ইসলামি রাষ্ট্রব্যবস্থার ভিত্তি

ইসলামি রাষ্ট্রব্যবস্থার ভিত্তি – আল্লাহর নিকট একমাত্র মনোনীত দ্বীন হলো ইসলাম। আর শাসনব্যবস্থা চলবে আল্লাহর আদেশে এবং নবীজি ﷺ এর অনুসরণে, অনুকরণে।

মক্কায় ১৩ বছর আল্লাহর রাসুল মুহাম্মাদ ﷺ দাওয়াতের মাধ্যমে ইসলামকে ছড়িয়ে দিয়েছেন। ১০ বছর মদিনায় থাকাকালীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেছেন।

যে-ই রাষ্ট্র ছিল পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর এবং ন্যায়ের উপর প্রতিষ্ঠিত রাষ্ট্র। আল্লাহ সরাসরি আয়াত নাজিল করে বিভিন্ন সময়ে রাষ্ট্রের নীতিমালা ঠিক করে দিয়েছেন।

নবীজি ﷺ এর মৃত্যুর পর সাহাবায়ে কেরাম নবিজির বাতলে দেওয়া পথের উপর প্রতিষ্ঠিত ছিলেন। তারাও সেভাবেই রাষ্ট্রপরিচালনা করেছেন, যেভাবে নবীজি দেখিয়ে দিয়েছেন। ইতিহাসের পাতায় যা ‘খোলাফায়ে রাশেদা’ নামে পরিচিত।

ইসলামী শরীয়াহ বাস্তবায়ন প্রত্যেক মুসলমানের হৃদয়ের সুপ্ত বাসনা। শরীয়াহ বাস্তবায়নের ফলে দেশের সমস্ত অরাজকতা, খুন-গুম, রাহাজানি, চুরি-ডাকাতি, টাকা পাচার, আদর্শিক অপ্রচারের পথ বন্ধ হয়ে যায়।

আল্লাহর জমিনে আল্লাহর দ্বীন প্রতিষ্ঠাই হবে মুসলমানদের একমাত্র লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য। ইসলামি রাষ্ট্রব্যবস্থার ভিত্তি হলো ৬টি।

যথা- রাষ্ট্রপ্রধান, শাসন-ব্যবস্থাপনা, রাষ্ট্রীয় আইনকানুন, স্বয়ংসম্পূর্ণ বিচার ব্যবস্থা, শক্তিশালী সেনাবাহিনী, ‘হাসবা’ অর্থাৎ একদল ন্যায়নিষ্ঠ যুবক।

প্রতিটি বিষয় নিয়ে বিস্তারিত আলোচনার দাবি রাখে।

রাষ্ট্রপ্রধান

ইসলামী রাষ্ট্রপ্রধানকে বেশ কয়েকটি নামে ডাকা হয়। যেমন খলিফা, ইমাম, আমিরুল মুমিনীন, সুলতান ইত্যাদি।

খলিফা বা ইসলামী রাষ্ট্রপ্রধান নির্বাচনের বেশ কিছু পদ্ধতি রয়েছে। যা ইসলামে অনুমোদিত।

এর বাহিরে কোনো পন্থায় খলিফা নির্বাচিত হলে তা কখনোই ইসলাম অনুমোদন করে না। ইসলামী রাষ্ট্রে খলিফা তিনভাবে নির্বাচিত হয়।

এক, পূর্ববর্তী খলিফা পরবর্তী খলিফা নির্বাচন করে দেবে। যেমনটা আবু বকর রা. উমার রা. কে নির্বাচন করে দিয়েছিলেন।

দুই, পূর্ববর্তী খলিফা মৃত্যুর পূর্বে শূরা বা কোনো দল গঠন করে যাবে। তারা পরস্পর আলোচনা করে একজনকে খলিফা হিসেবে নিযুক্ত করবে। যেমনটা উমার রা. মৃত্যুর পূর্বে ছয় সদস্য বিশিষ্ট শূরা গঠন করে দিয়েছিলেন।

তিন, আহলুল হাল্লি ওয়াল আকদের মাধ্যমে খলিফা নির্বাচন করা হবে। যেমনটা আলী রা.-এর সময়, আবু বকর রা.-এর সময় খলিফা নির্বাচন করা হয়েছিল।

