মুসান্না বিন হারিসা রা. ও ইরাক

মুসান্না বিন হারিসা রা. ও ইরাক – হযরত ‍মুসান্না বিন হারিসা রা. ইরাকের দায়িত্বভার গ্রহন করেন খালিদ রা. এর নিকট হতে। যখন হযরত খালিদ বিন ওয়ালিদ রা. রোমান বাহিনীর সাথে যুদ্ধের জন্য ইয়ারমুকে গমন করলেন তখন তিনি আবু বকর রা. এর নির্দেশে মুসান্না বিন হারিসার হাতে ইরাকের দায়িত্ব দিয়ে যান।

মুসান্না বিন হারিসা রা. তখন ইরাকের শহরগুলি রক্ষণাবেক্ষণের কাজে মনোবিবেশ করেন। সে সময়  খালিদ রা. এর ইরাক ত্যাগ ছিল খুবই অনাকাঙ্খিত। তখনও ইরানীরা পুরোপুরি পরাজয় বরণ করে নি।

বিভিন্ন স্থানে তারা ঘাপটি মেরে ছিল। সে সময় হযরত মুসান্না বিন হারিসা রা. এর হেডকোর্টার ছিল ইরাকের ঐতিহাসিক শহর হিরাতে।

আর খালিদ রা. এর সাথে নয় হাজার সৈন্যের ইরাক ত্যাগে পারসিকরা আরো শক্তিশালী হয়ে উঠলো। খালিদ রা. জানতেন, তিনি অনুপস্থিত থাকা অবস্থায় পারসিকরা আক্রমণ করতে পারে।

তাই তিনি অসুস্থ ও অসহায় ব্যক্তিদের মদীনায় পাঠিয়ে দেন। যেহেতু মুসান্না রা. কে আবু বকর রা. যুদ্ধের জন্যই ইরাকে পাঠিয়েছিলে। তাই তিনিও দায়িত্ব পাওয়ার পর সতর্ক থাকলেন।

মুসান্না বিন হারিসা

ইরাকের আক্রমণ

ইরাকের সিংহাসনে তখন শাহরিয়ার ইবনে আর্দেশীর ক্ষমতায় বসেছে। সে মূলত পারস্যের রাজ বংশের কেউ নয়।

কিন্তু সে তার সময়কালের বড় যোদ্ধা ছিল।

তাই তার ক্ষমতা দখল করার সময় কেউ কিছু বলে নি।

যখন সে জানতে পারে, মুসলমানদের অর্ধেক সৈন্য ইরাক ত্যাগ করেছে তখনই সে মুসলমানদের হাত থেকে ইরাক উদ্ধারের জন্য যুদ্ধের প্রস্তুতি শুরু করলো।

তখন সে পারস্যের অন্যতম সেনাপতি হরমুজের নেতৃত্বে দশ হাজার সৈন্যের একটি বাহিনী প্রেরণ করলেন। তারা এসে হীরায় উপস্থিত হলো।

মুসান্না রা. তখন তাদেরকে হিরার সীমানা পর্যন্ত আসতে দেয়াটা উচিৎ মনে করলেন না।

তাই তিনি তার সেনাবাহিনী নিয়ে ইরাকের সীমান্ত এলাকা বাবেল নামক স্থানে ছাউনী স্থাপন করেন।

এরপর মুসান্না বিন হারিসা রা. এর সাথে যুদ্ধ শুরু হয় ইরানীদের। তারা দাঁড়ানোর ঠাঁই পর্যন্ত পাচ্ছিল না।

পরিশেষে তারা ময়দান থেকে পলায়ন করতে বাধ্য হয়।

যুদ্ধে মুসলিম বাহিনীকে ‍মুসান্না রা. সঠিকবাবে বিন্যস্ত করে।

মুজাহিদ বাহিনীর ডান দিকের দায়িত্ব মুআন্না রা. কে ও বাম দিকের দায়িত্ব মাসুদ রা. কে দেয়া হয়।

মুসান্না রা. তাদেরকে ধাওয়া করতে করতে পারস্যের রাজধানী পর্যন্ত পৌছে যান।

মুসান্না রা. এর নিকট সৈন্য কম থাকায় তিনি ফিরে আসেন। সে সময় তিনি গুরুত্বপূর্ণ কাজে মদীনা গমন করেন।

এটা ১৩ হিজরীর ঘটনা।

(মুসলিম উম্মাহর ইতিহাস, তৃতীয় খণ্ড, পৃষ্ঠা ১৩৭। আবু বকর রা. জীবনী, পৃষ্ঠা ২৩২)

ইরাকে ক্ষমতাশীলদের মধ্যে অন্তর্দ্বন্দ্ব

যুদ্ধের ময়দান থেকে হরমুজ পালিয়ে আসার পর ইরাকের রাজা শাহরিয়ার ভয় পেয়ে যান।

যে কোনো মুহুর্তে মুসলমারা আমাদের শহর দখল করে নিতে পারে। এই ভয়ের মধ্যেই সে অসুস্থ হয়ে মারা যায়।

তার মৃত্যুর পর তার পুত্র সাবুর সিংহাসনে বসলো। সে বসে ফররোখযাদ নামক একজনকে মন্ত্রী বানালো।

এরপর তারা শুরু করলো নতুন প্ল্যান। কিন্তু মদীনার মুজাহিদরা তাদের সেই প্ল্যান নস্যাৎ করে দেয়।

(আবু বকর রা. এর জীবনী, পৃষ্ঠা ২৩৩)

মদীনায় মুসান্না বিন হারিসা রা.

