আরুজ বারবারোসা – বিখ্যাত উসমানীয় সালতানাতের গুরুত্বপূর্ণ একজন শাসক হলেন ইয়াভুজ সুলতান এবং খলিফা প্রথম সেলিম। তিনি ১৫১২ থেকে ১৫২০ সাল পর্যন্ত সুলতান ছিলেন।

প্রথম সালিমের শাসনকালের সাথেই জড়িয়ে আছে বিখ্যাত অ্যাডমিরাল আরুজের কৃতিত্ব।

ষোড়শ শতাব্দীর এই সময়টাতে আফ্রিকা ও ভূমধ্য সাগরের অবস্থা ছিল খুবই করুণ অবস্থার শিকার হয়।

উত্তর আফ্রিকার তিউনিস, মরক্কো, আলজেরিয়ায় ছিল রাজনৈতিক সমস্যা। বিভিন্ন গৃহযুদ্ধ চলমান ছিল এই অঞ্চলে।

তাদের মারামারির সুযোগ নিয়ে পর্তুগিজরা এই অঞ্চলে আধিপত্য বিস্তার করা শুরু করে। এদিকে সাগরে খৃষ্টীয় জোট দস্যুবৃত্তি চালু রেখেছিল।

কলম্বাস, ভাস্কো দ্যা গামা এবং মেজিলান ছিল ওই ধরনের সম্প্রদায়ের নেতা। তারা ইউরোপীয় বিভিন্ন সরকার কাছ থেকে সহায়তা নিয়ে সাগরে দস্যুবৃত্তি চালিয়ে যাচ্ছিল।

জলদস্যুপনার বাইরে তাদের তেমন কোনো ভূমিকা ছিল না।

এই জলদস্যু ও লুটেরাদের পাশাপাশি যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত বহু দাগি আসামিকে মুক্তি দিয়ে সাগরে ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল।

ওই দস্যুদের শুধু ইউরোপীয় সম্রাটরাই নয়; খোদ পোপরাও মুসলিম উপকূলীয় এলাকায় হানা দেওয়ার অবাধ অনুমতি দিয়ে রেখেছিল।

এই দস্যুরা সাধারণত ব্যবসায়ীর বেশে সমুদ্রে ঘোরাফেরা করত; কিন্তু তাদের লক্ষ্য থাকত শিকারভূমি খুঁজে বের করা।

পর্তুগিজ জলদস্যু ভাস্কো দ্যা গামা আফ্রিকা ও হিন্দুস্তানের উপকূলে বেশ কয়েকটি এলাকা জ্বালিয়ে উজাড় করে দেয়। অনেক নিরপরাধ মানুষকে হত্যা করে।

ওদিকে কলম্বাস স্প্যানিশ সাম্রাজ্যবাদীদেরকে আমেরিকার পথ দেখিয়ে দেয়। তারা সেখানে পৌছে স্থানীয় রেড ইন্ডিয়ান জাতিকে নিমূল করার প্রয়াস চালায়।

একইভাবে স্প্যানিশ নাবিক মেজিলান ফিলিপাইনে পৌঁছে দ্বীপরাষ্ট্রটিকে তাদের উপনিবেশ বানিয়ে নেয়। এমনই পরিস্থিতির শিকার ছিল তৎকালীন বিশ্ব।

স্প্যানিশ জলদস্যুদের এসব তৎপরতা রুখতে কতিপয় অভিজ্ঞ মুসলিম অ্যাডমিরালও সাগরে নেমে আসেন। আর মিশর ও উসমানীয় সুলতানগণ এই মুসলিম নাবিকদের পৃষ্ঠপোষকতা করেন।

আরুজ বারবারোসার জন্ম, নামকরণ ও উপাধী

সুলতান প্রথম সালিমের যুগে তুর্কি নাবিকদের মধ্যে খায়রুদ্দিন বারবারুসা এবং তার ভাই আরুজের এমন কিছু বিস্ময়কর অভিযানের সুখ্যাতি পুরো বিশ্বময় ছড়িয়ে পড়ে।

তাদের পিতা নুরুল্লাহ আগা এবং দাদা আবদুল্লাহ আগা একসময় চাকুরি করেছিলেন তুর্কি সেনাবাহিনীর অফিসার পদে।

