মুরতাদদের বিরুদ্ধে আবু বকর রা.

মুরতাদদের বিরুদ্ধে আবু বকর রা. – রাসূল সা. এর ইন্তিকালের পর আরবের অনেক গোত্র ইসলাম ত্যাগ করে মুরতাদ হয়ে যায়। তাদের এভাবে গণহারে মুরতাদ হওয়ার পেছনে কিছু কারণ ছিল।

যেমন: ঈমানের দুর্বলতা, কুরআনের মর্ম সঠিকরূপে অনুধাবন না করতে পারা, জাহিলিয়াতের প্রতি আগ্রহ, গোত্রীয় চেতনা, ক্ষমতার লোভ ইত্যাদি।

এর পাশাপাশি সে সময় ইহুদী এবং খৃষ্টানদের চক্রান্ত তো ছিলই। ইহুদী-খৃষ্টানরা সর্বদা চাইতো, মুসলমানরা ধ্বংস হয়ে যাক।

কিন্তু আল্লাহ তা’আলা এই কঠিন সময়ে এ সকল মুরতাদদের বিরুদ্ধে হযরত আবু বকর রা. কে দৃঢ় থাকার তাওফীক দিয়েছেন।

মুরতাদদের বিরুদ্ধে আবু বকর

মিথ্যা নবুয়তের দাবী

রাসূলের ইন্তিকালের পর মিথ্যা নবুয়তের দাবী উঠে তিন প্রাপ্ত থেকে। ইয়ামেনে নবুয়তের দাবী করে আসওয়াদ আনাসি

ইয়ামামায় নবুয়তের দাবী করে মুসায়লামাতুল কাজ্জাব। নিজ এলাকায় নবুয়তের দাবী করে তুলায়হা আসাদি

এই তিনজন ছিল মারাত্মক পর্যায়ের। তারা নবুয়ত দাবী করার পর বহু মানুষ তাদের অনুসারী হয়ে যায়। মানুষ দলে দলে তাদের সাথে যোগদান করে।

রাসূল সা. এই ব্যাপারে ভবিষ্যদ্বানী করেছিলেন। সহীহ বুখারী শরীফের ৩৬২১ নং হাদীসে উল্লেখ রয়েছে,

فَأَخْبَرَنِيْ أَبُوْ هُرَيْرَةَ أَنَّ رَسُوْلَ اللهِ صلى الله عليه وسلم قَالَ بَيْنَمَا أَنَا نَائِمٌ رَأَيْتُ فِيْ يَدَيَّ سِوَارَيْنِ مِنْ ذَهَبٍ فَأَهَمَّنِيْ شَأْنُهُمَا فَأُوْحِيَ إِلَيَّ فِي الْمَنَامِ أَنْ انْفُخْهُمَا فَنَفَخْتُهُمَا فَطَارَا فَأَوَّلْتُهُمَا كَذَّابَيْنِ يَخْرُجَانِ بَعْدِيْ فَكَانَ أَحَدُهُمَا الْعَنْسِيَّ وَالْآخَرُ مُسَيْلِمَةَ الْكَذَّابَ صَاحِبَ الْيَمَامَةِ

“(ইবনু ‘আব্বাস (রাযি.)…বলেন,) আবূ হুরাইরাহ্ (রাঃ) আমাকে জানিয়েছেন, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আমি ঘুমিয়ে ছিলাম।

স্বপ্নে দেখতে পেলাম আমার দু’হাতে সোনার দু’টি বালা। বালা দু’টি আমাকে চিন্তায় ফেলল। স্বপ্নেই আমার নিকট অহী এল, আপনি ফুঁ দিন।

আমি তাই করলাম। বালা দু’টি উড়ে অদৃশ্য হয়ে গেল। আমি স্বপ্নের ব্যাখ্যা এভাবে করলাম, আমার পর দু’জন মিথ্যাবাদী বের হবে। এদের একজন আনসী, অপরজন ইয়ামামাহবাসী মুসায়লামাতুল কায্যাব।”

