মক্কা বিজয়ের দিন ওমর

মক্কা বিজয়ের দিন ওমর – ৮ হিজরীতে মক্কার কুরাইশরা মুসলমানদের সাথে করা চুক্তি ভঙ্গ করে। তারা বনু বকরকে এক গোত্রের বিরুদ্ধে উস্কানী দেয়।

উক্ত গোত্র মুসলমানদের পক্ষে চুক্তিতে শরীক ছিল। বনু বকর সেই গোত্রের উপর হামলা করে লুটপাট করে। তখন উক্ত গোত্রের একব্যক্তি নবীজির নিকট এসে অভিযোগ দায়ের করে।

নবীজি তখন কুরাইশদের নিকট জনৈক সাহাবীতে দূত হিসেবে প্রেরণ করেন। উক্ত সাহাবী মক্কার কাফেরদের নিকট দুইটি প্রস্তাব পেশ করে।

প্রথমত: এই হামলার সাথে কুরাইশদের কোনো সম্পর্ক নেই।

দ্বিতীয়ত: চুক্তি বাতিল করা।

মক্কার কাফেররা আত্মগৌরবে চুক্তি বলে করে দেয়। মদীনায় এসে উক্ত সাহাবী নবীজিকে এই কথা জানান দেন। মক্কার কুরাইশদের নেতা আবু সুফিয়ানের টনক নড়ে।

আবু সুফিয়ানের মদীনায় আগমণ

আবু সুফিয়ান তখন মদীনায় এসে নবীজির সাথে সাক্ষাৎলাভ করে চুক্তিতে পূনরায় বহাল রাখতে চায়। কিন্তু নবীজি তাদের উপর অনেক ক্রুদ্ধ ছিলেন। তাই তিনি মুখ ফিরিয়ে নিলেন।

এরপর আবু সুফিয়ান আবু বকরের নিকট গিয়ে চুক্তির মেয়াদ বাড়ানোর জন্য অনুরোধ করে। নবীজির মতো তিনিও তা প্রত্যাখ্যান করেন।

ওমর রা. এর নিকটও আবু সুফিয়ান এসে চুক্তির ব্যাপারে কথা বলে। কিন্তু উমর রা. ও তাকে তাড়িয়ে দেন। আবু সুফিয়ান তখন খালি হাতে মক্কায় চলে যায়।

মক্কা বিজয়ের প্রস্তুতি

এরপর নবীজি সাহাবীদেরকে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হতে বললেন। আবু বকর রা. নবীজির ঘরে এসে দেখেন যে, আয়েশা রা. আটা পিষছেন।

আবু বকর রা. তখন মেয়েকে নবীজির যুদ্ধের স্থান সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলেন। কিন্তু আয়েশা রা. কিছুই বললেন না।

কারণ, নবীজির একটা যুদ্ধনীতি ছিল যে, সাহাবীদেরকে তিনি আগে যুদ্ধের স্থান সম্পর্কে জানাতেন না। তিনি অভিযানে বের হওয়ার পর তাদেরকে জানাতেন।

কিছুক্ষণ পর নবীজি ঘরে আসলেন। আবু বকর রা. তখন বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আপনি কাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছেন? রোমানদের বিরুদ্ধে নাকি ইহুদীদের বিরুদ্ধে?

নবীজি তখন বললেন, কুরাইশদের বিরুদ্ধে। আবু বকর রা. বললেন, কিন্তু তাদের সাথে তো আমাদের চুক্তি আছে। নবীজি তখন বললেন, তুমি কি জান না যে, তারা চুক্তিভঙ্গ করেছে?

মক্কা বিজয়ের দিন ওমর ও হাতিব ইবনে আবু বালতা’ রা.

