ইমাম হত্যা আমাদের কি বার্তা দেয় – আমাদের সমাজের চারপাশে যখন আইয়ামে জাহেলিয়াতের ন্যায় নিকৃষ্ট পাপাচার ছড়িয়ে পড়ছে, তখন আমাদের নিভুনিভু ইমানের কথা মনে করিয়ে দেয় পাঁচ ওয়াক্ত নামাজে মুয়াজ্জিনের আজান।
আমরা সালাতের আহ্বানে সাড়া দিয়ে মসজিদে যাই। ইমামের পেছনে সালাত আদায় করি।
মুসলমানদের সাপ্তাহিক ঈদের দিন জুমুআর সময়ে ইমাম সাহেবের আলোচনা শুনি। যা তিনি কুরআন-সুন্নাহ মোতাবেক উপস্থাপন করেন সাধারণ মানুষদের সামনে।
ইমামরা হলেন সমাজের ধর্মীয় নেতা, আধ্যাত্মিক রাহবার। মানবজীবন পরিচালনা করার পথ বাতলে দেন তারা।
কখনো কখনো জীবনের রিস্ক নিয়ে সত্য পৌঁছে দেন আমাদের নিকট। সমাজের কত ইমাম সত্য বলার অপরাধে তাগুতের চক্ষুশূলে পরিণত হয়েছে, তার কোনো ইয়ত্তা নেই।
মুরতাদ হাসিনার শাসনামলে বহু আলিম-উলামাকে গ্রেফতার করা হতো সত্য বলার অপরাধে।
যুগে যুগে আলিমদের ত্যাগ ও নজরানার ইতিহাস রক্তাক্ষরে লিপিবদ্ধ আছে ইতিহাসগ্রন্থে।
সমাজে বিভিন্ন সময়ে নব্য চিন্তাধারা, কার্যক্রম হাজির হয়। যা কুরআন-সুন্নাহর বিরোধী। হাদীসের ভাষায় সেটিকে বলা হয় বিদআত।
নবীজি সা. বলেছেন, আমার পরে দ্বীনের নামে উদ্ভাবিত সকল কাজই বিদআত। তার কোনো ভিত্তি নেই। দ্বীন পরিপূর্ণ করে দেওয়া হয়েছে। 1
শায়েখ আবদুল আযিয আত-তারিফী হাফিঃ বলেন, ভ্রান্ত মতবাদগুলোর উদাহরণ হলো ধূলিকণার ন্যায়। কোনো পাত্রকে ধরে ঝাঁকি দিলে তলায় পড়ে থাকা ধুলোবালি ওপরে উঠে আসে। কোথাও গোলমাল লাগলে এমন ভ্রান্ত মতবাদগুলোও সেভাবে মাথা চাড়া দিয়ে ওঠে।
চাঁদপুরে গত শুক্রবারে (১১ জুলাই ২০২৫) ঘটে গেল এক মর্মান্তিক ঘটনা।
জুমুআর নামাজের পর মাওলানা আ.ন.ম. নূরুর রহমান মাদানী হাফিঃ এর ওপর বিল্লাল হোসেন নামক এক ব্যক্তি চাপাতি দিয়ে আক্রমণ করে। মারাত্মক আহত হন তিনি।
বৃদ্ধ মানুষ, আঘাতের শঙ্কা কাটিয়ে উঠতে পারেন কিনা, আল্লাহ মালূম। হঠাৎ এমন কার্যক্রমে আশপাশের লোকজনও ভড়কে যায়।
ঘাতককে আটক করা হয়। ঘাতক বলছে, উক্ত ইমাম সাহেব নাকি রাসুলের শানে উলটাপালটা কথা বলেছেন।
কি বলেছে জিজ্ঞাসা করা হলে সে বলে, ইমাম সাহেব মিলাদ পড়াকে ভ্রান্ত বলেন। আর সেদিন জুমুআর খুতবাতে নবীজিকে “ইসলামের বার্তাবাহক” বলেছেন। এরই জের ধরে সে উক্ত ইমামকে হত্যা করতে চাপাতি দিয়ে হামলা করে।
২
একটাবার কল্পনা করুন দৃশ্যটা! মিলাদ পড়া যে ভ্রান্ত, এটি আজকাল সাধারণ মুসলমানরা এমনিতেই জানে।
