলো, এবারও তারা জয়লাভ করবে। তাই সে সেনাপতি মিহরানের অধীনে একদল সেনা দিয়ে মুসলমানদের বিরুদ্ধে প্রেরণ করে।

ফুরাত নদীর তীরে বুহাইব নামক স্থানে তারা একত্রিত হয়। মুসান্না বিন হারিসা রাঃ এবার আর নিজ থেকে নদী পার হন নি।

পারসিকদেরকে বললেন, নদী পার হয়ে আসতে। পারসিকরা তখন বিজয়ের নেশায় এই আবদার লুফে নেয়।

তারা তখন নির্বিঘ্নে নদী পার হয়ে অপরপাশে চলে আসে।

মুসলমানদেরকে সারিবদ্ধভাবে মুসান্না বিন হারিসা রাঃ ময়দানে দাঁড় করালেন। তিনি বললেন, আমি তিনবার তাকবীর বলার পর তোমরা কাতাবন্দী হয়ে যাবে।

চতুর্থ তাকবীর বলার পর একযোগে তোমরা আক্রমণ করবে। এরমধ্যে পারসিকরা সারিবদ্ধভাবে অগ্রসর হচ্ছিল। তাদের যুদ্ধের নাকারা বাজানোর আওয়াজ অত্যন্ত উঁচু ছিল।

কিছু সময় পর মুসান্না রাঃ তিনবার তাকবীর দেন। মুসলমানরা সকলে হাতিয়ার নিয়ে প্রস্তুত হয়ে যান।

চতুর্থ তাকবীর বলার পূর্বে কিছু ব্যক্তি আক্রমণের জন্য অগ্রসর হতে থাকে।

তখন মুসান্না রাঃ তাদেরকে ডাক দিয়ে সাবধান করে দেন। এরপর তিনি চতুর্থ তাকবীর বলার সাথে সাথে যুদ্ধ শুরু হয়ে যায়।

দুপক্ষই তুমুলভাবে যুদ্ধ করছিল। মুসলমানদের নিকট এবং পারসিকদের নিকট এটি ছিল অস্ত্বিত্বের লড়াইয়ের মতো।

যুদ্ধের ফলাফল

বুহাইবের যুদ্ধে পারসিকদের সেনাপতি মিহরান মারা যায়। ফলে পারসিকরা মনোবল হারিয়ে ফেলে।

অপরদিকে মুসলমানদের ডান ও বাম বাহু পারসিকদের উপর জোড়ালো আক্রমণ করে তাদেরকে পিছু হটিয়ে দেয়।

শেষ পর্যন্ত পারসিকদের নদী অতিক্রম করা ব্যতিত আর কোনো রাস্তা ছিল না।

তারা নদী পার হওয়ার আগেই মুসলমানদের একটি দল গিয়ে সাঁকোর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয়।

ফলে পারসিকরা দিগবিদিক পলায়ন করতে থাকে। এই যুদ্ধে মুসলমানদের বিষয় অর্জন হয়।

পারসিকদের প্রায় ১ লক্ষ সৈন্য নিহত হয় এই যুদ্ধে।

ইয়ারমুকের যুদ্ধ

খলিফা ওমর রাঃ এর খেলাফতের সুচনালগ্নেই সবচেয়ে বড় যুদ্ধক্ষেত্রের নাম ছিল ইয়ারমুকের যুদ্ধ । এই যুদ্ধের মাধ্যমে রোমানদের মধ্যে ফাঁটল সৃষ্টি হয়ে যায়।

তাদের রাজধানী হিমস পর্যন্ত এলাকা ‍মুসলমানদের কবজায় চলে আসে। হযরত আবু বকর রাঃ এর মৃত্যুর ছয়দিন পর ইয়ারমুকের যুদ্ধ শুরু হয়।

তখন পর্যন্ত ইয়ারমুকে অবস্থানরত মুসলমানরা আবু বকর রাঃ এর মৃত্যুর সংবাদ জানতেন না। আবু বকর রাঃ এই যুদ্ধকে সামনে রেখে বেশ কিছু পরিকল্পনা গ্রহণ করেছিলেন।

রোমানরা যেহেতু অনেক বড় বাহিনী ছিল তাই তাদেরকে পরাজিত করতে হলে মুসলমানদেরকেও বড় সংখ্যক সৈন্যবাহিনী দরকার।

তাই আবু বকর রাঃ শামের আশেপাশে অবস্থানরত বিভিন্ন মুজাহিদ ইউনিটগুলোকে একত্রিত হতে বললেন। তাদের সকলকে এই আদেশ দিলেন যে, তারা যেন ইয়ারমুকে চলে আসে।

বড় বড় মুসলিম সেনাপ্রধানদের তত্ত্বাবধানে ৬ বা ৭ হাজার করে সৈন্য সংখ্যা ছিল। তাদের মধ্যে আমর ইবনে আস রাঃ, ইয়াজিদ ইবনে আবু সুফিয়ান রাঃ শুরাহবিল বিন হাসানা রাঃ সকলের অধীনে ছিল প্রায় ৭ হাজার করে সৈন্য।

হযরত খালিদ বিন ওয়ালিদ রাঃ তখন ইরাকে অবস্থান করছিলেন। তার সাথে ছিল ৯ হাজার মুজাহিদ। আবু বকর রাঃ তাকে তার বাহিনীসহ ইয়ারমুকে গমন করতে বললেন।

সব মিলিয়ে প্রায় ৩৬ হাজার মুসলমান মুজাহিদ ইয়ারমুকের যুদ্ধে অংশগ্রহণ করে। এই যুদ্ধে রোমানদের সৈন্য সংখ্যা ছিল প্রায় ২ লক্ষ ৪০ হাজার।

ইয়ারমুকে আসার পর সকলেই নিজের বাহিনী নিয়ে নিজের মতো অবস্থান করছিলেন। কারণ, কেন্দ্রীয় খেলাফত থেকে কোনো নতুন আদেশ আসে নি।

সকলেই ভেবেছিলেন এভাবে হয়তো আলাদা আলাদাভাবে যুদ্ধ সংগঠিত হবে। হযরত খালিদ বিন ওয়ালিদ রাঃ বুঝতে পারলেন, এটি অত্যন্ত বিপজ্জনক।

খালিদ বিন ওয়ালিদ রাঃ এর সিদ্ধান্ত

আল্লাহর তরবারি হযরত খালিদ বিন ওয়ালিদ রাঃ সকল অভিজ্ঞ সাহাবীদেরকে একত্রিত করে বললেন,

আবু বকর রাঃ তো আমাদেরকে পৃথক পৃথকভাবে লড়াইয়ের জন্য এখানে আনেন নি।

আমরা যেন একত্রে শত্রুদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে পারি, সে জন্যই তিনি আমাদেরকে এখানে এনেছেন। আমরা যদি বিভক্ত থাকি তাহলে শত্রুরা খুব সহজেই আমাদেরকে পরাস্ত করতে পারবে।

তাই আমাদের সকলকে একত্রে একজনের নেতৃত্বে লড়াই করা উচিৎ। অন্যথায় আমরা নিজেরাই নিজেদের ধ্বংসের কারণ হবো।

অন্যান্য অভিজ্ঞ সাহাবারা তখন বললেন, আচ্ছা তাহলে আপনিই বলুন যে, কে আমাদের আমির নির্ধারিত হবেন? খালিদ রাঃ তখন বললেন,

আমাদের সকলকে একসাথে এক আমিরের নেতৃত্বে যুদ্ধ করতে হবে। আর প্রত্যেক সিপাহসালারকে একদিন করে নেতৃত্বের সুযোগ দেয়া হবে।

আর আপনারা যদি কিছু মনে না করেন, তাহলে প্রথমদিন আমাকে আমির হিসেবে নিযুক্ত করুন।

উপস্থিত সাহাবারা খালিদ রাঃ এর সমরনীতি ও অভিজ্ঞতার কথা জানতেন।

তাই সকলেই আনন্দচিত্তে তাকে নেতৃত্বের অনুমতি প্রদান করেন। হযরত খালিদ রাঃ পূর্বেই রোমানদের পরিকল্পনা ধরতে পেরেছিলেন।

তাই তার জন্য যুদ্ধে সিদ্ধান্ত নেয়া সহজ ছিল।

যুদ্ধের ময়দানে দুই বাহিনী

পরদিন উভয় বাহিনী ময়দানে মুখোমুখি হয়। রোমানরা তাদের সৈন্যদের এমনভাবে বিন্যাস করে, যা আগে কখনো কেউ দেখে নি।

কিন্তু অপরদিকে মুসলমানদেরকে খালিদ বিন ওয়ালিদ রাঃ এমনভাবে বিন্যাস করেন যে, তাদেরকে দেখে বুঝার উপায় ছিল না, এরা আরবের সৈন্যদল।

হযরত খালিদ বিন ওয়ালিদ রাঃ মুসলিম বাহিনীকে ৩৬ টি ইউনিটে ভাগ করেন। প্রতিটি ইউনিটে ভিন্ন ভিন্ন কাতার তৈরি করেন।

ইতিপূর্বে কখনো কোনো বাহিনী এতগুলো বিন্যাসে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন নি।

মুসলিম বাহিনীর মাঝের ১৬ টি ইউনিটের দায়িত্ব ছিল আবু উবায়দা ইবনে জাররাহ রাঃ এর হাতে।

ডান দিক থেকে ১০ টি কাতার ছিল আমর ইবনে আস রাঃ ও শুরাহবিল বিন হাসানা রাঃ এর হাতে।

বাম দিক থেকে ১০ টি বাহিনী ছিল ইয়াজিদ বিন আবু সুফিয়ান রাঃ এর হাতে।

এরপর খালিদ রাঃ প্রত্যেক ইউনিটে একজন করে দক্ষ ও অভিজ্ঞ অফিসার নিযুক্ত করেন।

হযরত ‍মিকদাদ বিন আসওয়াদ রাঃ কে দায়িত্ব দেয়া হয়, মুসলমানদের আবেগ উদ্দীপনা জাগ্রত করতে।

যুদ্ধের পূর্বে একজন মুসলিম সৈন্য বলে উঠে, রোমানরা কত বেশি। আমরা কত সামান্য! তখন খালিদ রাঃ এটা শুনে বললেন,

কখনো নয়। মুসলমানরাই হলো সবচেয়ে বেশি। আর মুসলমানদের তুলনায় রোমানরা কত সামান্য!

জনৈক রোমান অফিসারের ইসলাম গ্রহণ

যুদ্ধের প্রারম্ভেই একটি আশ্চর্যজনক ঘটনা ঘটে যায়। রোমানদের সিপাহসালার জারিজ ঘোড়া ছুটিয়ে মুসলমানদের নিকট এসে খালিদ রাঃ এর সাথে কথা বলতে চাইলেন।

খালিদ রাঃ অগ্রসর হলে জারিজ বললেন, খালিদ তুমি সত্য সত্য বলবে। আল্লাহ কি তোমাদের নবীর উপর আসমান থেকে কোনো তরবারি দিয়েছেন, যা দিয়ে তোমরা যুদ্ধ করে থাক।

তখন খালিদ রাঃ বললেন, না। তিনি আমাদেরকে ইসলামের দাওয়াত নিয়ে ছড়িয়ে যেতে বলেছেন।

তখন জারিজ বললো, তাহলে তোমাকে কেন সকলে আল্লাহর তরবারি বলে ডাকে?

খালিদ রাঃ তখন দৃঢ় কণ্ঠে বললেন, আমিও এক সময় নবীর বিরোধিতা করতাম। নবীকে আমরা মিথ্যা প্রতিপন্নও করতাম।

তারপর তিনি আমাদেরকে হেদায়েত দিয়েছেন। আমি তার আনুগত্য করেছি। তখন নবীজি আমাদের বললেন, তুমি হলে আল্লাহর তরবারি।

যা আল্লাহর কাফেরদের বিরুদ্ধে কোষমুক্ত করেছেন। রাসূলের দোয়াতেই আল্লাহ আমাকে যুদ্ধের ময়দানে সাহায্য করেছেন।

জারিজ তখন ইসলাম সম্পর্কে আরো জানতে চাইলো। খালিদ রাঃ পূর্ণাঙ্গরুপে বলার চেষ্টা করলেন।

এরপর জারিজ ইসলাম গ্রহণ করে তার সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে তরবারি নিয়ে দাঁড়িয়ে যায়।

উভয় দলের মধ্যে লড়াই

অবশেষে লড়াই শুরু হয়। একদল অপরদলের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। সারাদিন তুমুল লড়াই চলে। এর মধ্যেই মদীনা থেকে দূত আসে।

সে তখন খালিদ রাঃ এর নিকট গিয়ে সংবাদ প্রদান করে যে, খলিফা আবু বকর রাঃ ইন্তিকাল করেছেন।

আর ওমর রাঃ খলিফা হয়েছেন। আর তিনি এই যুদ্ধে হযরত আবু ‍উবায়দা ইবনে জাররাহ রাঃ কে সেনাপ্রধান নিযুক্ত করেছেন।

খালিদ রাঃ এই সংবাদ শ্রবণ করে যুদ্ধের শেষ পর্যন্ত সংবাদটি গোপন রাখার চেষ্টা করেন।

কারণ, অন্যথায় খলিফার মৃত্যুতে মুসলমানরা শোকাহত হয়ে পড়তে পারে।

মুসলমানরা পূর্ণ উদ্যমে যুদ্ধ করতে থাকে। খালিদ বিন ওয়ালিদ রাঃ এর নেতৃত্বে তারা শত্রুদের এক একটি প্রতিরক্ষা ভেদ করে ফেলতে সক্ষম হয়।

অবশেষে কাফেররা পলায়ন করতে থাকে। এ সময় হযরত ইররিমা বিন আবু জাহল রাঃ বলেন, আমি কয়েকবার রাসূলের বিরুদ্ধে লড়াই করেছি।

ইসলাম গ্রহণের পর আজ আমার কোরবানি দেয়ার সময় এসেছে। আমি কি এখান থেকে পলায়ন  করবো? এরপর তিনি চিৎকার করে বলেন,

কে আছে আজ মৃত্যুর সাথে বাইয়াত গ্রহণ করবে? তখন তার চারপাশে ৪০০ মুজাহিদ চলে আসে। তিনি তখন তাদেরকে নিয়ে কাফেরদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়েন।

এই যুদ্ধে ২০ হাজার রোমান সৈন্য নিহত হয়। মুসলমানদের মধ্যেও অনেক মুজাহিদ শহীদলাভ করেন। মুসলমানরা যুদ্ধে খুব সাহসিকতার সাথে লড়াই করছিল।

