জিসিরের যুদ্ধ ও আবু উবায়েদ সাকাফি

জিসিরের যুদ্ধ – পারসিক বাহিনীর অন্যতম জেনারেল জাবানকে ছেড়ে দেয়ার পর পারসিকদের সেনাপ্রধান রুস্তম বাহমান নামে একজন অভিজ্ঞ সিপাহসালারকে মুসলমানদের বিরুদ্ধে প্রেরণ করে।

এরপর তার সাহস ও উদ্দীপনা বৃদ্ধির জন্য শামের পতাকা ‘দেরাফশ কাবিয়ানি’ প্রদান করা হয়। এই পতাকা নিয়ে পারসিকদের মধ্যে অন্ধ বিশ্বাস ছিল।

আবু উবায়েদ সাকাফি সম্পর্কে আরো পড়ুন: ইরাকে আবু উবায়েদ সাকাফি রহঃ এর জিহাদ

বাহমান তার বাহিনী নিয়ে ফুরাত নদীর পূর্ব অংশে শিবির স্থাপন করে। মুসলমানরা তখন পশ্চিম অংশে শিবির স্থাপন করেছিল।

আবু উবায়েদ সাকাফির স্ত্রীর স্বপ্ন

যুদ্ধের আগের রাত্রে মুসলিম সেনাপ্রধান আবু উবায়েদ সাকাফি রহঃ এর স্ত্রী স্বপ্ন দেখেন যে, এক ব্যক্তি আকাশ থেকে শরবতের পাত্র নিয়ে অবতরণ করেছে।

এরপর সেই শরবত আবু উবায়েদ সহ আরো কয়েকজন মুসলমান পান করেন। আবু উবায়েদ সাকাফি এই স্বপ্নের কথা শুনে বললেন,

এর মাধ্যমে আল্লাহ আমার শাহাদাতের প্রতি ইঙ্গিত করেছেন।

লড়াইয়ের পূর্বে – জিসিরের যুদ্ধ

সকালবেলা লড়াইয়ের পূর্বে পারস্যের সেনাবাহিনীর প্রধান বাহমান আবু উবায়েদ সাকাফি রহঃ কে বললো,

তোমরা নদী পার হয়ে এদিকে আস। অথবা আমাদেরকে নদী পার হতে দাও।

তখন আবু উবায়েদ সাকাফি মুসলমানদের সাহসিকতা প্রকাশ করার জন্য নিজেরাই নদী অতিক্রমের সিদ্ধান্ত নেন। তার অভিজ্ঞ সাথীরা ভিন্নমত প্রকাশ করলে তিনি বলেন,

পারসিকরা যেন এটা মনে না করে যে, মুসলমানরা মৃত্যুকে ভয় পায়। অবশেষে মুসলমানরা নদী পার হওয়ার জন্য সাঁকো নির্মাণ করেন এবং নদীর অপরপাশে চলে যান।

যুদ্ধ শুরু – জিসিরের যুদ্ধ

যখন উভয় বাহিনীর ঘোরতর যুদ্ধ শুরু হয় তখন মুসলমানরা একটি মারাত্মক সংকটে পড়ে যায়।

যেহেতু তারা নদী পার হয়ে এসেছিল, তাই তাদের নদীর পাড়ের নিম্নভূমি থেকে যুদ্ধ করতে হচ্ছিল।

আর পারসিকদের বাহিনী ছিল অনেক বড়। মুসলমানরা সামান্য পিছু হটলেই নদীতে পতিত হবে। ক্রমে ক্রমেই যুদ্ধ প্রকট আকার ধারণ করলো।

পারসিকরা তখন তাদের যোদ্ধা হাতিগুলো মুসলমানদের ঘোড়ার সামনে দাঁড় করিয়ে দেয়। যেহেতু আরব ঘোড়াগুলো কখনো হাতি দেখে নি, তাই সেগুলো ভয় পেয়ে এদিক-ওদিক পালাতে শুরু করে।

ফলে যুদ্ধের সারিতে ফাঁটল দেখা দিল। পারসিকরা আবার উঁচু ভূমি থেকে তীর নিক্ষেপ করছিল। তাই মুসলমানরা অনেক ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছিল।

হাতির মোকাবেলা- জিসিরের যুদ্ধ

এমন সংকটপূর্ণ অবস্থা দেখে মুসলমানদের সেনাপতি আবু উবায়েদ সাকাফি রহঃ ঘোড়া থেকে নেমে যান।

তিনি কোষমুক্ত তরবারি নিয়ে হাতিগুলোর দিকে এগিয়ে যান।

সেনাপতিকে এভাবে অগ্রসর হতে দেখে আরো অনেক মুজাহিদও এভাবে অগ্রসর হতে শুরু করে। এরপর তারা একযোগে হাতিগুলোর উপরে আক্রমণ করেন।

হাতিগুলো কাউকেই নিকটে আসতে দিচ্ছিলো না। তারপরও তারা অনেক কষ্টে সামনে অগ্রসর হয়ে আক্রমণ পরিচালনা করেন।

