ইমাম ইবনে তাইমিয়া রহ. ছিলেন একজন মহান ইসলামিক পণ্ডিত ব্যক্তি। তিনি ছিলেন তার যুগের অসাধারণ একজন প্রতিভাবান ব্যক্তি।

তিনি ইসলামকে শিরক, বিদআত, কুফর ও অনাচার থেকে মুক্ত ও নির্ভেজাল করতে আজীবন সংগ্রামে আত্মনিয়োগ করে গেছেন।

তিনি ছিলেন একজন বিখ্যাত মুফাসসির, মুহাদ্দিস, ফকীহ, বাগ্মি ও আকায়েদ শাস্ত্রের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি।

জন্ম ও নামকরণ

ইমাম ইবনে তাইমিয়া রহ. এর মূল নাম ছিল তাকিউদ্দিন। ইবনে তাইমিয়া হলো তার পারিবারিক উপনাম। এই উপনামেই তিনি পরিচিত।

কুনিয়াত হলো আবুল আব্বাস। পিতার নাম, আল্লামা আব্দুল হালিম।

ইমাম তাকিউদ্দিন ৬৬১ হিজরীর ১০ রবিউল আউয়াল রোজ সোমবার মোতাবেক ১২৬৩ খৃষ্টাব্দের ২৩ জানুয়ারীতে সিরিয়ার রাজধানী দামেশকের নিকটবর্তী হাররান নামক স্থানে জন্মগ্রহণ করেন।

ইমাম তাইমিয়ার পরিবার আট প্রজন্ম থেকে দীনি খেদমত করে আসছিলেন। তার দাদা আবুল বারাকাত মাজদুদ্দিন ছিলেন একজন খ্যাতিমান মুহাদ্দিস ও ফকিহ।

ইবনে তাইমিয়ার শৈশবকাল

তাকিউদ্দিন ইবনে তাইময়ার বয়স যখন ৬ বছর তখন তার পিতা তাতারিদের অত্যাচারে জন্মভূমি হাররান ছেড়ে দামেশকে চলে আসেন।

দামেশকে আসার পর ইমাম ইবনে তাইমিয়ার পরিবারকে দামেশকবাসীরা স্বাগত জানায়। দামেশকের লোকেরা ইবনে তাইমিয়ার দাদার ইলমী কাজ সম্পর্কে অবগত ছিল।

আর তাকিউদ্দিনের বাবার ইলমি কাজ সম্পর্কেও দামেশকবাসীরা জানতো। কিছুদিনের মধ্যেই তাকিউদ্দিনের বাবা আব্দুল হালিম উমাইয়া মসজিদে দারস প্রদান শুরু করেন।

কিশোর তাকিউদ্দিন শীঘ্রই কুরআন মাজিদ হেফজ করে হাদিস ও ফিকহ চর্চায় মশগুল হন। ইমাম তাইমিয়ার স্মৃতিশক্তি ছিল খুব প্রখর।

তার বিস্ময়কার স্মৃতিশক্তির কথা সকলের মুখে মুখে উচ্চারিত হতে থাকে। একবার একজন আলেম তার স্মৃতিশক্তি পরীক্ষা করতে চাইলেন।

তিনি তার শ্লেটে ১৩টি হাদীস লিখে দেন। এরপর তা ইবনে তাইমিয়াকে দিয়ে বললেন, ভালোভাবে এগুলো দেখ। দেখা শেষ হলে তিনি হাদীসগুরো মুছে দিয়ে বললেন,

এখন হাদীসগুলো বলো। তখন ইবনে তাইমিয়া সবগুলো হাদীস শুনিয়ে দেন। এরপর উক্ত আলেম সনদসহ হাদীসগুলো লিখলেন।

এবারও এক নজর দেখার পর সনদসহ হাদীসগুলো তাকিউদ্দিন ইবনে তাইমিয়া মুখস্থ শুনিয়ে দেন। তখন উক্ত আলেম বিস্ময় প্রকাশ করে বলেন,

যদি এই ছেলে বেঁচে থাকে, তাহলে অবশ্যই সে বড় কিছু হবে। কেননা এর মতো প্রতিভাধর এই যুগে খুঁজে পাওয়া মুশকিল।