৮৬৬ হিজরিতে (১৪৬২ খ্রি.) মিডলিল্লি দ্বীপ বিজয়ের পর তারা সেখানে বিশাল জায়গির লাভ করেন। নুরুল্লাহ আগা বিয়ে করেছিলেন স্থানীয় এক রোমান নারীকে।

তার গর্ভে নুরুল্লাহর পাঁচ সন্তান জন্মগ্রহণ করেন। তাদের মধ্যে ইলইয়াস, ইসহাক, আরুজ ও খায়রুদ্দিন খিজিরপাশা চিরন্তন খ্যাতি অর্জন করতে সক্ষম হন।

লাল চুলধারী ওই ভ্রাতৃবৃন্দকে মুসলিম ইতিহাসে “বারবারুসা” হিসেবে স্মরণ করা হয়। বারবারোসা অর্থ, লাল দাঁড়িওয়ালা।

আরুজ বারবারোসা ছিলেন ভাইদের মধ্যে তৃতীয়। তার জন্ম হয় মিডলিল্লি দ্বীপে। এটি ছিল উসমানীয়দের অধিনস্ত গ্রীসের একটি দ্বীপ।

বিখ্যাত নৌ সেনাপতি আরুজ বারবারোসার জন্ম আনুমানিক ১৪৭৪ খৃস্টাব্দে। তার মূল নাম আরুজ। উপাধী বারবারোসা। তাকে বাবা আরুজ, আরুজ রেইস ইত্যাদি নামকরণে ডাকা হতো।

আরুজ রেইসের প্রাথমিক কার্যক্রম

পিতা নুরুল্লাহ আগার ছেলেরা সাধারণত জাহাজ যোগে ব্যবসা পরিচালনা করতেন। দীর্ঘদিন ধরে তারা এই পেশা চালিয়ে যাচ্ছিলেন।

সাধারণত তুর্কি ও গ্রিসের মধ্যবর্তী সমুদ্র এলাকাই ছিল তাদের বিচরণস্থল। পরবর্তী সময়ে তারা মিশরেও যাওয়া-আসা শুরু করেন।

একবার বাণিজ্যিক সফরে তারা রোডস দ্বীপের জলদস্যুদের হামলার শিকার হন। ওই লড়াইয়ে তাদের বড় ভাই ইলিয়াস শাহাদাতবরণ করেন।

তাদের জাহাজ ছিনিয়ে নেওয়া হয়। বন্দি করে রাখা হয় আরুজকে।

ছোটভাই খায়রুদ্দিন খিজির তখন বিশাল অঙ্কের মুক্তিপণের মাধ্যমে তার ভাইয়ের মুক্তি চাইলেও খ্রিষ্টান দস্যুরা তাতে রাজি হয়নি।

তখন খ্রিষ্টানরা একটি চুক্তির মাধ্যমে পারস্পরিক ১০০ বন্দী বিনিময়ের সিদ্ধান্ত নেয়।

তারা ১০০ বন্দী নিজেদের মতো বাছাই করে তাদের জাহাজে করে তুর্কিতে নিয়ে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিল।

তবুও খ্রিষ্টানরা কোনোভাবেই আরুজকে মুক্তি দেওয়ার পক্ষে ছিল না। কিন্তু আরুজ অতি গোপনে ওই জাহাজে চড়ে সেখানে লুকিয়ে থাকেন।

জাহাজটি তুর্কি উপকূলের কাছাকাছি পৌঁছলে আরুজ জাহাজ থেকে লাফ দিয়ে সাগরে নেমে পড়েন এবং সাঁতার কেটে তুর্কির উপকূলে গিয়ে পৌঁছেন। এটি ১৫০৬ খৃস্টাব্দের ঘটনা।

তখন আরুজ ছিলেন ৩৬ বছরের টগবগে যুবক। তিনি নিজ চোখে খ্রিষ্টান জলদস্যুদের ধ্বংসতাণ্ডব দেখতে পেয়েছিলেন।

আর তখনই সিদ্ধান্ত নেন বাকি জীবন মুসলমানদের নিরাপত্তায় ব্যয় করবেন।

তিনি তুর্কি শাসকদের দরবারে উপস্থিত হয়ে ভূমধ্যসাগরে খ্রিষ্টান আধিপত্যের শঙ্কা তুলে ধরেন।

আরুজের আবেদনের প্রেক্ষিতে উসমানীয়দের পক্ষ হতে তাকে দুটি যুদ্ধ জাহাজ দান করা হয়। যেন এর মাধ্যমে তিনি খ্রিষ্টান জলদস্যুদের দমন করতে পারেন।