এই বিষয়ে ইমাম নববী রহ. বলেন,

وَأَجْمَعُوا عَلَى انْعِقَادِ الْخِلَافَةِ بِالِاسْتِخْلَافِ وَعَلَى انْعِقَادِهَا بِعَقْدِ أَهْلِ الْحَلِّ وَالْعَقْدِ لِإِنْسَانٍ إِذَا لَمْ يَسْتَخْلِفِ الْخَلِيفَةُ وَأَجْمَعُوا عَلَى جَوَازِ جَعْلِ الْخَلِيفَةِ الْأَمْرَ شُورَى بَيْنَ جَمَاعَةٍ كَمَا فَعَلَ عُمَرُ بِالسِّتَّةِ

এ ব্যাপারে আলিমগণের ইজমা রয়েছে যে, স্থলাভিষিক্ত নিযুক্ত করার দ্বারা খিলাফাহ সম্পন্ন হয়। আর খলিফা যদি কাউকে নিজের স্থলাভিষিক্ত করে না যান, তাহলে আহলুল হাল্লি ওয়াল আকদ কর্তৃক কোনো ব্যক্তিকে নির্বাচনের দ্বারাও তা সম্পন্ন হয়। এবং তারা আরও ইজমা করেছেন যে, পূর্ববর্তী খলিফার জন্য পরবর্তী খলিফা নির্বাচনের গুরুদায়িত্ব কোনো জামাআতের মধ্যে পরামর্শের বিষয় হিসেবে রেখে যাওয়াও জায়েজ; যেভাবে উমর রা. ছয় সদস্যের পরামর্শ পরিষদ গঠন করে রেখে গিয়েছিলেন।[1]

খলিফা নির্বাচন করলেই তো হবে না। তার কিছু গুণাবলির প্রয়োজন। যেগুলো ফিকহের কিতাবাদিতে উল্লেখ রয়েছে।

যথা- মুসলিম হওয়া, প্রাপ্তবয়স্ক হওয়া, সুস্থ বিবেকসম্পন্ন হওয়া, স্বাধীন হওয়া, পুরুষ হওয়া, ন্যায়পরায়ণ হওয়া, কুরাইশ বংশের হওয়া (তবে একান্ত কুরাইশ বংশের যোগ্য কাউকে না পাওয়া গেলে অন্য কেউও খলিফা হতে পারবে), লোভী প্রার্থী বা ক্ষমতালিপ্সু না হওয়া ইত্যাদি।

এ ছাড়াও আরও দুইটা গুণের কথা পাওয়া যায়। কিন্তু তাতে ইমামদের মধ্যে ইখতিলাফ রয়েছে।

তা হলো- ইজতিহাদের যোগ্য হওয়া, শারীরিক দোষত্রুটিমুক্ত হওয়া। যাতে তিনি অন্ধ, বধির, দৃষ্টিহীন, ল্যাংড়া, বোবা না হন।

এখানে একটি প্রশ্ন আসে। খলিফার বাইয়াত শুদ্ধ হওয়ার জন্য কি সকল মুসলমানের ঐকমত্য প্রয়োজন? বা দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানের ঐকমত্য প্রয়োজন?

গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় থেকে এমন চিন্তা আমাদের মাথায় অনেক সময় আসে। উত্তর হলো, না।

বরং আহলুল হাল্লি ওয়াল আকদ দ্বারা খলিফা নির্বাচিত হবে। আর আহলুল হাল্লি ওয়াল আকদ হচ্ছে আলিম-উলামা, মর্যাদাবান ও সম্ভ্রান্ত ব্যক্তিবর্গ, বিভিন্ন বাহিনীর প্রধানগণ, সমাজের নেতাগণ এবং বড়ো ব্যবসায়ীগণ।

দেশের অধিকাংশ মানুষ এই গুণাবলির হয় না। নারী, চুক্তিবদ্ধ কাফির ও দাসরা যতই মহৎ গুণের অধিকারী হোক না কেন, তারা কখনো আহলুল হাল্লি ওয়াল আকদের অন্তর্ভুক্ত হবে না।