ইবনে তাইমিয়ার জ্ঞান অর্জন

ইমাম তাইয়িমা রহ. সাত বছর বয়স থেকেই জ্ঞান অর্জন শুরু করেন। বাইশ বছর বয়সে তার জ্ঞানের ভাণ্ডারকে পরিপূর্ণ করে তোলেন।

তিনি কুরআন-হাদীস, ফিকহ, উসূল বা মূলনীতির পাশাপাশি আরবী সাহিত্যে পারদর্শিতা অর্জন করেন। প্রায় ২০০ এর বেশি শিক্ষকের নিকট হতে ইলম অর্জন করেন।

তিনি কুরআনের তাফসীর অধ্যয়ন করেছেন প্রায় ১০০ এর বেশি। এটি তিনি নিজেই বলেছেন। তিনি সমসাময়িক গ্রন্থ প্রণেতাদের সাথে সাক্ষাৎ করে ইলমকে আরো সমৃদ্ধ করে তুলতেন।

কুরআন-হাদীসের পাশাপাশি তিনি কালাম শাস্ত্র অধ্যয়ন করেন। সেই সময়টাতে কালাম শাস্ত্রের প্রচলন ছিল ব্যাপক।

(কালাম শাস্ত্র হচ্ছে ইসলামী আকীদা বিশ্বাস সংক্রান্তবিজ্ঞান। যে শাস্ত্রে ইসলামের মৌলিক আকীদা-বিশ্বাস সংক্রান্তবিষয়গুলো সম্পর্কে যুক্তি ও দর্শনভিত্তিক আলোচনা করা হয় তাকে কালাম শাস্ত্র বলা হয়।)

ইবনে তাইমিয়ার সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিম কণ্ঠস্থ ছিল। তিনি যেই শাস্ত্র অর্জন করতে চাইতেন, পূর্ণ মনোযোগ দিয়ে তা আয়ত্ব করে নিতেন।

ইবনে তাইমিয়া রহ. এর জ্ঞান বিতরণ

মাত্র ১৭ বছর বয়স থেকেই ইবনে তাইমিয়া রহ. ফিকহের ব্যুৎপত্তি অর্জন করে ফাতওয়া নিয়ে কাজ শুরু করেন। তিনি ছিলেন হাম্বলী মাযহাবের অনুসারী।

ইমাম ইবনে তাইমিয়ার পুরো পরিবারই হাম্বলী মাযহাবের অনুসারী ছিলেন। সমকালীন বড় বড় হাম্বলী আলেমদের সাথে তখন ইবনে তাইমিয়ার নামও উচ্চারণ হতে থাকে।

পিতা আব্দুল হালিমের ইন্তিকালের পর তিনি দামেশকে হাদীসের দরস প্রদান শুরু করেন। পাশাপাশি দামেশকের মসজিদে তাফসীরের পাঠদান শুরু করেন।

ইমাম ইবনে তাইমিয়ার যুগে মানুষ সুফিবাদী তরিকা অবলম্বন করে সত্যপথ সিরাতুল মুস্তাকিম থেকে দূরে সরে গিয়েছিল।

তৎকালীন সময়ে সুফিরা বিভিন্ন আবেগীয় কথা বলার পর অনুসারিরা তা কিতাবে লিপিবদ্ধ করে মানুষকে আরো বেশি গোমরাহ করতো।

ইবনে তাইমিয়া রহ. উক্ত বিষয়গুলো খুঁজে খুঁজে মানুষকে সংশোধনের দিকে আহবান করেছেন। সেই সময়ে রাফেজিরা ইসলামের শেকড় কেটে ফেলতে অনেক চেষ্টা করেছে।

ইমাম তাইমিয়া রহ. তার কিতাবে এদের ফেতনার মুখোশও উন্মোচন করেন। তিনি এই বিষয়টা পরিষ্কার করেন যে,

শিয়া, রাফেজী, বাতেনীরা যেই ইসলাম প্রচার করছে, আল্লাহর নবী সা. এই ইসলামকে নিয়ে আসেন নি। সকলকে তিনি কুরআন-সুন্নাহর দিকে আহবান করতেন।

ইমাম তাইমিয়ার বিরুদ্ধচারণ

তাকিউদ্দিন ইবনে তাইমিয়া রহ. ছিলেন মূলত হাম্বলী মাজহাবের অনুসারী। আল্লাহ উনাকে ইজতিহাদের যোগ্যতা দিয়েছিলেন।