যুদ্ধে আবু সুফিয়ান রাঃ এর এক চোখে তীর লেগে তা নষ্ট হয়ে যায়।

আর নওমুসলিম জারিজ লড়াই করতে করতে শাহাদাতলাভ করেন।

ইকরিমা রাঃ ও তার ছেলে মারাত্মক আহত হয়ে যান। এরপর খলিদ রাঃ এর সামনেই পিতা ও পুত্র শাহাদাতের সুধা পান করেন।

বিজয়ের ধারপ্রান্তে নতুন সিপাহসালার

যুদ্ধশেষ হওয়ার পূর্বে যখন খালিদ রাঃ বুঝতে পারলেন, এখন মুসলমানরা খলিফার মৃত্যু সংবাদ জানলে কোনো অসুবিধা নেই। তখন তিনি সাহাবী ও মুজাহিদদের একত্রিত করে তা জানালেন।

পাশপাশি এই বিশাল মুসলিম মুজাহিদের প্রধান হিসেবে ওমর রাঃ এর নিয়োগের কথা বললেন।

যেহেতু খালিদ রাঃ সকলের ঐক্যমতে কিছুদিনের জন্য প্রধান নিযুক্ত হয়েছিলেন,

তাই আবু উবায়দা ইবনে জাররাহ রাঃ এর সেনাপ্রধান হিসেবে নিয়োগের পর খালিদ রাঃ তার অধীনে থেকেই যুদ্ধ করেছেন।

এভাবেই ইয়ারমুকের যুদ্ধ এ তিনি মুসলমানদের মধ্যে ঐক্য বজায় রেখেছেন।

দামেস্ক অবরোধ

ইয়ারমুকের যুদ্ধে মুসলমানদের বিজয়ের পর হযরত ওমর রাঃ মুসলিম বাহিনীকে সামনে অগ্রসর হতে আদেশ দেন।

তখন সেনাপতি আবু উবাইদা রাঃ মুসলিম মুজাহিদদের শামের গুরুত্বপূর্ণ শহর দামেষ্কে নিয়ে আসেন। তিনি সেখানে গিয়ে শহরের একপাশে অবরোধ করে রাখেন।

আর অন্যপাশে খালিদ বিন ওয়ালিদ রাঃ এর নেতৃত্বে সৈন্য মোতায়েন করেন। পাশাপাশি তিনি আমর ইবনে আস রাঃ কে একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব প্রদান করেন।

দামেস্কের প্রাচীন ছিল অনেক শক্তিশালী। মুসলমানগণ কয়েকদিন পর্যন্ত বাইরে শিবির স্থাপন করে রেখেছিলেন।

এ সময় উভয়পক্ষই তীর ও গোলাবর্ষণ করতে থাকে।

রোমান সম্রাট হিরাক্লিয়াস দামেস্কের অধিবাসীদের সহায়তায় রাজধানী হিমস থেকে সাহায্যকারী দল প্রেরণ করে।

কিন্তু আবু উবায়দা রাঃ সাহায্যের রাস্তা বন্ধ করে দেয়ায় তারা পৌছতে পারে নি।

শহরবাসীরা একদিন কোনো এক উৎসবে মত্ত ছিল। খালিদ বিন ওয়ালিদ রাঃ সুযোগ পেয়ে কয়েকজন মুজাহিদকে নিয়ে প্রাচীরে উঠে যান।

এরপর ভেতর থেকে প্রাচীরের দরজা খুলে ফেলেন। মুসলিম সৈন্যরা তখন উক্ত প্রবেশদ্বার দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করতে থাকে।

দামেস্কের অধিবাসীরা যখন দেখলো, একপাশ দিয়ে মুসলমানরা প্রবেশ করে ফেলেছে তখনই তারা অপরপাশের দরজা খুলে আবু উবাইদা রাঃ এর সাথে সন্ধিচুক্তি করে।

আবু উবাইদা রাঃ খালিদ রাঃ এর পূর্ব আক্রমণের ব্যাপারে অবগত ছিলেন না। তাই তিনি সন্ধিচুক্তি করে নেন।

অন্যদিকে খালিদ রাঃ রোমানদের সাথে যুদ্ধ করতে করতে শহরে প্রবেশ করছিলেন।

শেষে যখন পূর্ণাঙ্গ বিষয়টি সামনে আসে তখন দেখা যায়, শহরের একটি অংশ তরবারির মাধ্যমে বিজিত হয়েছে এবং অপর অংশ সন্ধির মাধ্যমে আয়ত্তে এসেছে।

এ জন্য এখানে মতানৈক্য সৃষ্টি হয়। যেহেতু সন্ধি পরে হয়েছে, যুদ্ধ আগেই শুরু হয়েছিল তাই অনেকেই বলছিলেন,

আমরা শহরবাসীদের কোনো শর্ত মানতে বাধ্য নই।

আবার অনেকে বলছিলেন, যেহেতু সেনাপতি সন্ধি করে ফেলেছেন তাই এখন সন্ধি রক্ষা করাটাই বাধ্যতামূলক। শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত হয়,

শহরের অর্ধেক অংশে সন্ধিচুক্তি হিসেবে কার্যক্রম চলবে। বাকী অর্ধেক অংশে যুদ্ধের মাধ্যমে বিজয় হিসেবে কার্যক্রম চলবে।

ফিহিলের যুদ্ধ

দামেষ্ক বিজয়ের পরে রোমানরা বড় ধরনের আঘাত পায়। প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য তারা বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে।

রোমান সৈন্যরা পরপর দুইটি যুদ্ধে পরাজিত হয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছিল। তখন তাদের এক সেনাপতি এসব পালিয়ে বেড়ানো সৈন্যদের একত্রিত করে।

তাদের সংখ্যা ছিল প্রায় ৩০ হাজারের অধিক। বর্তমান জর্দানের বাইসান নামক স্থানে তারা ক্যাম্প স্থাপন করে। হযরত আবু উবায়দা তাদেরকে প্রতিহত করার জন্য সামনে অগ্রসর হন।

তিনি রোমানদের সাথে যুদ্ধের জন্য ফিহিল ময়দানে অবস্থান করেন। রোমানরা তখন মুসলমানদের এত তাড়াতাড়ি প্রস্তুতিতে ভয় পেয়ে যায়।

তারা আবু উবাইদা রাঃ এর সাথে সমঝোতার চেষ্টা করতে থাকে। আব উবাইদা রাঃ তখন দুত হিসেবে মুয়াজ বিন জাবাল রাঃ কে পাঠালেন।

রোমানরা তাকে অত্যন্ত সম্মানের সাথে প্রধান সেনাপতির তাবুতে নিয়ে যায়। সেখানে অত্যন্ত দামী গালিচা বিছানো ছিল।

হযরত ‍মুয়াজ রাঃ সেই গালিচায় না উঠে মাটিতে বসা পছন্দ করলেন। তারা তখন পীড়াপীড়ি করলে তিনি বললেন, আমি গালিচায় বসা পছন্দ করি না। কারণ তাতে গরীবদের হক রয়েছে।

রোমানরা বললো, আমরা আপনাকে সম্মান করতে চাই।

তখন মুয়াজ রাঃ বললেন, তোমরা যাকে সম্মান মনে করো, আমার সেটা কোনো প্রয়োজন নেই। যদি মাটিতে বসাটা গোলামের মতো কাজ হয়ে থাকে তাহলে নিঃসন্দেহে আমি আল্লাহর গোলাম।

যদি তোমাদের কিছু বলার থাকে তা তোমরা বলতে পার, অন্যথায় আমি ফিরে যাচ্ছি। তারা বললো, আমরা জানতে চাচ্ছি,

কেন আপনারা হাবশা ও পারসিকদের বাদ দিয়ে আমাদের সাথে লড়াই করতে এসেছেন? অথচ আমরা হলাম দুনিয়ার সবচেয়ে বড় সাম্রাজ্যের অধিকারী!

হযরত মুয়াজ রাঃ প্রতুত্তরে বললেন, আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে নিজেদের সীমান্ত সংলগ্ন রাষ্ট্রের সঙ্গে জিহাদের নির্দেশ দিয়েছেন।

তাই আমরা আল্লাহর নির্দেশ পালনার্থে তোমাদের সাথে যুদ্ধ করছি। আমরা চাই যে, তোমরা মুসলমান হয়ে যাও। তাহলে তোমরা আমাদের ভাই হয়ে যাবে।

যদি তোমরা এটা পছন্দ না করো তাহলে জিজিয়া কর প্রদান করো। আমরা তোমাদের নিরাপত্তা দিব।

আর যদি এটা গ্রহণ না করো, তাহলে তোমাদের সাথে আমাদের যুদ্ধের ময়দানে ফায়সালা হবে।

রোমানদের দূত প্রেরণ

রোমানরা তখন ভয়ে আবু উবাইদা রাঃ এর নিকট দূত প্রেরণ করে। দূত যখন মুজাহিদদের শিবিরে পৌঁছে,

তখন আবু উবাইদা রাঃ মাটিতে বসে তীর সাজিয়ে দেখছিলেন।

দূত এদিক ওদিক তাকিয়ে সিপাহসালারকে খুঁজতে থাকে। সে কিছুই বুঝতে পারছিল না। সকলকে একই রকম দেখাচ্ছিল।

তখন সে পাশ থেকে একজনকে জিজ্ঞাসা করলো, তোমাদের আমির কোথায়? উক্ত ব্যক্তি তখন আবু উবাইদা রাঃ কে দেখিয়ে দিল।

এটা শুনে সে তো পুরো হতবাক হয়ে গেল। তারপর সে সেনাপতির নিকট গিয়ে বললো,

আমাদের রাষ্ট্র আপনাদের জনপ্রতি দুইটি করে স্বর্ণমুদ্রা প্রদান করবে। আপনারা এখান থেকে চলে যান।

আবু উবাইদা রাঃ তখন মৃদু হেসে বললেন,

আমাদের যদি ধন-সম্পদের লোভ থাকতো তাহলে এটা আমাদের জন্য লোভনীয় অফার ছিল। কিন্তু আমরা আল্লাহর দ্বীনের বিজয়ের জন্যই যুদ্ধ করি।

শেষ পর্যন্ত রোমানরা নিরাশ হয়ে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হয়। ১৪ হিজরীর জিলকদ্ব মাসে ফিহিলের ময়দানে এই যুদ্ধ সংগঠিত হয়।

মুসলমানদের ডান অংশের নেতৃত্বে ছিলেন আবু উবাইদা রাঃ। বাম অংশের নেতৃত্বে ছিলেন আমর ইবনুল আস রাঃ।

পদাতিক বাহিনীর আমির ছিলেন ইয়াজ বিন গানাম রাঃ। অশ্বারোহী বাহিনীর প্রধান ছিলেন জিরার বিন আযওয়ার রাঃ।

এই যুদ্ধে রোমানদের শোচনীয়  পরাজয় হয়। মুসলমানরা এই অঞ্জল নিজেদের সীমানার অন্তর্ভূক্ত করে নেন।

সেনাপতি রুস্তম এর নিকট মুসলিম দূত

কাদেসিয়ায় অবস্থিত মুসলমান সেনাদের নিকট ওমর রাঃ এর পক্ষ থেকে বিভিন্ন দিক-নির্দেশনা আসছিল। তিনি একটি চিঠিতে মুসলমানদেরকে শত্রুদের সংখ্যা দেখে ভীত হতে নিষেধ করেন।

হযরত সাদ বিন আবু ওয়াক্কাস রাঃ এক মাস কাদেসিয়ার ময়দানে সৈন্যদের নিয়ে অবস্থান করেন। এর মধ্যে পারস্যের বাদশাহ ইয়াজদাগিরদ সেনাপতি রুস্তমের নেতৃত্বে ১ লক্ষ ২০ হাজার সেনা প্রেরণ করে।

রুস্তম এই যুদ্ধে জয়ী হওয়ার ব্যাপারে এতটা আশাবাদী ছিল না। তারপরও সে সেনাবাহিনীদের নিয়ে অগ্রসর হয়। সে জায়গায় জায়গায় অবস্থান করে সময় অতিবাহিত করছিল।

রুস্তমের বাহিনীর প্রথম কাতারে ৪০ হাজার যোদ্ধা ছিল। ডান বাহুতে ৩০ হাজার সৈন্য ছিল। এর নেতৃত্ব ছিল হুরমুজানের হাতে। সে ছিল ধূর্ত অফিসার।

বাম বাহুতে ছিল ৩০ হাজার সৈন্য। তাদের অফিসারের নাম ছিল মেহরান। মুসলমানদের সাথে লড়াইয়ের ব্যাপারে তার যথেষ্ঠ অভিজ্ঞ ছিল।

এ ছাড়াও পারসিকদের নিকট ছিল ৩৩ টি প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত হাতি। এত বড় বাহিনী থাকতেও রুস্তম যুদ্ধ এড়ানোর চেষ্টা করছিল।

সে মুসলমানদের নিকট দূত পাঠিয়ে বলে, একজন প্রতিনিধি পাঠানো হোক। যার সাথে আলোচনা করা যাবে।

হযরত সাদ বিন আবু ওয়াক্কাস রাঃ দূত হিসেবে মুগিরা বিন শুবা রাঃ কে দূত হিসেবে পাঠান। মুগিরা রাঃ এলে রুস্তম বলে,

তোমরা তো আমাদের প্রতিবেশি। আমরা সর্বদা তোমাদের সাথে ভালো আচরণ করেছি। তোমাদের ব্যবসায় আমরা কোনো বাঁধা প্রদান করি না।

তাই তোমরা এখান থেকে ফিরে যাও। মুগিরা রাঃ তখন বললেন, আমাদের উদ্দেশ্য দুনিয়ার কোনো সম্পদ নয়। আমরা তো পরকালের প্রত্যাশী।

আমরা আমাদের ধর্ম প্রচারের জন্য অন্য দেশের নিকট গমন করি। রুস্তম তখন আগ্রহভরে ইসলামের পরিচয় জানতে চায়।

তখন মুগিরা রাঃ সংক্ষেপে তাকে ইসলামের শিক্ষা ও বিভিন্ন দিকগুলো উল্লেখ করেন। রুস্তম তখন বলছিল, এটা তো অতি উত্তম জিনিষ।

পরিশেষে সে জিজ্ঞাসা করে, যদি আমরা এই ধর্ম কবুল করে নেই, তাহলে কি হবে?

