মুসলিমবিশ্বে জাতীয়তাবাদের প্রভাব – ১৫০ বছর আগে মুসলিমবিশ্বের অবস্থার দিকে অবলোকন করতে আমরা দেখতে পাই, এক নিভুনিভু খিলাফতের ছায়ায় এই উম্মাহ একত্রিত হয়ে বসবাস করছে। সীমান্তের কাঁটাতারের বেড়া নেই, পাসপোর্ট সংক্রান্ত সমস্যা নেই।
পরবর্তীতে এমন কী হলো যে, খিলাফত পতনের পর এর থেকে প্রায় অর্ধশত রাষ্ট্রের জন্ম হলো? মুসলিমবিশ্বের শৌর্যবীর্য থাকাকালীন কুফফার বিশ্ব তাদের বাদ-মতবাদ মুসলমানদের উপর বর্তমানের মতো নগ্নভাবে চাপিয়ে দেওয়ার দুঃসাহস করেনি।
সর্বপ্রথম আব্বাসি খিলাফতের সময় মুসলমানরা পশ্চিমা গ্রিক ফিলোসফির পাল্লায় পড়ে নিজের ঈমান বিসর্জন দেওয়া শুরু করে। কালাম শাস্ত্রের উদ্ভব, মুতাজিলাদের দৌরাত্ম্য, ইমাম গাজালি রহ. সহ অন্যান্য মনীষীদের দীর্ঘ প্রচেষ্টার পর দর্শনশাস্ত্রের ফিতনার দরজায় তালা দেওয়া সম্ভব হয়।
১০৯৬ থেকে চলমান ক্রুসেডের সময় ইউরোপে জ্ঞানের আলো বলতে কিছু ছিল না। পুরো ইউরোপজুড়ে পাদরিদের কুঁটচালে ফেঁসে গিয়ে হাপিত্যেশ করছিল ইউরোপ। পরপর কয়েকটা ক্রুসেড যুদ্ধ পরিচালনা করল তারা। কিন্তু জিততে পেরেছিল মাত্র একটা যুদ্ধে।
ইউরোপীয় জাতীয়তাবাদের জন্ম ও আমাদের পতনের সূচনা
খ্রিষ্টধর্মের পাদরিরা প্রথম ক্রুসেডে জিতে গিয়ে যত অনুসারী ভাগে এনেছিল, তার থেকে বেশি অনুসারী হারাতে হয়েছে পরবর্তী ক্রুসেডগুলোতে হেরে যাওয়ার ফলে। ইউরোপজুড়ে মহামারি, পাদরিদের চাপিয়ে দেওয়া ট্যাক্স ও যুদ্ধের ফলে মানুষ একটা সময় ধর্ম থেকেই বিমুখ হওয়া শুরু করে।
নতুন নতুন চিন্তকদের উদ্ভব ঘটে ইউরোপে। তারই পরিপ্রেক্ষিতে রেনেসাঁ, রিফরমেশন ও এনলাইটেনমেন্ট আন্দোলনের উত্থান ঘটে ইউরোপে।
১৬১৮-১৬৪৮ সাল মোট এই ৩০ বছর ইউরোপে ক্যাথলিক এবং প্রোটেস্ট্যান্ট মতবাদের মাঝে লাগাতার যুদ্ধ হয়। ‘ত্রিশ বছরের যুদ্ধ’ নামে পরিচিত এটি। নিজেদের মধ্যে মারামারির ফলে ইউরোপে মারা যায় প্রায় ৮০ লাখ মানুষ।
ইউরোপে আধুনিক রাষ্ট্রচিন্তার উদ্ভব ঘটে ১৬৪৮ সালে ওয়েস্টফেলিয়া চুক্তির পর। পরবর্তীতে তাদের মধ্যে জাতীয়তাবাদী চিন্তাধারার উদ্ভব ঘটে ১৮শ শতাব্দীর শেষ দিক থেকে।
এই সময়টা থেকে ইংল্যান্ড, ফ্রান্স, রাশিয়া, জার্মানি একযোগে মুসলিমবিশ্বের উপর হামলে পড়ে। কেননা সর্বশেষ মুসলিম খিলাফত উসমানি সাম্রাজ্যের সীমানা ইউরোপ, আফ্রিকা ও এশিয়াজুড়ে ছিল।
১৮শ ও ১৯ শতকের এই সময়টায় বেশ কয়েকজন দুর্বল খলিফা শাসনক্ষমতায় আসেন। তাদের ভুলভাল সিদ্ধান্ত ও শরীয়াহবিহীন কার্যকলাপের ফলে মুসলিমবিশ্ব পতনের আরও ধার প্রান্তে চলে যায়।
উসমানি খিলাফতের পতন ও মুসলিমবিশ্বে জাতীয়তাবাদের প্রভাব
সর্বশেষ স্বাধীন খলিফা, সুলতান আব্দুল হামিদ রহ. কিছুটা চেষ্টা করেছিলেন উম্মাহকে আবার একত্রিত করার। কিন্তু আগেই তরুণ তুর্কিদের মাথায় বিষ প্রবেশ করিয়ে দিয়েছিল কুফফাররা। ফলাফল খলিফাকে অপসারণ করা হয় ১৯০৯ সালে।
