কাদিসিয়ার যুদ্ধ

কাদিসিয়ার যুদ্ধ – রুস্তম মুগিরা বিন শুবা রাঃ এর সাথে কথা বলার পরই তার বাহিনীতে অগ্রসর হওয়ার নির্দেশ দেয়। সে বর্ম এবং উজ্জ্বল পোশাক পরিধান করে ঘোড়ায় বসে চিৎকার দিয়ে বলে,

আমি আরবদেরকে নিশ্চিহ্ন করে দিব। তার পাশে থাকা এক অফিসার বলে, যদি খোদা চান তাহলেই হবে। তখন রুস্তম প্রতিউত্তরে বলে, যদি খোদা না চান তাহলেও হবে।

সে এক লক্ষ ২০ হাজার সৈন্য নিয়ে সাবাতের সেনাছাউনি থেকে বের হয়। মুসলমানরা ফুরাত নদীর পশ্চিম দিকে শিবির স্থাপন করেছিল।

রুস্তম এখানে পৌঁছার পর পুল না বানিয়ে পাথর ও মাটি ফেলে নদী ভরাট করে রাস্তা বানিয়ে ফেলে।

সকালবেলা সে নদীর তীরে সৈন্যদেরকে বিন্যস্ত করে।

পারস্যের ৩০ হাজার আত্মমর্যাদাশীল ব্যক্তি পায়ে শেকল বেধে ময়দানে দাঁড়িয়ে যায়।

প্রতিপক্ষ যেন কাতার ভাঙতে না পারে এবং নিজেরা পলায়ন না করে তাই এই ব্যবস্থা করা হয়।

সৈন্যবাহিনীল মধ্যভাগে ১৮ টি জঙলি হাতি আর ডান বামে পনেরোটি করে হাতি রাখা হয়।

হাতির পিঠে দক্ষ তীরন্দাজরা আসন গ্রহণ করে।

মুসলমানদের প্রস্তুতি

মুসলমানরা যুদ্ধের ময়দানে কাতার করে দাঁড়ালেন। সেনাপতি সাদ বিন আবু ওয়াক্কাস রাঃ সেদিন খুব অসুস্থ ছিলেন।

এ জন্য তিনি সেনাবাহিনীর পেছনে একটি বাড়ির ছাদে চিৎ হয়ে শুয়ে পর্যবেক্ষণ করছিলেন। সেখান থেকে পুরো যুদ্ধের ময়দান দেখা যেত।

এরপর তিনি মুসলমানদের উদ্দেশ্যে বক্তব্য রাখলেন। এরপর তিনি খালিদ বিন উরফুতা গিফারী রাঃ কে যুদ্ধের ময়দানে নিজের স্থলাভিষিক্ত করেন।

সকলে তাকে মান্য করেন এবং তার নেতৃত্বে যুদ্ধ শুরু হয়। সাদ রাঃ প্রয়োজনীয় দিক নির্দেশনা কাগজে লেখে খালিদ রাঃ কে দিতেন।

আরমাস দিবস – কাদিসিয়ার যুদ্ধ

যুদ্ধের সময় দুপুর পর্যন্ত মুসলমানরা নিজের জায়গায় অবস্থান করে। সেনাপতির নির্দেশে জায়গায় জায়গায় সুরা আনফাল তেলওয়ারত করতে থাকে মুসলমানরা।

যোহরের নামাজের শেষে সাদ রাঃ তাকবীর ধ্বনি দেন। সকলে বুঝে যায়, হামলার নির্দেশ দেয়া হয়েছে।

দ্বিতীয় তাকবীর দেয়া হলে সকলে হাতিয়ার নিয়ে প্রস্তুত হয়ে যায়।

তৃতীয় তাকবীর দেয়ার সাথে সাথেই মুসলমানরা যুদ্ধ শুরু করেন। তীরন্দাজরা তীর নিক্ষেপ শুরু করে। অশ্বারোহীরা আগে বাড়তে থাকে।

বিন্যাস অনুযায়ী সকল মুজাহিদ একসাথে আগে বাড়তে থাকেন।

পারসিক শাহজাদা হরমুজ মুকুট পরিধান করে হযরত গালিব বিন আব্দুল্লাহ আসাদির মোকাবেলায় আসে।

তিনি তাকে গ্রেপ্তার করে ফেলেন। আরেকজন পারসিক অফিসার এসে হুংকার দেয়। হযরত আমর বিন মাদিকারিব রাঃ তাকে হত্যা করেন।

