আবিসিনিয়ায় আবু বকরের হিজরত

আবিসিনিয়ায় আবু বকরের হিজরত –  সবেমাত্র মক্কায় শত মানুষ নিজেকে আল্লাহর জন্য আত্মসমর্পণ করেছে। তারা সর্বদা আল্লাহর ইবাদতে লিপ্ত থাকে কিংবা কোনো ভালো কাজে মশগুল থাকে।

আবু বকর রা. ইসলামকে আরো ছড়িয়ে দেয়ার জন্য দিন-রাত চেষ্টা করতে লাগলেন। কিন্তু কট্টরপন্থি মূর্তিপূজকরা বারবার বাঁধা দিতে লাগলো।

তারা মুসলমানদের উপর নির্যাতন করতে লাগলো গণহারে। আবু বকর এবং নবীজির মতো সম্মানিত ব্যক্তিদেরকেও তারা কা’বার প্রাঙ্গনে মারধর করতো।

যেই নবীজি দীর্ঘ ৪০ বছর মক্কার মানুষদের নিকট আল-আমিন নামে প্রসিদ্ধ ছিলেন, যিনি কারো সাথে কোনোরূপ ঝামেলায় জড়ান নি, তাকেও কাফেররা আজ ইসলাম প্রচারের কারণে গালিগালাজ করে, মারধর করে।

আবু বকর রা. এর মতো জ্ঞানী এবং বিজ্ঞ ব্যক্তিকেও তারা এই নির্যাতন থেকে রেহাই দেয় নি। পরিস্থিতি ক্রমে ক্রমেই আরো ভয়াবহ হতে লাগলো।

এরইমধ্যে রাসূলের অনুমতিক্রমে কিছু সাহাবা হাবশায় তথা বর্তমান ইথিওপিয়ায় হিজরত করেন। কাফেরদের নির্যাতনে বাধ্য হয়ে আবু বকরও চাইলেন হিজরত করতে।

আবিসিনিয়ায় হিজরতের জন্যে হযরত আবু বকর এর সিদ্ধান্ত

আবু বকরের হাবশার উদ্দেশ্যে গমন

আবিসিনিয়ায় আবু বকরের হিজরতহযরত আয়েশা রা. বর্ণনা করেন, আমার বাবা অর্থাৎ আবু বকর রা. হিজরতের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়েন। তিনি বারকুল গিমাদ পর্যন্ত চলে গিয়েছিলেন।

বারকুল গিমাদ বর্তমানে সৌদি আবরের জেদ্দা শহরের কোনো এলাকার নাম।

সেখানে তার সাথে কারাহ গোত্রের সরদার ইবনে দাগানার সাথে দেখা হয়। অনেক ইতিহাসবিদ ইবনে দাগানার মূল নাম হিসেবে উল্লেখ করেছেন,

হারিস ইবনে ইয়াজিদ। আবার কেউ বলেছেন তার নাম মালিক। কতক ঐতিহাসিক লিখেছেন, তার নাম রাবিআ বিন রাফি। আর কারাহ গোত্র হলো (হাওন ইবনে খুজাইমা) খুজাইমা গোত্রের শাখা গোত্র।

ইবনে দাগানা তাকে জিজ্ঞাসা করেন, হে আবু বকর! আপনি এত প্রস্তুত হয়ে কোথায় যাচ্ছেন?

আবু বকর রা. জবাব দিলেন, আমার জাতি আমাকে দেশ থেকে বের করে দিয়েছে। আমি এমন কোথাও চলে যেতে চাই, যেখানে আমি স্বাধীনভাবে আমার রবের ইবাদত করতে পারবো।

এটা শুনে ইবনে দাগানা আঁতকে উঠলেন। বললেন, কোনো প্রয়োজন নেই। আপনি তো অসহায়দের সাহায্য করেন। আত্মীয়দের খেয়াল রাখেন। আপনাকে আমি নিরাপত্তা দিচ্ছি। আপনি আমার সাথে মক্কায় চলুন।

পূনরায় মক্কায় প্রত্যাবর্তন

আবু বকর রা. ইবনে দাগানার সাথে মক্কায় ফিরে আসেন। ইবনে দাগানা তখন কুরাইশদের নেতৃবর্গের সাথে সাক্ষাৎ করে বললেন,

তোমরা কি আবু বকরের মতো এমন একজন গুণধর ব্যক্তিকে তাড়িয়ে দিচ্ছ, যিনি অভাবীদের সাহায্য করে এবং আত্মীয়দের খেয়াল রাখে?

যিনি অন্যের বোঝা উঠিয়ে নেন এবং বিপদগ্রস্তদের সহায়তা করেন?

