রোমানদের সাথে যুদ্ধ ও সাহাবাদের সাহসিকতা

রোমানদের সাথে যুদ্ধ ও আবু বকর রা. এর খেলাফতকাল – ইসলাম পরবর্তী যুগে পৃথিবীর মধ্যে সুপার পাওয়ার দেশগুলোর মধ্যে অন্যতম একটি দেশ ছিল শাম। এটি সে সময় রোমান সাম্রাজ্যের অধীনে ছিল।

বর্তমানে শামের ম্যাপের সাথে প্রাচীন শামের ম্যাপের ব্যাপক পরিবর্তন রয়েছে।

পূর্বে শাম ছিল রোমান সাম্রাজ্যের একটা বৃহত্তম প্রদেশ। সেখানে বসবাস করতো খৃষ্টানরা। পাশাপাশি সে সময় ইয়ামানেও অনেক খৃষ্টানরা বসবাস করতো।

ইসলাম যখন আস্তে আস্তে প্রাচ্যে ছড়িয়ে পড়তে লাগলো তখন রোমানরা নড়েচড়ে বসলো।

তারা ভাবতে লাগলো, যদি ইসলামকে সামনে অগ্রসর হতে বাঁধা না দেয়া হয় তাহলে অচিরেই নির্যাতিত খ্রিষ্টানরা খ্রিষ্টধর্ম ত্যাগ করবে এবং গির্জার ছলচাতুরি ফাঁস হয়ে যাবে।

তাই তারা রাসূলের যুগ থেকেই মুসলমানদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত ছিল।

রোমানদের সাথে যুদ্ধ

এক সাহাবাকে হত্যা

রাসূল রা. হুদাইবিয়ার সন্ধির পরে যখন আশেপাশের রাজা-বাদশাহদের নিকট দাওয়াতি চিঠি প্রেরণ করতে লাগলেন তখন তিনি তার সাহাবী হযরত হারিস বিন আমর রা. কে দূত হিসেবে রোমান সাম্রাজ্যের নিকট পাঠিয়েছিলেন।

হযরত আমর বিন হারিস রা. তাদেরকে ইসলামের দাওয়াত দেয়ায় তারা তেলে বেগুনে জ্বলে উঠে।

এরপর তারা ভূ-রাজনৈতিক নিয়ম ভঙ্গ করে হযরত হারিস বিন আমর রা. কে হত্যা করে। নবীজি এই খবর জানতে পেরে যুদ্ধের প্রস্তুতি গ্রহন করেন।

এই প্রস্তুতি সম্পূর্ণ হওয়ার পর মুতার যুদ্ধ শুরু হয়। মুসলমানরা এই যুদ্ধে মাত্র চার হাজার জন ছিল।

অপরদিকে রোমান বাহিনী ছিল এক লক্ষের কাছাকাছি।

এই যুদ্ধে হযরত খালিদ রা. এর সমর নীতির ফলে সহজেই মুসলমানরা বিজয় অর্জন করে।

রোমানদের বিরুদ্ধে প্রথম পদক্ষেপ

এত বিশাল ভূখণ্ডে লড়াই করার জন্য প্রয়োজন হলো শক্তি। হযরত আবু বকর রা. শামের সীমান্তে খালিদ বিন সাঈদ রা. কে নিযুক্ত করেন।

কিন্তু তিনি তাকে রোমানদের বিরুদ্ধ হুটহাট যুদ্ধ করা থেকে বিরত থাকতে বললেন। কারণ, হঠাৎ যুদ্ধে নেমে পড়লে অঘোরে মারা পড়তে হবে।

খালিদ বিন সাঈদ রা.