শাসন-ব্যবস্থাপনা

খলিফার শাসনকার্য পরিচালনা করার জন্য বিভিন্ন ব্যক্তিদের সহযোগী হিসেবে দরকার হয়।

একজন খলিফার জন্য উচিত নয়, সে অযোগ্যদের নিজের চারপাশে জমা করবে, সহযোগী হিসেবে চাটুকার, ফাসিক, পাপাচারীদের নিয়োগ দেবে।

শরয়ী শাসনব্যবস্থায় শুধুমাত্র যোগ্য ব্যক্তিদের নির্বাচন করা হবে। যোগ্যতা ছাড়া অন্য কিছু ধর্তব্য নয়। স্বজনপ্রীতি চলবে না এই ক্ষেত্রে।

ক্ষেত্রবিশেষে যোগ্যতা থাকলেও আজিমত হিসেবে স্বজনদের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেওয়া থেকে বিরত থাকা উচিত।

যেমনটা হজরত উমার রা. তার যোগ্য সন্তান সাহাবী আব্দুল্লাহ ইবনে উমার রা. কে গুরুত্বপূর্ণ কোনো দায়িত্ব দেননি।

তবে দেশের প্রয়োজনে রুখসত নেওয়ার অবকাশ আছে। যেমন উসমান রা., আলী রা. নিজের ভাই এবং সন্তানদের বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দিয়েছিলেন।

এই পুরো ব্যবস্থাটিই নির্ভর করে নিয়তের উপর। এই ব্যাপারে তো বিখ্যাত হাদীস রয়েছে “সকল কাজ নিয়তের উপর নির্ভরশীল”।

নবীজি ﷺ হাদীসে ইরশাদ করেছেন,

عن يزيد بن أبي سفيان قال : قال لي أبو بكر رحمه الله حين بعثني إلى الشام : يا يزيد إن لك قرابة عسيت أن تؤثرهم بالولاية وذلك أكبر ما أخاف عليك ، فإن رسول الله – صلى الله عليه وسلم – قال : ” من ولي من أمر المسلمين شيئا فأمر عليهم أحدا محاباة  فعليه لعنة الله لا يقبل الله منه صرفا ولا عدلا حتى يدخله جهنم

হজরত ইয়াজিদ ইবনে আবু সুফিয়ান রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, যখন আবু বকর রা. আমাকে শামে প্রেরণ করলেন তখন বললেন, হে ইয়াজিদ! সেখানে তো তোমার ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিরা আছে। আর এটা খুবই সম্ভব যে, শাসনব্যবস্থায় তুমি তাদেরকে অগ্রাধিকার দেবে। আমি তোমার ব্যাপারে এটিই সবচেয়ে বেশি ভয় করি। জেনে রাখ, নবীজি ﷺ বলেছেন, যে ব্যক্তি মুসলমানদের কোনো দায়িত্ব গ্রহণ করল, এরপর পক্ষপাতিত্ব করে কাউকে আমির বানাল তাহলে তার ওপর আল্লাহর লানত। আল্লাহ তার থেকে কোনো বিনিময়, মুক্তিপণ গ্রহণ করবেন না। এমনকি তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করবেন।[2]

অন্য এক রেওয়ায়েতে আছে,

عن حسين بن قيس الرحبي عن عكرمة عن ابن عباس رضي الله عنهما قال: قال رسول الله صلى الله عليه وسلم: من استعمل رجلا من عصابة وفي تلك العصابة من هو أرضى لله منه فقد خان الله وخان رسوله وخان المؤمنين

হজরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. হতে বর্ণিত, নবীজি ﷺ ইরশাদ করেছেন, যে-ই ব্যক্তি কাউকে কোনো দলের দায়িত্বশীল নিযুক্ত করল অথচ উক্ত ব্যক্তির চেয়েও উত্তম ব্যক্তি বিদ্যমান ছিল তাহলে সে আল্লাহ ও তাঁর রাসুল এবং মুমিনদের সাথে খেয়ানত করল।[3]

হজরত উমার রা.-এর থেকেও প্রায় একই রকম কথা বর্ণিত আছে। তিনি আরও একটু বৃদ্ধি করে বলেছেন, যে ব্যক্তি পক্ষপাতিত্ব করে আত্মীয়তার কারণে বা পছন্দের কারণে কাউকে দায়িত্বশীল নিযুক্ত করল সে আল্লাহ, তার রাসুল এবং মুসলমানদের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করল।

