আবু আব্দুল্লাহ শিয়ায়ী কে ছিলেন

আবু আব্দুল্লাহ কে ছিল? – ইয়ামান অঞ্চলকে ইসমাঈলী শিয়া মতবাদের প্রচারকেন্দ্র হিসেবে প্রথম স্থানে ধরা হতো। কারণ, সে সময় ইয়ামান আব্বাসীয় খেলাফতের দৃষ্টি থেকে দূরে ছিল।

এখান থেকেই তারা গোপনে সশস্ত্র বাহিনী গড়ে তোলার কাজ শুরু করে। রুস্তম ইবনে হাওশার নামে এক লোক ইয়ামানে উক্ত সশস্ত্র বাহিনীর নেতৃত্ব গ্রহন করে।

সে তার দলে পারসিকদের টানতে সক্ষম হয়। যে পারসিকরা ছিল মুসলমানদের চরম শত্রু।

তার কাছে পশ্চিমাঞ্চলীয় দেশসমূহকে শিয়া মতবাদ প্রচারের জন্য উর্বরভূমি মনে করা হয়।

ইয়ামান থেকে সে তিউনিশিয়ায় তার কিছু অনুসারীকে শিয়া মতবাদ প্রচারের জন্য প্রেরণ করে।

রুস্তম ইবনে হাওশার শিয়া  মতবাদ প্রচারের জন্য ইয়ামানে আবু আব্দুল্লাহকে দায়িত্ব প্রধান করে।

আবু আব্দুল্লাহ

আবু আব্দুল্লাহ

সে ছিল ইয়ামানের রাজধানী সানাআর অধিবাসী। আবু আব্দুল্লাহর মধ্যে নেতৃত্বের গুণাবলি ছিল সুস্পষ্টভাবে।

সে বিচারবুদ্ধিতে অনেক পারদর্শী ছিল। পাশাপাশি আবু আব্দুল্লাহ কথার মাধ্যমে মানুষকে কাছে টানতে পারতো।

এই আবু আব্দুল্লাহ শিয়ায়ীকে ইয়ামানে ইসমাঈলী সাম্রাজ্য বা রাফেযী সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা মনে করা হয়।

শিয়া মতাদর্শের দুইজন প্রচারক আবু সুফিয়ান ও হালওয়ানীর মৃত্যুর পর আবু আব্দুল্লাহকে শিয়া মতবাদের প্রচারকের দায়িত্ব দিয়ে উত্তর আফ্রিকার মরক্কোতে প্রেরণ করা হয়।

তাকে মরক্কোতে পাঠানো হয় এক মিশনের দায়িত্ব দিয়ে।

মরক্কোয় আবু আব্দুল্লাহ

২৮৮ হিজরীতে আবু আব্দুল্লাহ শিয়ায়ী হজ্জ্বের জন্য মক্কায় আসে। সে তখন মক্কায় হজ্জযাত্রীদের সাথে দেখা করে।

তাদের সাথে বড় আলেম হিসেবে নিজেকে উপস্থাপন করে।

এর মাধ্যমে সে মরক্কোর কাত্তান অঞ্চলের শায়েখদের মন জয় করে নেয়।

তখন কাত্তানী শায়েখরা তাকে মরক্কো যেতে অনুরোধ করে। তখন সে সেই শায়েখদের সাথে করে মরক্কোতে যায়।

আবু আব্দুল্লাহ শিয়ায়ী মরক্কোতে পৌঁছে প্রথমে তিনটা কাজ করে।

ক) আগালিবা সাম্রাজ্যের দুর্বল জায়গা চিহ্নিত করা।

খ) মরক্কোর গোত্রগুলো সম্পর্কে ভালোভাবে জানা।

গ) মরক্কোতে প্রবেশেদ্বারগুলো সম্পর্কে জানা।

আবু আব্দুল্লাহ শিয়ায়ীর ব্যক্তিত্ব

জীবদ্দশায় সে একজন দুনিয়াবিমুখ সমাজ সংস্কারক ও মুত্তাকী ব্যক্তির ভাব ধারণ করে। এর দ্বারা সে মানুষের মন জয় করতে সক্ষম হয়।

তার সুনাম চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ে। এক পর্যায় সে ধীরে ধীরে রাজনীতিতে জড়ায় নিজেকে। রাষ্ট্রীয় কার্যক্রমে সে নিজের অবস্থান তৈরী করে নেয়।

তখন সে তার মতবাদ প্রচার করার মোক্ষম সুযোগ পেয়ে যায়। পূর্ব থেকেই আগালিবা গোত্রের দ্বারা নিপীড়িত মানুষকে সে টার্গেট করে।

