উসমান রা. এর আফ্রিকা অভিযান

উসমান রা. এর আফ্রিকা অভিযান – মিশর সীমান্তের সাথে সংযুক্ত উত্তর আফ্রিকার বিস্তীর্ণ ভূমি তৎকালীন সময়ে রোমান শাসক জুরজিরের নিয়ন্ত্রণে ছিল।

প্রথম দিকে সে রোমান সম্রাটের অধীনস্থ গভর্নর ছিলেন। কিন্তু এশিয়া থেকে রোমানদের নিয়ন্ত্রণ বিলুপ্ত হওয়ার পর তিনি স্বাধীনতা ঘোষণা দিয়ে দেন।

তার রাজ্য মিশর সীমান্ত থেকে নিয়ে মরক্কো পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। বর্তমানে এখানে তিউনিশিয়া, লিবিয়া, আলজাজিরা এবং মরক্কো অবস্থিত।

একবার মিসরের গভর্নর হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে সাদ ইবনে সারাহ রা. ১০ হাজার মুজাহিদ নিয়ে আফ্রিকার বিশাল মরুভূমি পাড়ি দেন।

এরপর তিনি রোমানদের শাসক জুরজিরের সীমান্তে প্রবেশ করেন। এখানে খন্ড খন্ড কয়েকটি যুদ্ধ হয়।

প্রতিপক্ষের বহুসংখ্যক সৈন্য বন্দি ও নিহত হয়।

স্থানীয় মানুষরা জুরজিরের জুলুম-নির্যাতন এবং রোমানদের কঠোরতার মধ্যে জীবন অতিবাহিত করছিল।

তারা ইসলামের সৌন্দর্য দেখে দলে দলে ইসলাম কবুল করতে থাকে।

কোনো কোনো এলাকার লোকেরা যুদ্ধ ব্যতিতই সন্ধি করে ফেলে। হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে সাদ রা. এর উদ্দেশ্য যেহেতু ইসলাম প্রচার, আর তা যুদ্ধ ব্যতিতই অর্জন হয়েছিল, তাই তিনি আফ্রিকা থেকে ফিরে আসেন।

আফ্রিকায় জিহাদ পরিচালনার জন্য খলিফার অনুমতি

২৬ হিজরী তথা ৬৪৬ খ্রিষ্টাব্দে হযরত আমর ইবনে আস রা. মিশরের গভর্নর পদ থেকে অব্যাহতি নেন।

তখন তার স্থলে নিযুক্তি দেয়া হয় হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে সাদ রা. কে।

আব্দুল্লাহ রা. মিশরে পৌছে একের পর এক বিভিন্ন দিকে অশ্বারোহী বাহিনী পাঠাচ্ছিলেন, যেভাবে আমর রা. পাঠাতেন।

এদিকে জুরজির মুসলমানদের উত্তর আফ্রিকায় ইসলাম প্রচার-প্রসার ভালোভাবে নেয় নি। তাই সে যুদ্ধের জন্য তৈরি হতে থাকে।

হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে সাদ রা. এর নিকট সকল তথ্য পৌঁছলে খলিফা উসমান রা. এর নিকট এই অঞ্চলে জিহাদ পরিচালনার অনুমতি চান।

তখন হযরত উসমান রা. সাহাবাদেরকে একত্র করে এ ব্যাপারে তাদের পরামর্শ চান।

তখন হযরত সায়িদ ইবনে যায়েদ রা. ব্যতিত সকল সাহাবী আফ্রিকা বিজয়ের ব্যাপারে নিজেদের অভিমত পেশ করেন।

হযরত সায়িদ ইবনে যায়েদ রা. ছিলেন উমর রা. এর সীমানার উপর অটল। উসমান রা. সকলের ঐক্যমতে এবং উপস্থিতিতে জিহাদের ঘোষণা দিয়ে দেন।

এই যুদ্ধে অংশগ্রহনের জন্য মদীনা থেকে অনেক স্বেচ্ছাসেবী মুজাহিদ যোগদান করেন।

তা ছাড়া অনেক সাহাবী যেমন, হাসান, হুসাইন, আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস ও আব্দুল্লাহ ইবনে জাফর রা. যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন।

জিহাদের জন্য অগ্রসর

মুসলমানরা ২০ হাজার মুজাহিদ নিয়ে জুরজিরের এলাকায় প্রবেশ করেন।

সেনাপতি জুরজির তখন সুবাইতিলা নামক স্থানের ১ মঞ্জিল সামনে ১ লক্ষ ২০ হাজার সৈন্য নিয়ে যুদ্ধের জন্য অপেক্ষা করছিল।

