সুফিবাদী ইসলাম ও সুবিধাবাদী ইসলাম

সুফিবাদী ইসলাম ও সুবিধাবাদী ইসলাম – ইসলামের সূচনালগ্ন থেকেই এর বিধি-বিধান সমৃদ্ধ, সমাদিত। নবীজি ﷺ বিদায় হজ্জের ভাষণে বলেছিলেন, আমি তোমাদের নিকট দুইটা জিনিস রেখে যাচ্ছি। এক কুরআন, দুই সুন্নাহ।[1] কুরআন হলো, সরাসরি ওয়াহী।

এর মধ্যে কোনো ভুলে নেই, কোনো সন্দেহ নেই। একজন মুসলমানের আল্লাহর নিকট আত্মসমর্পণের সর্বোচ্চ প্রায়োগিক দিক হলো,

নিজের জীবনকে কুরআনের রঙে রাঙানো। কুরআনের আদেশ-নিষেধ, বিধি-বিধান মান্য করা।

এই কুরআনের ব্যাখ্যাস্বরূপ হিসেবে হাদীসের আবির্ভাব। রাসূলুল্লাহ ﷺ বিভিন্ন আয়াতের ব্যাখা, আমল, বিধি-বিধান, নিয়ম-নীতিকে বিষদভাবে এই হাদীসে বর্ণনা করেছেন।

রাসূলের যুগেই হাফিজে কুরআন বহু সাহাবী ছিলেন। এজন্য কুরআনের মধ্যে নতুন করে কোনো বানোয়াট আয়াত প্রবেশ করানো সম্ভব ছিল না।

প্রথম দুই খলিফার জীবদ্দশাতেই কুরআনের গ্রন্থ আকারে লিপিবদ্ধ করে ফেলা হয়েছে।

হাফিজে কুরআনের মতো হাফিজে হাদীস রাসূলের যামানায় ছিল না। লক্ষ লক্ষ হাদীস একই ব্যক্তির জন্য মুখস্ত রাখা অসম্ভবও বটে। যেই সাহাবী যেই হাদীসটি শুনেছেন, সেটি তিনি বর্ণনা করেছেন।

রাসূলের ইন্তিকালের ১০০ বছরের মধ্যেই বেশ কিছু ফিতনা দেখা দেয়। যার মধ্যে অন্যতম একটি ছিল বানোয়াট হাদীস বর্ণনা করা।

এটি এতটা ভয়াবহ আকারে ধারণ করে যে, কোনো ব্যক্তি নিজের মালামাল বিক্রির জন্যও হাদীস বানিয়ে বলা শুরু করলো।

কোনো একটি কথার শুরুতে “আল্লাহর রাসূল ﷺ বলেছেন” বলেই মানুষকে ধোঁকা দেওয়া শুরু হলো। এই সময়ে মুহাদ্দিসীনে কেরামরা এই ভয়াবহ পরিস্থিতি থেকে উম্মাহকে রক্ষা করার জন্য বেশ কিছু মূলনীতি লিপিবদ্ধ করলেন।

পরবর্তীতে এই মূলনীতিসমূহের কষ্টিপাথরে হাদীসকে ঘষা দিয়ে গ্রহণ করা হতো অথবা বর্জন করা হতো।

হাদীস শাস্ত্রের মধ্যে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ হলো, সনদ। আর এই সনদ তখনই শক্তিশালী হয়, যদি বর্ণনাকারীদের ব্যক্তিগত জীবনের মধ্যে কোনো উল্টাপাল্টা না থাকে।

এভাবেই ইসলামের এই দুই শক্তিশালী নুসুস তথা কুরআন-হাদীস থেকেই পরবর্তীতে মাসআলা-মাসায়েল বের করেছেন ফকীহরা।

যার ফলে আধুনিক বিভিন্ন সমস্যার সমাধান কুরআন-সুন্নাহর আলোকে লিপিবদ্ধ করা হলো। এই শাস্ত্রের নাম ইলমুল ফিকহ।

কোনো একটি মাসআলা বর্ণনার সময় ৪টা মূলনীতি সামনে রাখা হয়। ১. কুরআন, ২. হাদীস, ৩, ইজমা (সমস্ত সাহাবীদের একমত পোষণ), ৪, কিয়াস (তিন মূলনীতির আলোকে ইস্তিমবাত)।