মুগিরা রাঃ বলেন, তাহলে আমরা তোমাদের রাজ্যের ধারেকাছেও আসবো না। এ কথা শুনে রুস্তম আনন্দপ্রকাশ করে।

সে তখন মুগিরা রাঃ কে বিদায় দিয়ে পারসিক সরদারদের ইসলাম ধর্ম করলে করে নিজেদের সাম্রাজ্য রক্ষার জন্য বলে।

পরবর্তী দূত প্রেরণ

কিন্তু সকলেই এই প্রস্তাব ফিরিয়ে দেয়। রুস্তম তখন যুদ্ধের জন্য টালবাহানা করতে থাকে। এরপর সে পূনরায় সাদ রাঃ কে প্রতিনিধি পাঠানোর জন্য বলে।

এরপর সাদ রাঃ হযরত রিবয়ি বিন আমের রাঃ কে পাঠান। রুস্তম এবার অত্যন্ত জাঁকজমকপূর্ণ দরবার প্রস্তুত করে মুসলমানদেরকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করে।

কিন্তু এসব জাঁকজমক রিবয়ি বিন আমের রাঃ কে প্রভাবিত করতে পারে নি। বরং তিনি নিজের অমুখাপেক্ষিতা প্রকাশ করার জন্য ঘোড়া দ্বারা গালিচা মাড়িয়ে ভেতরে প্রবেশ করেন।

এরপর ঘোড়াকে মূল্যবান আসনের সাথে বাঁধেন।

রোমান পাহারাদাররা তার অস্ত্র খুলে রাখতে চাইলে তিনি বলেন, আমি তোমাদের আবেদনের প্রেক্ষিতে এখানে এসেছি। তাই আমি যেভাবে এসেছি, সেভাবে ভেতরে যেতে দাও।

অন্যথায় আমি চলে যাচ্ছি। পাহারাদাররা তখন আর তাকে আটঁকাতে পারে নি। তিনি নিজের বর্শা দ্বারা গালিচা খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে ভেতরে প্রবেশ করেন।

ফলে রুস্তমের গালিচা এক সাইড থেকে অন্য সাইড পর্যন্ত পুরোটা বিদীর্ণ হয়ে যায়।

এই কর্মকান্ডের কারণে রুস্তম ভীত হয়ে যায়। সে জিজ্ঞাসা করে, বলো তোমরা কেন এসেছ?

হযরত রিবয়ি বিন আমের রাঃ অত্যন্ত চমৎকার ভাষায় মুসলমানদের আগমণের উদ্দেশ্য তুলে ধরেন। তিনি বলেন, আল্লাহ আমাদেরকে পাঠিয়েছেন,

যাতে তিনি যাকে চান তাকে মানুষের গোলামি থেকে আমরা আল্লাহর গোলামির দিকে নিয়ে যেতে পারি।

রুস্তম এই কথা শুনে চিন্তাভাবনা করার সময় চায়।

পরবর্তীতে আাবার মুগিরা রাঃ কে দূত হিসেবে প্রেরণ করা হয়। তিনি গিয়ে সোজা রুস্তমের পাশে থাকা সিংহাসনে বসে পড়েন।

দরবারের লোকেরা চিৎকার শুরু করলে তিনি বলেন, এর মাধ্যমে কেবল আমার সম্মান উঁচু হয়েছে।

তোমাদের মুনিবের সম্মানের কোনো ঘাটতি হয় নি।

রুস্তম তখন বুঝতে পারে, যুদ্ধ অনিবার্য। তাই সে শেষ পর্যন্ত  যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হয়ে যায়।

সে মুগিরা রাঃ কে বলে, আগামীকাল তোমাদেরকে আমাদের বীরত্ব দেখাবো।

কাদিসিয়ার যুদ্ধ

রুস্তম মুগিরা বিন শুবা রাঃ এর সাথে কথা বলার পরই তার বাহিনীতে অগ্রসর হওয়ার নির্দেশ দেয়। সে বর্ম এবং উজ্জ্বল পোশাক পরিধান করে ঘোড়ায় বসে চিৎকার দিয়ে বলে,

আমি আরবদেরকে নিশ্চিহ্ন করে দিব। তার পাশে থাকা এক অফিসার বলে, যদি খোদা চান তাহলেই হবে। তখন রুস্তম প্রতিউত্তরে বলে, যদি খোদা না চান তাহলেও হবে।

সে এক লক্ষ ২০ হাজার সৈন্য নিয়ে সাবাতের সেনাছাউনি থেকে বের হয়। মুসলমানরা ফুরাত নদীর পশ্চিম দিকে শিবির স্থাপন করেছিল।

রুস্তম এখানে পৌঁছার পর পুল না বানিয়ে পাথর ও মাটি ফেলে নদী ভরাট করে রাস্তা বানিয়ে ফেলে।

সকালবেলা সে নদীর তীরে সৈন্যদেরকে বিন্যস্ত করে।

পারস্যের ৩০ হাজার আত্মমর্যাদাশীল ব্যক্তি পায়ে শেকল বেধে ময়দানে দাঁড়িয়ে যায়।

প্রতিপক্ষ যেন কাতার ভাঙতে না পারে এবং নিজেরা পলায়ন না করে তাই এই ব্যবস্থা করা হয়।

সৈন্যবাহিনীল মধ্যভাগে ১৮ টি জঙলি হাতি আর ডান বামে পনেরোটি করে হাতি রাখা হয়।

হাতির পিঠে দক্ষ তীরন্দাজরা আসন গ্রহণ করে।

মুসলমানরা যুদ্ধের ময়দানে কাতার করে দাঁড়ালেন। সেনাপতি সাদ বিন আবু ওয়াক্কাস রাঃ সেদিন খুব অসুস্থ ছিলেন।

এ জন্য তিনি সেনাবাহিনীর পেছনে একটি বাড়ির ছাদে চিৎ হয়ে শুয়ে পর্যবেক্ষণ করছিলেন। সেখান থেকে পুরো যুদ্ধের ময়দান দেখা যেত।

এরপর তিনি মুসলমানদের উদ্দেশ্যে বক্তব্য রাখলেন। এরপর তিনি খালিদ বিন উরফুতা গিফারী রাঃ কে যুদ্ধের ময়দানে নিজের স্থলাভিষিক্ত করেন।

সকলে তাকে মান্য করেন এবং তার নেতৃত্বে যুদ্ধ শুরু হয়। সাদ রাঃ প্রয়োজনীয় দিক নির্দেশনা কাগজে লেখে খালিদ রাঃ কে দিতেন।

আরমাস দিবস

যুদ্ধের সময় দুপুর পর্যন্ত মুসলমানরা নিজের জায়গায় অবস্থান করে। সেনাপতির নির্দেশে জায়গায় জায়গায় সুরা আনফাল তেলওয়ারত করতে থাকে মুসলমানরা।

যোহরের নামাজের শেষে সাদ রাঃ তাকবীর ধ্বনি দেন। সকলে বুঝে যায়, হামলার নির্দেশ দেয়া হয়েছে।

দ্বিতীয় তাকবীর দেয়া হলে সকলে হাতিয়ার নিয়ে প্রস্তুত হয়ে যায়।

তৃতীয় তাকবীর দেয়ার সাথে সাথেই মুসলমানরা যুদ্ধ শুরু করেন। তীরন্দাজরা তীর নিক্ষেপ শুরু করে। অশ্বারোহীরা আগে বাড়তে থাকে।

বিন্যাস অনুযায়ী সকল মুজাহিদ একসাথে আগে বাড়তে থাকেন।

পারসিক শাহজাদা হরমুজ মুকুট পরিধান করে হযরত গালিব বিন আব্দুল্লাহ আসাদির মোকাবেলায় আসে।

তিনি তাকে গ্রেপ্তার করে ফেলেন। আরেকজন পারসিক অফিসার এসে হুংকার দেয়। হযরত আমর বিন মাদিকারিব রাঃ তাকে হত্যা করেন।

তুমুল যুদ্ধ চলতে থাকে। হযরত সাদ রাঃ প্রাসাদের ছাদে বসে সেনাদের দিক নির্দেশনা দিতে থাকেন। তিনি সম্পূর্ণ নির্ভয়চিত্ত ছিলেন।

এমনকি তারা ঘরের দরজা পর্যন্ত খোলা ছিল। সেখানে কোনো পাহারাদার ছিল না। যদি মুসলমানরা পিছু হটতেন তাহলে পারসিকরা সহজেই সাদ রাঃ কে গ্রেপ্তার করতে পারতেন।

আরবের অন্যতম সাহসী বনু বাজিলার অশ্বারোহীরা অত্যন্ত সাহসীকতার সাথে লড়াই করছিলেন। পারসিকরা ১৭ টি হাতি নিয়ে তাদের উপর আক্রমণ করে।

বনু বাজিলার কাতার ভেঙ্গে যেতে থাকে। সাদ রাঃ তৎক্ষণাৎ বনু আসাদের যোদ্ধাদের তাদের সহযোগীতায় পাঠান। হাতিগুলো তখন বনু আসাদের উপর আক্রমণ করে।

এরপর বনু তামিমের যোদ্ধারা অগ্রসর হয়ে হাতিগুলোকে প্রতিহত করেতে সক্ষম হন। কাদিসিয়ার প্রথমদিনের যুদ্ধকে ইতিহাসে ইয়াওমুল আরমাস নামে স্মরণ করা হয়।

আগওয়াস দিবস

প্রথমদিনের যুদ্ধে কয়েকজন মুসলমান শহীদ হন। আবার কিছু মুসলমান আহত ও হন।

শহীদদের দাফন করা হয় আর আহতদের চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়।

পরেরদিন মুসলমানরা আবার যুদ্ধের জন্য সারিবদ্ধ হয়ে দাঁড়ায়। তখনও যুদ্ধ শুরু হয় নি।

হঠাৎ হযরত সাদ রাঃ এর ভাই হযরত হিশাম রাঃ ৫ হাজার সৈন্য নিয়ে মুসলমানদের সাহায্যে পৌঁছেন।

ইতিপূর্বে তিনি আবু উবাইদা রাঃ এর নেতৃত্বে শামে যুদ্ধ করছিলেন।

খলিফা ওমর রাঃ নির্দেশ দেন, ইরাক থেকে খালিদ বিন ওয়ালিদ রাঃ এর সাথে যারা শামে এসেছিল, তাদেরকে যেন কাদিসিয়ায় পাঠানো হয়।

এতে মুসলমানদের সাহস ও মনোবল আগে থেকে আরো বৃদ্ধি পায়। এ ক্ষেত্রে একটি চমৎকার বিন্যাস করা হয়েছিল।

নতুন মুজাহিদ বাহিনীকে দশজন দশজন করে ভাগ করে দেয়া হয়েছিল। তারা একটু পর পর তাকবীর ধ্বনি দিয়ে ময়দানে প্রবেশ করছিলেন।

এতে পারসিকরা মনে করছিল, অনেক বড় বাহিনী চলে এসেছে। তাই তারা যুদ্ধের সময় মনোবল হারিয়ে ফেলে।

এদিন মুসলমানদের ঘোড়াগুলো পারসিকদের সারিগুলোকে লন্ডভন্ড করে দিচ্ছিল।

পারসিকরা নতুন কোনো পন্থা খুঁজে বের করতে পারে নি। তাই তারা এভাবেই যুদ্ধ করতে থাকে।

এদিকে কাকা বিন আমর রাঃ পারসিকদের ঘোড়াগুলোকে ভীত করে তোলার জন্য আশ্চর্যজনক পন্থা অবলম্বন করেন।

তিনি মুসলমানদের উটগুলোর সামনে কালো চাদর পেঁচিয়ে দেন। ফলে সেগুলো ভয়ঙ্কর দেখাচ্ছি। এতে পারসিকদের ঘোড়াগুলো ভয়ে পলায়ন করতে থাকে।

পারসিকদের দক্ষ তীরন্দাজ ছিল। তারা বারবার মুসলমানদেরকে টার্গেট করছিল। এর ফলে মুসলমানরা সামনে অগ্রসর হতে পারছিল না।

হযরত আমর বিন মাদিকারিব রাঃ একদল মুসলমানদের নিয়ে সামনে এগিয়ে যান। তিনি ও তার বাহিনী তীরন্দাজদের পরাভূত করতে সক্ষম হন।

ঈমাস দিবস

যুদ্ধের তৃতীয় দিনকে ঈমাস দিবস নামে অবহিত করা হয়। হযরত কাকা রাঃ রাতেই মুসলমানদের একদলকে দূরে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন।

সকালবেলায় তারা তাকবীর দিয়ে ময়দানে প্রবেশ করছিল। ফলে কাফেররা আবার ভীত হয়ে যায়।

যুদ্ধের শুরুতে মল্লযুদ্ধ শুরু হয়। এখানে পারসিক পালোয়ানদের বিরুদ্ধে ‍মুসলিম মুজাহিদরা লড়াই করে।

এরপর শুরু হয় আবার যুদ্ধ। পারসিকরা এদিনও আবার হাতি আনে। এগুলো হেফাজতের জন্য পদাতিক বাহিনীকে হাতির চারপাশে বসানো হয়।

হযরত আমর বিন মাদিকারিব রাঃ এর নেতৃত্বে আবার হাতির উপর হামলা করা হয়। এরপর মুসলমনারা পারসিকদের কাতার ভেদ করে সামনে অগ্রসর হতে থাকে।

অল্প সময়ের মধ্যে ময়দানের সবগুলো হাতিকে ধরাশয়ী করা হয়। দিন শেষে মুসলমানদের জয় হয়।

কাদিসিয়া দিবস

পরদিন সকলে উভয়পক্ষের সৈন্যবাহিনী ক্লান্ত ছিল। এদিন কাকা রাঃ এর নেতৃত্বে আবার উজ্জিবীত হয়ে মুসলমানরা হামলা করে।

যুদ্ধে মুসলমানরা রুস্তমের ঝাকঁঝমকপূর্ণ প্রাসাদের নিকটে চলে যায়। মুসলমানদের আসতে দেখে সে নদীতে ঝাঁপ দেয়।

কিন্তু হেলাল বিন আলকামা রহঃ নামক একজন মুসলমান তাকে ধরে ফেলে। এরপর তিনি রুস্তমকে হত্যা করেন। রুস্তমকে হত্যা করার পর পারসিকরা পালানো শুরু করে।

প্রায় ৩০ হাজার পারসিক সৈন্য প্রাণ বাঁচানোর জন্য নদীতে ঝাঁপ দেয়। মুসলমানদের তীরের আঘাতে তারা সকলে মৃত্যুবরণ করে।

এই যুদ্ধ সংগঠিত হয় ১৪ হিজরীতে। এভাবেই শেষ হয় কাদিসিয়ার যুদ্ধ ।

কিসরার মুকুট

কাদিসিয়ার যুদ্ধের পর মুসলমানরা সামনে অগ্রসর হওয়া শুরু হলেন। উক্ত যুদ্ধে রুস্তমসহ আরো কয়েকজন সেনাপতি নিহত হয়।

তারপরও আরো অনেকে বেঁচে ছিলেন। তারা তখন বিভিন্ন দুর্গে অবস্থান করে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিল। সাদ রাঃ এই সংবাদ পেয়ে সামনে অগ্রসর হলেন।

এখানে একটি যুদ্ধ সংগঠিত হওয়ার পর দজলা নদীর পাড়ে চলে আসে মুসলমানরা। তখন সেনাপতি সাদ রাঃ সংবাদ পেলেন,

সম্রাট পালানোর চেষ্টা করছে। তাই তাড়াতাড়ি ওপারে না পৌঁছলে তাদেরকে ধরা যাবে না।

সাদ রাঃ তখন বললেন, এই নদী কখনো মুসলমানদের বাধা দিয়ে রাখতে পারে না। শত্রুরা পালানোর পূর্বেই তাদেরকে ধরে ফেলতে হবে।

এরপর হযরত হুজর বিন আদি রাঃ উচ্চ আওয়াজে বলেন, হে মুসলমানেরা! তোমাদের সামনে এই সামান্য পানির কি মূল্য আছে?