তুমুল যুদ্ধ চলতে থাকে। হযরত সাদ রাঃ প্রাসাদের ছাদে বসে সেনাদের দিক নির্দেশনা দিতে থাকেন। তিনি সম্পূর্ণ নির্ভয়চিত্ত ছিলেন।

এমনকি তারা ঘরের দরজা পর্যন্ত খোলা ছিল। সেখানে কোনো পাহারাদার ছিল না। যদি মুসলমানরা পিছু হটতেন তাহলে পারসিকরা সহজেই সাদ রাঃ কে গ্রেপ্তার করতে পারতেন।

কাদিসিয়ার যুদ্ধ

আরবের অন্যতম সাহসী বনু বাজিলার অশ্বারোহীরা অত্যন্ত সাহসীকতার সাথে লড়াই করছিলেন। পারসিকরা ১৭ টি হাতি নিয়ে তাদের উপর আক্রমণ করে।

বনু বাজিলার কাতার ভেঙ্গে যেতে থাকে। সাদ রাঃ তৎক্ষণাৎ বনু আসাদের যোদ্ধাদের তাদের সহযোগীতায় পাঠান। হাতিগুলো তখন বনু আসাদের উপর আক্রমণ করে।

এরপর বনু তামিমের যোদ্ধারা অগ্রসর হয়ে হাতিগুলোকে প্রতিহত করেতে সক্ষম হন। কাদিসিয়ার প্রথমদিনের যুদ্ধকে ইতিহাসে ইয়াওমুল আরমাস নামে স্মরণ করা হয়।

আগওয়াস দিবস – কাদিসিয়ার যুদ্ধ

প্রথমদিনের যুদ্ধে কয়েকজন মুসলমান শহীদ হন। আবার কিছু মুসলমান আহত ও হন।

শহীদদের দাফন করা হয় আর আহতদের চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়।

পরেরদিন মুসলমানরা আবার যুদ্ধের জন্য সারিবদ্ধ হয়ে দাঁড়ায়। তখনও যুদ্ধ শুরু হয় নি।

হঠাৎ হযরত সাদ রাঃ এর ভাই হযরত হিশাম রাঃ ৫ হাজার সৈন্য নিয়ে মুসলমানদের সাহায্যে পৌঁছেন।

ইতিপূর্বে তিনি আবু উবাইদা রাঃ এর নেতৃত্বে শামে যুদ্ধ করছিলেন।

খলিফা ওমর রাঃ নির্দেশ দেন, ইরাক থেকে খালিদ বিন ওয়ালিদ রাঃ এর সাথে যারা শামে এসেছিল, তাদেরকে যেন কাদিসিয়ায় পাঠানো হয়।

এতে মুসলমানদের সাহস ও মনোবল আগে থেকে আরো বৃদ্ধি পায়। এ ক্ষেত্রে একটি চমৎকার বিন্যাস করা হয়েছিল।

নতুন মুজাহিদ বাহিনীকে দশজন দশজন করে ভাগ করে দেয়া হয়েছিল। তারা একটু পর পর তাকবীর ধ্বনি দিয়ে ময়দানে প্রবেশ করছিলেন।

এতে পারসিকরা মনে করছিল, অনেক বড় বাহিনী চলে এসেছে। তাই তারা যুদ্ধের সময় মনোবল হারিয়ে ফেলে।

এদিন মুসলমানদের ঘোড়াগুলো পারসিকদের সারিগুলোকে লন্ডভন্ড করে দিচ্ছিল।

পারসিকরা নতুন কোনো পন্থা খুঁজে বের করতে পারে নি। তাই তারা এভাবেই যুদ্ধ করতে থাকে।

এদিকে কাকা বিন আমর রাঃ পারসিকদের ঘোড়াগুলোকে ভীত করে তোলার জন্য আশ্চর্যজনক পন্থা অবলম্বন করেন।

তিনি মুসলমানদের উটগুলোর সামনে কালো চাদর পেঁচিয়ে দেন। ফলে সেগুলো ভয়ঙ্কর দেখাচ্ছি। এতে পারসিকদের ঘোড়াগুলো ভয়ে পলায়ন করতে থাকে।