আরুজ জাহাজ দুটি নিয়ে দক্ষিণ ইতালির দিকে রওনা হন।

আর বছরের পর বছর ধরে সিসিলি, ইতালি ও স্পেনের যুদ্ধ জাহাজগুলোর ওপর আক্রমণ চালিয়ে তাদের ব্যস্ত রাখেন।

আলজেরিয়াতে আরুজ বারবারোসার অভিযান পরিচালনা

১৫১০ খৃস্টাব্দে আলজেরিয়ার শাসক সালিমতুমি স্পেন অধিপতি ফার্দিনান্দ পঞ্চমের কাছে গিয়ে তাকে কর প্রদানের মাধ্যমে তার আনুগত্য স্বীকার করে আসে।

এরপর থেকে স্প্যানিশরা আফ্রিকার উপকূলে এসে কেল্লা নির্মাণ শুরু করে। তখন আরুজের নৌবহর পাশেই সিসিলি বন্দরে নোঙর করা ছিল।

আলজেরিয়ার মুসলমানরা তাকে সহায়তার আহ্বান জানালে আরুজ দ্রুত সেখানে গিয়ে পৌঁছেন।

সালিমতুমি তাকে স্বাগত জানালেও জুমার নামাজ চলাকালে তাকে হত্যার চক্রান্ত করা হয়। সৌভাগ্যক্রমে ঠিক সময়ে এই চক্রান্ত ফাঁস হয়ে যায়।

ফলে আরুজ সালিমতুমিকে হত্যা করে আলজেরিয়ার উপকূল থেকে স্প্যানিশদের উচ্ছেদ করেন। পাশাপাশি তাদের নির্মিত কেল্লাগুলো সম্পূর্ণরূপে গুঁড়িয়ে দেন।

ওই সময় স্পেনের মুসলমানরা ভয়াল-বিভীষিকাময় দিন পার করছিল।

ছোট ভাই খায়রুদ্দিন খিজির পাশা তার নৌবহরটি মজলুম ও মুসলিমদের উদ্ধারের নিমিত্তে ওয়াকফ করে নেন।

তার নৌবহরে জাহাজের সংখ্যা ছিল মোট ৩৬টি। তিনি সংক্ষিপ্ত সময়ের সাতবার স্পেন উপকূলে যান।

স্প্যানিশ যুদ্ধজাহাজগুলো মাথা কুটে তাকে প্রতিহত করার চেষ্টা চালাচ্ছিল।

কিন্তু তিনি কৌশলে তাদের চোখে ধুলো দিতে দিতে ঠিকই স্পেন উপকূলে পৌঁছতেন আর নির্যাতিত মুসলমানদের উদ্ধার করে নিয়ে আসতেন।

একবার স্প্যানিশ নৌবহর তার নৌবহরটি অবরোধ করে ফেলে। কিন্তু জানবাজ মুসলিম মাল্লারা প্রাণপণ যুদ্ধ করে তাদের হারিয়ে দেয়।

যুদ্ধে স্প্যানিশদের ৩টি জাহাজ ডুবিয়ে দেওয়ার পাশাপাশি সাতটি জাহাজ দখল করে নেওয়া হয়।

খায়রুদ্দিন পাশা যতবার স্পেনে গিয়েছিলেন প্রতিবার ১০ হাজার করে মজলুম মুসলমানদের উদ্ধার করে নিয়ে এসেছিলেন।

এভাবে তিনি প্রায় ৭০ হাজার মুসলমান নিশ্চিত মৃত্যু থেকে বাঁচিয়ে আনতে সমর্থ হন।

মিসরে ফিরে যাওয়া

১৫১৩ খৃস্টাব্দে উসমানীয়দের সঙ্গে কোনো কারণে আরুজের সম্পর্ক তিক্ততার পর্যায়ে চলে যায়। ফলে তিনি তার ব্যক্তিগত চারটি জাহাজ নিয়ে মিশরে চলে যান।

মিশরের মামলুক সুলতান কানসুঘোরি উপকূলের নিরাপত্তার লক্ষ্যে আরুজের সেবা গ্রহণ করেন।