এর ফলে তিনি কখনো অন্ধভাবে মাজহাব অনুসরণ করতেন না। তাই তিনি বিভিন্ন মাসআলায় ভিন্নমত পোষণ করতেন।

এসব কারণে হাম্বলী মাজহাবের অন্যান্য আলেমরা বার বার তার বিরুদ্ধে আওয়াজ ওঠান। এছাড়াও সূফিবাদীর বিরুদ্ধে লেখালেখি করায় অনেক আলেম তা পছন্দ করেন নি।

বিরুদ্ধবাদীরা কয়েকবার ষড়যন্ত্র করে তাকে জেলখানায় পাঠিয়েছিল। তিনি তার দলীল সমৃদ্ধ দাবী থেকে কখনোই সরে আসতেন না।

যদি কেউ যুক্তি ও দলীলের মাধ্যমে তার কথার ভুল প্রমাণ করতে পারতো তখনই তিনি তার কথা বা মতামত থেকে ফিরে আসতেন।

অন্যায়ের বিরুদ্ধে ইমাম ইবনে তাইমিয়ার জিহাদ

৬৯৩ হিজরীতে ইমাম ইবনে তাইমিয়াকে সর্বপ্রথম সামনে দেখা যায় একটি ঘটনাকে কেন্দ্র করে। সে সময়ে আসসাফ নামে একজন খৃস্টান নবীজিকে গালি-গালাজ করে।

লোকেরা উক্ত ব্যক্তির বিরুদ্ধে গভর্নরের কাছে অভিযোগ করে। কিন্তু সেই খৃস্টান ব্যক্তিটি একজন মুসলমানের কাছে নিয়ে সাহায্য চায়।

উক্ত মুসলিম তাকে নিরাপত্তা দেয়। একথা জানার পর ইবনে তাইমিয়া গভর্নরের কাছে নিয়ে ঘটনার তদন্ত করে অপরাধীকে শাস্তি দিতে বলেন।

গভর্নর ইযযুদ্দিন আইয়ুবী উক্ত খৃস্টানকে এবং নিরাপত্তাদানকারীকে ডেকে পাঠান। তারা আসার পর লোকেরা উক্ত মুসলিমকে গালি-গালাজ করতে থাকে।

তখন সে বলে, এই খৃস্টান ব্যক্তি তোমাদের চেয়ে ভালো। এ কথা শুনে জনতা ক্ষিপ্ত হয়ে তার দিকে ঢিল মারতে থাকে।

মূহুর্তের মধ্যে এই ঘটনাটি বিরাট সংঘর্ষের রূপ নেয়। গভর্নর তখন এই ঘটনার জন্য ইমাম ইবনে তাইমিয়াকে দায়ী করে বন্দি করে কারাগারে নিক্ষেপ করে।

হঠাৎ ঘটনাটি অন্যদিকে মোড় নেয়ায় খৃস্টান ব্যক্তিটি প্রভাবিত হয়ে ইসলাম গ্রহণ করে। তখন গভর্নর ইমাম ইবনে তাইমিয়াকে মুক্তি দিয়ে তার নিকট মাফ চান।

তাতারীদের বিরুদ্ধে ইমাম ইবনে তাইমিয়া

ইরাক ও ইরানের তাতার সম্রাট গাজান ৬৯৪ হিজরীতে ইসলাম গ্রহণ করেন। কিন্তু এরপরও সে মুসলমানদের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করতে থাকে।

৬৯৯ হিজরীতে সে সিরিয়া আক্রমনের প্রস্তুতি নেয়। তাতারীদের আক্রমনের খবর শুনে সিরিয়া ও অন্যান্য শহরের লোকেরা ভীতগ্রস্থ হয়ে পড়ে।

মানুষ তখন নিরাপত্তার জন্য সিরিয়ার রাজধানী দামেশকে আসতে থাকে। ইমাম তাকিউদ্দিন ইবনে তাইমিয়া তখন দামেশকে ছিলেন।

এ সময়ে মিসরের সুলতান দামেশকবাসীর সাহায্যে সৈন্যদল পাঠালেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত তারা তাতারদের সাথে যুদ্ধে পরাজিত হলো।