দলীলের কষ্টিপাথর

আপনার নিকট কেউ একটি ঘটনা বর্ণনা করলো। এখন এটির দুই সূরত হতে পারে। এক, এটি সত্য হবে। দুই, এটি মিথ্যা হবে। এই সত্য-মিথ্যা নির্ণয়ের জন্য একটি কাজ করতে হয়। তা হলো, দলীলের খোঁজ করা।

উক্ত ব্যক্তির নিকট হতে ঘটনাটি শুনেই প্রচার না করে আগে নিজে যাচাই-বাচাই করলেই সত্য-মিথ্যা স্পষ্ট হয়ে যায়।

ইসলামের প্রথম ৩০০ বছরের মধ্যেই দলীলের আলোকে গ্রহণ ও বর্জন করার নীতি শিক্ষা দিয়েছেন মুজতাহিদ ইমামগণ।

এর ফলে আজ আমরা নতুন কিছু শুনলেই প্রথমেই জানতে চাই, এটির দলীল কি? এটি কোন নুসুস থেকে ইস্তেমবাত করা হয়েছে? যদি এই দুটো প্রশ্নের স্পষ্ট জবাব পাওয়া যায় তাহলে তা গ্রহণ করি। অন্যথায় তা বর্জন করি।

ইসলামের সূচনালগ্ন থেকেই একটি দল ছিল, যারা মিথ্যা কথা বানিয়ে বানিয়ে বলতো। রাসূলের সময়ে এদেরকে মুনাফিক বলা হতো।

নবীজির পর ওয়াহীর ধারাবাহিকতা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ‘কে মুনাফিক আর কে মুসলিম’ এটি আর ওয়াহীর মাধ্যমে নির্ণয় করা সম্ভব নয়।

এখন বুঝে নিতে হবে মানুষের বাহ্যিক কাজকর্ম দ্বারা। পরবর্তী শতাব্দীগুলোতে বিভিন্ন ফিতনার আবির্ভাব ঘটে। এমনই একটি ফিতনা হলো সুফিবাদী ধারা।

2

সুফিদের নিকট নিজের মতামত, চিন্তাধারাসমূহ কখনো কখনো ইসলামী শরীয়াহর বিধি-বিধান, নুনুসের বর্ণনার চেয়েও বেশি প্রাধান্য পায়।

তারা আধ্যাত্মিকতার নামে এমন কিছু ইলমকে সামনে নিয়ে আসে, যা রাসূল ﷺ থেকে বর্ণিত নয়। তারা ইলমকে দুইভাগে ‘জাহেরী ইলম, বাতেনী ইলম’ নামে বিভক্ত করে ফেলে।

এর ফলে ইসলামী শরীয়াহর দলীল সমৃদ্ধ জ্ঞান তাদের নিকট হয়ে যায় সাধারণ পর্যায়ের। আর স্বপ্ন, কাশফ, ধ্যানমগ্নতার মাধ্যমে পাওয়া বুঝসমূহ হয়ে যায় গুরুত্বপূর্ণ ইলম।

সুফিবাদী ধারার প্রচলনের পরে সুফিদের বিভিন্ন কার্যকলাপে আবিভূত হয়ে মানুষ দলে দলে তাদের অনুসারী হওয়া শুরু করে।

এভাবে তাদের মাধ্যমে ইসলামের একদিকে একটি খেদমত হয়, অন্যদিকে মানুষ গোমরাহিতেও পড়ে যায়।[2]

সুফীদের কেউ কেউ প্রাচীন বৈরাগ্যবাদের সূচনাও ঘটায় ইসলামের মধ্যে।

অথচ এটি নবীজি ﷺ হাদীসে এবং আল্লাহ তা’আলা কুরআনে সুস্পষ্টভাবে নিষেধ করেছেন।

এখানে আরেকটি বিষয় স্পষ্ট করা দরকার। আল্লাহর সাথে বান্দার আধ্যাত্মিক সম্পর্ক স্থাপনের এই ধারা সুফিদের উদ্ভাবিত কোনো শক্তি নয়।