আর নবীজি সা. হলেন ইসলামের বার্তাবাহক, এটাও তো ঠিক আছে। এতে দোষের কি আছে? মূলত এই সকল ব্যক্তিদের একটি দেশীয় পরিভাষা আছে। নামটা হলো সুন্নি।
এরা আকীদার ক্ষেত্রে মারাত্মক উগ্র এবং তাকফিরী। কোনো দলিল ছাড়াই তারা তাকফির করে।
এদের পেছনে কাজ করে বিভিন্ন স্থানীয় ভণ্ড পীর ও বেদআতী পীর।
সুফিবাদী ইসলামকে এজন্যই ক্ষতিকর বলা হয়। ইলম ছাড়া আমল বাস্তবিক অর্থেই ক্ষতিকর।
এতে আমলটি কি ইসলামের নিয়মনীতি অনুযায়ী হচ্ছে কিনা, বোঝা যায় না।
উক্ত ঘটনার পর আজ প্রায় দুইদিন হয়ে গেল। অনলাইনে এটি নিয়ে সুন্নি গোষ্ঠীর লোকেরা বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে।
তারা উক্ত ইমামকে শাতিমে রাসূল হিসেবে সাব্যস্ত করছে। উক্ত ঘাতককে বানানো হয়েছে আশেকে রাসূল।
ভারতবর্ষের অন্যতম নবীপ্রেমী ইলমুদ্দিনের সাথে তুলনা দেওয়া হচ্ছে ঘাতককে। চিন্তা করা যায়! কোন পর্যায়ের আকীদার মিসকিন হলে এমন কাজ করে তারা।
আপনি একজন সুন্নি ব্যক্তির নিকট নিয়ে বাংলাদেশের কওমী আলিমদের নিয়ে কথা বলুন, দেখবেন সে তাদের খারেজি, ওহাবী, কাফির বলে সম্মোধন করবে।
ওহাবী ট্যাগিংটা উপমহাদেশে ছড়িয়েছে ইংরেজদের সময়। ইংরেজরা প্রোপাগান্ডা করে এই শব্দটি ছড়িয়ে দিয়েছিল ইংরেজ বিরোধীদের ক্ষেত্রে।
ফলে মূলধারার আলিমরা হয়ে গেল মূর্খ জনগণের চক্ষুশূল।
আজ তারা একজন ঈমামের রক্তে মসজিদ রঞ্জিত করেছে, আগামীকাল তারাই হিন্দুত্ববাদী ও সাম্রাজ্যবাদীদের চর হয়ে আপনার রক্তে আপনার ঘর রঞ্জিত করবে।
আপনাকে হত্যার বৈধতাও তাদের নিকট আছে। আপনি মিলাদ পড়েন না, কিয়াম করেন না, নবীজিকে নুরের তৈরি মানেন না, এর মানে আপনি কাফির-ওয়াবী-খারেজি ইত্যাদি।
সময় থাকতে আমাদের সতর্ক হতে হবে। আকীদার ক্ষেত্রে মিসকিন হলে আগামীতে বড়োই ভয়াবহ দিন অপেক্ষা করছে আমাদের জন্য।
সমাজ, রাষ্ট্রের মধ্যে দাওয়াতি কাজের ক্ষেত্রে আকীদা একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ। এটিকে পাশ কাটিয়ে দাওয়াতি কাজ চালিয়ে গেলে উক্ত দাওয়াত হবে মাথা ছাড়া শরীরের ন্যায়।
রেফারেন্স
চাঁদপুরে মসজিদে ঢুকে ইমামকে কুপিয়ে হত্যার চেষ্টা, হামলাকারী আটক
হামলাকারী পরিকল্পিতভাবে ইমামকে হত্যার উদ্দেশ্যে হামলা করে: ইমাম পরিষদ
খুতবা পছন্দ না হওয়ায় ইমামকে কুপিয়ে হত্যার চেষ্টা !
- সূরা আল-মায়িদাহ, আয়াত নং ৩ । সহীহ বুখারী, হাদীস নং ২৬৯৭ ↩︎
আল্লাহ এসব উগ্রদের থেকে হেফাজত করুন