তাতারদের ভয়ে রাজধানী দামেশকের গভর্নরসহ নেতৃত্বস্থানীয় সকলেই জনগণকে ফেলে চলে গেল। শুধুমাত্র দুর্গরক্ষক ছিল।

এদিকে কাজানের সৈন্যরা দামেশকের নিকটবর্তী হতে লাগলো। এ সময়ে ইমাম ইবনে তাইমিয়া ও শহরের মুরুব্বিরা বসে একটি সিদ্ধান্ত নিলেন।

তারা সিদ্ধান্ত নিলেন: ইমাম ইবনে তাইমিয়ার নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধি দল নগরবাসীর জন্য গাজানের নিকট হতে নিরাপত্তা লিখে আনবেন।

এরপর ইমাম ইবনে তাইমিয়া তার দলবল নিয়ে তাতার অধিপতি কাজানের নিকট গেলেন।

তাকিউদ্দিন ইবনে তাইমিয়া তখন কাজানের নিকট কুরআন-হাদীস থেকে ইনসাফ ও ন্যায়নীতির উদ্ধৃতি নিয়ে যাচ্ছিলেন।

শেষ পর্যন্ত গাজান তার ইচ্ছা থেকে পরিত্যাগ করে নিরাপত্তার ফরমান লিখে দেয়। এরপর তাতার বাহিনী সেখান থেকে চলে যায়।

তাতারদের আক্রমণ

কিন্তু ৭০০ হিজরীতে আবার খবর আসলো, তাতাররা আবার আসছে। এবার তারা প্রথমে দামেশক এরপর মিসর দখল করবে।

সিরিয়ার লোকজন তখন যে যেদিকে পারলো পলায়ন করলো। শহরে পানির দামে পণ্য বিক্রি হতে লাগলো। মানুষ কোনোমতে তার জিনিষ বিক্রি করে পলায়ন করছিল।

ইমাম ইবনে তাইমিয়া জনগণকে পালিয়ে না যাওয়ার জন্য এবং তাতারদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে উদ্বুদ্ধ করতে লাগলেন।

এই সময়ে ইমাম সাহেবের অনুরোধে মিসরের সুলতান বাহিনী নিয়ে দামেশকের সাহায্যে এগিয়ে আসে। পরে খবর আসে তাতাররা এক বছরের অন্য পিছিয়ে গেছে।

এ সংবাদ শুনে সকলেই আনন্দে বাড়ি ফিরে গেল। কিন্তু পরবর্তী বছর ৭০২ হিজরীর রমজান মাসে মিসরের বাহিনীর সাথে তাতারদের যুদ্ধ হয়।

এই যুদ্ধে মিসরের বাদশাহ আন নাসির বিন কালাউন তাতার অধিপতি গাজানকে পরাজিত করে সিরিয়া তথা শামকে তাতারদের আধিপত্য থেকে মুক্ত করেন।

মুসলমান হওয়ার পরও তাতারদের এই বর্বর আচরণের কারণে আলেমরা এবং সাধারণ মুসলিমরা তাদের প্রতি বিতৃষ্ণ হয়ে উঠে।

তখন ইমাম ইবনে তাইমিয়া গাজান ও তার বাহিনীর বিরুদ্ধে খারেজি ফাতওয়া দিয়ে তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধকে জিহাদ হিসেবে আখ্যা দেন।

তাতারদের এমন বর্বর আচরণের কারণ ছিল, তাদের দলের সবাই মুসলিম ছিল না। বৌদ্ধ, খৃস্টান ছিল অনেক।

এছাড়া তারা ইসলামের শিক্ষা-দীক্ষা সম্পর্কে ছিল অজ্ঞ। আর তারা তখনও চেঙ্গিস খানের সংবিধান “ইয়াসা” অনুসরণ করতো।

আর এই সংবিধানে লুটপাট ও জ্বালাও পোঁড়াও ছিল বাধ্যতামূলক। কিন্তু এত কিছুর পরও তাদেরকে কাফের বরা উচিৎ নয়।

মিসরের কারাগারে ইবনে তাইমিয়া

ইমাম ইবনে তাইমিয়া তখন অবস্থান করতেন সিরিয়ার দামেশকে। তখন সিরিয়া ছিল মিসরের অধীন।

