হুদাইবিয়ার দিন আবু বকর

হুদাইবিয়ার দিন আবু বকর – হযরত ইবরাহিম আ. এর সময়কাল থেকেই মানুষ অন্যতম একটি ইবাদত সর্বদা করে আসছে। তা হলো, হজ্জ বা বাইতুল্লাহ যিয়ারত।

রাসূল সা. কে কাফেররা মক্কা থেকে বের করে দিল প্রথম হিজরীতে। তিনি মদীনায় সফর করলেন। সেখানে অবস্থান করে মানুষকে দাওয়াত দিতে লাগলেন।

এরইমাঝে সংগঠিত হয়ে গেল বদর যুদ্ধ এবং ওহুদ যুদ্ধ। উভয় যুদ্ধেই কাফের মুশরিকরা শোচনীয়ভাবে পরাজয় বরণ করে। মুসলমানরা আল্লাহর মেহেরবানীতে বিজয়লাভ করে।

হুদাইবিয়ার দিন আবু বকর

স্বপ্ন থেকে শুরু

রাসূল সা. একদিন স্বপ্ন দেখলেন, তিনি সাহাবাদেরকে নিয়ে মসজিদে হারামে প্রবেশ করছেন। এরপর তিনি কা’বাঘরের চাবি গ্রহণ করে সাহবাদেরকে নিয়ে ওমরাহ পালন করেন।

নবীদের স্বপ্ন হলো একরকম ওহীর ন্যায়। তাদের নিকট আল্লাহ ফেরেশতার মাধ্যমে ওহী পাঠান। আবার স্বপ্নেও তাদেরকে দিক-নির্দেশনা দেয়া হয়।

রাসূল সা. তখন সাহাবাদেরকে এই স্বপ্নের কথা জানালেন। সকলেই খুব খুশী হলেন এবং ওমরাহ পালন করার আগ্রহ পোষণ করলেন।

ওমরাহ এর জন্য সফর

হুদাইবিয়ার দিন আবু বকর – রাসূল সা. তখন মক্কায় ওমরাহ করবেন বলে ঘোষণা করে দিলেন। অনেক সাহাবারাই ইতস্তত করছিলেন, কারণ মক্কা কাফেরদের দখলে।

ইতোমধ্যেই রাসূল সা. প্রস্তুতি নিয়ে নিলেন। মদীনার ভারপ্রাপ্ত হিসেবে আব্দুল্লাহ ইবনে উম্মে মাকতূম রা. কে নিয়োগ দেয়া হলো।

এই ঘটনা সংগঠিত হয় ৬ষ্ঠ হিজরীর ১ যিলকদ তারিখে। এই দিন তিনি মক্কা অভিমুখে যাত্রা শুরু করলেন। এই সফরে রাসূলের সাথে ছিলেন উম্মুল মুমিনীন হযরত উম্মে সালামা রা.।

রাসূলের সাথে এই সফরে লোকসংখ্যা ছিল প্রায় ১৪০০ জন। তবে ইবনে কাসীর রহ. তার বিখ্যাত গ্রন্থ আল বিদায়ায় উল্লেখ করেছেন, লোকসংখ্যা ছিল ৭০০ জন।

এই সফরে ভারী কোনো যুদ্ধাস্ত্র ছিল না মুসলমানদের সাথে। তারা অন্যান্য মুসাফিরদের ন্যায় শুধুমাত্র আত্মরক্ষার জন্য কোমরে তরবারি ছিল।

যুল হোলায়ফায়

রাসূল সা. একজন গোয়েন্দাকে আগেই পাঠিয়ে দেন পরিস্থিতি কেমন, তা জানার জন্য। যখন রাসূল যুল হোলায়ফায় আসলেন তখন তিনি কুরবানীর পশুকে সজ্জিত করলেন এবং উটে চিহ্ন দিয়ে দিলেন।

সে সময়  গোয়েন্দার মাধ্যমে খবর আসলো, মক্কার মুশরিকরা আগেই রাসূলের আগমণের খবর জেনে গেছে। তারা এই ওয়াদায় সংকল্প করেছে যে, মুহাম্মাদ সা. কে মক্কায় প্রবেশ করতে দিবে না।

পাশাপাশি তারা মক্কার আশেপাশে সৈন্য জড়ো করে রেখেছে। রাসূল সা. এই খবর শুনে উপস্থিত ব্যক্তিদের বললেন, এখন কি করা যায়?