এই পানি চিঁড়ে তোমরা এগিয়ে যাও। আল্লাহ তাআলা তো বলেছেন, আল্লাহর হুকুম ছাড়া কেউ নড়তে পারে না। সেজন্য তিনি সকলের জন্য নির্দিষ্ট সময় নির্ধারিত করে দিয়েছেন।

এরপর হুজর রাঃ ঘোড়া নিয়ে নদীতে নেমে পড়েন। তার সাথে সাথে মুসলমানরাও নদীতে নেমে পড়ে।

পারসিকরা মুসলমানদেরকে নির্বিঘ্নে নদী পার হতে দেখে ভয় পেয়ে যায়। তারা ভূত-প্রেতাত্মা ভেবে পালানো শুরু করে দেয়।

ওপারে নামার পরই মুসলামানদের সামনে ছিল কিসারার প্রাসাদ। রাসূল সা. নিজেই এই প্রাসাদ জয়ের সু সংবাদ দিয়ে গিয়েছিলেন।

মুসলমানরা পারস্যের রাজদরবারে প্রবেশের পর শুকরিয়াস্বরুপ নামাজ আদায় করেন। রাজধানী মাদায়েন থেকে মুসলমানদের নিকট অঢেল ধন-সম্পদ আয়ত্বে আসে।

পড়ুন আবু মিহজান রাঃ এর সাহসিকতা

হযরত জাবের বিন সামুরা রাঃ বলেন, যখন শরিয়ত অনুযায়ী গনিমতের চার পঞ্চমাংশ মুজাহিদদের মধ্যে বণ্টন করা হচ্ছিল,

তখন প্রত্যেক ব্যক্তির ভাগে ৪০ থেকে ৪৫ লক্ষ টাকার সমপরিমাণ সম্পদ পড়ে। রাজপ্রাসাদে কিছু বস্তা দেখে মনে হয়েছিল,

এগুলো হয়তো শস্য বা খাদ্যের বস্তা। কিন্তু খুলে দেখা গেল, এগুলো স্বর্ণ-রৌপ্য দিয়ে ভর্তি।

কিসরার মুকুট ও নবীজির ভবিষ্যদ্বানী

গনিমতের বাকী সম্পদ মদীনায় পাঠানো হয়। তার মধ্যে কিসরার পোশাক ও মুকুটও ছিল। রাসূল সাঃ যেদিন মক্কা থেকে মদীনায় হিজরত করছিলেন তখন সুরাকা বিন মালেক নবীজিকে ধরিয়ে দেয়ার জন্য তার পিছু নিয়েছিল।

নবীজি তখন সুরাকাকে বললেন, হে সুরাকা! সেদিনটি কেমন হবে, যেদিন তোমাকে কিসরার পোশাক পরিধান করানো হবে।

সুরাকা সেদিন খানিকটা অবাক হয়েছিল। ওমর রাঃ এর নিকট এই পোশাক রাখার পর সেই ঘটনা তার মনে পড়ে যায়।

তিনি তখন সুরাকাকে ডেকে আনেন। তিনি তখন একজন পরিপূর্ণ মুসলিম। এরপর সুরাকাকে পারস্যের সম্রাটের পোশাক ও মুকুট পরালেন।

মাত্র ১৫ বছর আগের করা ভবিষ্যদ্বানী আজ সকলের নিকট। ইসলামকে আল্লাহ এমনভাবে শক্তিশালী করেছেন যে, ইসলামের সৈনিকরা চাইলে পানির উপরেও ঘোড়া চালাতে পারে।

হরমুজান ও উমর

মুসলমানরা পারস্যের রাজধানী মাদায়েন দখল করার পর পারসিকরা যেদিকে পারে, সেদিকে পলায়ন করে। মুসলমানদের রাজধানী দখলের পরও জনৈক শাহজাদা যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছিল।

সে ছিল হরমুজান। সম্রাট তখন অন্য এক শহরে ছিল। হরমুজান তখন তার নিকট আবেদন করে, যদি আমাকে পারস্যের রাজত্ব প্রদান করেন তাহলে আমি মুসলমানদের পরাজিত করতে পারবো।

সম্রাট কিসরার মুকুট কিভাবে মুসলমানদের হাতে এলো, পড়ুন

সম্রাট ইয়াজদাগিরদ প্রস্তাবে রাজি হয়ে যায়। এরপর হরমুজান বড় একটি বাহিনী তৈরি করে অগ্রসর হওয়া ‍শুরু করে।

সাদ বিন আবু ওয়াক্কাস রাঃ এই সংবাদ পাওয়ার পর তিনি হুরমুজকে মোকাবেলার জন্য হযরত উতবা বিন গাজওয়ান রাঃ কে নির্ধারণ করেন।

তিরা নদীর কিনারে উক্ত সাহাবীর সাথে হরমুজানের যুদ্ধ হয়। এই যুদ্ধে হরমুজান পরাজিত হয়। এরপর সে পালিয়ে আহওয়ায নামক স্থানে যায়।

সেখানে গিয়ে উতবা রাঃ এর সাথে সন্ধিচুক্তি করে। এরপর সে গোপনে নিজের সামরিক শক্তি বৃদ্ধি করতে থাকে। অবশেষে সে মুসলমানদের সাথে মতবিরোধের বাহানা দিয়ে সন্ধিচুক্তি ভঙ্গ করে।

আবারো পরাজয়

ওমর রাঃ এই সংবাদ পাওয়ার পর তিনি উতবা রাঃ এর সাহায্যে হুরকুস বিন যুহাইর রাঃ এর নেতৃত্বে একদল সৈন্য পাঠান।

তাদের আক্রমণে হরমুজ এবারও পরাজিত হয়। সে তখন যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পলায়ন করে রাম শহরে আশ্রয়লাভ করে।

সেখানে সে নিজের সামরিক শক্তি বৃদ্ধি করতে থাকে। এরপর সে একদিন অতর্কিতভাবে ‍মুসলমানদের উপর আক্রমণ করে।

এতে অনেক বীর সাহাবী শহীদ হয়ে যান। মুসলমানরা তার পিছু নেয়। এক পর্যায়ে ময়দানে থাকা তার অধিকাংশ সৈন্য নিহত হয়। মুসলমানরা তার নিকটে চলে যায়।

সে তখন চিৎকার দিয়ে বলে, আমার তূণীরে ১০০ তীর আছে। তোমরা আমার ‍নিকট পৌছার পূর্বে ১০০ জনের লাশ পড়বে।

যদি তোমরা আমাকে উমরের নিকট জীবিত নিয়ে যাওয়ার ওয়াদা দাও, তাহলে আমি আত্মসমর্পন করবো। মুসলমানরা তার সাথে ওয়াদাবদ্ধ হয়।

ওমরের নিকট হরমুজান

যখন হরমুজানকে মদীনায় আনা হয় তখন ওমর রাঃ মসজিদের মধ্যে শুয়ে ছিলেন। তার কোনো পাহারাদার বা দেহরক্ষক ছিল না।

হরমুজান তখন মুসলমানদের জিজ্ঞাসা করে, তোমাদের রাজা কোথায়?

মুসলমানরা বলেন, এখানেই।

সে এরপর বলে, তাহলে এখানে দেহরক্ষী বা পাহারাদার কোথায়?

মুসলমানরা বলে, তিনি নিজের জন্য দেহরক্ষী বা পাহারাদার রাখেন না।

তখন ওমর রাঃ ঘুম থেকে জেগে উঠেন। হরমুজ তখন রেশমি পোশাক পরিহিত ছিল।

ওমর রাঃ তাকে সাধারণ কাপড় পরে আসার নির্দেশ দেন।

সাধারণ কাপড় পরিয়ে আনার পর ওমর রাঃ তাকে তিরষ্কার করে বললেন, সকল বাদশাহই আল্লাহর ফায়সালা দেখে নিয়েছে।

হরমুজ তখন হেসে বললো, জাহেলি যুগে খোদা আমাদের পক্ষে ছিল। এখন খোদা তোমাদের সাথে। ওমর রাঃ বললেন,

সে সময় তোমরা ঐক্যবদ্ধ ছিলে। আর আমরা বিভক্ত ছিলাম। ওমর রাঃ তখণ বিশিষ্ট সাহাবীদের নিকট তাকে হত্যার ব্যাপারে ফায়সালা চাইলেন।

এদিকে হরমুজ পানি পান করতে চায়। পানি আনা হলে সে বলে, আমি শঙ্কাবোধ করছি যে,

পানি পান করার সময় আমাকে হত্যা করে ফেলা হবে।

ওমর রাঃ তখন বললেন, পানি পান করা পর্যন্ত তুমি নিরাপদ। এটা শুনে সে হাত থেকে পানি ফেলে দেয়।

এরপর সে বলে,

আমি আমাকে আর হত্যা করতে পারবেন না। আমাকে নিরাপত্তা দিয়েছেন।

ওমর রাঃ তা অস্বীকার করলেন। বললেন, আমার তো এমন কোনো উদ্দেশ্য ছিল না। সে সময় হযরত আনাস রাঃ বললেন,

তাকে আর হত্যা করার সুযোগ নেই। কারণ, সে পানি পান করে নি।

ওমর রাঃ বললেন, এ বিষয়ে কোনো সাক্ষী আছে? আনাস রাঃ তখন যুবায়ের রাঃ কে দেখিয়ে দেন। তিনিও এটি সমর্থন করেন।

তখন ওমর রাঃ হরমুজকে বলেন, আমরা কোনো ধোঁকাবাজ নই। তাই তোমাকে নিরাপত্তা দেয়া হলো।

হরমুজ তখন ইসলামের ব্যাপারে আগ্রহ প্রকাশ করে।

এরপর সে মুসলমান হয়ে যায়। উমর রাঃ আনন্দিত হয়ে তাকে মদীনাতে থাকার জন্য একটি বাসস্থান নির্ধারণ করে দেন।

জাবালা ইবনে আইহাম ও উমর

পারস্য বিজয়ের পর জনৈক শাহজাদা জাবালা ইবনে আইহাম ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে। ইয়ারমুকের যুদ্ধে সে রোমানদের কমান্ডার হিসেবে দায়িত্ব পালন করে।

অবশেষে সে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে মদীনায় আগমন করে। এটি ১৬ হিজরীর ঘটনা। হযরত ওমর রাঃ তাকে উপঢৌকন প্রদান করেন।

সে তখন মুসলমানদের একজন হয়ে যায়। কিন্তু তার স্বভাব পরিবর্তন হয় নি।

একবার সে হজ্জ করার জন্য মক্কায় গমন করে। বাইতুল্লাহ তাওয়াফ করার সময় তার ইহরামের কাপড় জনৈক ব্যাক্তির পা লেগে খুলে যায়।

ফলে জাবালা রাগান্নিত হয়ে তাকে স্বজোরে থাপ্পর মারে। এতে লোকটি মারাত্মকভাবে আহত হয়। তার নাকের হা্ড্ডি ভেঙ্গে যায়।

উক্ত লোকটি তখন ওমর রাঃ এর নিকট গিয়ে নালিশ প্রদান করে। তিনি তখন জাবালাকে ডেকে আনেন। তাকে জিজ্ঞাসা করেন যে,

ঘটনা সত্যি নাকি? জাবালা স্বীকার করে নেয়। ওমর রাঃ তখন বলেন, তুমি তোমার অপরাধ স্বীকার করে নিয়েছ। এখন তুমি সম্ভব হলে উক্ত ব্যক্তিকে খুশী করো। অথবা তাকে বদলা নেয়ার সুযোগ দাও।

জাবালা নিজের মর্যাদার কারণে ভেবেছিল, সে হয়তো সকল নিয়ম-কানুনের উর্ধ্বে। তাই সে এ কথা শুনে পুরো অবাক হয়ে যায়।

এরপর জাবালা ওমর রাঃ কে বলে, আমি হলাম একজন শাহজাদা। আর উক্ত লোকটি হলো একজন সাধারণ ব্যক্তি। আমরা কিভাবে পরষ্পর সমান হই?