কুরাইশরা তখন ইবনে দাগানার নিরাপত্তার প্রস্তাব মেনে নেয়। তবে তারা শর্ত জুড়ে দেয় যে, তিনি ঘরের বাহিরে কোনোরূপ ইবাদত করতে পারবেন না।

কা’বার প্রাঙ্গনে আসা নিষেধ। মানুষকে তিনি তার ধর্মের দিকে আহবান করতে পারবেন না। কারণ, আমরা আশংকা করি, তার ইবাদত দেখে অথবা তার কথায় আমাদের যুবক, নারী এবং বৃদ্ধরা ধর্মত্যাগ করবে।

আবু বকরের কার্যক্রম

 আবু বকরের নিকট ইবনে দাগানা এই সংবাদ পৌঁছে দিলে তিনি ঘরেই ইবাদত করতে লাগলেন। ঘর থেকে বের হন না।

তখন তিনি বুদ্ধি করে তার বাড়ির আঙ্গিনায় একটি ছোট ইবাদতখানা নির্মাণ করেন। সেখানে তিনি নামাজ এবং কুরআন তেলওয়াত করতে লাগলেন।

কুরাইশদের যুবক, নারী-পুরুষরা সেখানে দাঁড়িয়ে তেলওয়াত শ্রবণ করতো। কুরাইশরা এই পরিস্থিতি দেখে ভীত হয়ে গেল।

তারা ইবনে দাগানাকে বললো, আমরা আপনার কারণে আবু বকরকে তার অবস্থার উপরে ছেড়ে দিয়েছিলাম। শর্ত ছিল,

তিনি তার ঘরে নামাজ বা তেলওয়াত করবেন। কিন্তু তিনি শর্ত ভঙ্গ করে ঘরের বাহিরে ইবাদতখানা বানিয়ে সেখানে নামাজ এবং তেলওয়াত করছেন।

এর ফলে অনেকেই বিভ্রান্ত হয়ে যাচ্ছে। যদি সে এমন করতে থাকে তাহলে আপনি তার নিরাপত্তা উঠিয়ে নিন।

আবু বকরের নিকট ইবনে দাগানা এই কথা বলার পর আবু বকর বললেন,

ঠিক আছে। আপনি জিম্মাদারী উঠিয়ে নিন। আল্লাহর নিকট আমি নিরাপত্তা কামনা করছি।

নিরাপত্তা উঠিয়ে নেয়ার পর

ইবনে দাগানা নিরাপত্তা উঠিয়ে নেয়ার পর একবার কা’বার প্রাঙ্গনে গেলেন। তখন কুরাইশদের একজন ব্যক্তি আবু বকরের মাথায় মাটি ঢেলে দেয়।

তখন আবু বকরের পাশ দিয়ে ওয়ালিদ ইবনে মুগিরা অতিক্রম করছিল। আবু বকর তাকে বললেন, দেখুন সে কি কাজটি করলো!

ওয়ালিদ ইবনে মুগিরা বললো, এটা তো তোমার কর্মফল। তখন আবু বকর এই কথা বলতে বলতে চলে গেলেন, আমার সৃষ্টিকর্তা কতই না ধৈর্যশীল!

তথ্যসুত্র

১. আবু বকর সিদ্দিক রা.। মুহাম্মাদ আস সাল্লাবী। পৃষ্ঠা ৬৮

হযরত আবু বকর রা. জীবনী। আজিজুল হক আনসারী। পৃষ্ঠা ৪৩

২. আবু বকর সিদ্দিক রা.। পৃষ্ঠা ৬৯

হযরত আবু বকর রা. জীবনী। পৃষ্ঠা ৪৩

৩. আবু বকর সিদ্দিক রা.। পৃষ্ঠা ৬৯

হযরত আবু বকর রা. জীবনী। পৃষ্ঠা ৪৩

৪. আবু বকর সিদ্দিক রা.। পৃষ্ঠা ৭০

আবু বকর সিদ্দিক বইয়ের রেফারেন্স অনুযায়ী, আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া। খণ্ড ৩। পৃষ্ঠা ৯৫

FAQ

আবু বকরকে কে নিরাপত্তা দেয়?

ইবনে দাগানা

কেন আবু বকর রা. হাবশায় হিজরত করতে চেয়েছিলেন?

কাফেরদের যুলুম-নির্যাতন থেকে রেহাই পেয়ে একান্তে আল্লাহর ইবাদত করার জন্য

আমি একজন ইসলামিক আলোচক, লেখক। ছোটবেলায় পড়ালেখা করেছি কওমী মাদ্রাসায়। পরবর্তীতে সাইন্স বিভাগ থেকে এসএসসি পরীক্ষা দিয়ে কৃতিত্বের সাথে পাশ করি। বর্তমানে আমি ডিপ্লোমা ইন মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং এ অধ্যায়নরত। অবসরে আমি বই পড়তে পছন্দ করি। নতুন কিছু শিখতে, নতুন কিছু জানতে ভালোবাসি। আমার ইচ্ছা, ভালো মানুষ হয়ে সমাজকে সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজে বিরত রাখার চেষ্টা করা।

https://www.arhasan.com