হযরত আবু বকর রা. বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আপনি তো কা’বা যিয়ারত করতে এসেছেন। কাউকে হত্যা বা যুদ্ধের জন্য নয়। তাই আপনি এগিয়ে চলুন। যদি তারা বাধা দেয়, তাহলে আমরা লড়াইয়ের জন্য প্রস্তুত আছি।

রাসূল সা. তখন বললেন, আল্লাহর নামে এগিয়ে চলো।

কুরাইশদের বাধা

এদিকে কুরাইশরা এই খবর শুনে অগ্নিশর্মা হয়ে ওঠে। তারা প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয় যে, মুহাম্মাদ যেন মক্কায় প্রবেশ করতে না পারে। এরপর মক্কাবাসীরা নবীজির নিকট দূত পাঠায়

রাসূল সা. আগেই এই ইচ্ছা পোষণ করেছেন, যদি তারা স্বাভাবিক কোনো দাবী উত্থাপন করে তাহলে মক্কাবাসীদের সাথে অটুট সম্পর্ক রক্ষায় মেনে নেয়া হবে।

তবে আল্লাহর বিরুদ্ধে যায় বা ইসলামের বিরুদ্ধে যায়, এমন আইন মানা হবে না।

সন্ধির আলোচনা

সর্বপ্রথম কুরাইশদের দূত হিসেবে আগমণ করে বনু খুজআর সদস্য বুদাইল ইবনে ওয়ারাকা। তিনি রাসূল কেন এসেছেন, জেনে ফিরে যান।

এরপর পর্যায়ক্রমে আরো কয়েকজন আসেন। তাদের মধ্যে একজন ছিলেন উরওয়া ইবনে মাসউদ। উরওয়ার সাথে রাসূলের আলোচনা শুরু হয়।

উরওয়া তখন মুসলমানদের মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করে তোলার জন্য বলে, হে মুহাম্মাদ! এই অভদ্র (রাসূলের সাহাবারা) লোকগুলো তো তোমার সর্বনাশ করে ছাড়বে।

মনে রেখ, কুরাইশদের সকলেই যুদ্ধের পূর্ণ প্রস্তুতি নিয়ে এবং যুদ্ধের জন্য উৎকৃষ্ট বাহন নিয়ে তোমাদের জন্য অপেক্ষা করছে। তারা এই শপথ করেছে যে, তোমাকে কিছুতেই মক্কায় প্রবেশ করতে দেয়া হবে না।

আর তোমার সাথে থাকা এই গুটিকয়েক লোকেরা তো কুরাইশদের ভয়ে তোমাকে রেখে পালিয়ে যাবে। তুমি তখন নিঃসঙ্গ হয়ে পড়বে।

আবু বকর রা. উরওয়ার এই কথা শুনে নিজেকে স্থির রাখতে পারেন নি। উরওয়াকে বললেন, তুমি ‍গিয়ে তোমার প্রতিমার কাছে বসে থাক। আমরা কি রাসূলকে যুদ্ধের ময়দানে রেখে পালিয়ে যাব?