জাবালা

ওমর রাঃ তাকে বললেন, ইসলামের দৃষ্টিতে তোমরা উভয়ই সমান। জাবালা তখন বলে,

যদি এমন হয় তাহলে আমি পূনরায় খৃষ্টান হয়ে যাব।

উমর রাঃ বললেন, তাহলে তোমাকে মুরতাদ হিসেবে হত্যা করে ফেলা হবে। জাবালা তখন বুঝতে পারে,

ওমর রাঃ তাকে ইনসাফ ব্যতিত ছাড়বেন না।

তাই সে পরদিন সকাল পর্যন্ত চিন্তা-ভাবনা করার সময় চায়। ওমর রাঃ তাকে সেই সুযোগ প্রদান করেন।

রাতের বেলায় জাবালা মদীনা থেকে দলবলসহ পলায়ন করে।

জাবালার শেষ পরিণতি

এরপর সে মদীনা থেকে বের হয়ে কনস্টান্টিনোপলে হিরাক্লিয়াসের নিকট যাত্রা করে। সেখানে গিয়ে খৃষ্টান হওয়ার ঘোষণা দেয়।

হিরাক্লিয়াস তাকে থাকার জন্য একটি জায়গির নির্ধারণ করে দেয়। সেখানে সে দিন কাঁটাতে লাগলো।

ইসলাম থেকে বের হয়ে আসায় তার মনে অনুশোচনা হয়।

কিন্তু ক্ষমতার মোহ তাকে অন্ধ করে ফেলে। হযরত ওমর রাঃ একবার হিরাক্লিয়াসের নিকট একজন দূত পাঠিয়েছিলেন।

উক্ত দূতকে তখন জাবালার নিকট নিয়ে যাওয়া হয়। সে তখন তাকে হাসসান বিন সাবেত রাঃ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করেন।

দূত জাসসামা বিন মুসাহিক রাঃ জবাব দেন, তিনি তো বৃদ্ধ হয়ে গেছেন। জাবালা তখন খানিকটা চুপ থেকে বললো, হায়! যদি আমি সেদিন পালিয়ে না যেতাম।

জাসসামা বিন মুসাহিক রাঃ তাকে পূনরায় ইসলাম গ্রহণ করতে বলে। কিন্তু ক্ষমতার মোহ তাকে অন্ধ করে ফেলে। তাই সে রাজী হয় নি।

এরপর সে হাসসান বিন সাবেত রাঃ এর জন্য উপহার প্রেরণ করে।

ওমরের বাইতুল মুকাদ্দাস বিজয়

হযরত ‍ওমর রাঃ এর খেলাফতের তৃতীয় বছরেই শামের বৃহত্তম অঞ্চল ও দামেশক, হালব, এন্তাকিয়া এবং কিন্নাসারিনের মতো বড় বড় শহর মুসলমানদের কবজায় চলে আসে।

তখনো মুসলমানরা বাইতুল মুকাদ্দাসের দিকে অগ্রসর হয় নি। কারণ, এতে ঐতিহাসিক ও আঞ্চলিক শান্তি বিনষ্ট হতে পারতো।

এই শহর যেন যুদ্ধ ব্যতিতই মুসলমানদের হাতে আসে, সেই ব্যবস্থা করা হচ্ছিল। শামে তখন মুসলিম কমান্ডার ছিলেন হযরত  আবু উবাইদা রাঃ।

তার অধীনে ছিলেন হযরত আমর ইবনুল আস রাঃ এবং খালিদ বিন ওয়ালিদ রাঃ। হযরত আমর ইবনে আস রাঃ প্রথম খলিফা আবু বকর রাঃ এর যুগেই এদিকে আসেন।

১৬ হিজরীতে সাহাবায়ে কেরামের সম্মলিত বাহিনী এই শহর অবরোধ করে। ততদিনে রোম ও পারস্য সাম্রাজ্য মুসলমানদের কবজায়।

তাই স্থানীয় খৃষ্টানরা মুসলমানদের সাথে যুদ্ধ করাটা অর্থহীন মনে করে। কারণ, তাদের এত বেশি সৈন্য নেই।

আর রোম সাম্রাজ্য থেকে তারা কোনো সাহায্যও পাবে না।

তাই তারা সন্ধির প্রস্তাব পেশ করে। যেহেতু বাইতুল মাকদিস ইহুদী, খ্রিষ্টান ও মুসলমানদের নিকট পবিত্রতম জায়গা,

তাই তারা মুসলিম খলিফাকে এসে সন্ধিচুক্তি করার ব্যাপারে আগ্রহ প্রকাশ করে।

যাতে কোনো ভুল বুঝাবুঝি না থাকে। মুসলিম সেনাপতি আবু উবাইদা রাঃ তৎক্ষণাত উমর রাঃ এর নিকট দূত প্রেরণ করেন।

এরপর সেই দূত ফিলিস্তিনবাসীদের আকাঙ্খা ব্যক্ত করে। তিনি সেখানে যাওয়ার জন্য অভিজ্ঞ সাহাবাদের সাথে পরামর্শ করেন।

হযরত আলী রাঃ মতামত দিলেন, যেহেতু বাইতুল মাকদিস মর্যাদাপূর্ণ শহর তাই সেখানে খলিফার যাওয়াটাই উত্তম হবে।

এরপর এই সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হয়।

ওমর রাঃ এর ফিলিস্তিন সফর

হযরত ওমর রাঃ মদীনায় নিজের স্থলাভিষিক্ত হিসেবে আলী রাঃ কে নির্ধারণ করে ফিলিস্তিনের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করেন।

তার সাথে একটি উট ও একজন খাদেম ছিল। কোনো দেহরক্ষী বা অতিরিক্ত লোক ছিল না। তিনি আরবের মরুভূমি দিয়ে সফর শুরু করলেন।

যখন তিনি শামে প্রবেশ করেন তখন তার জামা-কাপড় ছিড়ে গিয়েছিল আর ধূলিমলিন হয়ে গিয়েছিল। তখন সেখানের এক ইহুদী তাকে দেখে চিনে ফেলে।

সে বলতে থাকে, হে ফারুক! তুমি বাইতুল মাকদিসের বিজেতা। মুসলিম সৈন্যরা ওমর রাঃ এর অপেক্ষায় ছিলেন। যখন তিনি বাহিনীর নিকট আসলেন তখন একজন বললো,

হে আমিরুল মুমিনীন! শামের খ্রিষ্টান পাদরিরা আপনাকে অভ্যর্থনা জানানোর জন্য অপেক্ষা করছে। অথচ আপনার কাপড়-চোপড় সব নোংরা হয়ে আছে?

তখন তিনি বললেন, আল্লাহ যাদেরকে ইসলামের মাধ্যমে সম্মানিত করেছেন তার অন্য কিছু দিয়ে সম্মান তালাশ করা অনুচিত।

উমর রাঃ বাইতুল মুকাদ্দাসে যাওয়ার জন্য অন্য একটি জামা পরিধান করলেন। আগেরটি ধুয়ে দিলেন। এরপর তিনি নেতৃস্থানীয় লোকদের সাথে দেখা করলেন।

সেখানে সন্ধির শর্তাবললি নির্ধারিত হয় এবং তাতে চুক্তি সাক্ষরিত হয়।

এরপর চুক্তি অনুযায়ী তিনদিনের মধ্যে রোমান সৈন্যরা শহর থেকে বের হয়ে যায়। ওমর রাঃ শহর ঘুরে দেখেন। এরপর কিছুদিন শামে অবস্থান করে মদীনায় ফিরে আসেন।

শামে প্লেগ এবং সাহাবীগণ

বাইতুল মাকদিস তখন সবেমাত্র মুসলমানদের হাতে আসলো। ১৭ হিজরীর শেষের দিকে শাম ও এর পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে প্লেগ রোগ ছড়িয়ে পড়ে।

প্রায় কয়েকমাস পর্যন্ত রোগ সংক্রমণ হতে থাকে। বহুলোক এতে আক্রান্ত হয়। অনেকেই মৃত্যুবরণ করে। মহামারি মারাত্মক আকারে ধারণ করে।

সে সময় শামে অবস্থিত মুসলিম মুজাহিদ বাহিনীও এই মহামারিতে আক্রান্ত হয়। প্রতিদিন একটি করে জানাযা অনুষ্ঠিত হতো।

মুসলিম সেনাপতি আবু উবাইদা রাঃ অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে উক্ত এলাকায় অবস্থান করছিলেন। কেননা নবীজি বলেছেন,

তোমরা যদি  মহামারি কবলিত এলাকায় অবস্থান করো তাহলে উক্ত এলাকা থেকে বের হইয়ো না।

আর যদি তোমরা উক্ত এলাকার বাহিরে থাক তাহলে তাতে প্রবেশ করিও না।

খলিফা হযরত ওমর রাঃ মহামারিতে আক্রান্ত সাহাবীদের ব্যাপারে চিন্তিত ছিলেন।

তিনি নিজে শামে গিয়ে মুজাহিদদেরকে অন্যত্র সরে যাওয়ার নির্দেশ প্রদান করেন।

কিন্তু সেনাপতি আবু উবাইদা রাঃ বললেন, এটা তো তাকদীর থেকে পলায়নের নামান্তর।

হযরত ওমর রাঃ সেনাপতি আবু উবাইদাকে সেখান থেকে বের করতে চাইলেন।

তাই তিনি তার নিকট মদীনা থেকে চিঠি লিখেন, জরুরি প্রয়োজনে তুমি আমার নিকট চলে আস। কিন্তু সেনাপতি বুঝতে পারলেন উমর রাঃ এর উদ্দেশ্য।

তাই তিনি জবাব দিলেন, আমি এমন এক বাহিনীর সাথে আছি। যাদের থেকে আমি বিচ্ছিন্ন হতে চাই না।

ওমরের দ্বিতীয় চিঠি

ওমর রাঃ পূনরায় চিঠি পাঠালেন আবু উবাইদা রাঃ এর নিকট। বললেন, আপনারা উঁচু কোনো ভূমিতে চলে যান।

তখন সেনপতি আবু ‍উবাইদা রাঃ মুসা আশআরী রাঃ কে দায়িত্ব দিলেন।

কিন্তু মুসা আশআরী রাঃ এর স্ত্রী তখন প্লেগে আক্রান্ত ছিল। তাই আবু উবাইদা নিজেই ভূমির খোঁজে বের হন।

কিন্তু পথিমধ্যেই তিনি প্লেগে আক্রান্ত হন।

এর কিছুদিন পর তিনি মৃত্যুবরণ করেন। এই মহামারিতে অনেক বড় বড় সাহাবীর মৃত্যু হয়। তাদের মধ্যে রয়েছেন,

মুআজ বিন জাবাল রাঃ, ইয়াজিদ বিন আবু সুফিয়ান রাঃ, হারিস বিন হিশাম রাঃ, সুহাইল বিন আমর রাঃ , উকবা বিন সুহাইল রাঃ, আমের বিন গায়লান রাঃ সহ আরো অনেক সাহাবী।

এই মহামারিতে প্রায় ২৫ হাজার মুসলমান আল্লাহর ডাকে সাড়া দেয়। এরপর আল্লাহ মুসলমানদের এই মহামারি থেকে মুক্তি দান করেন।

মিশর বিজয়

প্রাচীনকাল থেকেই মিশর ছিল উৎকৃষ্ট ভূমি। এখানে বহুকাল যাবৎ বসবাস করে আসছে বিভিন্ন জাতি-উপজাতি।

পাশাপাশি বিভিন্ন ধর্মের ব্যক্তিরা মুসা আ. এর পূর্ব থেকেই তাদের প্রভাব বিস্তার করে আসছে।

মুসলমানদের বাইতুল মাকদিস বিজয়ের পর হযরত আমর বিন আস রাঃ এর অন্তরে ইসলামী বাহিনীর মিসরের প্রতি অগ্রসর হওয়ার ইচ্ছা জন্মায়।

হযরত আমর রাঃ ব্যবসায়ী হওয়ার কারণে ইসলামের পূর্বেও এই মিশরে সফর করেছিলেন।

তিনি তখন খুব কাছ থেকে মিশরের সামরিক ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে অবগত হয়েছেন।

মিশর অঞ্চলের অধিকাংশ এলাকাই হলো গ্রামীণ। শুধু নীলনদ  এবং রোম সাগরের উপকূলে গড়ে উঠা দুই তিনটি শহরের উপর কর্তৃত্ব করেই গোটা মিশর কবজায় আনা সম্ভব।

মিশরে তখন চলছিল খৃষ্টান ধর্মের জয়-জয়কার। কিন্তু তারা তখন খৃষ্টান জগতের মধ্যমনি রোমানদের সাথে ভিন্নমত পোষণ করতো।

এ ছাড়াও তারা রোমান সম্রাটের প্রতি বেজায় অসন্তুষ্ট ছিল। এর কারণ ছিল,

মিশরের শাসক মুকাওকিস সম্রাটকে খুশী করার জন্য মিশরীয়দের উপর নির্যাতন করতো।

এ সকল বিষয়গুলো সামনে রেখে হযরত আমর বিন আস রাঃ খলিফা উমর রাঃ এর নিকট মিশর জয়ের আহবান জানান ও অনুমতি প্রদান করতে বলেন।

হযরত ওমর রাঃ তখন খানিকটা দ্বিধায় ছিলেন। কারণ প্লেগ ও মহামারির কারণে অনেক মুসলমান মৃত্যুবরণ করেছেন।

এ ছাড়াও তখন ইরানের সাথে মুসলমানদের যুদ্ধ হচ্ছিল। তাই এই পরিস্থিতিতে নতুন কোনো অভিযান চালানো যুক্তিযুক্ত ছিল না।

হযরত ওমর রাঃ তখন আমর রাঃ কে চিঠি লিখেন, তোমার বাহিনী নিয়ে অগ্রসর হও।

কিন্তু মিশরের সীমানায় প্রবেশের পূর্বে আমার চিঠি আসলে ফিলে আসবে।

হযরত আমর রাঃ অনুমতি পাওয়ার সাথে সাথেই মাত্র ৪ হাজার মুজাহিদ বাহিনী নিয়ে শাম থেকে মিসরের দিকে রওয়ানা হন।

কিছুদিন অগ্রসর হওয়ার পর হঠাৎ একদিন ওমর রাঃ এর চিঠি আসে যে, তোমরা ফিরে আস।

কিন্তু ততক্ষণে আমর রাঃ মিসরের সীমান্ত অতিক্রম করে আরিশ অঞ্চলে পৌঁছে গিয়েছেন।

তিনি মনেপ্রাণে বিশ্বাস করতেন যে, মিশর অভিযানে তিনি সফর হবেন। এটি ১৯ হিজরী ঘটনা।

আমর রাঃ এর মহানুভবতা

হযরত আমর বিন আস রাঃ জানতেন যে, মিশরের বাদশাহ মুকাওকিস নবীজির দাওয়াতি চিঠিকে সম্মান করেছিলেন।

তাই তিনি স্থানীয়দের সাথে উত্তম আচরণ করে তাদের মন জয় করে নেন। মিসরের বড় পাদরী মুসলমানদের মোকাবেলায় সৈন্য নিয়ে আমর রাঃ এর নিকট উপস্থিত হন।

কিন্তু সে আমর রাঃ এর সাথে মিসরবাসীর উত্তম আচরণ দেখে বলে উঠলো, এত দূরবর্তী আত্মীয়তার সম্পর্ক কেবল নবীরাই বহাল রাখেন।

পরিশেষে আমর রাঃ সীমান্তবর্তী আরিশ ও বিলবিস দুর্গ জরে নীলনদের তীরবর্তী মিসরের রাজধানী পর্যন্ত অর্থাৎ ব্যবিলন শহর পর্যন্ত পৌঁছে যান।

মিসরের বাদশাহ মুকাওকিস এখানেই অবস্থান করছিলেন। তিনি মুসলমানদের সাথে সন্ধি করতে চাচ্ছিলেন। কিন্তু ইউরোপ থেকে রোমান সম্রাটের নির্দেশ আসে যে, তোমরা যুদ্ধ চালিয়ে যাও।

শেষ পর্যন্ত মুসলমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের জন্য মুকাওকিস প্রস্তুত হয়।

হযরত আমর বিন আস রাঃ শহব অবরোধ করে মুকাওকিসকে আত্মসমর্পনের জন্য বলেন। প্রায় সাত মাস এই শহর অবরোধ হয়ে থাকে।

অবশেষে উমর রাঃ ১৯ হিজরীর জুমাদাল উখরা মাসে ১২ হাজার মুজাহিদদের একটি বাহিনী পাঠান। যার নেতৃত্বে ছিলেন হযরত যুবাইর ইবনুল আওয়াম, উবাদা বিন সামেত, মিকদাদ বিন আসওয়াদ রাঃ প্রমুখ।