অবশেষে উভয় বাহিনী মুখোমুখি হয়। জুরজিরের বাহিনী মুসলমানদের ৬ গুণ বড় ছিল।

কিন্তু মুসলমানরা তাদের দেখে সামান্য পরিমাণও ভীত হন নি।

কেননা কাদেসিয়া ইয়ারমুকের যুদ্ধে মুসলমানরা কম থাকা সত্ত্বেও আল্লাহর রহমতে বিজয় অর্জন করেছিলেন।

আল্লাহর নিকট আস্থা ও বিশ্বাসই মুসলমানদের পদতলে বিজয় এনে দিত।

যুদ্ধের পূর্বে আব্দুল্লাহ ইবনে সাদ ইবনে আবু সারাহ রা. জুরজিরের নিকট ইসলাম কবুল করার দাওয়াত পেশ করেন অথবা জিযিয়া দেয়ার প্রস্তাব রাখেন।

কিন্তু সে তা ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করে। অবশেষে তুমুল লড়াই শুরু হয়। কয়েকদিন পর্যন্ত এই যুদ্ধ অব্যাহত থাকে।

প্রতিদিন সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত লড়াই হতো।

উসমান রা. এর আফ্রিকা তে সাহায্যকারী বাহিনী পাঠানো

হযরত উসমান রা. এই যুদ্ধের ব্যাপারে চিন্তিত ছিলেন। তখন তিনি মদীনা থেকে সাহায্যকারী বাহিনী প্রেরণ করেন।

যার নেতৃত্বে ছিল হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে যুবায়ের রা.।

যেহেতু শিশুকাল থেকেই তার বরকতের কথা লোকমুখে প্রসিদ্ধ ছিল এ জন্য মুসলমানরা তাকে দেখে অভ্যর্থনা জানিয়ে জোরে জোরে তাকবির দিতে থাকেন।

এই তাকবীর ধ্বনি শুনে জুরজির ভীত হয়ে পড়ে। সে এই তাকবিরের কারণ জিজ্ঞাসা করলে তার লোকেরা বলে, মুসলমানদের সাহায্যকারী বাহিনী চলে এসেছে।

জুরজির এতে ভীষণ পেরেশান হয়ে যায়। কিন্তু সৈন্যদের মনোবল ঠিক রাখার জন্য সে ঘোষণা করে,

যে ব্যক্তি মুসলমানদের আমির আব্দুল্লাহ বিন সাদকে হত্যা করতে পারবে, তাকে আমার মেয়ের সঙ্গে বিয়ে দিব এবং ১ লক্ষ স্বর্ণমুদ্রা (৩৬১ কোটি ২৫ লাখ টাকা) উপহার দিব।

এই ঘোষণার ফলে রোমানদের মধ্যে ব্যাপক স্পৃহা তৈরি হয়। মুসলমানরা এই কথা জানতে পারলে নিজের আমিরের ব্যাপারে শঙ্কিত হয়ে উঠে।

হযরত আব্দুল্লাহ বিন সাদ রা. সতর্কতাবশত একদিন যুদ্ধের ময়দানে সরাসরি উপস্থিত না হয়ে আড়াল থেকে তদারকি করতে থাকেন।

তখন হযরত আব্দুল্লাহ বিন যুবায়ের রা. তাকে বললেন, আপনিও ঘোষণা দিয়ে দিন, যে ব্যক্তি জুরজিরকে হত্যা করতে পারবে,

তাকে ১ লক্ষ স্বর্ণমুদ্রা (৩৬১ কোটি ২৫ লাখ টাকা) উপহার দিব। পাশাপাশি জুরজিরের মেয়ের সাথে তাকে বিয়ে দিব।

সেনাপতি আব্দুল্লাহ বিন সাদ রা. এর প্রস্তাবটি পছন্দ হয়। তিনি এই ঘোষণা দেয়ার পর জুরজির ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে পড়ে।

উসমান রা. এর আফ্রিকা
উসমান রা. এর আফ্রিকা অভিযান

নতুন দিকে যুদ্ধের মোড়

কয়েকদিন পর্যন্ত যুদ্ধের কোনো ফায়সালা হচ্ছিল না। হযরত আব্দুল্লাহ বিন যুবাইর রা. যুদ্ধের কৌশল পরিবর্তন আনার জন্য পরামর্শ দেন যে,