আরুজ তখন লিবিয়া এবং তিউনিসের মধ্যবর্তী জেরবা দ্বীপকে তার কেন্দ্র বানিয়ে নেন।

কিছু দিন পর মিডলিল্লি দ্বীপ থেকে তার ছোটভাই খায়রুদ্দিন পাশাও তার ব্যক্তিগত নৌ-বহর নিয়ে এখানে এসে উপস্থিত হন।

তখন উভয় ভাইয়ের কাছে ছিল মোট ১২টি যুদ্ধজাহাজ এবং ১০০০ সৈনিক। এরপর ভাতৃদ্বয় মিলে খ্রিষ্টান নৌ সেনাপতিদের পরাজিত করেন।

সুলতান কানসুঘোরি আরুজের বীরত্বপূর্ণ লড়াই আর দক্ষতা দেখে এতই প্রভাবিত হন যে, আদর করে তাকে পুত্র বলে সম্বোধন করতেন।

তিনি প্রকাশ্যেই বলতেন- ‘আমার ছেলে আরুজ বারবারোসা খুবই অনুগ্রহ স্বীকারকারী। তার কল্যাণ পুরো পৃথিবী জুড়ে প্রসিদ্ধ।’

তিউনিসের পাশে জেরবা দ্বীপই ছিল আরুজ ও খায়রুদ্দিনের কেন্দ্র। তাই উভয় ভাই তিউনিসের আমির আবদুল্লাহ হাফসির সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখতেন।

আর আমির তাদেরকে দান করেন উপসাগরের একটি দ্বীপ। ১৫১৪ খৃস্টাব্দে তাদের সেই অভিযান শুরু হয়, যা ইউরোপ জুড়ে ত্রাসের সঞ্চার ঘটায়।

তখন ইউরোপীয়দের ছোটবড় কোনো জাহাজ-নৌকা মোটেও নিরাপত্তা জড়িত ছিল না।

এর প্রতিবিধানে রোমের পোপরা সাগরে এমন দুটি জাহাজ নামায়, যার জুড়ি ছিল না পুরো বিশ্বের কোথাও। কিন্তু আরুজ মাত্র একটি হামলায়ই জাহাজ দুটি দখল করে নেন।

স্প্যানিশদের বিরুদ্ধে আরুজ বারবারোসা

তখন আরুজ অনেক চিন্তাভাবনার পর এই সিদ্ধান্তে উপনীত হন, মুসলিম জাতির প্রতিরক্ষার নিমিত্তে উত্তর আফ্রিকায় একই শক্তিশালী ইসলামি হুকুমত প্রতিষ্ঠা দরকার।

সুতরাং তিনি গৃহযুদ্ধে লিপ্ত স্প্যানিশ করাশ্রিত আলজেরীয় আমিরদের পরাজিত করে তাদের অঞ্চলগুলো দখলের সিদ্ধান্ত নেন।

তবে এর জন্য পূর্বশর্ত ছিল আলজেরিয়ার উপকূল থেকে মাত্র ২০০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত বিজায়াকে স্প্যানিশদের কাছ থেকে দখলমুক্ত করা।

যেন তারা তাদের করাশ্রিত আমিরদের সাহায্যে এগিয়ে আসতে না পারে। আরুজ একদিন ৪টি জাহাজ নিয়ে ঝড়ের বেগে একদম বিজায়া উপকূলে গিয়ে উপনীত হন।

স্প্যানিশদের ৯টি জাহাজ তার গতিরোধ করতে এগিয়ে আসে। কিন্তু তিনি একটি জাহাজ ডুবিয়ে দিয়ে দুটি দখল করে নেন।

তার এই মারমুখিতা দেখে অবশিষ্ট ছয়টি জাহাজ পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়। আরুজ মুজাহিদদের নিয়ে বিজায়া শহরে নগর প্রাচীর পর্যন্ত পৌঁছে কামান দাগানো শুরু করেন।

বিজায়া যখন পতনের দ্বারপ্রান্তে, দুর্ভাগ্যক্রমে ওই মুহূর্তে শহরপ্রাচীর থেকে নিক্ষিপ্ত একটি গুলি আরুজের বাম হাতে বিদ্ধ হয়।

এটি ১৫১৪ সালের ঘটনা। আঘাতটি গুরুতর ছিল বিধায় আরুজকে সেখান থেকে ফিরে যেতে হয়। ফলে অভিযানটি অর্ধসমাপ্ত থেকে যায়।