রাষ্ট্রীয় আইনকানুন

ইসলামী রাষ্ট্রের আইনকানুন কীসের ভিত্তিতে হবে? এর উত্তর স্পষ্ট। কুরআন-সুন্নাহর আলোকে আইনকানুন গৃহীত হবে।

কোনো ব্যক্তি বা রাষ্ট্র নিজেরা আইন তৈরি করতে পারবে না। আল্লাহর আইনের বিপরীত তারা অন্য কোনো আইন জারি করতে পারবে না।

এই বিষয়ে প্রত্যেক মাজহাবের ফিকহের গ্রন্থগুলোতে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। হানাফি মাজহাবের ‘আল-হিদায়া’ গ্রন্থ ইসলামী আইনকানুন বিষয়ক গুরুত্বপূর্ণ কিতাব। এটি দেখা যেতে পারে।

স্বয়ংসম্পূর্ণ বিচার ব্যবস্থা

শরীয়াহ শাসনের গুরুত্বপূর্ণ একটি স্তম্ভ হলো বিচার ব্যবস্থা। এটি যদি কাঠামোগত দিক থেকে উন্নত থাকে তাহলে সমাজ সংশোধিত হয়ে যায়।

বিচারকরা যখন আল্লাহ ব্যতীত কাউকে ভয় করা ছেড়ে দেয় তখন লোভ-লালসাকে তারা লাথি মেরে সরিয়ে দিতে পারেন।

নিজের সন্তানও যদি কোনো ভুল করে তাহলে তাকেও বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করানোর সৎ সাহস রাখেন তিনি।

ইসলামী রাষ্ট্রে বিচার ব্যবস্থা হয় সম্পূর্ণ স্বাধীন। এতে খলিফা বা সুলতানের  কোনো হস্তক্ষেপ থাকে না।

এই আদালতে রাজা-প্রজা, কৃষক-ব্যবসায়ী, জমিদার-শ্রমজীবী, স্বাধীন-গোলাম সকলেই সমান। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা’আলা বলেন,

یٰۤاَیُّهَا الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا كُوۡنُوۡا قَوّٰمِیۡنَ بِالۡقِسۡطِ شُهَدَآءَ لِلّٰهِ وَ لَوۡ عَلٰۤی اَنۡفُسِكُمۡ اَوِ الۡوَالِدَیۡنِ وَ الۡاَقۡرَبِیۡنَ ۚ اِنۡ یَّكُنۡ غَنِیًّا اَوۡ فَقِیۡرًا فَاللّٰهُ اَوۡلٰی بِهِمَا ۟ فَلَا تَتَّبِعُوا الۡهَوٰۤی اَنۡ تَعۡدِلُوۡا ۚ وَ اِنۡ تَلۡوٗۤا اَوۡ تُعۡرِضُوۡا فَاِنَّ اللّٰهَ كَانَ بِمَا تَعۡمَلُوۡنَ خَبِیۡرًا

হে ঈমানদারগণ! তোমরা ন্যায় বিচারের উপর দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত থাক। আল্লাহর উদ্দেশ্যে ন্যায়সঙ্গত সাক্ষ্য দাও, যদিও তা তোমাদের নিজেদের অথবা পিতা-মাতা এবং আত্মীয়-স্বজনের বিরুদ্ধে হয়। সে বিত্তবান হোক অথবা বিত্তহীনই হোক, আল্লাহ উভয়েরই যোগ্যতর অভিভাবক। সুতরাং তোমরা ন্যায়-বিচার করতে নিজের খেয়াল-খুশীর অনুগামী হয়ো না। যদি তোমরা পেঁচালো কথা বল অথবা পাশ কেটে চল তাহলে (জেনে রাখ) যে, তোমরা যা কর, আল্লাহ তার খবর রাখেন।[4]