আগামীকালের যুদ্ধে আমরা কিছু সৈন্য তাবুতে রাখবো। যখন উভয় বাহিনী যুদ্ধ করতে করতে ক্লান্ত হয়ে যাবে তখন এই তাজাদম সৈন্য এসে ক্লান্ত শত্রুর উপর আক্রমণ করবে।

কমান্ডাররা সকলে ঐক্যমত পোষণ করেন। ফলে আব্দুল্লাহ বিন সাদ ইবনে আবু সারাহ রা. এই প্রস্তাবটি গ্রহণ করেন।

রীতিমতো সূর্য উদিত হওয়ার পর পর যুদ্ধ শুরু হয়ে যায়। নির্বাচিত কিছু অশ্বারোহীকে তাবুতে আরাম করার নির্দেশ দেয়া হয়।

সারাদিন যুদ্ধ শেষে বিকেলের দিকে হযরত আব্দুল্লাহ বিন যুবাইর রা. কিছু বাহাদুর মুজাহিদ নিয়ে শত্রুর উপর ঝাঁপিয়ে পড়েন।

তাদের কাতার লন্ডভন্ড করে তাদেরকে পেছন দিকে তাড়িয়ে দেন। জুরজির সেখানে ঘোড়ার উপর বসে ছিল। দুজন বাঁদি তাকে বাতাস দিচ্ছিল।

জুরজির ও তার দেহরক্ষীরা আব্দুল্লাহ ইবনে যুবায়ের রা. কে আসতে দেখে মনে করে, হয়তো শত্রুদের কোনো দূত আসছে।

তাই সে পলায়ন কিংবা প্রতিরোধের কোনো চেষ্টা করে নি। কিন্তু একটুপর তাদেরকে হাতিয়ার কোষমুক্ত করতে দেখে ঘাবড়ে যায়।

জুরজির ঘোড়া হাঁকিয়ে পলায়নের চেষ্টা করে। কিন্তু আব্দুল্লাহ ইবনে যুবায়ের রা. তার নিকট পৌঁছে যান এবং তরবারি দ্বারা শরীর থেকে মাথা আলাদা করে ফেলেন।

বাদশাহকে নিহত হতে দেখে কাফেরদের মনোবল ভেঙ্গে যায়। গোটা বাহিনী পলায়ন শুরু করে। তাদের শাহজাদিকে গ্রেপ্তার করা হয়।

ওয়াদা অনুযায়ী তাকে হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে যুবায়ের রা. এর নিকট সোপর্দ করা হয়।

মুসলিম বাহিনী সামনে অগ্রসর হয়ে কাফেরদের রাজধানী নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেন।

এই বিজয়াভিযানে মুসলমানরা বহু গণিমত অর্জন করেন। তার পরিমাণ এত বেশি ছিল যে,

প্রত্যেক মুসলমান সৈনিক ১ হাজার দিনার ( ৩ কোটি ৬১ লাখ ২৫ হাজার টাকা) করে পেয়েছিলেন।

তথ্যসুত্র

১. মুসলিম উম্মাহর ইতিহাস, খন্ড ৩, পৃষ্ঠা ২৮২-২৮৭

২. উসমান ইবনু আফফান রা., ড. আলী মুহাম্মাদ সাল্লাবি, কালান্তর প্রকাশনী, পৃষ্ঠা ২৯৪-৩০২

৩. এক স্বর্ণমুদ্রাকে অর্থাৎ দিরহামকে ৪.২৫ গ্রাম স্বর্ণ ধরে বাসুস এর ১ এপ্রিল ২০২৩ এর নোটিশ অনুযায়ী বাংলাদেশে স্বর্ণের দাম অনুযায়ী মান বসানো হয়েছে

গাজ্জার জন্য অনুদান

৭ অক্টোবর ২০২৩ তারিখে তুফানুল আকসা যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকেই ফিলিস্তিনের গাজ্জায় অসংখ্য মানুষ আহত ও শহীদ হয়েছে। বহু মানুষ নিজেদের ঘর-বাড়ী হারিয়েছে। এছাড়াও বর্তমানে গাজ্জার ৯৮% মানুষ অনাহারে জীবন-যাপন করছে। গাজ্জার মানুষের এই দুঃসময়ে আমরা যদি তাদের পাশে না দাঁড়াই তাহলে কে দাঁড়াবে?

আর-রিহলাহ ফাউন্ডেশন তুফানুল আকসা যুদ্ধের শুরু থেকেই ফিলিস্তিনের গাজ্জার জন্য ডোনেশন সংগ্রহ করে আসছে। এই মহান কাজে আপনিও আমাদের সাথে যুক্ত হতে পারেন।

অনুদান দিন

Scroll to Top