এটি নবীজির সময়কাল থেকেই ছিল। সাহাবীদের অন্তরে আল্লাহর জন্য প্রেম-ভালোবাসা ছিল, নিজেদের উৎসর্গ করার মানসিকতাও তাদের মধ্যে ছিল।

কিন্তু তাদের এই কার্যক্রম কুরআন-সুন্নাহ ব্যতিত শুধুমাত্র স্বপ্ন, কাশফ ও ধ্যানমগ্নতার মধ্যেই ছিল  না।

কুরআন-সুন্নাহর বিধি-বিধান মান্য করার মাধ্যমেই তাদের সম্পর্ক আল্লাহর সাথে জুড়ে গিয়েছে। সাহাবীদের মহান জামাআত আমাদের জন্য আদর্শ।

কুরআন-সুন্নাহর বিকৃতি

মুসলমানদের মধ্যে দুই শ্রেণীর প্রভাবশালী ব্যক্তিগণ ইসলামে বিকৃতি আনে। ১. সুফিগণ ২. উলামায়ে ছু’ গণ।

নবীজি ﷺ ইসলামের ১০টি বিষয়ে সরাসরি আদেশ করেছেন। যা দুইটি হাদীস দ্বারা প্রমাণিত।

وَعَنِ ابْنِ عُمَرَ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: بُنِيَ الْإِسْلَامُ عَلَى خَمْسٍ: شَهَادَةِ أَنْ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ وَأَنَّ مُحَمَّدًا عَبْدُهُ وَرَسُولُهُ وَإِقَامِ الصَّلَاةِ وَإِيتَاءِ الزَّكَاةِ وَالْحَجِّ وَصَوْمِ رَمَضَانَ

ইবনু ’উমার রা. হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূল ﷺ বলেছেন, পাঁচটি স্তম্ভের উপর ইসলামের ভিত্তি স্থাপিত। এ সাক্ষ্য দেয়া যে, আল্লাহ ছাড়া প্রকৃতপক্ষে কোন ইলাহ নেই ও মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর বান্দা ও রাসূল, সালাত (নামাজ) কায়েম করা, যাকাত আদায় করা, হজ্জ পালন করা এবং রমাযান মাসের সিয়াম (রোজা) পালন করা।[3]

عَنْ زَيْدِ بْنِ سَلاَّمٍ، أَنَّ أَبَا سَلاَّمٍ، حَدَّثَهُ أَنَّ الْحَارِثَ الأَشْعَرِيَّ حَدَّثَهُ أَنَّ النَّبِيَّ صلى الله عليه وسلم قَالَ……أَنَا آمُرُكُمْ بِخَمْسٍ اللَّهُ أَمَرَنِي بِهِنَّ السَّمْعُ وَالطَّاعَةُ وَالْجِهَادُ وَالْهِجْرَةُ وَالْجَمَاعَةُ

হযরত হারেস আল আশআরী রা. হতে বর্ণিত, নবীজি ﷺ ইরশাদ করেছেন,…………. আমি তোমাদেরকে পাঁচটি বিষয়ের নির্দেশ দিচ্ছি যেগুলো প্রসঙ্গে আল্লাহ তা’আলা আমাকে আদেশ করেছেন। কথা শুনবে, আনুগত্য করবে, জিহাদ করবে, হিজরত করবে এবং জামা’আতবদ্ধ হয়ে থাকবে।[4]

উপরোক্ত দ্বিতীয় হাদীসটি অনেক বড়। এটির সংক্ষিপ্ত অংশ এখানে আনা হলো। এই দুইটি হাদীস মিলিয়ে আমাদের নিকট ১০টি বিষয় রয়েছে।

যা আল্লাহ এবং নবীজির পক্ষ হতে আমাদেরকে আদেশ করা হয়েছে।

এখন আমরা বাস্তবতার সাথে এটি মেলাই। এর কয়টি আদেশ-নিষেধ পালন করা হয় আর কয়টি বর্জন করা হয়?