একদিন যুবাইর রাঃ কিছু জানবাজ সাথি নিয়ে সিঁড়ি লাগিয়ে একা একা দেয়ারের প্রাচীরে উঠে যান। লড়াই করতে করতে তারা ভেতরে নেমে দরজা খুলে দেন।

এইভাবে ২০ হিজরীর রবিউস সানিতে এই দুর্গ মুসলমানদের করায়ত্ব হয়। মুসলিম সিপাহসালার ও সেনাপতি আমর রাঃ মুকাওকিসসহ স্থানীয় কিবতি ও রোমানদের নিরাপত্তা দেন।

মুকাওকিস এই পরাজয় মেনে নিতে পারে নি। তাই সে রোম উপসাগরের তীরে অবস্থিত আলেকজান্দ্রিয়া শহরে গিয়ে দুর্গবন্দি হয়ে যায়।

আমর রাঃ উক্ত শহরটি জয়ের ইচ্ছা করলেন। রোমান সম্রাট মুসলমানদের পরিকল্পনা বুঝতে পেরে অত্যন্ত শক্তিশালী একটি বাহিনী পাঠিয়ে দেয়।

আলেকজান্দ্রিয়া অবরোধকালেই সম্রাট হিরাক্লিয়াস মারা যায়। এরপর সম্রাট হয় তার ছেলে কনস্টান্টিন। সে ছিল অল্প বয়স্ক ও অনভিজ্ঞ।

তাই সে মুকাওকিসের ইচ্ছার বিরুদ্ধে মুসলমানদের সাথে সন্ধিচুক্তি করে। এর ফলে মিশর বিজয় লাভ করে এবং এশিয়া মাইনর ব্যতিত অবশিষ্ট অঞ্চল রোমানদের নিকট হতে হাতছাড়া হয়ে যায়।

নীলনদের চিঠি

সবেমাত্র ভূখন্ড জয় করে মুসলমানরা দেশ পরিচালনায় মনোযোগ দিয়েছেন। দেশের অর্থনীতি, সামরিক ও অন্যান্য খাদকে আরো সমৃদ্ধ করার আপ্রান চেষ্টা করছেন আমর বিন আস রাঃ।

কোনো সমস্যা হলে তৎক্ষণাত ওমর রাঃ কে চিঠি লিখে সমস্যার প্রতিকার জানতে চান। ওমর রাঃ অভিজ্ঞদের সাথে পরামর্শ করে তার সমাধান দেন।

হঠাৎ একদিন মিসরের কৃষকরা আমর রাঃ এর নিকট উপস্থিত হলো। সকলের চোখে-মুখে হতাশার ছাপ। এ বছর ফসল বেশি হয় নি।

এমনভাবে চলতে থাকলে বছরখানেক পর দুর্ভিক্ষ লেগে যাবে। মরু অঞ্চল হওয়ায় বৃষ্টি খুব কম হয় মিসরে। কিন্তু মিসরের জমিগুলো নীলনদের উপর নির্ভরশীল।

নীলনদের পানি দ্বারা জমি চাষ করা করে কৃষকরা। গবাদি পশু এবং নিজেরা খাওয়ার জন্যও এই নীলনদের পানি ব্যবহার করে থাকে মিসরের জনগণ।

হযরত আমর বিন আস রাঃ তাদের নিকট উপস্থিত হলেন। জিজ্ঞাসা করলেন, তোমাদের অভিযোগ কি?

লোকেরা বললো, প্রাচীনকাল থেকেই এই নীলনদের একটি নিয়ম বা রেওয়াজ আছে। প্রতি বছরের একটি নির্দিষ্ট সময়ে একজন কুমারী নারীকে নববধুর মতো উত্তম কাপড় পরিধান করিয়ে ও সজ্জিত করে নীলনদে ফেলে দেয়া হতো।

এরপরই নীলনদের পানি নদীর কানায় কানায় ভরপুর হয়ে যেত। এই কাজ না করলে নদীর পানি শুকিয়ে নিচে নেমে যায়।

তাই উক্ত প্রথা পালনের অনুমতি না দেয়া হলে দেশে দুর্ভিক্ষ লেগে যাবে। হযরত আমর রাঃ সব শুনে কঠোরভাবে নিষেধ করলেন।

তিনি বললেন, ইসলামে এমন কুসংষ্কারের কানো স্থান নেই। তারপর হযরত আমর রাঃ তৎক্ষণাত ওমর রাঃ কে ঘটনা লিখে জানালেন।

ওমর রাঃ এর চিঠি

হযরত ওমর রাঃ সব জেনে আমর রাঃ এর নিকট চিঠি লিখলেন। সেখানে তিনি বললেন,

তুমি যা করেছ তা সম্পূর্ণ ঠিক আছে।

আমি তোমাকে একটি ছোট চিরকুট দিচ্ছি। এটি তুমি নীলনদে ফেলে দিবে।

হযরত আমর রাঃ যখন উক্ত চিরকুটটি খুললেন তখন তাতে লেখা দেখতে পেলেন,

আমিরুল মুমিনীনের পক্ষ থেকে মিসরবাসীদের নীলনদের নামে। হে নীল! যদি তুমি তোমার খেয়াল খুশির ন্যায় প্রবাহিত হয়ে থাক তাহলে তোমার কোনো প্রয়োজন নেই।

আর যদি তুমি পরাক্রমশালী আল্লাহর নির্দেশে প্রবাহিত হয়ে থাক তাহলে আমরা আল্লাহর নিকট আবেদন করছি যেন তিনি তোমার পানি প্রবাহিত করে দেন।

এরপর হযরত আমর বিন আস রাঃ উক্ত কাগজটি রাতের বেলা নীনদের মধ্যে ফেলে দিয়ে আসেন।

স্থানীয় লোকেরা মিসরে পানি না থাকায় মিসর ছেড়ে চলে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত হচ্ছিল।

সকালবেলা তারা দেখতে পায়, নদীতে পানি থৈ থৈ করছে। এরপর থেকে আর কখনো নীলনদের পানি শুকায়নি।

নাহাওয়ান্দের যুদ্ধ

ইরাক ও পারস্য থেকে মুসলমানদের অব্যাহত অভিযানের ফলে পারসিকরা পালিয়ে চলে গিয়েছিল। পারস্যের রাজ্যহারা সম্রাট ইয়াজদাগিরদ তখনো বেঁচে ছিল।

সে পুনরায় তারা সৈন্যদের বিভিন্ন স্থানে একত্রিত করে চূড়ান্ত হামলার চেষ্টা করে। রায়, ইসফাহান ও কিরামান অঞ্চলে সৈন্যদের দিয়ে রাজ্য পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করে।

কিন্তু প্রতিটা অভিযানই ব্যর্থ হয়। এরপর সে খোরাসানের কেন্দ্রীয় শহর মার্ভে অঞ্চলে যায়। সেখানে সে তার অনুসারী ও আস্থাভাজনদের খুঁজে পায়।

ইসলামের আলো তখনো তাতে এতটা পৌঁছে নি। তাই সে অগ্নি দেবতার নামে মুসলমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের জন্য জনগণকে উষ্কিয়ে দেয়।

সম্রাট ইয়াজদাগিরদের অনুসারীরা এই আহবান দূর-দূরান্তে পৌঁছে দেয়। চতুর্দিকে একটা সাড়া পড়ে যায়। মানুষ দলে দলে সম্রাটের নিকট আসতে থঅকে।

ইসফাহান, তাবারিস্তান, মরকান ও সিন্ধু অঞ্চল থেকে লোকেরা দলে দলে মার্ভে শহরে এসে সম্রাটের পতাকাতলে একত্র হয়।

অল্প কয়েকদিনের মধ্যেই দেড় লক্ষ সৈন্যের এক বিশাল বাহিনী তৈরি হয়ে যায়। সম্রাট ইয়াজদাগিরদ তাদের নেতৃত্বের ভার শাহজাদা মরদান শাহ বিন হরমুজকে প্রদান করেন।

এ সময় তাদের প্রধান সেনাপতির মাথায় পবিত্র পতাকা ঝুলিয়ে দেন সম্রাট। এই বিশাল পারসিক বাহিনী নিহাওয়ান্দ নামক স্থানে এসে শিবির স্থাপন করে।

আমিরুল মুমিনীন উমর রাঃ এর নিকট সংবাদ

হযরত ওমর রাঃ ইয়াজদাগিরদের এই প্রস্তুতির সংবাদ শুনে অত্যন্ত চিন্তিত হয়ে পড়লেন। তিনি পরামর্শসভার আহবান করলেন।

সাহাবারা ও অভিজ্ঞরা উক্ত মসলিসে উন্মুক্ত মতামত পেশ করছিলেন। কাদিসিয়ার যুদ্ধের সময়ের মতো, কিছু সাহাবী বলেন,

আমিরুল মুমিনিনের এই যুদ্ধে উপস্থিত থাকা উচিৎ। কিন্তু আলী রাঃ বললেন, আমিরুল মুমিনীন কেন্দ্রে অবস্থান করবেন।

তিনি প্রত্যেক রণক্ষেত্র থেকে এক তৃতীয়াংশ সৈন্য পারস্যের বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য পাঠিয়ে দিবেন। হযরত ওমর রাঃ এই মতটি গ্রহণ করেন।

এই যুদ্ধের সেনাপতি হিসেবে হযরত নোমান বিন মুকাররিন রাঃ কে নির্বাচন করেন আমিরুল মুমিনীন। নির্দেশ পাওয়ামাত্রই তিনি ত্রিশ হাজার মুজাহিদ নিয়ে নিহাওয়ান্দ অভিমুখে অগ্রসর হন।

সে সময় পারসিকদের সাহায্য ও রসদ আসতো বিভিন্ন অঞ্চল থেকে। হযরত ওমর রাঃ এর নির্দেশে সে সকল জায়গাগুলোর নিয়ন্ত্রণ মুসলমানরা নিয়ে নেন।

এতে পারসিকদের নিকট সাহায্য আসা সম্পূর্ণরূপে বন্ধ হয়ে যায়। এদিকে নোমান রাঃ তার সৈন্যদের নিয়ে কোনো সমস্যা ছাড়াই নিহাওয়ান্দে পৌঁছে যান।

মুসলিম বাহিনীতে তখন আব্দুল্লাহ বিন উমর, হযরত মুগিরা বিন শুবা, হযরত হুযাইফা, হযরত আমর বিন মাদিকারিব, হযরত জারির বিন আব্দুল্লাহ বাজালী রাঃ প্রমুখ সাহাবারা উপস্থিত ছিলেন।

হযরত মুগিরা বিন শুবা রাঃ দূত হিসেবে পারসিক বাহিনীর নিকট যান। তিনি তাদেরকে এক আল্লাহর পথে আহবান অথবা কর প্রদান অথবা যুদ্ধের আহবান জানান।

পারসিক বাহিনী যুদ্ধকেই বেছে নেয়। অবশেষে দুই বাহিনী মুখোমুখি হয়।

উভয় বাহিনীর সেনাবিন্যাস

মুসলিম সেনাপতি হযরত নোমান বিন মুকাররিন রাঃ সেনাদলের প্রত্যেক প্রথম কাতারের দায়িত্ব আপন ভাই হযরত নুয়াইম রাঃ কে প্রদান করেন।

ডান-বাম ও পদাতিক বাহিনীর দায়িত্ব হযরত হুজাইফা রাঃ ও হযরত সুআইদ রাঃ কে প্রদান করেন।

পারসিকরা এই যুদ্ধে ভিন্ন পন্থা অবলম্বন করলো। তারা প্রথমে পরিখা খনন করে সৈন্যরা তাতে অবস্থান করলো। পরিখার মধ্যে তীরন্দাজরা সহজেই আসন করে নিল।

পরিখার সামনে অংশ তারা পুরো ফাঁকা রাখলো। সেখানে তারা কাঁটা, গুল্ম বিছিয়ে রাখলো।

এ জন্য মুসলমানদের সামনে অগ্রসর হতে বেগ পেতে হলো।

পারসিকরা পরিখার মধ্য থেকে সহজেই তীর নিক্ষেপ করে মুসলমানদের গায়েল করতে পারতো।

আর যখন ই মুসলমানরা তীর নিক্ষেপ করতো তখন তারা পরিখার মধ্যে প্রবেশ করে ফেলতো।

এতে তারা নিরাপদ হয়ে যেত। কয়েকদিন পর্যন্ত যুদ্ধ এভাবেই চলতে থাকে।

অভিজ্ঞ ও বিশিষ্ট ব্যক্তিরা একত্রিত হয়ে পরামর্শে বসলেন। প্রতিটি প্রতিবন্ধকতাকে তারা সামনে রাখলেন।

কিভাবে এগুলো সমাধান করা যায়, তাতে তারা মনোনিবেশ করলেন।

কিন্তু মুসলমানরা কোনো কুল-কিনারা করতে পারছিল না। কারণ, পারসিকরা অত্যন্ত নিখুঁত যুদ্ধকৌশল অবলম্বন করছিল।

হযরত তালহা বিন খুয়াইলিদ রাঃ বলেন, আজ পর্যন্ত শত্রুরা আমাদেরকে পালিয়ে যেতে দেখে নি।

তাই আমার মত হলো, আমাদের অশ্বারোহীরা তাদের উপর একবার আক্রমণ করে পলায়ন শুরু করবে।

তখন তারা ভাববে যে, আমরা আসলেই পালাচ্ছি। এরপর তারা নিশ্চিন্তে আমাদের পিছু নিবে। তখন আমরা তাদের উপর আক্রমণ চালাবো।

হযরত নোমান রাঃ উক্ত পরামর্শ পছন্দ করলেন। তিনি অশ্বারোহীদের প্রধান হিসেবে কা’কা বিন আমর রাঃ কে এই জিম্মাদারি প্রদান করেন।

পরিখা থেকে পারসিকদের বের করা

হযরত কা’কা রাঃ অশ্বারোহীদের নিয়ে পারসিকদের পরিখার নিকটে চলে যান। এরপর তিনি সেখান থেকে প্রবলবেগে তীর নিক্ষেপ করেন।

জবাবে যখন পারসিকরা তীর চালানো শুরু করে, তখনই মুসলমানরা পলায়ন শুরু করে। পারসিকরা ভাবলো, মুসলমানরা পরাজিত হয়ে গেছে।

তাই তারা পরিখা থেকে বের হয়ে পশ্চাদ্ধবন শুরু করে। তাদের এক একজন সৈনিক সাতটি করে বর্ম পরিহিত অবস্থায় পাহাড়ের মতো সামনে অগ্রসর হতে থাকে।

পারসিকদের সেনাপতি মরদান শাহ তার সৈন্যদের আগ্রহ বাড়ানোর জন্য তাদের পেছনে পালানোর রাস্তা বন্ধ করে দেয়।