চিকিৎসার মাধ্যমে আহত স্থান কিছুটা ভালো হলেও, ওই হাত জীবনের জন্য অকেজো হয়ে পড়ে। মুসলমানদের সামুদ্রিক অভিযান তীব্রভাবেই চলতে থাকে।

বাহাদুর নাবিকরা খ্রিষ্টানদের স্মরণ করিয়ে দিতে থাকেন, মুসলিমদের বাহুর শক্তি এখনও ফুরিয়ে যায়নি। এখনও তারা নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার সামর্থ্য রাখে।

১৫১৫ সালে শীতকালীন ছয় মাসের মধ্যে ইউরোপীয়দের কাছ থেকে ২০টি জাহাজ ছিনিয়ে নেওয়া হয়। সঙ্গে কয়েদ করা হয় ৩৮০০ খ্রিষ্টান সৈন্য।

গ্রীষ্মকাল শুরু হওয়ার সাথে সাথে আরুজের শারীরিক অবস্থারও অনেকটা উন্নতি হয়।

তখন পুনরায় তিনি হামলার ধারাবাহিকতা কেবল শাণিয়েই তুলেননি; বরং এবার তার আক্রমণের পরিধি স্পেন উপকূল পর্যন্ত বিস্তার করেন।

মেনোর্কা দ্বীপে জাহাজ নোঙর করে স্পেনের যে হাজার হাজার মুসলমানকে জোরপূর্বক খ্রিষ্টান বানিয়ে নেওয়া হচ্ছিল, তাদের নিয়ে আসা শুরু করেন উত্তর আফ্রিকায়।

এভাবে অসংখ্য নির্যাতিত আবালবৃদ্ধবণিতা নিরাপদের সেই জ্বলমের ভূখণ্ড হতে বেরিয়ে আসতে সক্ষম হন।

উসমানীয়দের সাথে পূনরায় বন্ধুত্ব আরুজ বারবারোসা এর

আরুজ ও খায়রুদ্দিন তাদের কর্মতৎপরতা আরও বাড়াতে চাইছিলেন। তাই ভাতৃদ্বয় একদল প্রতিনিধিকে তুর্কির সুলতান প্রথম সালিমের কাছে পাঠিয়ে দেন।

সুলতান আনন্দিত হয়ে ভ্রাতৃদ্বয়কে ‘লালা’ (বাদশাহর পালিত) উপাধি প্রদান করেন।

তিনি অস্ত্রভর্তি দুটি জাহাজ প্রেরণের পাশাপাশি দুই ভাইকে একটি করে শাহি তরবারি উপঢৌকন হিসেবে দান করেন।

এটা তৎকালীন সময়ে কেবল একান্ত বিশ্বস্তজনদেরই দান করা হতো। এটি ছিল হিজরি ৯২২ সনের (১৫১৬ খ্রি.) ঘটনা।

খলিফার স্বীকৃতি পাওয়ার পর বারবারুসা ভ্রাতৃদ্বয়ের গ্রহণযোগ্যতা পুর্বের তুলনায় বহুলাংশে বেড়ে যায়।

খতিব ও দাঈগণ তখন আফ্রিকার প্রতিটি মসজিদে উপস্থিত হয়ে মানুষকে জিহাদের আহ্বান জানাতে থাকেন।

তখন উসমানি সালতানাতের অধীনস্থ তুর্ক ও আরবদের এক বিশাল দল আরুজের পতাকা তলে এসে ভিড় জমাতে থাকে।

খলিফার পক্ষ থেকেও তিনি বেশ সাহায্য-সহযোগিতা পাচ্ছিলেন। হিজরি ৯২৩ সনে (১৫১৭ খ্রি.) তাকে আরও চারটি যুদ্ধ জাহাজ দেওয়া হয়।

এ পর্যায়ে আরুজের নৌবহরে জাহাজের সংখ্যা দাঁড়ায় ২৮টি। তারা তখন যেকোনো রাষ্ট্রের নৌবহরের মোকাবেলা করার উপযুক্ত হয়ে ওঠেন।

উত্তর আফ্রিকায় ইসলামী হুকুমত প্রতিষ্ঠা ও আরুজ বারবারোসা

আরুজ সর্বপ্রথম উত্তর আফ্রিকায় একটি শক্তিশালী ইসলামি হুকুমত প্রতিষ্ঠার প্রতি জোর দেন।