কুরআনের অন্যত্র বলা হচ্ছে,

اِنَّ اللّٰهَ یَاۡمُرُكُمۡ اَنۡ تُؤَدُّوا الۡاَمٰنٰتِ اِلٰۤی اَهۡلِهَا ۙ وَ اِذَا حَكَمۡتُمۡ بَیۡنَ النَّاسِ اَنۡ تَحۡكُمُوۡا بِالۡعَدۡلِ ؕ اِنَّ اللّٰهَ نِعِمَّا یَعِظُكُمۡ بِهٖ ؕ اِنَّ اللّٰهَ كَانَ سَمِیۡعًۢا بَصِیۡرًا

নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদেরকে আদেশ দিচ্ছেন আমানতসমূহ তার হকদারদের কাছে পৌঁছে দিতে। আর যখন মানুষের মধ্যে ফয়সালা করবে তখন ন্যায়ভিত্তিক ফয়সালা করবে। নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদেরকে কতইনা সুন্দর উপদেশ দিচ্ছেন। নিশ্চয় আল্লাহ সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা।[5]

আল্লাহ তা’আলা এই আয়াতে সমগ্র মানুষকে উদ্দেশ্য করেছেন। সকল মানুষের মাঝে ন্যায়সংগতভাবে ফয়সালা করতে হবে।

অন্যথায় জাহান্নাম হলো কঠিন আবাসস্থল। কোনো বিচারক যদি স্বেচ্ছাচারিতা করে অথবা কাউকে ক্রোধের বশবর্তী হয়ে শাস্তি দেয় তাহলে উক্ত বিচারকের জন্যও ভয়াবহ দুঃসংবাদ রয়েছে।

বিচারকের দায়িত্ব বড়োই কঠিন। হাদীসে রয়েছে, 

حَدَّثَنَا مُحَمَّدُ بْنُ كَثِيرٍ، أَخْبَرَنَا سُفْيَانُ، عَنْ عَبْدِ الْمَلِكِ بْنِ عُمَيْرٍ، حَدَّثَنَا عَبْدُ الرَّحْمَنِ بْنُ أَبِي بَكْرَةَ، عَنْ أَبِيهِ، أَنَّهُ كَتَبَ إِلَى ابْنِهِ قَالَ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم ” لاَ يَقْضِي الْحَكَمُ بَيْنَ اثْنَيْنِ وَهُوَ غَضْبَانُ “

আবু বাকরা (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদা তিনি তার পুত্রকে লেখেন যে, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, রাগান্বিত অবস্থায় কাযী যেন কোন মামলার রায় প্রদান না করে।[6]

পূর্বেকার বড়ো বড়ো আলিম, ইমামদের অনেকেই যোগ্যতা থাকার পরও বিচারক হতে চাইতেন না। তারা আশঙ্কা করতে নিজের প্রতি এবং খলিফার ইচ্ছার প্রতি।

ইমাম আবু হানিফা রহ. বিচারকের পদ গ্রহণ না করার ফলে তাকে জেলখানায় মৃত্যুবরণ করতে হয়েছে।

ইমাম মালেক রহ. কে আটক করে রাখা হয়েছিল। হাদীসে নবীজি সা. বিচারকদের ভয়াবহতা উল্লেখ করে বলেন, 

حَدَّثَنَا نَصْرُ بْنُ عَلِيٍّ، أَخْبَرَنَا فُضَيْلُ بْنُ سُلَيْمَانَ، حَدَّثَنَا عَمْرُو بْنُ أَبِي عَمْرٍو، عَنْ سَعِيدٍ الْمَقْبُرِيِّ، عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ، أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: مَنْ وَلِيَ الْقَضَاءَ فَقَدْ ذُبِحَ بِغَيْرِ سِكِّينٍ

হযরত আবূ হুরাইরাহ রা. হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, যে ব্যক্তিকে বিচারকের পদে নিযুক্ত করা হলো, তাকে যেন ছুরি ব্যতিত যবেহ করা হলো।[7]

অনেক সময় বিচারককে বাদী-বিবাদীরা হাদিয়া তোহফা দেয়। নবীজি ﷺ কঠিনভাবে এটি নিষেধ করেছেন।

এর ফলে বিচারক ফিতরতের বশবর্তী হয়ে ভুল সিদ্ধান্ত নেবে। তার ওপর থেকে আল্লাহর রহমত উঠে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

শক্তিশালী সেনাবাহিনী

ইসলামী রাষ্ট্রে সেনাবাহিনী হলো রাষ্ট্রের মাথা। শক্তিশালী সেনাবাহিনী না থাকলে রাষ্ট্রের অবস্থা হবে মাথা ছাড়া দেহের মতো।