সে সময় খালিদ বিন সাঈদ রা. সতর্কতার সাথে একটা বাহিনী নিয়ে রোমান সেনাপতি বাহানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করেন।

হযরত খলিদ বিন সাঈদ রা. অত্যন্ত সাহসিকতার সাথে এই যুদ্ধে লড়াই করলেন।

কিন্তু তিনি বুঝতে পারলেন, আমাদের নিকট সৈন্য সংখ্য খুব কম। তাই আরো সৈন্য দরকার।

খালিদ বিন সাঈদ রা. খেলাফতের দরকারে হযরত আবু বকর রা. কে বিষয়টা জানালেন।

আবু বকর রা. তৎক্ষণাৎ নতুন বাহিনী তৈরি করেন।

নতুন বাহিনী

আবু বকর রা. স্বেচ্ছাসেবক সংগ্রহ শুরু করেন। এক পর্যায়ে ইয়ামান, তিহামা, ওমান, বাহরাইন থেকে লোক আসতে লাগলো। আব বকর রা. তাদেরকে ইকরিমা বিন আবু জাহলের নেতৃত্বে একত্র করে শামে পাঠিয়ে দেন।

কিন্তু এতেই প্রয়োজন পুর্ণ হয়ে যায় নি।

সেখানে আরো বড় বাহিনীর প্রয়োজন ছিল। যার প্রস্তুতি ও নেতৃত্বের ক্ষেত্রে প্রবীণ সাহাবায়ে কেরামই একমাত্র উপযুক্ত ছিলেন।

তাই আবু বকর রা. রাসূলের যামানা থেকে যাকাত উসূলকারী হযরত আমর ইবনে আ’স রা. কে জাকাত উত্তোলনের দায়িত্ব থেকে অব্যহতি দিয়ে তাকে যুদ্ধের ময়দানে নিয়ে আসলেন।

তার দায়িত্বে আরেকটি স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী অর্পণ করেন। তারপর তাকে ফিলিস্তিন অভিমূখে পাঠিয়ে দেয়া হয়।

এদিকে আরো একটি বাহিনী গঠন করা হয়। যার দায়িত্ব ওয়ালিদ বিন উকবা রা. কে দেয়া হয়। তাকে জর্দান অভিমুখে প্রেরণ করা হয়।

আবু বকর রা. এর অসিয়ত

এরপর আরো একটি বাহিনী গঠন করা হয়। তার দায়িত্ব প্রদান করা হয় হযরত ইয়াজিদ বিন আবু সুফিয়ান রা. কে।

তিনি ছিলেন মুয়াবিয়া রা. এর বড় ভাই। এই বাহিনীকে আবু বকর রা. গুরুত্বের সাথে বিদায় জানান।

এই বাহিনীর আমিরকে হযরত আবু বকর রা. বলেন, আমি তোমাকে নেতৃত্ব প্রদান করেছি, যাতে তুমি নিজের যোগ্যতার বহিঃপ্রকাশ ঘটাতে পার।

যদি তুমি সাফল্য অর্জনে ব্যর্থ হও তাহলে তোমাকে পদচ্যুত করা হবে। আর তোমাকে আল্লাহর প্রতি ভয়ের ব্যাপারে অসিয়ত করছি।

যখন তোমার নিকট শত্রুপক্ষের দূত আসবে, তখন তার সাথে বেশিক্ষণ অবস্থান করবে না।

তার নিকট কোনো গোপন কথা প্রকাশ করবে না এবং এমন কোনো কাজ করবে না, যার দ্বারা সে তোমাদের গোপন রহস্য বুঝে ফেলে।

প্রথম পরাজয় ও উত্থান

খালিদ বিন সাঈদ রা. সীমান্তে সাহায্যের জন্য অপেক্ষা করছিলেন।

যখনই তিনি মুসলিম বাহিনীর আগমণের সংবাদ জানতে পারলেন তখন তিনি শামের সীমান্তে পদক্ষেপ নেয়া শুরু করলেন। তিনি ফিলিস্তিনের মারজুস সুফফার নামক স্থানে পৌঁছেন।

এখানে রোমানদের এক বাহিনী প্রস্তুত ছিল। রোমানরা খালিদ বিন সাঈদ রা. এর বাহিনীর উপর আক্রমণ করে।

এই আক্রমণে খালিদ বিন সাঈদ রা. পরাজয় বরণ করেন। তার ছেলে ও আরো অনেক মুজহিদ নিহত হয়।