মুসান্না বিন হারিসা রা. হযরত বশির বিন ফাসামিয় রা. কে ইরাকে নিজের স্থলাভিষিক্ত করে মদীনার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হন।

মদীনায় পৌছার পর জানতে পারেন, আবু বকর রা. অসুস্থ। তখন মুসান্না রা. তার সাথে দেখা করেন।

আবু বকর রা. এর অন্তিম সময় ছিল সেটি। তিনি ইরাকের রণক্ষেত্রের অবস্থা সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করেন।

মুসান্না রা. ইরাকের অবস্থা জানিয়ে বললেন, আমার সাথে আরো কিছু সৈন্য দিন। যাতে আমরা পুরো ইরাক জয় করতে পারি।

এদিকে তখন মদীনায় তেমন একটা মানুষ ছিল না। যুবকরা ও নওমুসলিম স্বেচ্ছাসেবকরা অন্যান্য রণাঙ্গনে যুদ্ধরত ছিল। তাই তখন নতুন যোদ্ধা ব্যতিত এই অভিযান সম্ভব নয়।

তখন আবু বকর রা. ওমর রা. কে ডেকে বললেন, সম্ভবত এটি আমার জীবনের শেষ দিন।

যদি আমি আজ মৃত্যুবরণ করি তাহলে তুমি সন্ধা পর্যন্ত অপেক্ষা না করেই মুজাহিদ সংগ্রহ করে মুসান্নার সাথে পাঠিয়ে দিবে। আমার শোক যেন তোমাকে বাধাগ্রস্থ না করে।

আবু বকর রা. সেই রাতেই ইন্তিকাল করেন।

দিনটি ছিল ২৮ আগষ্ট ৬৩৪ খৃষ্টাব্দ মোতাবেক ১৩ হিজরীর জুমাদাল আখিরাহ্ মাস।

জিহাদের জন্য আহবান

উমর রা. পরেরদিন মসজিদে এসে জিহাদের জন্য লোকদের আহ্বান করেন।

পরপর তিনদিন লোকদের আহ্বান করার পর সর্বপ্রথম বনু সাকিফের আবু উবায়েদ বিন মাসউদ জিহাদের জন্য নাম লিখান।

তাকে দেখার পর বনু সাকিফের আরো অনেকেই জিহাদের জন্য প্রস্তুত হয়ে যান।

এদিকে মুসান্না রা.ও মানুষকে জিহাদের পথে আহ্বান করতে থাকেন।

অবশেষে বড় একটি বাহিনী তৈরি হয়ে যায় জিহাদের জন্য। ওমর রা. তখন আবু উবায়েদ বিন মাসউদকে দলের আমির হিসেবে নির্ধারণ করেন।

মুসান্না রা. তো সেনাপ্রধান। তাই এটা যেন পাঠকের মনে সংশয় সৃষ্টি না করে।

সে সময় কেউ কেউ এই আপত্তি তোলে, এত এত সাহাবী উপস্থিত থাকতে একজন তাবেয়ীকে কেন আমির নির্ধারণ করা হলো?

ওমর রা. তখন বললেন, যে জিহাদের জন্য সর্বপ্রথম সাড়া দিয়েছে তাকেই আমি আমির বানাবো। অন্য কাউকে নয়।

(মুসলিম উম্মাহর ইতিহাস, তৃতীয় খণ্ড, পৃষ্ঠা ১৩৮-১৩৯)

তথ্যসুত্র

মুসলিম উম্মাহর ইতিহাস, মাকতাবাতুল ইত্তিহাদ থেকে প্রকাশিত, খণ্ড ৩

আবু বকর রা., সোলায়মানিয়া বুক হাউজ থেকে প্রকাশিত

FAQ

মুসান্না রা. কে ছিলেন?

মুসান্না বিন হারিসা রা. ছিলেন ইরাকের হিরা অঞ্চলের সেনাপতি।

আমি একজন ইসলামিক আলোচক, লেখক। ছোটবেলায় পড়ালেখা করেছি কওমী মাদ্রাসায়। পরবর্তীতে সাইন্স বিভাগ থেকে এসএসসি পরীক্ষা দিয়ে কৃতিত্বের সাথে পাশ করি। বর্তমানে আমি ডিপ্লোমা ইন মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং এ অধ্যায়নরত। অবসরে আমি বই পড়তে পছন্দ করি। নতুন কিছু শিখতে, নতুন কিছু জানতে ভালোবাসি। আমার ইচ্ছা, ভালো মানুষ হয়ে সমাজকে সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজে বিরত রাখার চেষ্টা করা।

https://www.arhasan.com