উসমান রা. এর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র

উসমান রা. এর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র – মুসলিম উম্মাহর বিজয়যাত্রা ও গৌরবময় ক্রমবিকাশ হযরত আবু বকর রা. ও হযরত উমর রা. এর যুগ থেকে শুরু করে ‍উসমান রা. এর শাসনকালের ১১ তম বছর পর্যন্ত অব্যাহত ছিল।

এই সময়টা ছিল শান্তি ও নিরাপত্তার। সেই সাথে বিজয়যাত্রাও ছিল অব্যাহত। হযরত উসমান রা. একজন শ্রেষ্ঠ শাসকের ভূমিকা পালন করে গেছেন।

কিন্তু শাসনকালের শেষ বছরগুলোকে কিছু দুষ্টপ্রকৃতির মানুষ তার শাসনব্যবস্থা ভেঙ্গে দেয়ার জন্য উঠে পড়ে লেগেছিল।

এই ষড়যন্ত্র কবে এবং কোথায় শুরু হয়েছিল, তা পুরোপুরি নির্দিষ্টভাবে বলা যায় না। তবে ধারণা করা হয়,

৩৪ হিজরীতে এই আন্দোলনকে প্রথম প্রকাশিত হতে দেখা যায়।

তবে এটি আরো বহু পূর্ব থেকেই তলে তলে ঘি ঢালছিল, তা অনুমান করা যায়। এসব ষড়যন্ত্রকারীদের নেতা কে ছিল, সেটা তেমন একটা জানা যায় না।

তারপরও আব্দুল্লাহ ইবনে সাবা নামে জনৈক ইহুদীর বর্ণনা পাওয়া যায় এই কাজের সাথে।

আব্দুল্লাহ ইবনে সাবা

হযরত উসমান রা. খলিফা নির্বাচিত হওয়ার কয়েক বছর পর ইয়ামানের রাজধানী সানা’য় এক ইহুদী ইসলাম গ্রহণের ঘোষণা দিল।

মানুষের মুখে মুখে তার নাম ছড়িয়ে পড়লো-আব্দুল্লাহ ইবনে সাবা। সে মুসলিম হওয়ার পর কোনো সাহাবী বা তাবেয়ীর নিকট শিক্ষা অর্জন না করেই মানুষকে দীক্ষা দেয়া শুরু করলো।

ইয়ামান, হিজাজ, কুফা, বসরা, শাম এলাকায় সে দরবেশ হিসেবে মানুষের নিকট পরিচিত হতে লাগলো।

মানুষ তার ব্যাপারে ভাবলো, সে তো একজন সংশোধনকারী!

সে খৃষ্টানদের সেন্ট পলের ন্যায় অতিভক্তি প্রকাশ করে অজ্ঞ মুসলমানদের বিভ্রান্ত করতে লাগলো।

বহু সরলমনা মুসলমান তাকে মনে করতে লাগলো, সেই ইসলামের সবচেয়ে বড় পণ্ডিত ও রাহবার।

সে মানুষের মধ্য থেকে একতা ও সম্প্রীতি নষ্ট করার জন্য বিভিন্ন ব্যক্তির নামে বানোয়াট ও অনৈতিক কথাবার্তা ছড়াতে লাগলো।

আব্দুল্লাহ ইবনে সাবা’র নতুন আকীদা প্রসার

সে তার প্রথম মতবাদ প্রচার শুরু করলো নবীজির প্রতি অতিরিক্ত ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়ে। সে বলতে লাগলো,

রাসূল সা. অবশ্যই ঈসা আ. এর থেকে শ্রেষ্ঠ (নাউযুবিল্লাহ্)। সুতরাং রাসূল সা. পূনরায় দুনিয়াতে ফিরে আসবেন।

এরপর সে তার দ্বিতীয় মতবাদ প্রচার করলো এই বলে যে, প্রত্যেক নবীর একজন করে স্থলাভিষিক্ত থাকে। আর নবীজির স্থলাভিষিক্ত হলেন হযরত  আলী রা. (নাউযুবিল্লাহ্)।

এরপর আব্দুল্লাহ ইবনে সাবা তার ভক্তদের হযরত উসমান রা. বিরুদ্ধে বিদ্রোহের জন্য উসকে দিয়ে বলতো,

যে ব্যক্তি নবীজির অসিয়ত বাস্তবায়ন করতে দেয় না, তার চেয়ে বড় জালেম আর কে হতে পারে?