এরপর তিনি মদীনায় চলে আসেন। আবু বকর রা. তাকে মদিনায় রেখে শুরাহবিল বিন হাসানা রা., আবু সুফিয়ান রা. ও আবু উবায়দা রা. কে রোমানদের সাথে যুদ্ধ করার জন্য  শামের উদ্দেশ্যে প্রেরণ করেন।

যুদ্ধরীতি অনুযায়ী প্রতিটি বাহিনী ভিন্ন ভিন্ন স্থানে অবস্থান করতে থাকে।

মুসলমানদের তখন এই সম্মিলিত বাহিনী মিলে প্রায় একুশ হাজার সৈন্য ছিল।

রোমান বাদশাহ যখন মুসলমানদের এই সুবিন্যস্ত অভিযান জানতে পারলেন তৎক্ষণাৎ সে মার্চ করে রাজধানী হিমসে চলে যায়। এরপর সে কয়েকটা ইউনিট গঠন করে তাদেরকে ভিন্ন ভিন্ন জায়গায় পাঠিয়ে দেয়।

যাতে মুসলমানরা একত্রে লড়াই করতে না পারে।

রোমানদের এই ইউনিটগুলোর সম্মিলিত হিসাব প্রায় ১ লাখ ৪০ হাজারের মতো।

মুসলিম সেনাপতিরা পরষ্পর যোগাযোগ করে সিদ্ধান্ত নিলেন যে, তারা যেভাবেই হোক একত্রিত হয়েই যুদ্ধ করবেন।

তখন আবু বকর রা. তাদেরকে ইয়ারমুকে এসে শিবির স্থাপনের নির্দেশ দেন।

শামে খালিদ বিন ওয়ালিদ রা. এর আগমন

এ সময় হযরত আবু বকর রা. খালিদ বিন ওয়ালিদ রা. কে ইরাকের দায়িত্ব মুসান্না বিন হারিসা রা. এর নিকট অর্পণ করে তার সৈন্য নিয়ে দ্রুত শামে যাওয়ার নির্দেশ দিলেন।

শামে তখন সাহাবাদের ইউনিটগুলো একত্রিত হতে লাগলো। এর মধ্যে রোমানরা ও আসা যাওয়া করতে লাগলো।

এমন কঠিন মুহুর্তে রোমানদের ফাঁকি দিয়ে ইরাক থেকে শামে যাওয়াটা অনেক কঠিন ছিল।

কিন্তু তারপর ও তিনি আল্লাহর উপর ভরসা করে এবং রোমানদের সাথে যুদ্ধ করার জন্য ৯ হাজার মুজাহিদ নিয়ে হিরা থেকে উত্তর-পশ্চিম দিকে মার্চ করা শুরু করেন।

এদিকটা ছিল একটা মরুভূমি অঞ্চল। এখানে ছিল না কোনো পানি, ছিল না কোনো গাছ-পালা।

এই মরুভূমিটি কিরকুক থেকে সুয়া পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল।

কিরকুক হলো উত্তর ইরাকের দজলা নদীর পূর্ব পাশে।

এই মরুভূমিতে পথপ্রদর্শক ছিলেন রাফে বিন উমাইয়া রা.। তিনি তখন খালিদ রা. কে বললেন,

একজন দ্রুতগামী অশ্বারোহীও তো এই মরুভূমি সহজে পাড়ি দিতে পারবে না। আর আপনি পুরো দল নিয়ে এখান দিযে পাড়ি দেয়ার চিন্তা করছেন?