সুতরাং ১৫১৭ খৃস্টাব্দে ৮০০ নৌযোদ্ধা এবং ৫ হাজার আরব স্বেচ্ছাসেবীদের নিয়ে আলজেরিয়ার উপকূলে পৌঁছেন এবং কোনোপ্রকার সংঘাত ছাড়াই আলজেরিয়া তার করতলগত হয়ে যায়।

আর এলাকাটি উসমানি সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হিসেবে গণ্য হতে থাকে। স্থানীয়ভাবে আরুজকেই ‘সুলতান’ বলা হচ্ছিল।

তিনি স্থানীয় নেতাদের ঐকবদ্ধ করে সেখানে স্প্যানিশদের বিরুদ্ধে জিহাদের জজবা জাগিয়ে তুলতে সক্রিয় হন।

স্পেনের রাজা পঞ্চম চার্লস তখন আরুজের এই উত্থান দেখে শঙ্কিত হয়ে পড়ে।

ফলে সে সেপ্টেম্বর, ১৫১৭ খ্রিস্টাব্দে আরুজের ক্ষমতা গুঁড়িয়ে দিতে ৪০টি যুদ্ধ জাহাজে করে ১৫ হাজার সৈন্য আলজেরিয়া অভিযানে পাঠায়।

ওই বাহিনী উপকূলে পৌঁছে আরুজের নির্মিত একটি নতুন দুর্গ অবরোধ করে ফেলে।

জবাবে আরুজ এমন তীব্র আক্রমণ চালান যে, স্প্যানিশরা তাদের পেছনে ৫০০ লাশ ফেলে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়।

তখন ওয়াহরান দখল করে থাকা স্পানিশরা তিলমিসানের মুসলিম শাসক হাকিম পঞ্চম মুহাম্মাদকে কাবু করে ফেলেছিল।

তিলমিসান তৎসময়ে বিশ্বের অন্যতম বড় শহর হিসেবে গণ্য হতো।

পঞ্চম মুহাম্মাদের কাছে নিজের প্রতিরোধের মতো শক্তি না থাকায় তিনি তুর্কির মোকাবেলায় স্প্যানিশদের বশ্যতা স্বীকার করে নিয়েছিলেন।

প্রতি বছর স্পেনকে কর হিসেবে ১০ হাজার লিরা সোনা, ১০ হাজার বকরি, ১০ হাজার গরু-মহিষসহ বিপুল পরিমাণ খাদ্যদ্রব্য পাঠাতেন।

তিলমিসানে স্পেন থেকে উদ্ধার করে নিয়ে আসা বিপুলসংখ্যক স্প্যানিশ মুসলিম বসবাস করত।

তারা এ বিষয়টি মেনে নিতে পারছিল না যে, তাদের শাসক সেই স্পেন সরকারকে কর প্রদান করবে, যারা স্পেন থেকে মুসলিমদের নামনিশানা মিটিয়ে ফেলতে তৎপর।

সেখানকার কতিপয় আলেম তাদের করুণ অবস্থা আরুজের কানে পৌঁছে দিলে তিনি প্রায় হাজার কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে তিলমিসানে উপনীত হন।

পঞ্চম মুহাম্মাদ আরুজকে প্রতিহত করতে বেরিয়ে এলে যুদ্ধ বাধে, কিন্তু এর করুণ পরিণাম হিসেবে তাকে পরাজিত হয়ে পালাতে হয়।

স্থানীয় জনগণ আরুজকে প্রাণঢালা স্বাগত জানায়। তিলমিসান বিজয়ের পর আরুজ ফেজ অভিমুখে রওনা হন। তিনি পূর্ব দিকের ‘ওয়াজদা’ শহরটি দখল করে নেন।

এভাবে তিনি পশ্চিম-ত্রিপোলি (লিবিয়া) থেকে আলজেরিয়া পর্যন্ত বিস্তৃত এক সুবিশাল ভূখণ্ডের অধিপতি আরুজ বারবারোসা বনে যান।

বাবা আরুজ রেইসের শাসনকাল

এত সুবিশাল ভূখণ্ডের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য উসমানীয়দের অব্যাহত সহায়তার প্রয়োজন ছিল অপরিহার্য। কিন্তু আরুজ সেখান থেকে কাঙ্ক্ষিত সৈন্য ও অর্থবল পাচ্ছিলেন না।

ফলে তার সৈন্যদের অধিকাংশ সদস্যই সাগর অভিযান বন্ধ রেখে বিজিত এলাকার নিরাপত্তা প্রচেষ্টায় নিবেদিত হয়ে পড়ে।