পরবর্তী ১০ বছরের মধ্যেই উসমানীয়রা নিজেদের ভূমির প্রায় ৬০-৭০% হারিয়ে ফেলে। বৃহত্তর বলকান অঞ্চল (১৯১২-১৩), আফ্রিকার অঞ্চল ও মিশর হাতছাড়া হয়। এই সময় কুফফাররা বিশ্বযুদ্ধের নামে উসমানীয়দেরকে আরও কঠিনভাবে কামড়ে ধরে।
বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার পর দেখা গেল হিযাযের পবিত্র ভূমি এবং শামের বাইতুল মাকদিসও (১৯১৮) হাতছাড়া হয়ে গিয়েছে উসমানীয়দের হাত থেকে।
তৎকালীন তিন কুফরি শক্তি – ব্রিটেন, ফ্রান্স ও রাশিয়া – একটি চুক্তি করে নিজেদের মধ্যে উসমানি খেলাফাতের ভূমিগুলো ভাগাভাগি করে নেয়। যেটি ইতিহাসে ‘সাইকো-পিকো চুক্তি’ (১৯১৬) নামে প্রসিদ্ধ।
১৯২৪ সালে মুরতাদ কামালের মাধ্যমে খিলাফতের শেষ চিহ্নটিও ধ্বংস করে দেওয়া হয়। এখান থেকেই মুসলিমবিশ্বে জাতীয়তাবাদের প্রভাব এর সূচনা ঘটে। একই সাথে ঔপনিবেশিক শাসনামল, সেক্যুলার শিক্ষাব্যবস্থা সবচেয়ে বেশি অবদান রাখে জাতীয়তাবাদের প্রচার-প্রসারে।
আরব জাতীয়তাবাদ ও বাথ পার্টি
মুসলিমবিশ্বের এত এত দেশ থাকার পরও আরববিশ্বের গুরুত্ব সর্বদাই উঁচুতে থাকবে। যে-ই আরব বিশ্বকে ইসলামের বন্ধনে আবদ্ধ করে দিয়েছিলেন নবীজি ও সাহাবিরা, সেই আরববিশ্বে একটা সময় জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের উদ্ভব ঘটে।
বিংশ শতাব্দীর শেষ দিকে বাথ পার্টি নামক একটি দল প্রতিষ্ঠিত করে সিরিয়ান এক খ্রিষ্টান মাইকেল আফলাক। পরবর্তীতে এর রাজনৈতিক আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে লেবানন, সিরিয়া, ইরাক, বাহরাইনসহ অন্যান্য অঞ্চলে।
নতুন এই রাজনৈতিক চিন্তাধারায় জাতীয়তাবাদকে স্থান দেওয়া হয় ধর্মের ওপরে। জাহেলিয়াতের নতুন রূপ আবার উঁকি দিতে থাকে আরবের মাটিতে। সিরিয়াতে এই জাতীয়তাবাদী আন্দোলন উপহার দিয়েছে ধ্বংসযজ্ঞ এবং গণহত্যা। ইরাকে উপহার দিয়েছিল ধর্মবিদ্বেষ।
এর পাশাপাশি আরবে সমাজতান্ত্রিক আন্দোলন ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য সোভিয়েত ইউনিয়ন একটা সময় চেষ্টা করেছিল। বর্তমানে লিবারেলিজম ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য আমেরিকা চেষ্টা করছে।
এই প্রতিটা ক্ষেত্রেই একটি কমন জিনিস দেখা যায়। মুসলমানদের ঈমান-আকিদা, চিন্তাচেতনা, শিক্ষাদীক্ষা নষ্ট করার জন্য সমস্ত কাফিরদের চেষ্টা একটি বিন্দুকে ঘিরে আবর্তিত হয়।
খেলাফত পতনের পর মুসলিমবিশ্বে জাতীয়তাবাদের প্রভাব
জাতীয়তাবাদী আন্দোলন ও চিন্তাধারা যে শুধু আরবেই ছড়িয়েছে, এমনটা নয়। সকল মুসলিম দেশগুলো আজ এই বিষাক্ত থাবায় আক্রান্ত। বাংলাদেশ, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, পাকিস্তান, তুরস্কসহ সকল মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশগুলোতে বামপন্থি ও ডানপন্থি উভয় দলের মধ্যেই একটা স্লোগান জনপ্রিয়।
“আমি আমি (দেশের নাগরিক), এরপর আমি মুসলিম।” আমাদের দেশে এটা এভাবে বলে, আগে আমি বাঙালি এরপর আমি মুসলিম। প্রাচীন জাহেলিয়াতের মতো যারা ধর্ম পরিচয়কে গৌণ করে মাটির পরিচয়কে কামড়ে ধরে, তারা এটা বুঝতে পারেনি যে, মানুষ সভ্য হয় কীভাবে?