মুরতাদদের বিরুদ্ধে আবু বকরের অবস্থান

আবু বকর রা. মুরতাদদের খবর শুনে তাদেরকে দমন করার জন্য বাহিনী প্রস্তুত করলেন।

এই মুরতাদদের মধ্যে আরেকটি দল ছিল, যারা ইসলামের কিছু কিছু বিধানকে অস্বীকার করতো।

একটা দল ছিল, তারা যাকাত আদায় করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিল। আবু বকর রা. তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের জন্য দল তৈরি করলেন।

তখন ওমর রা. এবং আলী রা. সহ আরো কয়েকজন সাহাবী বললো, তাদের সাথে পরে লড়াইয়ে লিপ্ত হোন। এখন তাদেরকে তাদের অবস্থায় ছেড়ে দিন।

আবু বকর রা. তাদের এই প্রস্তাব সরাসরি প্রত্যাখ্যান করলেন। তিনি বললেন, আল্লাহর শপথ!

যদি কেউ জাকাতকে নামাজের মতো গুরুত্ব না দেয়, তাহলে আমি তার বিরুদ্ধে ‍যুদ্ধ ঘোষণা করবো।

মদীনার নিরাপত্তা ব্যবস্থা

মুরতাদরা মদীনার আশেপাশে একত্রিত হতে থাকে। তাদের ইচছা, তারা মদীনা দখল করে সেখানে রাজত্ব কায়েম করবে।

এদিকে হযরত উসামা বিন যায়েদ রা. কে রাসূলের নির্দেশে আবু বকর রা. রোমানদের বিরুদ্ধে পাঠিয়ে দিয়েছেন।

ফলে মদীনায় পুরুষের সংখ্যা নিতান্তই কম। এত কম ব্যক্তির উপর যদি হামলা করা হয় তাহলে নির্ঘাত মদীনার পতন হবে।

আবু বকর রা. তখন মদীনাবাসীরা রাতে মসজিদে অবস্থানের নির্দেশ দেন, যাতে প্রতিরোধ করার জন্য দ্রুত প্রস্তুতি গ্রহণ করা যায়।

মদীনার বিভিন্ন পথে নিরাপত্তারক্ষী বাহিনী তিনি মোতায়েন করেন। তাদের দায়িত্ব ছিল, তারা রাত্রীযাপন সেখানেই করবে। কোনো আক্রমণ হলে সেখানেই প্রতিরক্ষা গড়ে তুলবে।

প্রতিটি নিরাপত্তা দলে একজন করে আমির নির্দিষ্ট করে দেন। আমিররা ছিলেন, আলী, তালহা বিন উবায়দুল্লাহ,

যুবায়ের ইবনে আওয়াম, সা’দ বিন আবি ওয়াক্কাস, আবদুর রহমান ইবনে আউফ এবং আব্দু্ল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. প্রমুখ।

আবু বকর রা. মদীনার আশেপাশে থাকা গোত্রগুলোকে জিহাদের প্রস্তুতির নির্দেশ দেন। তারাও সন্তুষ্টিচিত্তে জিহাদে অংশগ্রহণ করে।

আবু বকর রা. মদীনা থেকে দুরবর্তী এলাকাগুলোর গভর্নরদের নিকট পত্র প্রেরণ করেন। যাতে তারা তাদের এলাকায় মুরতাদদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলে।

মদীনায় মুরতাদদের হামলা

মুরতাদরা মদীনায় একটা প্রতিনিধিদল প্রেরণ করে।

তারা হযরত আবু বকর রা. এর নিকট আবেদন করে, যেন তাদের যাকাত মওকুফ করে দেয়া হয়।

আবু বকর রা. সরাসরি তা প্রত্যাখ্যান করলেন। ফলে তারা ক্রুদ্ধ হয়ে মদীনা ত্যাগ করলো।

আবু বকর রা. উপস্থিত ব্যক্তিদর বললেন, এরা অচিরেই মদীনায় হামলা করবে।

এই প্রতিনিধিদল মদীনা ত্যাগ করার পর পরই একরাতে আচমকা বনু আসাদ, গাতফান, আবস, জুবইয়ান ও বকর গোত্রের লোকজন মদীনায় হামলা করে।