প্রথম পাঁচটি ফরজ স্তম্ভ প্রায় সকলেই জানে। তা পালন করার জন্য সকলেই বলে। উক্ত বিষয়গুলো আধ্যাত্মিকতার সাথে সম্পৃক্ত প্রায়।

কিন্তু দ্বিতীয় পাঁচটি। এখানে এসেই অনেকে হোঁচট খায়। তখন তাদের মুখ বন্ধ হয়ে যায়। কলমের লেখা থেমে যায়। রক্ত ঠান্ডা হয়ে যায়। চোখের সামনে অন্ধকার দেখে।

কেননা এই পাঁচটি মান্য করা মানে নুসুসের দলীল দিয়ে জীবনকে সাজানো। নিজের জীবনকে উৎসর্গ করা কুরআনী আইন প্রতিষ্ঠার জন্য।

সুফিরা বহু আগ থেকেই ইসলামের দলীলসমৃদ্ধ জ্ঞানকে পাশ কাঁটিয়ে গিয়েছে।

জনসম্মুখে এমন এমন কাজ করেছে, যেই কাজের জন্য শাস্তির কথা বর্ণিত রয়েছে কুরআনে।

মুসলিমবিশ্বে উপনিবেশিক সময়কালে ইংরেজরা মহাসমস্যায় পড়েছিল মুসলমানদের নিয়ে।

তারা ইংরেজদের শাসনব্যবস্থাকে মেনে নেয় নি। ফলে কিছুদিন পর পরই বিভিন্ন স্থানে বিদ্রোহ দেখা দিত।

এই সময় ইংরেজরা মারেফাত কপচানো সুফিদের পেছনে অর্থ ব্যয় করা শুরু করে।

এর পাশাপাশি উসলামায়ে ছু’ তথা টাকার নিকট বিক্রি হওয়া মাওলানাদের পেছনেও দেদারসে অর্থ ঢালে।

ফলস্বরূপ মুসলিমবিশ্বে এমন কিছু ফাতওয়ার আবির্ভাব ঘটে, যা সমাজকে কয়েকভাবে বিভক্ত করে ফেলে।

এতে সবচেয়ে  বড় ক্ষতিগ্রস্থ হয় মুজাহিদরা। সুফিদের এমন প্রোপাগান্ডামূলক কাজের কারণে বহু মুসলমান জিহাদ থেকে পিছু হটে যায়। ফলস্বরূপ মুজাহিদ দলের মধ্যে ভাঙন দেখা দেয়।

2

মুসলিমবিশ্বের সকল ইতিহাস এখানে বর্ণনা করা সম্ভব নয়। গুটিকয়েক আলোচনা আনা যেতে পারে বুঝার সুবিধার্থে।

১৯১৬ এর পরবর্তী সময়ে রেশমি রুমাল আন্দোলন যখন ফাঁস হয়ে যায় তখন ইংরেজরা ভারতবর্ষ এবং আফগানিস্তানে একটি প্রোপাগান্ডা শুরু করে।

আর এই প্রোপাগান্ডার মাথা ছিল সুফিরা এবং উসলামায়ে ছু’রা।

তারা প্রচার করা শুরু করে, ইংরেজবিরোধী জিহাদ করা হারাম। তুর্কি খলিফা জার্মানীদের সাথে চুক্তি করে কাফির হয়ে গেছেন। হিন্দুস্তান দারুল ইসলাম। জিহাদের জন্য আমির শর্ত, আমির ব্যতিত জিহাদ নেই ইত্যাদি। এই সকল ফাতওয়াসমূহ ইংরেজরা নিজ দায়িত্বে টাকা-পয়সা খরচ করে ভারতবর্ষ ও আফগানিস্তানে প্রচার করে।[5]

অথচ যেই আলেম কুরআন-হাদীসের সঠিক জ্ঞান অন্তরে লালন করেন, তিনি এই কথাগুলোর অসারতা মূহুর্তেই ধরে ফেলতে পারবেন।

সুফিদের বিভিন্ন কার্যকলাপ আছে। যেগুলো সরাসরি কুফর। কিন্তু তারপরও আমরা তাদেরকে কাফির বলতে  নারাজ।

বিভিন্নভাবে হিলা করে হলেও তাদেরকে আল্লাহর ওলী হিসেবে উপস্থাপন করি। যেমন মনসুর হাল্লাজের বিখ্যাত ঘটনা।

সে যে সুষ্পষ্ট মুরতাদ, এতে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু তাকে বানানো হয়েছে আল্লাহর ওলী।