খালিদ রা. বললেন, এ ছাড়া আমার আর কোনো পথ নেই।

খালিদ রা. এর বুসরা বিজয়

শামে পৌছে খালিদ রা. দেখলেন, রোমানদের সাথে যুদ্ধ করার  মুসলিম বাহিনীতে বড় ধরণের দুর্বলতা রয়েছে। দেখতে পেলেন এখন পর্যন্ত মুসলমানরা কোনো দুর্গ বা শহর জয় করে নি।

তাই তিনি যাত্রাপথে বুসরায় শিবির স্থাপন করেন। এরই মধ্যে অন্যান্য মুসলিম সেনাবাহিনীরা সাহায্য নিয়ে পৌছে যান। শহরবাসীরা জিজিয়া দেওয়ার শর্তে তরবারি ফেলে দেয়।

এভাবেই সন্ধির মাধ্যমে শহরটি মুসলমানদের হাতে চলে আসে।

আজনাদাইনের যুদ্ধ

এরপর খালিদ রা. মুসলিম আমিরগণ আজনাদাইন অভিমুখে রওয়ানা করেন।

সেখানে হযরত আমর বিন আস রা. এর মোকাবেলায় ৯০ হাজার রোমান সৈন্য অবস্থান করছিল।

এই স্থানটি ফিলিস্তিনের রামাল্লা এবং বাইতে জিবরিনের মাঝামাঝি অবস্থিত।

যুদ্ধের পূর্বে রোমান সিপাহসালার এক আরব গুপ্তচরকে মুসলিমদের শিবিরে পাঠায়। ফিরে এসে সে বলে,

তারা রাতে উপাসনা করে আর দিনে অশ্বপিঠে কাটায়।

এটা শুনে রোমান সেনাপতি বললেন, তাহলে তাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের চেয়ে মরে যাওয়াই শ্রেয়।

অবশেষে ১৩ হিজরীতে আজনাদাইনের যুদ্ধ সংগঠিত হয়।

মুসলিম আমিরগণ একমত হয়ে খালিদ রা. কে সেনাপতি নিযুক্ত করেন। অন্যান্য সেনাপ্রধানরা তার কমান্ডে যুদ্ধ করছিলেন।

শেষ পর্যন্ত রোমানরা পরাজয় বরণ করে। যুদ্ধের ময়দানে হিরাক্লিয়াসের ভাই তাজারিক নিহত হয়।

এরপরই শুরু হয় রোমানদের সাথে যুদ্ধ। এই যুদ্ধের সবচেয়ে বড় যুদ্ধটি ছিল ইয়ারমুকের যুদ্ধ।

তথ্যসুত্র:

মুসলিম উম্মাহর ইতিহাস, তৃতীয় খণ্ড

আবু বকর রা. এর জীবনী

FAQ

রোমানদের সাথে কোন সাহাবী যুদ্ধের সূচনা করেন?

হযরত খালিদ বিন সাঈদ রা.।

রাসূলের কোন সাহাবাকে রোমানরা হত্যা করে?

হযরত হারিস বিন আমর রা. কে।

খালিদ বিন ওয়ালিদ রা. ইরাকের দায়িত্ব কার উপর অর্পণ করে শামে গমণ করেন?

খালিদ বিন ওয়ালিদ রা. হযরত মুসান্না বিন হারিসা রা. এর উপর ইরাকের দায়িত্ব অর্পণ করে শামে আগমণ করেন।

খালিদ বিন ওয়ালিদ রা. কিভাবে শামে পৌঁছেন?

তিনি নয় হাজার মুজাহিদ নিয়ে হিরা থেকে উত্তর-পশ্চিম দিকে মার্চ করা শুরু করলেন। এটা ছিল মরু অঞ্চল। এই মরু অঞ্চল পাড়ি দিয়ে তিনি শামে পৌছেন।

আমি একজন ইসলামিক আলোচক, লেখক। ছোটবেলায় পড়ালেখা করেছি কওমী মাদ্রাসায়। পরবর্তীতে সাইন্স বিভাগ থেকে এসএসসি পরীক্ষা দিয়ে কৃতিত্বের সাথে পাশ করি। বর্তমানে আমি ডিপ্লোমা ইন মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং এ অধ্যায়নরত। অবসরে আমি বই পড়তে পছন্দ করি। নতুন কিছু শিখতে, নতুন কিছু জানতে ভালোবাসি। আমার ইচ্ছা, ভালো মানুষ হয়ে সমাজকে সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজে বিরত রাখার চেষ্টা করা।

https://www.arhasan.com