হাতিব ইবনে বালতা’ রা. ছিলেন একজন মুহাজির সাহাবী। তার আত্মীয়-স্বজনরা মক্কায় ছিল। তিনি নবীজির সাথে মদীনায় থাকতেন।

যখন তিনি মক্কা বিজয় সম্পর্কে জানতে পারলেন যে, নবীজি কুরাইশদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছে। তখন তিনি তার পরিবারের ব্যাপারে শঙ্কা অনুভব করলেন।

তিনি তখন একজন নারীর মাধ্যমে গোপনে একটি চিঠি লিখলেন তার পরিবারের নিকট। নবীজি সা. আগেই দোয়া করেছিলেন,

যেন মক্কার কাফেররা মুসলমানদের এই অভিযানের কথা জানতে না পারে।

হাতিব রা. যখন এই চিঠি মক্কায় পাঠালেন তখনই ওহীর মাধ্যমে নবীজি তা জানতে পারলেন।

তখনই আলী রা. ও মিকদাদ রা. কে উক্ত মহিলাকে পাকড়াও করার জন্য পাঠালেন।

মদীনা থেকে ১২ মাইল দূরে ওই মহিলাকে তারা গ্রেপ্তার করলেন।

উক্ত মহিলাকে তখন তল্লাশী করা হবে বলে হুমকি দিলে সে চিঠিটি বের করে দেয়। নবীজি তখন হাতিব রা. কে ডেকে পাঠান।

হাতিব রা. তখন তার পরিবারের জন্য কাজটি করেছেন বলে উল্লেখ করেন। রাসূল সা. তখন বললেন, সে সত্য বলেছে।

উমর রা. মতামত দিলেন যে, হাতিবের যেন শিরচ্ছেদ করা হয়। নবীজি তখন তাকে তিরষ্কার করে বললেন, সে তো বদরের যুদ্ধে অংশ নিয়েছিল।

আর আল্লাহ তাদের ব্যাপারে ক্ষমা ঘোষণা করে দিয়েছেন। তাহলে কিভাবে হাতিবকে শাস্তি দেয়া যায়?

মক্কা বিজয়ের দিন ওমর এর বাহিনীর সাথে মক্কায় গমন

রাসূল সা. দশ হাজার সাহাবীকে নিয়ে মক্কা অভিমুখে রওয়ানা হন। পথিমধ্যেই নবীজির চাচা আব্বাস রা. এর সাথে দেখা হয়।

তিনি তখন হিজরত করে মদীনায় যাচ্ছিলেন। আব্বাস রা. ও তখন সেই অভিযানে শরীক হলেন। কাফেলা মক্কার নিকটবর্তী স্থানে যাত্রাবিরতি করলো।

আবু সুফিয়ানসহ মক্কার ব্যক্তিরা এই খবর পেয়ে শঙ্কিত হয়ে ‍উঠলো।

আবু সুফিয়ান তখন রাতের বেলা মুসলিম বাহিনীর তথ্য সংগ্রহের জন্য গা-ঢাকা দিয়ে আসলেন।

কিন্তু তিনি আব্বাসের সামনে পড়ে যান। আব্বাস রা. তাকে নিরাপত্তা দিয়ে নবীজির নিকট নিয়ে আসলেন।

আসার সময় লোকেরা আব্বাসের সাথে এই ব্যক্তিকে দেখে জিজ্ঞাসা করতে লাগলো, ইনি কে?

তখন তারা রাসূল সা. এর বাহনে আবাসকে দেখে সরে গেল। ওমর রা. তখন আবু সুফিয়ানকে দেখলেন তখন তিনি বললেন,

আল্লাহর দুশমন আবু সুফিয়ান! আল্লাহর প্রশংসা যে, কোনো চুক্তি ছাড়াই তোমাকে আল্লাহ আমাদের হাতের মুঠোয় এনে দিয়েছেন।

অতঃপর ওমর রা. রাসূল সা. এর নিকট এসে বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমাকে এই দুশমনকে হত্যা করার অনুমতি দিন।

আব্বাাস রা. বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমি তাকে নিরাপত্তা দিয়েছি। ওমর রা. তখন রাসূল সা. কে পীড়াপীড়ি করতে লাগলেন।