যাতে পারসিক সৈন্যরা শুত্রুদের দমন করেই কেবল ফিরে আসে। তাদের যেন পিছু হটার চিন্তাও না আসে।

হযরত কা’কা রাঃ তাদেরকে বহুদুর পর্যন্ত নিয়ে আসেন।

পারসিকরাও পেছনে পেছনে উপস্থিত হয়। যুদ্ধের ময়দানের অপরপাশে নোমান রাঃ মূল বাহিনী নিয়ে অপেক্ষা করছিলেন।

যোহর নামাজ পর্যন্ত তিনি সেখানে অপেক্ষা করেন। এরপর যোহরের নামাজের পড়ে তিনি দোয়া করলেন, হে আল্লাহ! আপনার বান্দাদের সাহায্য করুন। আর আমাকে শহীদী মৃত্যু দান করুন।

এরপর তিনি সঙ্গীদের বললেন, আমি শহীদ হয়ে গেলে হুযাইফা বিন ইয়েমেন রাঃ তোমাদের আমীর হবেন।

এটা বলে তিনি মুসলমানদের যুদ্ধের রীতি ‍অনুযায়ী তিনবার তাকবীর বলে আক্রমণ শুরু করেন।

মূল যুদ্ধ

পারসিকরা ততক্ষণে পরিখা থেকে বহুদুরে চলে এসেছিল। এখন তারা সম্মুখযুদ্ধ করতে বাধ্য হয়। সন্ধা পর্যন্ত উভয় বাহিনী লড়াইতে লিপ্ত থাকে।

উভয় বাহিনীল তরবারির আওয়াজ বহুদূর থেকে শোনা যাচ্ছিল। রক্তের স্রোত বয়ে গেল ময়দানে। ঘোড়াগুলোর পা পিছলে যেতে লাগলো।

হযরত নোমান রাঃ এর শরীরে এ সময় একটি তীর বিদ্ধ হয়। সাথে সাথে তিনি ঘোড়া থেকে পড়ে যান। তখন তিনি চিৎকার করে বলতে থাকেন,

কোনো মুসলমান যেন আমার প্রতি মনোনিবেশ না করে। আমি শহীদ হয়ে গেলে তোমরা দুঃখ করো না।

ওদিকে নোমান রাঃ এর ভাই তার হাত থেকে পতাকা তুলে নিয়ে হুযাইফা বিন ইয়ামেন রাঃ এর হাতে তুলে দেন।

যুদ্ধ আগের মতোই চলতে থাকে। রাতের বেলা পারসিকদের মনোবল ভেঙ্গে যায়। তারা পিছু হটতে শুরু করে। কিন্তু পরিখার নিকটের রাস্তা আগেই বন্ধ করে দেয়া হয়েছিল।

ফলে তারা সেখানে আহত হয়ে পড়ে যেতে থাকে। এভাবে প্রায় ১ লক্ষ পারসিক ময়দানে মৃত্যুবরণ করে।

বিজয়

হযরত নোমান বিন মুকরিন রাঃ এর প্রাণ তখন ওষ্ঠাগত। সাহাবারা তাকে বিজয়ের সংবাদ শোনান। তিনি তখন বলেন,

আল্লাহর শোকর যে তিনি আমাদের বিজয় দিয়েছেন। তোমরা ওমর রাঃ এর নিকট এই সংবাদ জানিয়ে দিবে। এরপর তিনি শহীদের মর্যাদা লাভ করেন।

হযরত কা’কা রাঃ নিহাওয়ান্দে প্রাণে বেঁচে যাওয়া পারসিকদের হামদান শহর পর্যন্ত পশ্চাদ্ধাবন করেন। এমনকি তিনি হামাদান শহর জয় করে ফিরে আসেন।

এই ঐতিহাসিক যুদ্ধ ২১ হিজরীতে সংগঠিত হয়।

হযরত ওমর রাঃ এই নাহাওয়ান্দের যুদ্ধ এর ব্যাপারে সর্বদা চিন্তামগ্ন থাকতেন। তিনি সর্বদা দোয়া করতেন আল্লাহর নিকট।

যখন তাকে বিজয়ের সংবাদ দেয়া হয় এবং নোমান রাঃ এর মুত্যুর সংবাদ দেয়া হয়,

তখন তিনি অঝোরধারায় কাঁদতে থাকেন। এরপর বার্তাবাহককে জিজ্ঞাসা করেন আর কে কে শহীদ হয়েছে? বার্তাবাহক তখন আরো কিছু ব্যক্তির নাম উল্লেখ করেন।

যাদেরকে উমর রাঃ চিনতেন না। তখন তিনি বললেন, আমি উমর যদি তাদেরকে না চিনি তা হলে এতে কি আসে যায়? আল্লাহ তাআলা তো তাদেরকে চেনেন।

তাদেরকে তিনি শাহাদাতের সম্মান প্রদান করেছেন। এক সময়ের মিথ্যা নবুয়তের দাবিদার তুলাইহা বিন খুয়াইলিদ ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন পরে। তিনি এই যুদ্ধে শহীদ হন।

এর দ্বারা বুঝা যায়, তুলাইহার পরবর্তী জীবন সৎপথে উৎসর্গ হয়েছে ও তার তওবা সত্য ছিল।

ওমর রাঃ মৃত্যু

২৩ হিজরীর শেষের দিকের কথা। হযরত ওমর রাঃ সিদ্ধান্ত নিলেন, তিনি পুরো মুসলিম ভূখন্ডে সফর করবেন। আর প্রতিটি প্রদেশে তিনি দুইমাস করে অবস্থান করবেন।

সেই বছর তিনি হজ্জ্ব পালনের জন্য মদীনা থেকে মক্কায় গমন করেন। ফেরার সময় তিনি আবতাহ উপত্যকায় অবস্থান করে আল্লাহর নিকট দোয়া করলেন,

হে আল্লাহ! আমি বৃদ্ধ হয়ে গেছি। আমার শক্তি এখন দুর্বলতার দ্বারা পরিবর্তিত হচ্ছে। আমার প্রজারা দূর দূরান্তে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে।

আমার আংশকা হয়, আপনি তাদের ব্যাপারে আমাকে জিজ্ঞাসাবাদ করবেন। আর হে আল্লাহ! আমাকে আপনার রাস্তায় শাহাদাত নসিব করুন এবং রাসূলের শহরে মৃত্যুদান করুন।

হযরত ওমর রাঃ এর খেলাফতের শেষের দিকে মুসলিম বিশ্বের সীমানা অনেক বিস্তৃত হয়েছিল। পারস্য সম্রাটের বাদশাহী তখন অতীত হয়ে গিয়েছে।

রোমানরা তখন এশিয়া থেকে পালিয়ে ইউরোপে আশ্রয় নিয়েছে। ইহুদীদেরকে আরব ভূমি থেকে বিতাড়িত করা হয়েছিল। শাম ও মিসর থেকে খৃষ্টানদের প্রভাব মুছে যাচ্ছিল।

মানুষ দলে দলে ইসলামের সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে ইসলামের ছায়াতলে আশ্রয় নিচ্ছিল। এর মধ্যেও কিছু লোক নিজের স্বার্থে বাহ্যিকভাবে কালিমা পড়ে মুসলমানদের বেশ-ভূষা ধারণ করে।

তারা বাহ্যিকভাবে মুসলমানদের মতো জীবন-যাপন করছিল। কিন্তু ভেতরে ভেতরে তারা মুসলমানদের থেকে প্রতিশোধ নেয়ার সুযোগ খুঁজছিল।

যেহেতু সে সময় সকলেই কালিমা পড়ুয়া মুসলমানের মতো জীবন-যাপন করছিল, তাই ইতিহাস সুনির্দিষ্টভাবে এই মুনাফিকদের চিহ্নিত করতে পারে নি।

ওমর রাঃ এর উপর হত্যার উদ্দেশ্যে আক্রমণ

পারস্যের সম্রাট ইয়াজদাগিরদের একজন নিকটাত্মীয় ছিল হুরমুজান। সে মুসলমানদের সাথে লড়াই করে যুদ্ধে বন্দী হয়।

এরপর তাকে ওমর রাঃ এর নিকট নিয়ে আসার পর ইসলাম গ্রহণ করে। তখন ওমর রাঃ তাকে মদীনায় থাকার জন্য জায়গা নির্ধারণ করে দেন।

লোকটি বাস্তবেই খাঁটি মনে ইসলাম গ্রহণ করেছিল নাকি, তা নিয়ে ইতিহাস আজো দ্বিধায় আছে। কিন্তু বাহ্যিক বিষয়গুলো দেখলে তার প্রতি অনেক সন্দেহের তীর ধাবিত হয়।

আবার হতে পারে, সম্রাট ইয়াজদাগিরদের সাথে তার যোগাযোগ ছিল। নাহওয়ান্দের যুদ্ধের পর ইয়াজদাগিরদ সর্বশেষ শক্তি সঞ্চয় করে মুসলমানদের উপর হামলা চালায়।

কিন্তু তখনো সে ব্যর্থ হয় এবং পলায়ন করে। পারসিক সাম্রাজ্য তখন মুসলিম সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হলো। হয়তো এ জন্য তারা জোট বেধে হারানো রাজ্য পুনরুদ্ধার করতে আগ্রহী হয়।

হযরত ওমর রাঃ হজ্ব থেকে ফিরে এসে সরকারি দায়িত্বে পূর্ণ মনোনিবেশ করেন। ইতিহাসবিদরা বর্ণনা করেন, মদীনায় তখন অগ্নিপূজক গোলাম ফিরোজ আবু লুলু বসবাস করতো।

সে ২১ হিজরীতে পারস্যের সর্বশেষ যুদ্ধক্ষেত্র অর্থাৎ নিহাওয়ান্দের যুদ্ধে বন্দী হয়েছিল। মদীনায় আনার পর হযরত মুগিরা রাঃ এর ভাগে উক্ত গোলাম পড়ে।

ব্যক্তিগতভাবে সে একজন চিত্রকর, কাঠমিস্ত্রি এবং কামার ছিল। বিভিন্ন জিনিষ তৈরিতে সে অত্যন্ত দক্ষ ছিল। ইসলামী রাষ্ট্রের সীমানা বৃদ্ধি পাওয়ার পর ওমর রাঃ অমুসলিমদের মদীনায় থাকতে দিতেন না।

পড়ুন: যেসব ফেতনা খলিফা আবু বকর রাঃ এর সময়ে আত্মপ্রকাশ করেছিল

কিন্তু তার শৈল্পিক গুণের মাধ্যমে মদীনাবাসীর উপকৃত হওয়ার বিষয়টি সামনে হযরত মুগিরা রাঃ উমর রাঃ এর নিকট সুপারিশ করলে তিনি ফিরোজকে মদীনায় থাকার অনুমতি দেন।

ফিরোজের অভিযোগ

তৎকালীন সময়ে নিয়ম ছিল, যোগ্যতাসম্পন্ন গোলমানদের দ্বারা ব্যক্তিগত সেবা নেওয়ার পরিবর্তে তাদেরকে নিজ নিজ কাজ ও পেশা গ্রহণের সুযোগ প্রদান করা।

কাজের মাধ্যমে সে যে পারিশ্রমিক লাভ করবে তার একটি অংশ মনিবকে দিবে, যাকে খারাজ বা কর বলা হয়।

হযরত মুগিরা বিন শুবা রাঃ ফিরোজের লাভ থেকে প্রতিদিন দুই দিরহাম বা ২৫০ টাকা কর বাবদ নিতেন। কেননা ফিরোজের ব্যবসা অনেক ভালো চলতো।

ফিরোজ প্রতিদিন ২৫০ করে মনিবকে দিতে অপারগতা প্রকাশ করে উমর রাঃ এর নিকট অভিযোগ করে বলে, আমার মনিব আমার থেকে বেশি পরিমাণ কর আদায় করেন।

উমর রাঃ তাকে জিজ্ঞাসা করেন, কত উসুল করেন?

সে উত্তর দেয়, প্রতিদিন ২ দিরহাম বা ২৫০ টাকা।

হযরত উমর রাঃ বলেন, তুমি কোন কোন কাজের মাধ্যমে অর্থকড়ি উপার্জন করো? সে বললো, কাঠ ও লোহার আসবাব নির্মাণ ও চিত্রকর্মের মাধ্যমে।

সব শুনে উমর রাঃ তাকে বললেন, তোমার রোজগার হিসেবে তো কর বাবদ টাকা ঠিকই আছে।

এতে তো কোনো বেশি পরিমাণ আদায় করা হচ্ছে না।

ফিরোজ তখন এই বলে চলে যায় যে, তার ইনসাফের পাল্লা আমি ছাড়া সবার জন্যই অবারিত।

তা সত্ত্বেও ওমর রাঃ ভাবলেন যে, একজন বিচারপ্রার্থীকে নিরাশ করা ঠিক হবে না।

তাই তিনি হযরত মুগিরা রাঃ এর নিকট কর কমিয়ে দেয়ার জন্য সুপারিশ করার কথা চিন্তা করলেন।

কয়েকদিন পর ফিরোজকে কোথাও যেতে দেখে তার মনস্তুষ্টির জন্য উমর রাঃ বললেন,

শুনলাম তুমি নাকি ভালো ধরনের চাক্কি বানাতে পার, আমাকে কি একটি বানিয়ে দিবে?