এদিকে এই সুযোগের সদ্ব্যবহার করে ওয়াহরানের স্প্যানিশ জেনারেল ডন মার্টিন ১০ হাজার স্প্যানিশ এবং ১০ হাজার আরব সৈন্য নিয়ে ওয়াহরান থেকে ৮০ কিলোমিটার দূরবর্তী সেই দুর্গটি অবরোধ করে নেয়, যেখানে আরুজের ভাই ইসহাক মোর্চাবন্দি অবস্থায় ছিলেন।

ইসহাক ২৫ দিন পর্যন্ত অবরুদ্ধ অবস্থায় যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছিলেন।

কিন্তু অন্য আরেকটি রণাঙ্গনে আরুজ ও খায়রুদ্দিন যুদ্ধে লিপ্ত থাকার দরুন যথাসময়ে ইসহাককে সহায়তা করতে পারেননি।

তা ছাড়া দুর্গে খাদ্যের জোগান ছিল খুব সীমিত। অল্পদিনের মধ্যে তা ফুরিয়ে আসে। তখন উপবাস মুজাহিদদের অবস্থা তারা একেবারে নাজেহাল করে ফেলে।

মুজাহিদরে অধিকাংশই শহিদ হয়ে যান। অবশেষে ৩১শে জানুয়ারি, ১৫১৮ খ্রিষ্টাব্দে ডন মার্টিন দুর্গটি জয় করে নেয়।

ডন মার্টিন যখন দুর্গে প্রবেশ করছিল তখন আঘাত-প্রতিঘাতে ক্ষতবিক্ষত ইসহাকসহ তার নিবেদিত প্রাণ সাথিরা শেষ প্রতিরোধ গড়ে তোলেন।

যুদ্ধ করতে করতে একপর্যায়ে সবাই শাহাদাতের সুধা পান করে নেন।

স্প্যানিশদের আরুজ বারবারোসা এর উপর জোড়ালো আক্রমণ

এই বিজয়ের পর কোনোপ্রকার বিলম্ব না করেই ডন মার্টিন সাড়ে ১১ হাজার খ্রিষ্টান এবং ৩৫ হাজার আরব সৈন্য সঙ্গে নিয়ে তিলমিসান অভিমুখে ধেয়ে যায়।

সেখানে পৌঁছেই সে আরুজের বিরুদ্ধে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে। আরুজ ছয়মাস অবরুদ্ধ অবস্থায় যুদ্ধ চালিয়ে যেতে থাকেন।

তিনি ফেজের সুলতানের পক্ষ থেকে সাহায্যের প্রত্যাশা করছিলেন, কিন্তু তা বাস্তব হয়ে আর দেখা দেয়নি।

তা ছাড়া আলজেরিয়ায় অবস্থানরত তার ভাই খায়রুদ্দিন খিজির পাশার কাছেও তাকে সহায়তা করার মতো যথেষ্ট সৈন্য ছিল না।

আরুজের সামনে তখন মুক্তির একটামাত্র পথই খোলা, আর সে পথে জীবন- মৃত্যুর সম্ভাবনা ছিল সমান সমান।

পথটা ছিল কেল্লা থেকে বের হয়ে প্রবল বেগে আক্রমণ চালিয়ে পথ বের করে আলজেরিয়ায় চলে যাওয়া।

সুতরাং তিনি হিস্পনীয়দের মনোবল ভেঙে দেওয়ার লক্ষ্যে একদিন খুব জোরদার আক্রমণ চালিয়ে তাদের ৭০০ সৈন্য হত্যার পাশাপাশি ১০০০ সৈন্যকে বন্দি করেন।

এই হামলার মাধ্যমে তিনি মূলত তাদের ঘেরাও ভেদ করা যাবে কি না, তা পরখ করতে চাইছিলেন।

মুসলিম সেনাপতি আরুজ বারবারোসা এর মৃত্যু

এর দু-একদিন পর তিনি সুবহে সাদিকের কিছুক্ষণ পূর্বে তার সঙ্গে থাকা মাত্র ৪০ জন সিপাহি নিয়ে খ্রিষ্টান বাহিনীর ওপর এলোপাতাড়ি হামলা চালিয়ে তাদেরকে দিশেহারা করে বেরিয়ে যেতে সক্ষম হন।

