ওহী নাজিলের ধরণ ও পদ্ধতি

ওহী নাজিলের ধরণ ও পদ্ধতি – হেরাগুহায় নবীজির উপর প্রথম ওহী নাজিল হওয়ার পর থেকে ধারাবাহিকভাবে ২৩ বছর ওহী নাযিল হয়েছে।

কুরআনের বিভিন্ন বিধি-বিধান আল্লাহ তা’আলা ওহীর মাধ্যমে নবীজিকে জানিয়ে দিয়েছেন। বিভিন্ন নীতিমালার বিধান ও সমাধানও আল্লাহ ওহীর মাধ্যমে নবীজিকে জানিয়ে দিয়েছেন।

নবীজির উপর কিভাবে এবং কি কি পর্যায়ে ওহী নাজিল হয়েছে, তার বিস্তারিত বিবরণ বিভিন্ন কিতাবে মুহাদ্দিস এবং আলেমরা উল্লেখ করেছেন।

সত্য স্বপ্ন – ওহী নাজিলের ধরণ

আমাদের মতোই একজন মানুষ ছিলেন নবীজি সাঃ। তিনি আহার করতেন, ঘুমাতেন এবং ক্লান্ত হতেন। যখন আমরা ঘুমাই,

তখন আমরা যেই স্বপ্ন দেখি তা সত্য হওয়ার সম্ভাবনা ১০% ও থাকে না। কিন্তু নবীরা স্বপ্নে যা দেখে, তা আল্লাহর পক্ষ থেকে একরকম ওহী হিসেবে সাব্যস্ত হয়।

সহীহ বুখারীর ৩ নং হাদীসে বর্ণিত রয়েছে,

আয়েশা রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর প্রতি সর্বপ্রথম যে ওহী আসে, তা ছিল ঘুমের মধ্যে সত্য স্বপ্নরূপে। যে স্বপ্নই তিনি দেখতেন তা একেবারে ভোরের আলোর ন্যায় প্রকাশ পেত। তারপর তাঁর কাছে নির্জনতা প্রিয় হয়ে পড়ে এবং তিনি হেরা’র গুহায় নির্জনে থাকতেন। আপন পরিবারের কাছে ফিরে আসা এবং কিছু খাদ্যসামগ্রী সঙ্গে নিয়ে যাওয়া এইভাবে সেখানে তিনি একাধারে বেশ কয়েক রাত ইবাদতে নিমগ্ন থাকতেন।……

অন্তরে সত্য জাগ্রত হওয়া – ওহী নাজিলের ধরণ

আল্লাহর আদেশে নবীজির অন্তরে ফেরেশতারা আল্লাহর বাণী পৌঁছে দিত। নবী কারীম সা. ইরশাদ করেছেন,

إن روح القدس نفث في روعى أنه لن تموت نفس حتى تستكمل رزقها، فاتقوا الله وأجملوا في الطلب، ولا يحملنكم استبطاء الرزق على أن تطلبوه بمعصية الله ، فإن ما عند الله لا ينال إلا بطاعته‏

‘জিবরাঈল (আঃ) ফিরিশতা আমার অন্তরে এ কথা ঢেলে দিলেন যে, কোনো ব্যক্তি ততক্ষণ পর্যন্ত মৃত্যুবরণ করবে না যতক্ষণ পর্যন্ত তার ভাগ্যে যতটুকু খাদ্যের বরাদ্দ রয়েছে, তা পুরোপুরিভাবে তা পেয়ে না যাবে। সুতরাং তোমরা আল্লাহর আনুগত্য করো এবং রুজি অন্বেষণের জন্য হালাল পন্থা অবলম্বন কর। রুজি প্রাপ্তিতে বিলম্ব হওয়ায় তোমরা আল্লাহর অসন্তোষের পথ অন্বেষণে যেন উদ্বুদ্ধ না হও। কারণ, আল্লাহর নিকট যা কিছু রয়েছে তা তাঁর আনুগত্য ছাড়া পাওয়া দুস্কর।

ফেরেশতার মানুষের আকৃতিতে আগম

কখনো কখনো নবীজির নিকট মানুষের রূপ ধরে ফেরেশতা জিবরাইল আ. আগমণ করতেন। তিনি মানুষের বেশে এসে নবীজিকে কুরআন শিক্ষা দিতেন।

কখনো কখনো সাহাবারাও ফেরেশতাদেরকে মানুষের আকৃতিতে দেখেছেন।

তিরমিজি শরীফের ২৬১০ নং হাদীসে উল্লেখ রয়েছে,

“উমার ইবনু খাত্তাব রা. বলেছেন, কোন এক সময় আমরা রাসূলুল্লাহ -এর সামনে বসে ছিলাম। এমন সময় সাদা ধবধবে জামা পরা এবং কালো কুচকুচে চুলধারী এক লোক এসে উপস্থিত। তার মধ্যে সফরের কোন চিহ্নও ছিল না এবং আমাদের মধ্যে কেউই তাকে চিনতে পারলো না। তারপর তিনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সামনে এসে তার হাটুদ্বয় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর হাটুদ্বয়ের সাথে মিলিয়ে বসলেন। অতঃপর তিনি প্রশ্ন করেন, হে মুহাম্মাদ! ঈমান কি? তিনি বললেনঃ ঈমান হলো-তুমি আল্লাহ, তার ফেরেশতাকুলে, কিতাবসমূহে, রাসূলগণে, পরকালে এবং তাকদীরের ভাল-মন্দের উপর বিশ্বাস স্থাপন কর। ………………… তারপর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তিনদিন পর আমার সাক্ষাৎ পেয়ে প্রশ্ন করেন, হে উমার! তুমি কি জানো, ঐ প্রশ্নকারী কে ছিলেন? তিনি ছিলেন জিবরীল (আঃ), তোমাদেরকে ধর্মীয় অনুশাসন শিখাতে এসেছিলেন।

