ভূরাজনীতি এবং ভৌগলিক বিষয়াদি নিয়ে লিখিত বই হিসেবে প্রিজনার্স অব জিওগ্রাফি বইয়ের প্রশংসা করাই যায়।
লেখক পেশায় সাংবাদিক হওয়ায় অনেক দিকেই তার অনুসন্ধানী দৃষ্টি ছিল।
তবে দৃষ্টিভঙ্গির পার্থক্যের কারণে একই জিনিষ লেখক ও পাঠকের নিকট ভিন্নতর হতে পারে।
বইটা পড়তে গিয়ে ভালো-খারাপ উভয়টাই লেগেছে। প্রথমে খারাপ লাগা দিয়েই শুরু করি।
খারাপ লাগা
বইটার ব্যাপারে বৃটিশ গোয়েন্দা সংস্থা MI6 এর সাবেক প্রধান প্রশংসা করেছেন।
একজন গোয়েন্দা প্রধান কেন প্রশংসা করবেন বৈশ্বিক বিষয়াদি নিয়ে লেখা বইয়ের ব্যাপারে, তা খানিকটা ভেবেই বের করা যায়।
লেখক বিভিন্ন স্থানে ইউরোপীয় উপনিবেশিকের সমালোচনা করেছেন। আপনার নিকট মনে হতে পারে, তাহলে তো ভালোই। আসলে এটা একটা ধোঁকা।
ইউরোপীয়দের সমালোচনা করে পাঠকের নৈকট্য পাওয়াটাই মুখ্য উদ্দেশ্য মনে হয়েছে আমার নিকট।
কেননা এটা বাদ দিলেও বিভিন্ন স্থানে ইউরোপীয় চিন্তাধারা ঘোরতর সমর্থক তিনি।
যেমন লেখক মনে করেন, পৃথিবীর যুদ্ধ-বিগ্রহ ও দেশগুলোর মধ্যে বিপর্যয়ের মূল কারণ হলো গণতন্ত্রকে গ্রহণ না করা। তিনি গণতন্ত্রের কট্টর সমর্থক।
বিভিন্ন দেশের ভৌগলিক বিষয়াদির ব্যাপারে গুরুত্ব দিতে গিয়ে তিনি উক্ত দেশগুলোর দখলদারিত্বকে সরাসরি জাস্টিফাই করেছেন।
যেমন রাশিয়ার চেচনিয়া দখল করে রাখা, চীনের তিব্বত, পূর্ব তুর্কিস্তান (জিংজিয়াং) দখল করে রাখাকে তিনি গ্রহণযোগ্য মনে করেন ভৌগলিক কারণে।
এছাড়াও তিনি ভারতকে বৃহত্তম সেক্যুলার রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে তাদের গণতন্ত্রের প্রশংসা করেন।
আফগানিস্তান, পাকিস্তান, বাংলাদেশ নিয়ে এবং ইসলাম নিয়ে তার ভালোই চুলকানি আছে।
মধ্যপ্রাচ্য এবং এর অবস্থা নিয়েও তার একপাক্ষিক দৃষ্টিভঙ্গি ফুঁটে উঠেছে। লেখক ইসরাইলের ঘোরতর সমর্থক।
পুরো মধ্যপ্রাচ্যের আলোচনায় ইসরাইলকে এনে নিরীহভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। তাদের দখলদারিত্ব নিয়ে তার কোনো সমস্যা নেই। কেননা ইসরাইল একটি গণতান্ত্রিক দেশ!
আফ্রিকা নিয়ে আলোচনা করার প্রাক্কালে প্রসিদ্ধ সমস্যাগুলো তুলে ধরেছেন ঠিকই।
তবে উপনিবেশের ফলে তাদের যতটা ক্ষতি হলো, তা নিয়ে তেমন আলোচনা নেই।
কেন ফ্রান্স আফ্রিকা থেকে স্বর্ণ চুরি করলো, এ নিয়ে লেখকের মাথাব্যাথা নেই।
আমেরিকা নিয়ে আলোচনার সময়েও লেখকের আমেরিকার ছলছাতুরি এবং ধ্বংসযজ্ঞের বিষয়গুলো তেমন আলোচনায় আসে নি।
শুধু চীন-আমেরিকা আর রাশিয়া-আমেরিকার যুদ্ধক্ষেত্রেই সমাপ্ত হয়েছেন।
ওদিকে যে মুজাহিদরা আমেরিকার ঘুম হারাম করে দিচ্ছে, সেগুলো তার নিকট বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনা। এসব আমেরিকাকে কিছুই করতে পারবে না।
লেখক বিভিন্ন স্থানেই ইউরোসেন্ট্রিক বয়ান এনেছেন। যেমন ইউরোপীয়রা প্রথম কানাডা, আমেরিকার আসার পর এখানের তারা আবিষ্কারক হয়।
অথচ এর হাজার বছর পূর্ব থেকেই যে মানুষ ছিল, জাতিগোষ্ঠী ছিল, তা নিয়ে তার তেমন মাথাব্যাথা নেই।
ভালো লাগা
এবার বইটার ভালো কিছু দিক তুলে ধরা যাক। আন্তর্জাতিক ভূরাজনীতি ও ভৌগলিক বিষয় যদি বুঝতে চান, তাহলে এটা পড়া যেতে পারে।
বিভিন্ন দেশগুলো কিভাবে ভাবে, কোন জিনিষ প্রাধান্য দেয়, খানিকটা আন্দাজ করা যাবে। তবে লেখক এখানে ইউরোপ আমেরিকাকেই বেশি গুরুত্ব দিয়ে এনেছেন।
অন্যান্য ভূখন্ড নিয়ে তেমন আলোচনা সমৃদ্ধ মনে হয় নি। বইটা লেখা ২০১৫ সালে। গত ১০ বছরে অনেক কিছুই পরিবর্তন হয়েছে। তা মাথায় রাখতে হবে।
বইটা পড়ার সময় একটি বিশ্বম্যাপ পাশে রাখলে বুঝতে সুবিধা হবে। এটির অনুবাদ ভালো লেগেছে। তাদের উল্টাপাল্টা জিনিষগুলো মাথায় রেখে বইটি পড়া যেতে পারে।