এই কথার মাধ্যমে তার অজ্ঞ ভক্তরা হযরত উসমান রা. কে খেলাফতের দখলদার বলে বিশ্বাস করতে শুরু করে।

তখন সে তাদেরকে আরো উত্তেজিত করার জন্য বলে বেড়ায়,

নবীজির স্থলাভিষিক্তের উপস্থিতিতে উসমান রা. অন্যায়ভাবে খেলাফত দখল করে রেখেছে। সুতরাং তোমরা এর প্রতিবাদে বেরিয়ে পড়ো এবং সংগ্রাম করো।

বিশৃঙ্খলার কেন্দ্রসমূহ – উসমান রা. এর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র

আব্দুল্লাহ ইবনে সাবার ফেতনার ঘাঁটি ছিল তিনটি। ১.কুফা ২.বসরা ৩.মিসরের প্রধান শহর ফুসতাত

কুফা এবং বসরা শহর দুটো আবাদ হয়েছিল হযরত উমর রা. এর যামানায়।

আর সে সময় থেকেই এখানে মানুষেরা বিদ্রোহ করাকে একটা স্বাভাবিক রীতিতে পরিণত করেছিল। তাই হযরত মুসা আশআরী রা. কে উমর রা. বসরার গভর্নর নিযুক্ত করে পাঠান।

তখন উমর রা. হযরত মুসা আশআরী রা. কে বলেছিলেন, আপনাকে আমি এমন এক জায়গায় পাঠাচ্ছি, যেখানে শয়তান ডিমও দিয়েছে এবং ছানাও ফুটতে শুরু করেছে।

উমর রা. এর শাসনামলে কুফার গভর্নর ছিলেন হযরত সাদ বিন আবি ওয়াক্কাস রা.। তিনি ছিলেন আশআরে মুবাশশারার অন্যতম সাহাবী।

কিন্তু তাকেও লোকজনের সমালোচনার লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হতে হয়। কিছু মানুষ ওমর রা. এর কাছে অভিযোগ করে, তিনি সঠিকভাবে নামাজ আদায় করান না।

এমনকি এক ব্যক্তি সাদ রা. কে বলেছিল, আপনি তো ইনসাফ করেন না, সম্পদ ন্যায্যভাবে বণ্টন করেন না এবং জিহাদও করেন না।

এসব কারণে হযরত সাদ বিন আবু ওয়াক্কাস রা. এর বদলে সেখানে আম্মার ইবনে ইয়াসির রা. কে দায়িত্ব দিয়ে পাঠানো হয়।

কিন্তু তার ব্যাপারেও লোকেরা ওমর রা. এর নিকট অভিযোগ করে। তখন উমর রা. বিরক্ত হয়ে বলেছিলেন,

তাদের নিকট কঠোর শাসক পাঠালে দোষ ধরে, আর নম্র শাসক পাঠালে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে।

এসব ছাড়াও আরেকটি এলাকায় সকলের অগোচরে বিশৃঙ্খলার কেন্দ্রে পরিণত হচ্ছিল। সেটি ছিল দামেস্ক। এটি ছিল প্রাচীন শহরগুলোর অন্যতম।

দামেস্ক ছিল বনু উমাইয়ার রাজনৈতিক কেন্দ্র এবং দামেস্কবাসী ছিল শাসকদের প্রতি আস্থাশীল ও আনুগত্যশীল।

এজন্য এখানে ইবনে সাবা অত্যন্ত চতুরতার সাথে কাজ করছিল।

উসমান রা. এর রাজনৈতিক পলিসি

কিছু কিছু ঐতিহাসিকরা বলেন, উসমান রা. তার শাসনকালের প্রথম ছয় বছর আবু বকর ও উমর রা. এর আদর্শ অনুযায়ী চলেছেন।

কিন্তু এরপর তিনি পরিবর্তিত হয়ে গেছেন। আর এই পরিবর্তনের দ্বারা তারা বুঝাতে চায় যে, তিনি ছয় বছর রাসূলের আদর্শে চলেছেন। কিন্তু পরে আর সেভাবে চলেন নি।

তিনি তখন জুলুম-নির্যাতন, বিশ্বাসঘাতকতা ও অপহরণের অপরাধে জড়িয়ে পড়েছেন। ফলে লোকেরা তার বিরুদ্ধে ফুঁসে উঠেছিল।

অন্যদিকে কিছু ঐতিহাসিকরা বলেন, হযরত উসমান রা. বিন্দুমাত্র পরিবর্তিত হন নি।

এই উভয় মত থেকে প্রথম মতটি নির্জলা মিথ্যাচার ও অপবাদ।

আর দ্বিতীয় মতটি সম্পর্কে কথা বলো, এটি এ অর্থে সঠিক যে, তিনি শেষ ছয় বছরে ন্যায়পরায়ণ, বিশ্বস্ত, দেশ ও জাতির কল্যানকামী এবং রাষ্ট্রের একজন যোগ্য শাসকরূপে চলেছেন।

তবে বাস্তবতা হলো, ২৭-২৯ হিজরী পর্যন্ত মুসলিমবিশ্বে একটি পরিবর্তন ঘটেছিল। যার ব্যাখ্যা হলো, এ সময় মুসলিমবিশ্বের আটটি অংশ ছিল।

যথা: মক্কা, মদিনা, ইয়ামেন, বাহরাইন, কুফা, বসরা, দামেস্ক, মিসর।

মদীনা, মক্কা, ইয়ামেন ও বাহরাইনে এককথায় বলতে গেলে জাজিরাতুল আরবে তখন কোনো সেনাছাউনি ছিল না।