ইমাম সাহেব সকল ধরণের অনৈতিক কাজকর্ম দামেশকে বন্ধ করেছিলেন।

তিনি শরীয়াহ বিরোধী কাজকর্ম তার ছাত্র ও জনগণের সাহায্যে বলপূর্বক বন্ধ করতেন। এর ফলে ৭০৫ হিজরীতে শাহী ফরমান দিয়ে ইমাম ইবনে তাইমিয়াকে কায়রো আসার নির্দেশ দেওয়া হয়।

দামেশকের গভর্নর তখন তাকে যেতে নিষেধ করেন। কারণ, মিসরের লোকেরা ইমাম সাহেবের সংষ্কার কার্যক্রমের সাথে পরিচিত ছিল না।

কিন্তু তিনি সকল ভীতিকে পেছনে রেখে কায়রো যান। ২২ শে রমজানে তিনি মিসরে পৌঁছেন।

সেখানে একটি কেল্লাতে কিছুদিন আটক করে রাখার পর ঈদের দিন তাকে মিসরের জুব কারাগারে পাঠিয়ে দেওয়া হয়।

কারাগারে থাকাবস্থায় ইমাম সাহেব সেখানে দাওয়াতি কার্যক্রম অব্যাহত রাখেন। আস্তে আস্তে কয়েদিদের মধ্যে পরিবর্তন আসতে লাগলো।

তারাও ইমাম ইবনে তাইমিয়াকে ভালোবেসে ফেললো। কারাগার যেন তখন দ্বীন শিক্ষার মারকায হয়ে গেল।

জেলখানায় ইমাম ইবনে তাইমিয়ার ইন্তিকাল

ইমাম তাকিউদ্দিন ইবনে তাইমিয়া একবার ফাতওয়া দেন, কবর জেয়ারতের উদ্দেশ্যে সফর করা জায়েজ নয়।

এমনকি শুধুমাত্র নবীজির রওজা যিয়ারতের জন্য সফর করাও জায়েজ নয়।

কারণ, এই সময়টাতে শিরক বেদআত বেড়ে যাচ্ছিল। তাই ইমাম সাহেবের ধারণা ছিল,

যদি শুধু কবর যিয়ারতের অনুমতি থাকে তাহলে মানুষ বিদআতের নতুন দরজা বের করবে।

তখন তার বিরুদ্ধবাদীরা এটাকে এমনভাবে প্রচার করে যেন ইমাম ইবনে তাইমিয়া নবীজির রওজার বিরোধী। এই প্রচারণা এতটাই বিস্ফোরণোন্মুখ করে তোলে যে,

সুলতান আন নাসির থাকে বন্দি করতে বাধ্য হন। সময়টা ছিল ৭২৬ হিজরীর ৭ শাবান। এরপর তিনি তার বাকী জীবন জেলে কাটান।

এই সময়টাতে তিনি কুরআন তেলওয়াত, অধ্যয়ন, রচনা ও সংকলনে সময় কাটান। ইমাম ইবনে তাইমিয়া এতটাই বেশি তেলওয়াত করতেন যে, তা বিস্ময়কর ছিল।

এই সময়ে তিনি তাফসীর এবং ফিকহের গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের জবাব লিখেন।

প্রায় আটক হওয়ার ১ বছর ৭ মাস পর তার নিকট হতে লেখালেখির উপকরণ ছিনিয়ে নেওয়া হয়।

৭২৮ হিজরীর শাবান মাসে তিনি রোগাক্রান্ত হন। অবশেষে শাবন মাসেরই ২২ তারিখে জেলখানাতেই ইন্তিকাল করেন।

সেই মোতাবেক ১৩২৮ খৃস্টাব্দের ২৯ সেপ্টেম্বর ইমাম ইবনে তাইমিয়া ইন্তিকাল করেন। জেলখানা থেকেই তার জানাযা গোসল করে বের করা হয়।

সেদিন শহরের সব দোকান বন্ধ করে দেওয়া হয়। দামেশকের ইতিহাসে তার জানাযায় এত লোকের সমাগম আগে-পরে কখনোই দেখা যায় নি।

ইমাম ইবনে তাইমিয়ার জানাযায় প্রায় দুই লক্ষ পুরুষ এবং পনের হাজার নারী উপস্থিত হয়। তার জানাযা চারটি স্থানে অনুষ্ঠিত হয়।