তার কাজ-কর্ম কুরআন-সুন্নাহর কোন নুনুসের আলোকে সমর্থিত, এমনটা কি কেউ দেখাতে পারবে? কখনোই সম্ভব নয়।

আলেমদের বিভিন্ন কিতাবে সুফীদের ভ্রান্ত কাজকর্ম সম্পর্কে অনেক কিছুই লিপিবদ্ধ আছে। তা দেখা যেতে পারে।

সুফীদের অনেকে মুরিদদেরকে হাশীশ নামক মাদকদ্রব্য পান করিয়ে মাথা নষ্ট করতো। এটিকেই সে নিজের কাশফ হিসেবে সাব্যস্ত করতো।

অথচ মদপানের শাস্তি শরীয়াহর মধ্যে কি, তা নিশ্চয়ই ব্যাখ্যা করা লাগবে না।

আলেমদের শরীয়াহ ফোবিয়া

আলেমরা হলেন উম্মাহর মাথার তাজ। কুরআন-সুন্নাহ নিয়ে তারা অধিক গবেষণা করেন। ফিকহের উসূলসমূহ তারা ভালো জানেন।

বিগত ১৩০০ বছরে আলেমদের দেখা যেত, আত্মমর্যাদাসম্পূর্ণ ব্যক্তি হিসেবে। তারা কখনো বাতিলের সামনে মাথা নত করতেন না। উম্মাহর বৃহত্তর স্বার্থে নিজেরা অনেক পদ-পদবী বিসর্জন দিয়েছেন।

যুগে যুগে বহু শাসক আলেমদেরকে কিনে নিতে চেয়েছিল, কিন্তু তাদের সেই আশা পূরণ হয় নি। ফলস্বরূপ নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছেন আলেমগণ।

আবু হানিফা রহ. থেকে নিয়ে তাকিউদ্দিন ইবনে তাইমিয়া, শাফেয়ী রহ. থেকে নিয়ে ইবনে হাজার আসকালানী, মালেক রহ. থেকে নিয়ে সালেহ আল মুনাজ্জিদ, আহমাদ ইবনে হাম্বল রহ. থেকে নিয়ে মাহমুদুল হাসান দেওবন্দী, সকলেই সমকালীন শাসক ও তাগুতদের রোষাণলের শিকার হয়েছিলেন।

অথচ তাদের সামনে ‍সুযোগ ছিল শঙ্কাহীন লাইফস্টাইল গ্রহণ করা, আনন্দ-ফূর্তি করে জীবনকে উপভোগ করা। কিন্তু তারা দুনিয়াকে বিসর্জন দিয়ে আল্লাহর রজ্জুকে আঁকড়ে ধরেছিলেন।

বিগত ১০০ বছরে আলেমদের ক্ষুদ্র অথচ প্রভাবশালী একটি অংশের মধ্যে চিন্তাধারার পরিবর্তন এসেছে।

তারা নুনুসের দলীলসমৃদ্ধ আলোচনা, সালাফে সালেহীনদের কর্মপদ্ধতি বাদ দিয়ে নিজেদের মনগড়া মতামত প্রদান করে জনগণ এবং তালিবুল ইলমদের বিভ্রান্ত করছে।

তাদের কথাগুলো হাদীসের শায বর্ণনা থেকেও জঘন্যতর হয়ে যাচ্ছে। দলীয় মাসলাকের ফাঁদে পড়ে এমন কথাবার্তা বলছেন, যা হতাশাজনক।

দুঃখজনক বিষয় হলো, এই প্রভাবশালী আলেমদের বিরুদ্ধে কথা বলাকে অপরাধ হিসেবে দেখা হয়। “তুমি ধ্বংস হয়ে যাবে” এমন একটি চিন্তা খুবই সুক্ষ্মভাবে তাদের মর্যাদার সাথে জড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।

অথচ কুরআন-সুন্নাহর বাণী সঠিকভাবে প্রচার না করলে যে আমরা ধ্বংস হয়ে যাবো, এটি এড়িয়ে যাওয়া হচ্ছে।

ইংরেজদের ভারতবর্ষ থেকে চলে যাওয়ার পর ভারত-পাকিস্তানে কংগ্রেস, মুসলিম লীগসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় আসে।