এসব এলাকার গভর্নরদের হাতে ছিল সমাজ পরিচালনা ও বিচারব্যবস্থা পরিচালনার দায়িত্ব।

দামেষ্ক, মিসর, কুফা ও বসরায় তখন সেনাছাউনি ছিল। যোগাযোগ ও বসবাসের দিক থেকে এগুলো ছিল বড় বড় শহর। দেশের সামরিক শক্তি ছিল এই চার শহরের গভর্নরদের হাতে।

এই চার শহরের বড় দুটি শহরের গভর্নর ছিল হযরত উসমান রা. এর আত্মীয়। শামে মুয়াবিয়া রা. ও কুফায় ওয়ালিদ ইবনে উকবা রা.।

অন্যদিকে অপর দুই শহরের গভর্নর ছিল ভিন্ন গোত্রের। বসরায় আবু মুসা আশআরী রা. ও মিসরে আমর ইবনে আস রা.।

কিন্তু ২৭ হিজরীর আগ পর্যন্ত উক্ত গভর্নররাই শহরগুলো পরিচালনা করতেন।

কিন্তু ২৭ হিজরীতে উসমান রা. মিসর থেকে আমর ইবনে আস রা. কে অব্যাহতি দিয়ে সেখানে তার দুধভাই আব্দুল্লাহ ইবনে আবু সারাহ্ রা. কে গভর্নর নিযুক্ত করেন।

আর ২৯ হিজরীতে বসরা থেকে আবু মুসা আশআরী রা. কে অব্যাহতি দিয়ে সেখানে আপন মামাতো ভাই আব্দুল্লাহ বিন আমের রা. কে গভর্নর নিযুক্ত করেন।

উসমান রা. এর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র

আত্মীয়দের নিয়োগ ও জনরোষ – উসমান রা. এর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র

এই অদলবদল হযরত উসমান রা. তার দুরদর্শীতার মাধ্যমে অন্যদের সাথে পরামর্শ করে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। কিন্তু মানুষ এটা দেখেছিল অন্যরকম দৃষ্টিতে।

এছাড়াও আমরা যদি সম্পূন্ন চিত্রটা দেখি যে, কারা কারা উসমান রা. এর আত্মীয় ছিল তাহলে আমরা দেখতে পাই তারা সকলেই দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে যোগ্য ব্যক্তি ছিলেন।

সে সময় বড় বড় চার শহরের গভর্নরই ছিলেন হযরত উসমান রা. এর বংশের ব্যক্তিরা বা আত্মীয়রা। আর উসমান রা. নিজেও যেহেতু উমাইয়া বংশের ব্যক্তি ছিলেন,

তাই অজ্ঞ ব্যক্তিরা ধারণা করতে লাগলো যে, হযরত উসমান রা. জাতীয় কল্যানের ভিত্তিতে নয়।

বরং নিজের বংশের মান-মর্যাদা উঁচু করার লক্ষ্যে আত্মীয়-স্বজনকে পদের অধিকারী বানিয়ে দিয়েছেন।

তথ্যসুত্র

মুসলিম উম্মাহর ইতিহাস, খন্ড ৪, পৃষ্ঠা ১৩৭-১৫০

তারিখে দিমাশক, খন্ড ২৯, পৃষ্ঠা ৫-৯

আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া, খন্ড ২, পৃষ্ঠা ২৬৩

তারিখে তাবারী, খন্ড ৪, পৃষ্ঠা ৩৪০-৩৪১

তারিখে খলিফা বিন খাইয়াত, ‍পৃষ্ঠা ১৭৮

দামেস্কের গভর্নর কে ছিল

হযরত উসমান রা. এর সময়ে দামেস্কের গভর্নর ছিল হযরত মুয়াবিয়া রা.

মিসরের গভর্নর কে ছিল

হযরত উসমান রা. এর সময়ে প্রথমে আমর বিন আস রা. এবং পরে হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আবু সারাহ্ রা.

গাজ্জার জন্য অনুদান

৭ অক্টোবর ২০২৩ তারিখে তুফানুল আকসা যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকেই ফিলিস্তিনের গাজ্জায় অসংখ্য মানুষ আহত ও শহীদ হয়েছে। বহু মানুষ নিজেদের ঘর-বাড়ী হারিয়েছে। এছাড়াও বর্তমানে গাজ্জার ৯৮% মানুষ অনাহারে জীবন-যাপন করছে। গাজ্জার মানুষের এই দুঃসময়ে আমরা যদি তাদের পাশে না দাঁড়াই তাহলে কে দাঁড়াবে?

আর-রিহলাহ ফাউন্ডেশন তুফানুল আকসা যুদ্ধের শুরু থেকেই ফিলিস্তিনের গাজ্জার জন্য ডোনেশন সংগ্রহ করে আসছে। এই মহান কাজে আপনিও আমাদের সাথে যুক্ত হতে পারেন।

অনুদান দিন

Scroll to Top