স্পেনের জেনারেল গেরিয়া দ্য টেঙ্কু তাকে ধাওয়া করে। সুলাদু নদীর তীর পর্যন্ত সে তার পেছনে ছায়ার মতো লেগে থাকে।

কিন্তু আরুজ নদী সাঁতরে সহিসালামতেই অপর তীরে তিনি পৌঁছে যান। এ সময় তার সঙ্গে মাত্র ২০ জন সৈন্য অবশিষ্ট ছিল।

বাকি ২০ জন পেছনে পড়ে গিয়েছিল এবং নদীর তীরে পৌছে তারা খ্রিষ্টানদের ৪৫ জন সৈন্যের সঙ্গে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে।

আরুজ চাইলে নিজের প্রাণ নিয়ে চলে যেতে পারতেন। কিন্তু সাথিদের পেছনে রেখে নিজের প্রাণ নিয়ে পালিয়ে যাওয়া তার আত্মমর্যাদা বরদাশত করতে পারেনি।

সুতরাং তিনি পালটা আক্রমণের জন্য পুনরায় নদীতে ঝাঁপিয়ে পড়েন।

যখন নদী সাঁতরিয়ে ওই পারে এসে পৌঁছবেন, ততক্ষণে দীর্ঘদিনের তৃষিত খ্রিষ্টান বাহিনী ওই ২০ সৈন্যকে শেষ করে নিয়েছিল।

এরপর আরুজ তীরে পৌছামাত্রই তাকে শহিদ করে ফেলে। ডন মার্টিন আরুজ বারবারাসার মাথা কেটে স্পেনে পাঠিয়ে দেয়।

সেখানে খুব ধুমধাম করে তার কর্তিত মস্তক প্রদর্শন করা হয়।

ওই সময় সুলতান সালিম ২০০০ সৈন্য, প্রচুর গোলা-বারুদ ও তোপসহ ভারী সাহায্য ছাড়াও সাগর-যুদ্ধের প্রশিক্ষণ নিতে ৪ হাজার যুবক আলজেরিয়ায় পাঠিয়েছিলেন।

কিন্তু এই সাহায্য যখন আলজেরিয়ায় পৌঁছে, ততদিনে আরুজ শহিদ হয়ে গেছেন। মৃত্যুকালে ওই মহান মর্দে মুজাহিদের বয়স ছিল ৪৮ বছর। সময়টা ১৫১৮ খৃস্টাব্দ।

তিনি তারুণ্যের পুরো সময় জিহাদে ব্যস্ত থাকার ফলে বিয়েও করার সুযোগ পাননি। তবে তার জীবনদান ব্যর্থ যায় নি।

তার শাহাদাত উসমানি সালতানাতকে এই বিশ্বাসের জানান দেয়, যতক্ষণ উত্তর আফ্রিকাকে স্পেনের জুলুম নির্যাতন থেকে মুক্ত করা না যাচ্ছে, ততক্ষণ দেশ ও জাতির নিরাপত্তা অপূর্ণই থেকে যাবে। মিল্লাতের নিরাপত্তা শঙ্কার মধ্যে থাকবে।

তথ্যসুত্র

মুসলিম উম্মাহর ইতিহাস, খন্ড ১৫, পৃষ্ঠা ৫৪-৬২

আরুজ বারবারোসা কে ছিলেন

আরুজ বারবারোসা যাকে ওরুজ রেইস অথবা বাবা অরুজ নামে মানুষ চিনে। তিনি ছিলেন সুলতান সেলিমের সময়কালে একজন বিখ্যাত মুসলিম নৌ সেনাপতি। খাইরুদ্দিন খিজির পাশার ভাই

আরুজ বারবারোসা কবে জন্মগ্রহণ করেন

আরুজ বারবারোসার জন্ম আনুমানিক ১৪৭৪ খৃস্টাব্দে। তার মূল নাম আরুজ। উপাধী বারবারোসা। তাকে বাবা আরুজ, আরুজ রেইস ইত্যাদি নামকরণে ডাকা হতো।

আরুজ বারবারোসা কে নিয়ে নির্মিত তুর্কি সিরিজের সত্যতা কতটুকু?

অধিকাংশই বানোয়াট। মুল ইতিহাসের সাথে এক মিল নেই। সেটি একটি কল্পকাহিনী বললে ভুল হবে না

লেখাটি শেয়ার করতে সর্ট লিংক কপি করুন

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top