এই সকল দলের প্রধান মাথাগুলো ছিল বিলেত থেকে পড়াশোনা করে আসা ইংরেজদের চিন্তাধারায় আকৃষ্ট ব্যক্তিবর্গরা।

ফলস্বরূপ তারা ইসলামের মৌলিক বিধি-বিধান, শরীয়াহ শাসনকে শুধুমাত্র জনগণের সমর্থনলাভের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার শুরু করে।

একটা সময় পাকিস্তানে  ‘কারারদাদে মাকাসেদ’ আইন পাশ করিয়ে পাকিস্তানকে ইসলাম রাষ্ট্র হিসেবে ঘোষণা দেওয়ার ব্যর্থ চেষ্টাও করা হয়। কিন্তু বাস্তবে এসব ছিল স্রেফ বুলি।

2

এই সময়গুলোতে আলেমদের ক্ষুদ্র প্রভাবশালী অংশটি ইসলামের দ্বিতীয় ৫টি ফরজ নির্দেশনাকে পাশ কাঁটিয়ে তন্ত্রমন্ত্র আওড়ানো এবং তন্ত্রমন্ত্রকেই এই যমীনে ইসলাম প্রতিষ্ঠার মাধ্যম হিসেবে গ্রহণ করেন। এটির মূল গোঁড়া ছিল সেই সুফিবাদ।

আলেমদের ক্ষুদ্র প্রভাবশালী গোষ্ঠীদের দিকে ভালোভাবে নজর করলে দেখা যায়, তারাও কুরআন-সুন্নাহর কষ্টিপাথরে নব্য উত্থাপিত কাজকর্মগুলো না ঘষে, নিজেদের বুঝ, কাশফ, ইলহাম, ইলকাকে মূল হিসেবে গ্রহণ করে নিয়েছেন।

তাই কেউ ইসলামের বিজয় চায় শুধুমাত্র ভালোবাসার মাধ্যমে, কেউ বা বলেন, জিহাদের মাধ্যমে কখনোই ইসলাম প্রচার হয় নি।

কেউ আরো আগ বাড়িয়ে শরয়ী শাসনব্যবস্থাকে জঙ্গীবাদ ও উগ্রবাদের সাথে তুলনা করেন। এই সকল কিছুই হলো নব্য জাহিলিয়্যাহ।

ইসলামকে যতদিন পর্যন্ত কুরআন-সুন্নাহর দলীলের আলোকে বুঝা থেকে বিরত থাকা হবে, সালাফদের কর্মপদ্ধতি গ্রহণ করা থেকে বিরত থাকা হবে ততদিন জাহিলিয়্যাহ নতুন নতুন রূপে আমাদের মাঝে হাজির হবে। আমরাও বারবার ধোঁকা খেতে খেতে মৃত্যুর সাথে আলিঙ্গন করবো।


[1] সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদীস নং ৩০৭৪

[2] উপমহাদেশ, আফ্রিকা, তুর্কিসহ বিশ্বের বহু স্থানে সুফীদের মাধ্যমে ইসলামের প্রচার-প্রসার হয়। এটি অস্বীকার করার উপায় নেই। কিন্তু শুধু এই একটি কারণেই সুফীদের অন্য বিভ্রান্তিগুলো বাতিল হয়ে যায় না। সুফিরা ইসলাম প্রচার করেছেন, কিন্তু এরপর আলেমরা এই ভূমিগুলোতে ইসলামের বৃক্ষে পানি ঢেলে ইসলামকে জীবন্ত করে তুলেছেন। আলেমরা মানুষকে ইসলামের বিধি-বিধান শিক্ষা দিয়েছেন, কুরআন শিক্ষা দিয়েছেন।

[3] সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৮

[4] জামে তিরমিজী, হাদীস নং ২৮৬৩, হাদীসের মান সহীহ। ইমাম তিরমিজী রহ. এর মতে, এটি হাসান সহীহ গরীব। মুসনাদে আহমাদ ইবনে হাম্বল রহ., হাদীস নং ১৭১৮৪

[5] আফগানিস্তানের ইতিহাস, খন্ড ২, পৃষ্ঠা ১৬৫-১৬৬

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top