মুসলিমবিশ্বে যখন সেনাবাহিনী একমাত্র আল্লাহর জন্য নিজেদের উৎসর্গ করেছে তখনই বড়ো বড়ো বিজয় অর্জিত হয়েছে।

বদর থেকে ইয়ারমুক, আন্দালুসে তারিক বিন যিয়াদের বিজয়াভিযান থেকে আফ্রিকা মুসা বিন নুসাইরের বিজয়াভিযান, মোঙ্গলদের বিরুদ্ধে আইনে জালুতের যুদ্ধ থেকে মুহাম্মাদ আল ফাতিহের কন্সটান্টিনোপল বিজয়, ক্রুসেডের বিরুদ্ধে সালাহউদ্দিন আইয়ূবী সফল অভিযান থেকে তালিবানদের দুই পরাশক্তির বিরুদ্ধে সফল অভিযান, সবখানেই মুসলিম সেনাবাহিনী ছিল আল্লাহর প্রতি পরিপূর্ণ আস্থাশীল।

শরীয়াহর প্রতি বিশ্বাস স্থাপনকারী এবং শহীদ হওয়ার জন্য উদগ্রীব। ফলে আল্লাহ তাদেরকে বিজয় দান করেছেন।

মুসলিম সেনাবাহিনীর মধ্যে ৬টি বৈশিষ্ট্য থাকা অপরিহার্য।

এক, শত্রুকে সন্ত্রস্ত রাখা। দুই, শত্রুর বিরুদ্ধে সদা প্রস্তুত থাকা। তিন, দেশের নিরাপত্তা রক্ষা করা। চার, সীমানা পাহারা দেওয়া। পাঁচ, দেশের অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক স্বাধীনতা হেফাজত করা। আল্লাহর নিকটই আত্মসমর্পণ করা। ছয়, দাস ও বন্দিদের জালিম ও স্বেচ্ছাচারীদের হাত থেকে রক্ষা করা।

পবিত্র কুরআনে আল্লাহ এই সম্পর্কগুলো নিয়ে আলোচনা করেছেন। কুরআনে জিহাদের ব্যাপারে বারবার উৎসাহিত করা হয়েছে। আল্লাহ তা’আলা বলেন,

وَ مَا لَكُمۡ لَا تُقَاتِلُوۡنَ فِیۡ سَبِیۡلِ اللّٰهِ وَ الۡمُسۡتَضۡعَفِیۡنَ مِنَ الرِّجَالِ وَ النِّسَآءِ وَ الۡوِلۡدَانِ الَّذِیۡنَ یَقُوۡلُوۡنَ رَبَّنَاۤ اَخۡرِجۡنَا مِنۡ هٰذِهِ الۡقَرۡیَۃِ الظَّالِمِ اَهۡلُهَا ۚ وَ اجۡعَلۡ لَّنَا مِنۡ لَّدُنۡكَ وَلِیًّا ۚۙ وَّ اجۡعَلۡ لَّنَا مِنۡ لَّدُنۡكَ نَصِیۡرًا

তোমাদের কী হল যে, তোমরা আল্লাহর রাস্তায় লড়াই করছ না! অথচ দুর্বল পুরুষ, নারী ও শিশুরা বলছে, ‘হে আমাদের রব, আমাদেরকে বের করুন এ জনপদ থেকে যার অধিবাসীরা যালিম এবং আমাদের জন্য আপনার পক্ষ থেকে একজন অভিভাবক নির্ধারণ করুন। আর নির্ধারণ করুন আপনার পক্ষ থেকে একজন সাহায্যকারী।’[8]

وَ اَعِدُّوۡا لَهُمۡ مَّا اسۡتَطَعۡتُمۡ مِّنۡ قُوَّۃٍ وَّ مِنۡ رِّبَاطِ الۡخَیۡلِ تُرۡهِبُوۡنَ بِهٖ عَدُوَّ اللّٰهِ وَ عَدُوَّكُمۡ وَ اٰخَرِیۡنَ مِنۡ دُوۡنِهِمۡ ۚ لَا تَعۡلَمُوۡنَهُمۡ ۚ اَللّٰهُ یَعۡلَمُهُمۡ ؕ وَ مَا تُنۡفِقُوۡا مِنۡ شَیۡءٍ فِیۡ سَبِیۡلِ اللّٰهِ یُوَفَّ اِلَیۡكُمۡ وَ اَنۡتُمۡ لَا تُظۡلَمُوۡنَ