তখন আব্বাস বললেন, হে ওমর! থামুন। আবু সুফিয়ান বনু আবদে মানাফের বলে তুমি এমন করছো। যদি সে বনু আদ গোত্রের হতো তাহলে এমন করতে না।

ওমর রা. এটা শুনে বললেন, আল্লাহর কসম! আপনি যেদিন মুসলিম হলেন সেদিন যদি আমার পিতা খাত্তাবও মুসলিম হতেন তাহলে আমার নিকট আপনার মুসলিম হওয়ার ঘটনাটিই আনন্দদায়ক হতো।

কারণ, আমি জানি যে আপনার ইসলাম গ্রহণ করা আমার পিতা খাত্তাবের ইসলাম গ্রহণ করার চাইতেও অধিক প্রিয় রাসূলের নিকট।

পরে আবু সুফিয়ান রাসূল সা. এর নিকট মুসলমান হলো। মুসলমানরা শৌর্য-বীর্যের সাথে মক্কায় প্রবেশ করলেন। রাসূল সা. তখন মক্কার মানুষের নিরাপত্তার জন্য ঘোষণা দিলেন, যেই ব্যক্তি আবু সুফিয়ানের ঘরে প্রবেশ করবে, সে নিরাপদ।

যেই ব্যক্তি মসজিদুল হারামে অবস্থান করবে, সে নিরাপদ। সে নিজের ঘরের দরজা আটঁকিয়ে বসে থাকবে, সে নিরাপদ।

তথ্যসুত্র

জীবন কর্ম: ওমর রা.। পৃষ্ঠা ১০৫-১১০

মুসলিম উম্মাহর ইতিহাস। মাওলানা ইসমাইল রেহান। খণ্ড ২। মাকতাবাতুল ইত্তিহাদ। পৃষ্ঠা ২৪১-২৪২

আবু বকর সিদ্দিক রা.। ড. আলী সাল্লাবী। কালান্তর প্রকাশনী। পৃষ্ঠা ১১৯

আবু বকর সিদ্দিক। পৃষ্ঠা ১২০

আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া। খণ্ড ৪। ইসলামিক ফাউন্ডেশন। পৃষ্ঠা ৪৮৫

মুসলিম উম্মাহর ইতিহাস। খণ্ড ২। পৃষ্ঠা ২৮৬

আরো পড়ুন

হুদাইবিয়ার দিন ওমর রা.

এতিমের অধিকার কতুটুকু?

জীবন বীমা কিভাবে করবেন এবং করা কি উচিৎ

ওমর রা. এর হিজরত

মুসলমানদের প্রথম আবিসিনিয়া হিজরত

বিশেষ দ্রষ্টব্য: আমাদের লেখাগুলো সূচিপত্র অনুযায়ী দেখুন www.subject.arhasan.com এই ওয়েবসাইটে। আমরা কোন প্রকাশনীর বই রেফারেন্স হিসেবে ব্যবহার করি তা জানতে ভিজিট করুন www.arhasan.com/book এই ওয়েবসাইটে। আমাদেরকে গুগল নিউজে ফলো করতে পারেন এই লিংক থেকে। আমাদের ইউটিউব চ্যানেল ভিজিট করুন এই লিংক থেকে। এই লেখার লেখক সম্পর্কে আরো জানুন এই লিংক থেকে

আমি একজন ইসলামিক আলোচক, লেখক। ছোটবেলায় পড়ালেখা করেছি কওমী মাদ্রাসায়। পরবর্তীতে সাইন্স বিভাগ থেকে এসএসসি পরীক্ষা দিয়ে কৃতিত্বের সাথে পাশ করি। বর্তমানে আমি ডিপ্লোমা ইন মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং এ অধ্যায়নরত। অবসরে আমি বই পড়তে পছন্দ করি। নতুন কিছু শিখতে, নতুন কিছু জানতে ভালোবাসি। আমার ইচ্ছা, ভালো মানুষ হয়ে সমাজকে সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজে বিরত রাখার চেষ্টা করা।

https://www.arhasan.com