সুযোগ বুঝে আবু আব্দুল্লাহ শিয়ায়ী নির্যাতিতদের শিয়া দীক্ষায় দিক্ষিত করে।

তারা আবু আব্দুল্লাহকে নিজেদের মুক্তিদাতা মানতে শুরু করে। আগালিবা গোত্র যখন দেখলো, মানুষ দলে দলে আবু আব্দুল্লাহর কাছে জমায়েত হয়ে তাকে নেতা হিসেবে মেনে নিচ্ছে তখনই তাদের টনক নড়ে।

সংঘর্ষ শুরু হয় আগালিবা গোত্র আর আবু আব্দুল্লাহর মাঝে। এক পর্যায়ে সে আগালিবাদের পরাজিতে করতে সক্ষম হয়।

তবে সেটা পুরোপুরি পরাজয় ছিল না। এই যুদ্ধের মাধ্যমে আগালিবাদের প্রতাব-প্রতিপত্তি কমে যেতে থাকে।

আবু আব্দুল্লাহর হঠকারীতা

আবু আব্দুল্লাহও এমন সময় মানুষের নিকট প্রচার করা শুরু করে, আগালিবাদের শাসনকার্য শরীয়ত বহির্ভূত।

এর ফলে আগালিবাদের মধ্যকার পুরোনো বিরোধ আবু আব্দুল্লাহ আবার জাগ্রত করে। এর ফলে আগালিবাদের মধ্যে গৃহযুদ্ধ শুরু হয়।

আবু আব্দুল্লাহ একজন প্রচারক হওয়ার পাশাপাশি তীক্ষ্ন মেধার অধিকারীও ছিল্ তার সমরশক্তি ছিল উচ্চমানের।

ফলে সে আগালিবাদের বিরুদ্ধে যেই সাহস, বীরত্ব, রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও সৈন্য নৈপুন্যের পরিচয় দেয়, তাতে তার সঙ্গে থাকা লোকজনের এবং সৈনিকদের মনোবল এবং আস্থা বৃদ্ধি পেয়ে যায়।

এই মুহুর্তকেই আবু আব্দুল্লাহ শিয়া মতবাদ প্রচারের উপযুক্ত সময় মনে করে।

আরিস শহর দখল

২৯৬ হিজরীতে অর্থাৎ ৯০৯ খৃস্টাব্দে আবু আব্দুল্লাহ আরিস শহর হস্তগত করে।

এই শহর ছিল ওই অঞ্চলের রাজনৈতিক রাজধানী কায়রাওয়ানের প্রবেশদ্বার।

এই বছর শিয়াদের আরেক নেতা যিয়াদাতুল্লাহ মিসরে প্রত্যাবর্তন করে আর আবু আব্দুল্লাহ কায়রাওয়ান প্রবেশ করে।

ওবায়দুল্লাহর মাহদীর আবির্ভাব

এই ঘটনার পর আবু আব্দুল্লাহ ঘোষণা করে, ওবায়দুল্লাহ মাহদী হলেন মুসলমানদের প্রকৃত নেতা ও ইমাম।

তিনি অতিসত্তর মরক্কোতে পৌছবেন এবং ন্যায় ও ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করবেন।

এই কথা শুনে আগালিবদের আরো কিছু নেতা দলসহ আবু আব্দুল্লাহর দরে ভিড়ে।

এই সময়টাতে উত্তর আফ্রিকার আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাতের আলেমদের সঙ্গে আবু আব্দুল্লাহর বিতর্ক এবং বাহাস অনুষ্ঠিত হয়।

যুক্তি-প্রমাণের আলোকে আবু আব্দুল্লাহ সদুত্তর দিতে না পারায় সে হেরে যায়।

ফলে ক্ষিপ্ত হয়ে  আবু আব্দুল্লাহর ছোট ভাই আবুল আব্বাস আহলুস সুন্নাহর আলেম ও অনুসারীদের উপর ব্যাপক নির্যাতন চালায়।

তাদের কাউকে হত্যা করে, কাউকে গুম করে, কারো জিহ্বা কেঁটে দেয়। কাউকে অন্ধ করে দেয়।

ফলে মানুষের মাঝে বিদ্রোহ দেখা দিলে সে রাজনৈতিক কৌশলে তার ভাইকে দেশান্তর করে এবং সকল ধরণের বিতর্ক-বাহাস অনুষ্ঠান নিষিদ্ধ করে।

বনু মিদরাকের সাথে যুদ্ধ

২৯৭ হিজরী মোতাবেক ৯১০ খ্রিষ্টাব্দে আবু আব্দুল্লাহ শিয়ায়ী বড় বাহিনী তৈরী করে।

এর দ্বারা সে বনু মিদরারকে নির্মূল করতে সক্ষম হয়। সে উবায়দুল্লাহ মাহদীকে জেল থেকে মুক্ত করে। কারণ, উবায়দুল্লাহ মাহদীর পেছনে আব্বাসীয় খেলাফতের গোয়েন্দারা লেগে থাকতো।