তোমরা কাফিরদের মুকাবিলা করার জন্য যথাসাধ্য শক্তি ও সদাসজ্জিত অশ্ববাহিনী প্রস্তুত রাখবে যদ্দবারা আল্লাহর শক্র ও তোমাদের শক্রদেরকে ভীত সন্ত্রস্ত করবে, এছাড়া অন্যান্যদেরকেও যাদেরকে তোমরা জাননা, কিন্তু আল্লাহ জানেন। আর তোমরা আল্লাহর পথে যা কিছু ব্যয় কর, তার প্রতিদান তোমাদেরকে পুরোপুরি প্রদান করা হবে, তোমাদের প্রতি (কম দিয়ে) অত্যাচার করা হবে না।[9]

وَ قَاتِلُوۡهُمۡ حَتّٰی لَا تَكُوۡنَ فِتۡنَۃٌ وَّ یَكُوۡنَ الدِّیۡنُ كُلُّهٗ لِلّٰهِ ۚ فَاِنِ انۡتَهَوۡا فَاِنَّ اللّٰهَ بِمَا یَعۡمَلُوۡنَ بَصِیۡرٌ

তোমরা তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালিয়ে যাও যে পর্যন্ত না ফিতনা (কুফর ও শিরক) খতম হয়ে যায় আর দ্বীন পুরোপুরিভাবে আল্লাহর জন্য হয়ে যায়। অতঃপর তারা যদি বিরত হয় তাহলে তারা (ন্যায় বা অন্যায়) যা করে আল্লাহ তার সম্যক দ্রষ্টা।[10]

اِنَّ اللّٰهَ اشۡتَرٰی مِنَ الۡمُؤۡمِنِیۡنَ اَنۡفُسَهُمۡ وَ اَمۡوَالَهُمۡ بِاَنَّ لَهُمُ الۡجَنَّۃَ ؕ یُقَاتِلُوۡنَ فِیۡ سَبِیۡلِ اللّٰهِ فَیَقۡتُلُوۡنَ وَ یُقۡتَلُوۡنَ ۟ وَعۡدًا عَلَیۡهِ حَقًّا فِی التَّوۡرٰىۃِ وَ الۡاِنۡجِیۡلِ وَ الۡقُرۡاٰنِ ؕ وَ مَنۡ اَوۡفٰی بِعَهۡدِهٖ مِنَ اللّٰهِ فَاسۡتَبۡشِرُوۡا بِبَیۡعِكُمُ الَّذِیۡ بَایَعۡتُمۡ بِهٖ ؕ وَ ذٰلِكَ هُوَ الۡفَوۡزُ الۡعَظِیۡمُ

নিশ্চয় আল্লাহ মুমিনদের থেকে তাদের জান ও মাল ক্রয় করে নিয়েছেন (এর বিনিময়ে) যে, তাদের জন্য রয়েছে জান্নাত। তারা আল্লাহর পথে লড়াই করে। অতএব তারা মারে ও মরে। তাওরাত, ইঞ্জিল ও কুরআনে এ সম্পর্কে সত্য ওয়াদা রয়েছে। আর নিজ ওয়াদা পূরণে আল্লাহর চেয়ে অধিক কে হতে পারে? সুতরাং তোমরা (আল্লাহর সংগে) যে সওদা করেছ, সে সওদার জন্য আনন্দিত হও এবং সেটাই মহাসাফল্য।[11]

হাসবা’ অর্থাৎ একদল ন্যায়নিষ্ঠ যুবক

মুসলিম রাষ্ট্রে ন্যায়নিষ্ঠ খলিফার পাশাপাশি সমাজে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ কাজ আঞ্জাম দেওয়ার জন্য যুবকদের প্রয়োজন হয়। কেননা তারা অধিক মনোবল ধরে রাখতে পারে এবং ত্যাগ স্বীকার করতে পারে। বৃদ্ধদের তুলনায় যুবকরা দায়িত্বপালনে অধিক পরিশ্রমী হয়। মানসিকভাবেও তারা প্রস্তুত থাকতে পারে।