প্রথমে জানাযা জেলখানাতে, দ্বিতীয় জানাযা দামেশকের বনু উমাইয়া জামে মসজিদে, তৃতীয় জানাযা শহরের বাহিরে উন্মুক্ত ময়দানে, চতুর্থ জানাযা মাকবারায়ে সুফিয়াতে।

মৃত্যুর পর ইমাম তাকিউদ্দিন ইবনে তাইমিয়া রহ. কে মাকাবিরে সুফিয়া নামক কবরস্থানে দাফন করা হয়। আল্লাহ তার মর্যাদা বৃদ্ধি করুন।

ইমাম ইবনে তাইমিয়া রহ. এর শিক্ষকদের নাম

ইমামুদ্দীন আল বারযালী উল্লেখ করেছেন যে তাঁর উস্তাদের সংখ্যা একশতের অধিক। তাঁর উস্তাদদের নামের তালিকায় রয়েছেন,

ইবনু আবিল য়ূসর,

আল কামাল ইবনু আবদান,

আল কামাল আবদুর রহীম,

শামসুদ্দীন হাম্বলী,

ইবনু আবিল খাইর,

শরাফ ইবনুল কাওয়াস,

আবু বকর আল হিরাবী,

মুসলিম ইবনে আল্লান,

শামসুদ্দীন ইবনু আতা হানাফী,

জামালুদ্দীন ইবনু সায়রাফী,

আন নাজীব ইবনুল মিকদাদ,

আল কাসিম আল ইরবিলী,

জামালুদ্দীন বাগদাদী প্রমুখ।

ইমাম ইবনে তাইমিয়া রহ. এর ছাত্রদের নাম

ইমাম ইবনে তাইমিয়ার অসংখ্য ছাত্র ও শিষ্য ছিলো। তাঁদের মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হলেন-

১। আল্লামা শামসুদ্দীন হাম্মাদ ইবনুল কাইয়্যিম জাওজি (রহ), মৃত্যু- ৭৫১ হি.

২। আল্লামা ইমাদুদ্দীন ইসমাইল ইবনে কাসীর (রহ), মৃত্যু- ৭৭৪ হি.

৩। আল্লামা ইউসুফ আল মিযী (রহ), মৃত্যু-৭৪২ হি.

৪। ইমাম শরফুদ্দীন আবদুল্লাহ (রহ), ৭০৫ হি.

৫। আল্লামা শামসুদ্দীন আয্ যাহাবী (রহ), মৃত্যু ৭৪৮ হি.

৬। আল্লামা ইবনে ফাদলিল্লাহ আল উমারী (রহ),

৭। আল্লামা মাহমুদ ইবনে আসীর (রহ),

৮। আল্লামা কাসিম আল মুকরী (রহ) প্রমুখ।

তথ্যসুত্র

মুসলিম উম্মাহর ইতিহাস, খন্ড ১৪, পৃষ্ঠা ১৬৯-১৭৮

ইমাম ইবনু তাইমিয়া (রহ) ও শায়েখ মুহাম্মাদ ইবনু আবদিল ওয়াহহাব (রহ) জীবন ও কর্ম, পৃষ্ঠা ৭-৫২

গাজ্জার জন্য অনুদান

৭ অক্টোবর ২০২৩ তারিখে তুফানুল আকসা যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকেই ফিলিস্তিনের গাজ্জায় অসংখ্য মানুষ আহত ও শহীদ হয়েছে। বহু মানুষ নিজেদের ঘর-বাড়ী হারিয়েছে। এছাড়াও বর্তমানে গাজ্জার ৯৮% মানুষ অনাহারে জীবন-যাপন করছে। গাজ্জার মানুষের এই দুঃসময়ে আমরা যদি তাদের পাশে না দাঁড়াই তাহলে কে দাঁড়াবে?

আর-রিহলাহ ফাউন্ডেশন তুফানুল আকসা যুদ্ধের শুরু থেকেই ফিলিস্তিনের গাজ্জার জন্য ডোনেশন সংগ্রহ করে আসছে। এই মহান কাজে আপনিও আমাদের সাথে যুক্ত হতে পারেন।

অনুদান দিন

Scroll to Top