ঘন্টাধ্বনির ন্যায় ওহী আসা – ওহী নাজিলের ধরণ

কখনো কখনো রাসূল সা. এর নিকট ঘন্টাধ্বনির ন্যায় আল্লাহর ওহী আসতো। এটা ছিল ওহী নাজিল হওয়ার প্রতিটি প্রকারের মধ্যে সবচেয়ে কঠিন অবস্থা।

তখন নবীজি সা. ঘেমে একাকার হয়ে যেতেন। প্রচণ্ড শীতের মৌসুমেও যদি ঘন্টাধ্বনির ন্যায় ওহী নাজিল হতো, তাহলে তিনি ঘেমে যেতেন।

তার কপাল দিয়ে দর দর করে ঘাম ঝরতো। তিনি যদি তখন উটের উপর বসে থাকতেন তাহলে ওহীর ভারে উট মাটিতে বসে পড়তো।

একবার নবীজি সা. হযরত যায়েদ বিন সাবেত রা. এর উরুর উপর মাথা দিয়ে শুয়েছিলেন। তখন সেই মুহুর্তেই এভাবে ওহী নাজিল হলো।

হযরত যায়েদ রা. এতটা ভার অনুভব করলেন যে, মনে হলো কেউ তার উরু থেতলে দিয়েছে।

ওহী নাজিলের ধরণ

ফেরেশতার আসল চেহারায় প্রত্যক্ষ অবস্থায় ওহী নাজিল

নবীজি সা. এর উপর দুইবার ফেরেশতা জিবরাইলের আসল চেহারায় ওহী নাজিল হয়েছে। এই ঘটনা আল্লাহ সূরা নাজমে উল্লেখ করেছেন।

মেরাজে আল্লাহর আদেশ লাভ

নবীজি সা. যখন আল্লাহর আরশ দর্শনলাভ করেন তখন আল্লাহ তা’আলা সরাসরি নবীজিকে কিছু আদেশ-নিষেধ দিয়েছেন।

তার মধ্যে নামাজের বিধান অন্যতম। সূরা বনী ইসরাইলের ১ নং আয়াতে আল্লাহ বলেন,

سُبۡحٰنَ الَّذِیۡۤ اَسۡرٰی بِعَبۡدِهٖ لَیۡلًا مِّنَ الۡمَسۡجِدِ الۡحَرَامِ اِلَی الۡمَسۡجِدِ الۡاَقۡصَا الَّذِیۡ بٰرَکۡنَا حَوۡلَهٗ لِنُرِیَهٗ مِنۡ اٰیٰتِنَا ؕ اِنَّهٗ هُوَ السَّمِیۡعُ الۡبَصِیۡرُ

পবিত্র মহান সেই সত্তা, যিনি তাঁর বান্দাকে এক রাতে নিয়ে গিয়েছেন আল মাসজিদুল হারাম থেকে আল মাসজিদুল আকসা পর্যন্ত, যার আশপাশে আমি বরকত দিয়েছি, যেন আমি তাকে আমার কিছু নিদর্শন দেখাতে পারি। তিনিই সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা।

সরাসরি আল্লাহর সাথে কথা বলা

বনী ইসরাইলের নবী হযরত মুসা আ. যেমন আল্লাহর সাথে কথা বলতেন তেমনি নবীজি সা. ও আল্লাহর সাথে কথা বলেছেন।

মেরাজের রাতেই তো নবীজি সরাসরি আল্লাহর সাথে কথা বলেছেন। তাছাড়া আরো বিভিন্ন সময়ে তিনি আল্লাহর সাথে সরাসরি কথা বলেছেন।

তথ্যসুত্র

আর রাহিকুল মাখতুম। পৃষ্ঠা ৭৭

আরো পড়ুন

জীবন বীমা কাকে বলে?

শিয়াদের আকীদাগত বিচ্যুতি

মদীনায় আবু বকর রা. এর হিজরত

তুলাইহা আসাদির ফেতনা

নবীজির উপর কতভাবে ওহী নাজিল হতো ?

নবীজির উপর সাত রকমভাবে ওহী নাজিল হতো।

ওহী নাজিলের সবচেয়ে কঠিন পদ্ধতি কি ছিল ?

ঘন্টাধ্বনির ন্যায় ওহী নাজিল হওয়া ছিল সবচেয়ে কঠিন পদ্ধতি

ওহী নাজিলের সবচেয়ে সহজ পদ্ধতি কি ছিল ?

ফেরেশতা জিবরাইল আ. যখন মানুষের রুপে আসতো তখন ছিল ওহী নাজিল হওয়ার সবচেয়ে সহজ পদ্ধতি

আমি একজন ইসলামিক আলোচক, লেখক। ছোটবেলায় পড়ালেখা করেছি কওমী মাদ্রাসায়। পরবর্তীতে সাইন্স বিভাগ থেকে এসএসসি পরীক্ষা দিয়ে কৃতিত্বের সাথে পাশ করি। বর্তমানে আমি ডিপ্লোমা ইন মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং এ অধ্যায়নরত। অবসরে আমি বই পড়তে পছন্দ করি। নতুন কিছু শিখতে, নতুন কিছু জানতে ভালোবাসি। আমার ইচ্ছা, ভালো মানুষ হয়ে সমাজকে সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজে বিরত রাখার চেষ্টা করা।

https://www.arhasan.com