কুরআনে বারবার সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধের প্রতি আগ্রহী করা হয়েছে। বিভিন্নভাবে বোঝানো হয়েছে এর গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা। তাই ইসলামী রাষ্ট্রে সামাজিক বিভিন্ন কাজ আঞ্জাম দেওয়ার জন্য যুবকদের একটি দলের প্রয়োজন হয়। তাদের কাজ হলো তিনটি। এক, রাষ্ট্রীয় আইনকানুন প্রয়োগে খলিফাকে সহায়তা করবে। দুই, জনগণের জন্য কল্যাণকর পদক্ষেপ গ্রহণ করবে। তিন, জনগণকে পারস্পরিক ঝগড়া-বিবাদ থেকে রক্ষা করবে। এই দলকেই ‘হাসবা’ বলা হয়। অর্থাৎ যারা সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ করে। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ বলেন,

كُنۡتُمۡ خَیۡرَ اُمَّۃٍ اُخۡرِجَتۡ لِلنَّاسِ تَاۡمُرُوۡنَ بِالۡمَعۡرُوۡفِ وَ تَنۡهَوۡنَ عَنِ الۡمُنۡكَرِ وَ تُؤۡمِنُوۡنَ بِاللّٰهِ ؕ وَ لَوۡ اٰمَنَ اَهۡلُ الۡكِتٰبِ لَكَانَ خَیۡرًا لَّهُمۡ ؕ مِنۡهُمُ الۡمُؤۡمِنُوۡنَ وَ اَكۡثَرُهُمُ الۡفٰسِقُوۡنَ

তোমরাই হলে সর্বোত্তম উম্মত,যাদেরকে মানুষের জন্য বের করা হয়েছে। তোমরা ভাল কাজের আদেশ দেবে এবং মন্দ কাজ থেকে বারণ করবে, আর আল্লাহর প্রতি ঈমান পোষণ করবে। আর যদি আহলে কিতাব ঈমান আনত, তবে অবশ্যই তা তাদের জন্য কল্যাণকর হত। তাদের কতক ঈমানদার। তাদের অধিকাংশই ফাসিক।[12]

তথ্যসূত্র

ইসলামি রাষ্ট্রব্যবস্থা, শাইখ আব্দুল হাকিম হক্কানী হাফিঃ, পৃষ্ঠা ৪২-৪৬


[1] শরহু সহিহ মুসলিম, নববি : ১২/২০৫

[2] মুসনাদে আহমাদ, হাদীস নং ৯১৭৫, পক্ষপাতিত্বের বশবর্তী হয়ে মুসলমানদের উপর কাউকে নিযুক্ত করা সম্পর্কিত অধ্যায়

[3] মুসতাদরাকে হাকেম, খন্ড ৪, পৃষ্ঠা ১০৪। হাদীসটিকে যদিও ইমাম হাকেম সনদের দিক থেকে সহীহ বলেছেন কিন্তু পরবর্তী উলামায়ে কেরাম এটিকে যয়ীফ হাদীস বলেছেন। সনদের শুরুতে থাকা হুসাইনকে ইমাম যাহাবী, ইবনে হাজার রহ. দুর্বল বলেছেন। তবে এর আরেকটি সমর্থনযোগ্য সনদ রয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। শায়েখ আলবানি রহ. তাহকিকে হাদীসটিকে যয়ীফ বলেছেন।

[4] সূরা নিসা, আয়াত ১৩৫

[5] সূরা নিসা, আয়াত ৫৮

[6] সুনানে আবু দাউদ, হাদীস নং ৩৫৮৯, হাদীসের মান সহীহ।

[7] সুনানে আবু দাউদ, হাদীস নং ৩৫৭১, হাদীসের মান সহীহ।

[8] সূরা নিসা, আয়াত ৭৫

[9] সূরা আনফাল, আয়াত ৬০

[10] সূরা আনফাল, আয়াত ৩৯

[11] সূরা তাওবা, আয়াত ১১১

[12] সূরা আলে ইমরান, আয়াত ১১০

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top