পারসিকদের দক্ষ তীরন্দাজ ছিল। তারা বারবার মুসলমানদেরকে টার্গেট করছিল। এর ফলে মুসলমানরা সামনে অগ্রসর হতে পারছিল না।

হযরত আমর বিন মাদিকারিব রাঃ একদল মুসলমানদের নিয়ে সামনে এগিয়ে যান। তিনি ও তার বাহিনী তীরন্দাজদের পরাভূত করতে সক্ষম হন।

ঈমাস দিবস – কাদিসিয়ার যুদ্ধ

যুদ্ধের তৃতীয় দিনকে ঈমাস দিবস নামে অবহিত করা হয়। হযরত কাকা রাঃ রাতেই মুসলমানদের একদলকে দূরে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন।

সকালবেলায় তারা তাকবীর দিয়ে ময়দানে প্রবেশ করছিল। ফলে কাফেররা আবার ভীত হয়ে যায়।

যুদ্ধের শুরুতে মল্লযুদ্ধ শুরু হয়। এখানে পারসিক পালোয়ানদের বিরুদ্ধে ‍মুসলিম মুজাহিদরা লড়াই করে।

এরপর শুরু হয় আবার যুদ্ধ। পারসিকরা এদিনও আবার হাতি আনে। এগুলো হেফাজতের জন্য পদাতিক বাহিনীকে হাতির চারপাশে বসানো হয়।

হযরত আমর বিন মাদিকারিব রাঃ এর নেতৃত্বে আবার হাতির উপর হামলা করা হয়। এরপর মুসলমনারা পারসিকদের কাতার ভেদ করে সামনে অগ্রসর হতে থাকে।

অল্প সময়ের মধ্যে ময়দানের সবগুলো হাতিকে ধরাশয়ী করা হয়। দিন শেষে মুসলমানদের জয় হয়।

কাদিসিয়া দিবস

পরদিন সকলে উভয়পক্ষের সৈন্যবাহিনী ক্লান্ত ছিল। এদিন কাকা রাঃ এর নেতৃত্বে আবার উজ্জিবীত হয়ে মুসলমানরা হামলা করে।

যুদ্ধে মুসলমানরা রুস্তমের ঝাকঁঝমকপূর্ণ প্রাসাদের নিকটে চলে যায়। মুসলমানদের আসতে দেখে সে নদীতে ঝাঁপ দেয়।

কিন্তু হেলাল বিন আলকামা রহঃ নামক একজন মুসলমান তাকে ধরে ফেলে। এরপর তিনি রুস্তমকে হত্যা করেন। রুস্তমকে হত্যা করার পর পারসিকরা পালানো শুরু করে।

প্রায় ৩০ হাজার পারসিক সৈন্য প্রাণ বাঁচানোর জন্য নদীতে ঝাঁপ দেয়। মুসলমানদের তীরের আঘাতে তারা সকলে মৃত্যুবরণ করে।

এই যুদ্ধ সংগঠিত হয় ১৪ হিজরীতে। এভাবেই শেষ হয় কাদিসিয়ার যুদ্ধ ।

পড়ুন: কুরআনে কি তথ্যে ভুল আছে?

নাস্তিকতা কি কোনো ধর্মের নাম? পড়ুন

কাদিসিয়ার যুদ্ধ কবে সংগঠিত হয়

১৪ হিজরীতে এই যুদ্ধ সংগঠিত হয়। কেউ কেউ বলে, ১৬ হিজরীতে সংগঠিত হয়েছে

কাসিদিয়ার যুদ্ধে সেনাপতি কে ছিলেন

মুসলমানদের সেনাপতি ছিলেন সাদ বিন আবু ওয়াক্কাস রাঃ । পারসিকদের সেনাপতি ছিল রুস্তম

আমি একজন ইসলামিক আলোচক, লেখক। ছোটবেলায় পড়ালেখা করেছি কওমী মাদ্রাসায়। পরবর্তীতে সাইন্স বিভাগ থেকে এসএসসি পরীক্ষা দিয়ে কৃতিত্বের সাথে পাশ করি। বর্তমানে আমি ডিপ্লোমা ইন মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং এ অধ্যায়নরত। অবসরে আমি বই পড়তে পছন্দ করি। নতুন কিছু শিখতে, নতুন কিছু জানতে ভালোবাসি। আমার ইচ্ছা, ভালো মানুষ হয়ে সমাজকে সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজে বিরত রাখার চেষ্টা করা।

https://www.arhasan.com