যে-ই ব্যক্তির মধ্যে ঈমান নেই, যে মুসলিম নয়, সে কখনো প্রকৃত মানুষ হতে পারে না। মুসলিম পরিচয়ের উপর অন্য সকল পরিচয় পরিত্যাজ্য।
কেননা সেসব পরিচয় আসমানি কিতাব দ্বারা সমর্থিত নয়। কুরআনে সুস্পষ্টভাবে আমাদের পরিচয়ের কথা উল্লেখ আছে। বলা হচ্ছে,
يَاأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللهَ حَقَّ تُقَاتِهِ وَلاَ تَمُوتُنَّ إِلاَّ وَأَنْتُمْ مُسْلِمُونَ
‘হে মুমিনগণ! তোমরা যথার্থভাবে আল্লাহকে ভয় কর এবং অবশ্যই মুসলিম না হয়ে মৃত্যুবরণ করো না’ (সূরা আলে ইমরান, আয়াত ১০২)
বিভিন্ন সময় ফিলিস্তিন ইস্যু, আঞ্চলিক ইস্যুসহ অনেক কিছু নিয়েই মধ্যপ্রাচ্যে একটা সম্মেলন হয়। যেটিকে আরব লীগ নামে ডাকা হয়।
উক্ত সম্মেলনে শুধু আরবরাই অংশগ্রহণ করে। প্রচার করাও হয় এমনভাবে যে, এটি শুধু আরবদের কাজ। অথচ সমগ্র মুসলিমবিশ্ব নিয়ে একত্রিত হওয়া উচিত ছিল। ওআইসি এর মতো একটা কাপুরুষ সংগঠন নষ্ট হয়েছে কুফফারদের নজরদারির ফলে।
হ্যাঁ, আমি এটা বলছি না যে, এটাই একমাত্র সমাধানের পথ। এসব সভা-সেমিনার দিয়ে আদৌ কখনো কোনো লাভ হয় না।
মুসলিমবিশ্বের অধিকাংশ দেশের সরকারপ্রধানরা সুস্পষ্ট মুরতাদ। কিন্তু এরপরও আমরা বিভিন্ন সময় আশা ব্যক্ত করি। বিভিন্ন সম্মেলন থেকে কখনো খুশির ঝিলিক দেয় অন্তরে।
সর্বশেষ আলাপ এই, জাতীয়তাবাদী চিন্তাধারা যতদিন মুসলিম উম্মাহর অন্তরে বাসা বেধে থাকবে, যতদিন স্থানীয় কাপড়ের পূজা (পতাকা) করা হবে এবং নিজস্ব রুটির টুকরো (মানচিত্র) নিয়ে আদিখ্যেতা দেখানো হবে, ততদিন উম্মাহকে আরও মার খাওয়ার জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে।
মুসলিমবিশ্ব এক জাতি, তাদের মানচিত্র একটাই হবে পূর্ব তুর্কিস্তান থেকে দিয়ে স্পেন পর্যন্ত। তাদের পতাকাও একটাই থাকবে, যাতে লেখা থাকবে তাওহিদের বাণী। আঞ্চলিকতা কখনোই মুক্তির পথ হতে পারে না।
সবশেষে বলা যায়, যতদিন উম্মাহ বিভক্ত থাকবে, ততদিন মুসলিমবিশ্বে জাতীয়তাবাদের প্রভাব ধ্বংসাত্মকই হবে।