জেনে রাখো, কখনো এমন হবে না কখনই না।

উরওয়া তখন বললো, এই লোকটি কে? নবী সা. বললেন, আবু বকর।

উরওয়া বললো, সে পূর্বে আমার উপর অনুগ্রহ করেছে। তাই তাকে কিছু বললাম না।

হুদাইবিয়ার সন্ধির ব্যাপারে আবু বকরের অবস্থান

হুদাইবিয়ার দিন আবু বকর – হুদাইবিয়ার সন্ধি বাহ্যিকভাবে মনে হচ্ছিল, তা মুসলমানদের বিরুদ্ধে গ্রহণ করা হয়েছে। তাই হযরত ওমর রা. অস্থির হয়ে পড়েছিলেন।

তিনি রাসূলের নিকট গিয়ে বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আপনি কি আল্লাহর নবী নন?

তিনি বললেন, অবশ্যই আমি আল্লাহর নবী ও রাসূল।

উমর রা. এরপর বললেন, আমরা কি মুসলমান নই? রাসূল সা. বললেন, অবশ্যই তোমরা মুসলিম। তখন ওমর রা. বললেন, তাহলে কেন আমরা দীনের ব্যাপারে হীনতা অবলম্বন করবো?

তখন আল্লাহর নবী বললেন, ওমর আমি আল্লাহর নির্দেশ ব্যতিত কোনো কাজ করি না। তিনি আমাকে ধ্বংস করবেন না।

এরপর ওমর রা. আবু বকর রা. এর নিকট যান। তাকেও একইভাবে জিজ্ঞাসা করেন। মুহাম্মাদ সা. কি আল্লাহর রাসূল নন? আবু বকর রা. মূল বক্তব্য বুঝতে পেরে বললেন,

অভিযোগ না করে আনুগত্য করো। এতেই কল্যাণ রয়েছে। এরপর আবু বকর রা. বললেন, আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি, নিশ্চয় মুহাম্মাদ আল্লাহর রাসূল। তিনি আল্লাহর হুকুম মোতাবেকই কাজ করে থাকেন।

এভাবেই আবু বকর রা. হুদাইবিয়ার দিন রাসূলের পক্ষে অবস্থান করেন। পরবর্তীতে দেখা গেল, এই হুদাইবিয়াই ছিল সুস্পষ্ট বিজয়।

তথ্যসুত্র

১. আবু বকর রা. জীবনী। সোলায়মানিয়া বুক হাউজ। পৃষ্ঠা ৮১-৮৪

২. আবু বকর সিদ্দিক রা.। ড. আলী মুহাম্মাদ আস সাল্লাবী। পৃষ্ঠা ১১১-১১৪

৩. আর রাহিকুল মাখতুম। ছফিউর রহমান মোবারকপুরী। মীনা বুক হাউজ। পৃষ্ঠা ৩৩২-৩৪২

(উপরোক্ত তথ্যে আপনি এ বিষয়ে আরো বিস্তারিত জানতে পারবেন।)

বিশেষ দ্রষ্টব্য: আমাদের লেখাগুলো সূচিপত্র অনুযায়ী দেখুন www.subject.arhasan.com এই ওয়েবসাইটে।

আমরা কোন প্রকাশনীর বই রেফারেন্স হিসেবে ব্যবহার করি তা জানতে ভিজিট করুন www.arhasan.com/book এই ওয়েবসাইটে।
আমাদেরকে গুগল নিউজে ফলো করতে পারেন এই লিংক থেকে

আমি একজন ইসলামিক আলোচক, লেখক। ছোটবেলায় পড়ালেখা করেছি কওমী মাদ্রাসায়। পরবর্তীতে সাইন্স বিভাগ থেকে এসএসসি পরীক্ষা দিয়ে কৃতিত্বের সাথে পাশ করি। বর্তমানে আমি ডিপ্লোমা ইন মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং এ অধ্যায়নরত। অবসরে আমি বই পড়তে পছন্দ করি। নতুন কিছু শিখতে, নতুন কিছু জানতে ভালোবাসি। আমার ইচ্ছা, ভালো মানুষ হয়ে সমাজকে সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজে বিরত রাখার চেষ্টা করা।

https://www.arhasan.com