সে তখন আশ্চর্য ভঙ্গিতে বললো, আমি এমন চাক্কি বানাবো পূর্ব এবং পশ্চিমে বসবাসকারী সকলেই তা দেখতে পারবে।

হযরত উমর রাঃ তার কথাবার্তায় প্রতিশোধের গন্ধ পাচ্ছিলেন। সাথি-সঙ্গীদের তিনি বললেন,

এই গোলাম তো আমাকে হুমকি দিয়ে গেল। তা সত্ত্বেও তিনি তাকে গ্রেপ্তার করেন নি।

হযরত ওমর রাঃ এর মৃত্যুর ঘটনা

২৭ জিলহজ্জ বুধবার আমিরুল মুমিনীন রীতিমতো ফজরের নামাজ পড়ানোর জন্য মেহরাবে উপস্থিত হন।

যখনই তিনি তাকবীরে তাহরীমা বলেন, তখন লুকিয়ে থাকা ফিরোজ বেরিয়ে আসে। সে উমর রাঃ এর পিঠে খঞ্জর দ্বারা পরপর ছয়টি আঘাত করে।

অসম সাহসী ও পাহাড়সম হিম্মতের অধিকারী উমর রাঃ কোনোরূপ টু-শব্দ করেন নি।

আঘাতে তিনি মারাত্মক আহত হয়ে পড়ে যান। আক্রমণটি এতটাই আকস্মিক ছিল যে, পেছনের কাতারে দাড়ানো মুসলমানরা টেরই পান নি কিছু।

যখন তারা ওমর রাঃ এর কেরাতের আওয়াজ শুনতে পেলেন না তখন পেছনের কাতারের লোকেরা তাসবিহ বলে লোকমা দিতে থাকে।

এরমধ্যেই ফিরোজ পলায়ন করে। কেউ কেউ বিষয়টি বুঝতে পেরে তাকে পাকড়াও করার চেষ্টা করেন।

কিন্তু সে তাদেরকেও খঞ্জর দ্বারা আঘাত করে।

প্রায় ১৩ জন মুসলমান রক্তাক্ত হয়ে পড়ে যান। তার খঞ্জর চালানোর দক্ষতার কথা আগে কেউ জানতো না।

আঘাত এতটাই তীব্র ছিল যে, ৯ জন মুসলমান তৎক্ষণাত সেখানে মারা যান।

গ্রেপ্তার হওয়া থেকে বাঁচার জন্য ফিরোজ নিজের গলায় খঞ্জর চালিয়ে আত্মহত্যা করে।

আমিরুল মুমিনীন আহত হয়ে মেহরাবে পড়ে ছিলেন। তার হুশ তখনো ছিল।

তিনি নামাজ পড়ানোর জন্য আব্দুর রহমান ইবনে আউফ রাঃ কে সামনে বাড়িয়ে দেন।

তিনি সংক্ষেপে দু রাকাত নামাজ পড়ান। ধারালো খঞ্জর ওমর রাঃ এর পেট ও পিঠ ছিঁড়ে ফেলেছিল।

এরপরও তার অনুভূতি নিয়ন্ত্রণে ছিল।

নামাজ শেষ হওয়ার পর তিনি জিজ্ঞাসা করেন, ইবনে আব্বাস! দেখ তো লোকটা কে ছিল?

তখন তিনি দেখে এসে বলেন, মুগিরা বিন শুবা রাঃ এর গোলাম।

ওমর রাঃ তখন বললেন, ও আচ্ছা। তাহলে সেই কারিগর!

উত্তরে বলা হলো, জি হ্যাঁ। সেই।

এরপর ওমর রাঃ বললেন, আল্লাহ তাকে ধ্বং স করুন। আমি তো তার ব্যাপারে ইনসাফের ফায়সালা করেছিলাম।

তিনি আরো বলেন, আল্লাহর শুকরিয়া যে, তিনি কালিমা পড়ুয়া কারো হাতে আমাকে মৃত্যুদান করেন নি।

ওমর রাঃ মৃত্যু এর পূর্বে শেষ অসিয়ত

ওমর রাঃ কে তখন ‍উঠিয়ে ঘরে নিয়ে যাওয়া হয়। আঘাত অত্যন্ত মারাত্মক ছিল। রক্ত কোনোক্রমেই বন্ধ হচ্ছিল না।

এ জন্য তিনি বারবার বেহুশ হয়ে যাচ্ছিলেন। তাকে খাবার হিসেবে প্রথমে নাবিজ ও দুধ দেয়া হয়। কিন্তু সবকিছু ক্ষতস্থান দিয়ে বের হয়ে যাচ্ছিল।

এটা দেখে চিকিৎসক তার জীবনের ব্যাপারে নিরাশা প্রকাশ করেন।  পুত্র আব্দুল্লাহ রাঃ তার দায়িত্বে থাকা ‍ঋণের হিসাব করেন।

দেখা যায় তার পরিমাণ ৮৬ হাজার দিরহাম অর্থাৎ ৩৪,৩১৪,০০০ টাকা প্রায়।

এগুলোর কোনটির পর কোনটি আদায় করতে হবে, তা তিনি সন্তানকে বুঝিয়ে দেন।

পরবর্তী খলিফা নির্বাচনের চিন্তা অবশ্যই তার ছিল। এ জন্য তিনি অত্যন্ত যৌক্তিক ফায়সালা করেন।

তিনি ছয়জন মহান সাহাবীর নাম উল্লেখ করেন।

হযরত উসমান, আলী, আব্দুর রহমান ইবনে আউফ, তালহা, যুবায়ের, সাদ বিন আবি ওয়াক্কাস রাঃ এর সমন্বয়ে একটি কমিটি গঠন করেন।

তিনি বলেন, আমার মৃত্যুর তিনদিনের মধ্যেই যেন উনারা নিজেদের মধ্যে পরামর্শ করে কাউকে আমির নির্বাচন করে নেন।

ওমর রাঃ তার ছেলেকে উক্ত কমিটিতে রাখেন নি। তিনি শুধু তাকে পরামর্শসভায় অংশগ্রহণের অনুমতি দিয়েছিলেন।

উমর রাঃ এর প্রবল আগ্রহ ছিল প্রিয়তম ব্যক্তিত্ব হযরত মুহাম্মাদ সা. এর পাশে দাফন হওয়ার। তাই তিনি আয়েশা রাঃ এর নিকট আবেদন করলেন।

তখন আয়েশা রাঃ তাকে বলেন, আমি জায়গাটি আমার জন্য পছন্দ রেখেছিলাম। কিন্তু আমি উমরকে প্রাধান্য দিচ্ছি।

ওমর রাঃ যখন এটা জানতে পারেন তখন তিনি বলেন, এ চেয়ে বড় কোনো তামান্না আর নেই।

ওমর রাঃ মৃত্যু

তিনদিন আহত থেকে ২৪ হিজরীর মহরম মাসের ১ তারিখে পৃথিবীর ইতিহাসের এই নজিরবিহীন শাসক মৃত্যুর ডাকে সাড়া দেন।

হযরত সুহাইব বিন রুমি রাঃ ওমর রাঃ অসুস্থ হওয়ার পর ইমামতির দায়িত্ব পালন করেন। জানাযাও তিনি পড়ান। পরবর্তী খলিফা নির্বাচন হওয়া পর্যন্ত তিনি নামাজের দায়িত্ব পালন করেন।

ইন্তিকালের পর ওমর রাঃ কে রাসূল সা. ও আবু বকর রাঃ এর পাশে সমহিত করা হয়।

হাফেজ ইবনে হাজার রহ. বলেন, ওমর রাঃ এর মৃত্যুর সময় বয়স ছিল ৫৮/৫৯ বছর।

হরমুজানের হত্যা

উসমান রাঃ খেলাফতলাভের সময়ে মুসলমানদের অবস্থা ভালো পর্যায়ে ছিল। তাই রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে উসমান রাঃ এর কোনো রকম পেরেশানিতে পড়ার কথা ছিল না।

কিন্তু তখন উসমান রাঃ কে কিছু চরম বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হয়েছিল। যার মাধ্যমে অনুমান করা যায় যে,

ইসলামের শত্রুরা তখন লুকিয়ে প্রস্তুতি নিচ্ছিল।

মদীনায় আকস্মিক আক্রমণে আমিরুল মুমিনীন হযরত উমর ইবনে খাত্তাব রাঃ এর এক অগ্নিপূজকের হাতে নিহত হওয়া সাধারণ কোনো ঘটনা ছিল না।

বড় ধরনের ভুল না হলে অবশ্যই এ ষড়যন্ত্রের রহস্য পৃথিবীবাসীর নিকট প্রকাশ হয়ে যেত।

এই হত্যা ছিল বড় ধরনের একটি ভুল।

হযরত উসমান রাঃ তখনো খেলাফতের বাইয়াত নেওয়া শেষ করতে পারেন নি, এর মধ্যেই তার নিকট হযরত উমর রাঃ এর ছেলের মামলা চলে আসে।

হযরত উমর রাঃ এর ছেলে উবাইদুল্লাহ মদীনায় অবস্থিত মুসলমান হরমুজানকে অন্যায়ভাবে হত্যা করে ফেলেন। ঘটনাটি হলো,

উবায়দুল্লাহ বিন উমর রাঃ কে তার বন্ধু হযরত আব্দুর রহমান বিন আবু বকর রাঃ বলেছেন,

হযরত উমর রাঃ কে হত্যার জন্য যেই খঞ্জর ব্যবহার করা হয়েছে, তিনি সেটি অগ্নিপূজক আবু লুলু আক্রমণের আগের দিন খঞ্জরসহ হুরমুজানের সাথে দেখেছেন।

হুরমুজান তখন ফিরোজ আবু লুলকে খঞ্জরটি দিচ্ছিল। আব্দুর রহমানকে দেখলে তারা ঘাবড়ে যায় এবং খঞ্জরটি মাটিতে পড়ে যায়।

পরদিন সেই খঞ্জর দিয়ে আবু লুলু উসমান রাঃ এর উপর আক্রমণ করেন। উবায়দুল্লাহ রাঃ যখন এই কথা জানতে পারলেন তখন উমর রাঃ এর প্রাণ ওষ্ঠাগত ছিল।

উমর রাঃ এর মৃত্যু নিশ্চিত দেখে প্রতিশোধের স্পৃহায় তিনি হুরমুজানকে হত্যা করে ফেলেন। কেননা তার জানা অনুযায়ী সেও ষড়যন্ত্র করেছিল।

কিন্তু তার নিকট এর স্বপক্ষে কোনো প্রমাণ ছিল না। এই ঘটনার পর উবায়দুল্লাহ রাঃ কে গ্রেপ্তার করে সাদ বিন আবু ওয়াক্কাস রাঃ এর বাড়িতে বন্দী করে রাখা হয়।

উসমান রাঃ এর নিকট মামলা পেশ

হযরত উমর রাঃ শাহাদাত বরণ করার পর এই মামলা উসমান রাঃ এর নিকট পেশ করা হয়। উসমান রাঃ প্রবীন সাহাবীদের নিয়ে পরামর্শে বসেন।

উবায়দুল্লাহ বিন উমর রাঃ যেহেতু প্রমাণ ছাড়া একজন কালিমা পড়া মুসলমানকে হত্যা করেছেন তাই কিসাসস্বরুপ তাকেও হত্যা করা হবে—কিছু সাহাবী এই মত পোষণ করলেন।

কিছু যদিও উবায়দুল্রাহ রাঃ এর নিকট কোনো প্রমাণ ছিল না, কিন্তু এরপরও তিনি বিশ্বাস করতেন যে, হুরমুজান এতে শরীক ছিল।

তা ছাড়া ফিরোজ উমর রাঃ কে হত্যার পর নিজে আত্মহত্যা করায় এই কাজে আর কে কে সংশ্লিষ্ট ছিল,

তা জানা চিরদিনের জন্য বন্ধ হয়ে যায়।

এদিকে যদি কিসাস হিসেবে এখন উমর রাঃ এর ছেলেকে হত্যা করা হয়, তাহলে তা মুসলমানদের জন্য খুবই পীড়াদায়ক হবে।

তখন উসমান রাঃ একটি যুগপযোগী সিদ্ধান্ত নেন। তিনি ‍উবায়দুল্লাহ রাঃ কে ভুলবশত হত্যাকারী সাব্যস্ত করে তাকে এই হত্যার দিয়াত বা ক্ষতিপূরণ আদায়ের নির্দেশ দেন।

এরপর উসমান রাঃ নিজের পক্ষ থেকে বিশাল সংখ্যক অর্থ হুরমুজানের উত্তরাধিকারদের প্রদান করেন। এতে তারাও ইনসাফ পেয়ে সন্তুষ্ট হয়ে যায়।

মুসলমানরাও এতে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেন। কোনো কোনো বর্ণনা অনুযায়ী হুরমুজানের ছেলে উসমান রাঃ এর সিদ্ধান্তের পর উবায়দুল্লাহকে ক্ষমা করে দিয়েছিলেন।

এতে মদীনাবাসীরা আনন্দে তাকে কাঁধে তুলে নিয়েছিল।

ফিকহী মূলনীতি

ফকিহগণের একটি প্রসিদ্ধ মূলনীতি হলো, দণ্ডবিধি এবং কিসাস আবশ্যককারী বিষয়গুলো সন্দেহের মাধ্যমে রহিত হয়ে যায়।

তা ছাড়া বর্তমান বিচার-ব্যবস্থাতেও এটা একটা স্বীকৃত বিষয় যে,

কেউ সন্দেহের বশবর্তী হয়ে কাউকে হত্যা করলে তার শাস্তি লঘু হয়ে যায়।

আদালতের ভাষায় এটাকে বেনিফিট অব ডাউট বলা হয়।

উপরোক্ত ঘটনায় একটা বিষয় লক্ষ্যণীয় যে, হানাফি ফুকাহায়ে কেরাম হাদীসের দলীল সামনে রেখে বলেছেন,

একজন ব্যক্তি হত্যার ক্ষেত্রে অংশীদার একাধিক ব্যক্তিকে কিসাস স্বরূপ হত্যা করা যাবে তখন,

যখন সকলেই হত্যা করার জন্য আক্রমণে অংশীদার থাকবে।

যদি কেউ হত্যা করার আক্রমণে অংশীদার না থাকে বরং এই ক্ষেত্রে শুধু সহায়তা করে থাকে তাহলে শাসক তাকে অংশীদার হিসেবে উপযোগী কোনো শাস্তি দিতে পারেন।

কিন্তু কিসাসস্বরুপ তাকে হত্যা করা যাবে না। তবে ইমাম মুহাম্মাদ রহ. এই বিষয়ে সূক্ষ্ম আলোচনা করেছেন।

তবে মদীনাবাসীদের মাযহাব ছিল যে, হত্যাকাণ্ডে সহযোগীদেরকেও হত্যা করা হবে।

এর মাধ্যমে জানা গেল যে, উবায়দুল্লাহ বিন উমর রাঃ এর হুরমুজানকে কিসাসের উপযুক্ত মনে করাটা ভিত্তিহীন ছিল না।

বরং এই সন্দেহের পেছনে একটা দলীল অবশ্যই বিদ্যমান ছিল।

গাজ্জার জন্য অনুদান

৭ অক্টোবর ২০২৩ তারিখে তুফানুল আকসা যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকেই ফিলিস্তিনের গাজ্জায় অসংখ্য মানুষ আহত ও শহীদ হয়েছে। বহু মানুষ নিজেদের ঘর-বাড়ী হারিয়েছে। এছাড়াও বর্তমানে গাজ্জার ৯৮% মানুষ অনাহারে জীবন-যাপন করছে। গাজ্জার মানুষের এই দুঃসময়ে আমরা যদি তাদের পাশে না দাঁড়াই তাহলে কে দাঁড়াবে?

আর-রিহলাহ ফাউন্ডেশন তুফানুল আকসা যুদ্ধের শুরু থেকেই ফিলিস্তিনের গাজ্জার জন্য ডোনেশন সংগ্রহ করে আসছে। এই মহান কাজে আপনিও আমাদের সাথে যুক্ত হতে পারেন।

অনুদান দিন

Scroll to Top