আমর ইবনে আস সম্পর্কে পড়ুন: মিসরবাসীর আমর ইবনে আস রাঃ সম্পর্কে অভিযোগ

আবু উবায়েদ সাকাফি উচুঁ আওয়াজে ঘোষণা করছিলেন যে, হাতির পেট বিদীর্ণ করে দাও, তাদের হাওদা উল্টে দাও।

মুসলমানরা প্রাণপণে হাতির উপর ঝাঁপিয়ে পড়েন। কিছু হাতি এতে মারা যায়। আবু উবায়েদ সাকাফি নিজে সাদা হাতির সঙ্গে মোকাবেলা করছিলেন।

এটা সবচেয়ে শক্তিশালী ছিল। শেষে তিনি শক্তভাবে তরবারি দিয়ে হাতির উপরে আঘাত করেন।

হাতি এই আঘাত খেয়ে হযরত আবু উবায়েদকে শূড় দিয়ে পেঁচিয়ে ফেলে।

এরপর হাতি তাকে পা দিয়ে পিষ্ট করে দেয়। এখানেই আবু উবাযেদ সাকাফি রহঃ শহীদ হয়ে যান।

সেনাপতির শহীদ হওয়ার পর

আবু উবায়েদ সাকাফি রহঃ শহীদ হওয়ার পর মুসলমানদের পতাকা সাকিফ গোত্রের একজন ব্যক্তি তুলে নেন।

তিনি হাতির নিকট হতে আবু উবায়েদ রহঃ এর লাশ সরাতে গিয়ে নিজেও শহীদ হয়ে যান।

এরপর আরেকজন পতাকা তুলে নেন। তিনিও হাতির পায়ের নিচে চাপা পড়ে শহীদ হয়ে যান। এভাবে একে একে সাতজন যুবক শহীদ হয়ে যায়।

মুসলমানদের বড় ভুল

যুদ্ধের ময়দানে টিকতে না পেরে মুসলমানরা পিছু হটতে থাকেন। কিন্তু তখনই একজন অতি উৎসাহী মুসলমান নদীর উপরে সাঁকো ভেঙ্গে ফেলে।

এতে পিছপা হয়ে যাওয়া মুসলমানরা নদীতে পড়ে যেতে থাকেন। হাজার হাজার মুসলমান এখানে আহত ও শহীদ হয়ে যান।

মুসান্না বিন হারিসা রাঃ এর নেতৃত্ব

এমন নাজুক পরিস্থিতিতে মুসান্না বিন হারিসা রাঃ আহত অবস্থাতেই দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নেন।

তিনি একদলকে শত্রুদের প্রতিহত করতে পাঠিয়ে দেন।

অপরদলকে নতুনভাবে সাঁকো নির্মাণ করতে পাঠিয়ে দেন। তারপর তিনি সাঁকো নির্মানের পর ‍মুসলমানদের বললেন, তোমরা ওপারে চলে যাও। আমি কাফেরদের আটঁকিয়ে রাখছি।

অবশেষে মুসান্না বিন হারিসা রাঃ এর দৃঢ়তায় ৩ হাজার মুসলমান নদী পার হতে পারেন।

৯ হাজার মুজাহিদদের ৪ হাজার মুজাহিদ নদীর ঢেউয়ে শহীদ হয়।

আর বাকী ২ হাজার মুসলমান ভয়ংকর পরিস্থিতিতে পড়ে পলায়ন করে। এই যুদ্ধে যদিও ৬ হাজার পারসিক সেনা মারা গেছে। তারপরও জয় হয় তাদের।

এটা ছিল মুসলমানদের প্রথম বড় আকারে পরাজয়।

ওমর রাঃ এটা শুনে খুব কষ্ট পান। তিনি বলেন, আল্লাহ আবু উবায়েদের উপর রহম করুন।

যদি আব উবাইদ পেছনে ফিরে আসতেন তাহলে এত মুসলমান মৃত্যুবরণ করতো না।

তথ্যসুত্র

মুসলিম উম্মাহর ইতিহাস। খন্ড ৩। পৃষ্ঠা ৪১—৪৪

জীবন ও কর্ম: ওমর রাঃ। খন্ড ২। পৃষ্ঠা ১৩৮-১৪০

আরো পড়ুন

ওমর রাঃ এর চরিত্র কেমন ছিল, পড়ুন

স্রষ্টার অস্তিত্বের কি প্রমাণ আছে, পড়ুন

আল্লাহর কি মানুষের মতো অঙ্গ-প্রতঙ্গ আছে? পড়ুন

আমি একজন ইসলামিক আলোচক, লেখক। ছোটবেলায় পড়ালেখা করেছি কওমী মাদ্রাসায়। পরবর্তীতে সাইন্স বিভাগ থেকে এসএসসি পরীক্ষা দিয়ে কৃতিত্বের সাথে পাশ করি। বর্তমানে আমি ডিপ্লোমা ইন মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং এ অধ্যায়নরত। অবসরে আমি বই পড়তে পছন্দ করি। নতুন কিছু শিখতে, নতুন কিছু জানতে ভালোবাসি। আমার ইচ্ছা, ভালো মানুষ হয়ে সমাজকে সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজে বিরত রাখার চেষ্টা করা।

https://www.arhasan.com