তারা কয়েকজন মুসলমানকে বন্দী করে যুহাসা নামক স্থানে আটক করে রাখে।

মদীনার প্রহরীরা এটা জানার পর তারা আবু বকরকে অবহিত করেন।

আবু বকর রা. তখন মসজিদে অবস্থিত মুজাহিদদের নিয়ে মুরতাদদের উদ্দেশ্যে বের হলেন। তারা তখন মুসলমানদের উটগুলোকে বিভ্রান্ত করার জন্য পদ্ধতি অবলম্বন করে।

ফলে উটগুলো এদিক ওদিক ছুটে পালিয়ে যেতে থাকে। আরোহীরা উটগুলোকে ভালোভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে পারছিল না।

আবু বকর রা. তখন আর যুদ্ধ না বাড়িয়ে মদীনায় চলে আসলেন। শত্রুরা ভাবলো, আবু বকর ভয় পেয়েছে। তারা এটা নিয়ে কবিতা রচনা করলো।

মুরতাদদের বিরুদ্ধে ঝটকা আক্রমণ

প্রায় ৪০ দিন পর হযরত উসামা রা. তার বাহিনী নিয়ে মদীনায় আসেন।

আবু বকর রা. তখন উসামাকে মদীনার স্থলাভিষিক্ত করে মুজাহিদদের নিয়ে রওয়ানা হন মুরতাদদের বিরুদ্ধে।

সাহাবারা তখন আবু বকর রা. কে অনুরোধ করেন মদীনায় থাকতে। কিন্তু তিনি নিজের সিদ্ধান্তে অবিচল থাকেন।

একদিন ভোরের আলো ফোঁটার পূর্বেই আবু বকর রা. নিজের বাহিনী নিয়ে মদীনার পার্শ্ববর্তী মুরতাদদের বিরুদ্ধে আক্রমণ করেন।

মুরতাদরা ঘুণাক্ষরেও টের পায় নি এই বাহিনীর আগমণের কথা। সূর্য উদয় হতে হতেই মুজাহিদরা বিজয়লাভ করেন।

এরপর আবু বকর রা. মদীনা থেকে ১২ মাইল দূরে অবস্থিত যুলকাসসা নামক স্থানে শিবির স্থাপন করেন। এখানে তিনি মুজাহিদ বাহিনীকে ১১ টি ভাগে বিন্যস্ত করেন।

প্রতিটি ভাগে একজন করে অভিজ্ঞ আমির নিযুক্ত করেন। এরপর আবু বকর রা. যুদ্ধের পরিকল্পনা গ্রহণ করে এই ১১ বাহিনীকে আরব উপদ্বীপে ছড়িয়ে দেন।

এই একেকটি বাহিনী একেক গোত্রের মুরতাদদের উপর চড়াও হয়।

তথ্যসুত্র

১. মুসলিম উম্মাহর ইতিহাস। খণ্ড ৩। পৃষ্ঠা ৪৮-৫০

২. আবু বকর সিদ্দিক। কালান্তর প্রকাশনী। ২৮৩-২৯৬

৩. আবু বকর রা. জীবনী। সোলায়মানিয়া বুক হাউজ। পৃষ্ঠা ১৩৬-১৪০

বিশেষ দ্রষ্টব্য: আমাদের লেখাগুলো সূচিপত্র অনুযায়ী দেখুন www.subject.arhasan.com এই ওয়েবসাইটে।
আমরা কোন প্রকাশনীর বই রেফারেন্স হিসেবে ব্যবহার করি তা জানতে ভিজিট করুন www.arhasan.com/book এই ওয়েবসাইটে।
আমাদেরকে গুগল নিউজে ফলো করতে পারেন এই লিংক থেকে

আমি একজন ইসলামিক আলোচক, লেখক। ছোটবেলায় পড়ালেখা করেছি কওমী মাদ্রাসায়। পরবর্তীতে সাইন্স বিভাগ থেকে এসএসসি পরীক্ষা দিয়ে কৃতিত্বের সাথে পাশ করি। বর্তমানে আমি ডিপ্লোমা ইন মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং এ অধ্যায়নরত। অবসরে আমি বই পড়তে পছন্দ করি। নতুন কিছু শিখতে, নতুন কিছু জানতে ভালোবাসি। আমার ইচ্ছা, ভালো মানুষ হয়ে সমাজকে সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজে বিরত রাখার চেষ্টা করা।

https://www.arhasan.com