তাই তাকে বনু মিদরাররা আটক করতে সক্ষম হয়েছিল। এই যুদ্ধের দ্বারা মধ্য মরক্কোতেও শিয়াদের আধিপত্য বিস্তার ঘটে।

এর পরেই শিয়ারা সর্বপ্রথম রাষ্ট্র গঠন করে।

আবু আব্দুল্লাহ র সাথে বিরোধ

যেহেতু ফাতেমী সাম্রাজ্যের অনেক বড় অংশ আগে আবু আব্দুল্লাহর হাতে ছিল তাই সে নিজেকে সেসব এলাকার সম্পদের হকদার মনে করতো।

পাশাপাশি উবায়দুল্লাহ মাহদী অন্যায়ভাবে অনেক সম্পদ আত্মসাৎ করতো।

ফলে তার মনে সন্দেহ সৃষ্টি হয়।

কারণ আবু আব্দুল্লাহ শিয়ায়ী বিশ্বাস করতো, উবায়দুল্লাহ মাহদী হলো, প্রতিক্ষিত মাহদী।

যখন আবু আব্দুল্লাহর মনে সন্দেহ সৃষ্টি হয়, উবায়দুল্লাহ প্রতিক্ষিত মাহদী নয় তখন থেকে তার সাথে উবায়দুল্লাহর বিরোধ শুরু হয়।

এই কল্পিত ফাতেমী সাম্রাজ্য তাদের নসব বা বংশ প্রমাণের জন্য যারাই উঠেপড়ে লেগেছে, তাদেরকেই তারা হত্যা ও গুম করেছে।

ইমাম ইবনে তাইমিয়া রাহ. বর্ণনা করেন, ফাতেমী সাম্রাজ্যের সম্রাটটা নিজেদের ফাতেমা রা. এর বংশের সাথে নিসবত করলেও তারা প্রকৃতপক্ষে শামের সালমিয়া এলাকার ইহুদী বংশোদ্ভূত।

কাদ্দাহ ছিল তাদের পূর্বপুরুষের উপাধী। সে ছিল পেশায় চোখের ডাক্তার।

বিখ্যাত “ফাতেমী সাম্রাজ্যের ইতিহাস” গ্রন্থের লেখক ড. আলী মুহাম্মাদ সাল্লাবী বলেন,

আবু আব্দুল্লাহ শিয়ায়ীর কাছে যখন এই কথা স্পষ্ট হয়ে যায় যে,

উবায়দুল্লাহ মাহদী একজন ক্ষমতালোভী এবং স্বেচ্ছাচারী ব্যক্তি তখন থেকেই আবু আবদুল্লাহ তার কাছ থেকে নিষ্কৃতি পাওয়ার চেষ্টা করে।

তখন সে তার অনুসারীদের বুঝাতে থাকে, এ প্রকৃত মাহদী নয়।

আবু আব্দুল্লাহ কে হত্যা

কিন্তু উবায়দুল্লাহ ছিল আরো বেশি ধুরন্ধর এবং কুটনৈতিকবিদ। তাই সে ই আবু আব্দুল্লাহকে সম্ভবত হত্যা করে তার থেকে নিষ্কৃতি লাভ করে।

উবায়দুল্লাহ মাহদী তার শাসন ক্ষমতায় ধারাবাহিকভাবে বহাল থাকার পর ৩২২ হিজরীতে মৃত্যুবরণ করে। সে ২৫ বছর কয়েক মাস ক্ষমতার মসনদে থাকে।

উবায়দুল্লাহ মাহদী তার ভ্রান্ত দাবীর উপর নির্ভর করে নিজের মতবাদ প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করে।

এমনকি আবু আব্দুল্লাহ শিয়ায়ী তার ব্যাপারে আস্তে আস্তে নির্ভরতা কমাতে লাগলো।

শেষ পর্যন্ত আব্দুল্লাহ হয়তো বিদ্রোহ করতে গিয়েও করতে পারে নি। তিনি একটা ভুলের উপর প্রতিষ্ঠিত থেকে জীবেন কিছুই অর্জন করতে পারলেন না।

তার থেকে তিনি যদি তার দখলকৃত এলাকাসহ আব্বাসী খেলাফতের সাথে যুক্ত হতেন আর ভালো আকীদা লালন করতেন তাহলে তিনি আজকে ইতিহাসে উজ্জ্বল হয়ে থাকতেন।

আর চির অমর হয়ে থাকতেন। কারন সে মানুষকে আকর্ষণ করতে পারতেন এবং ভালো শিক্ষক ছিলেন।

এই হলো সংক্ষিপ্ত আকারে শিয়াদের প্রথম খলিফা, ফাতেমী সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা বা রাফেযী খলিফা উবায়দুল্লাহ মাহদীর সংক্ষিপ্ত জীবনী।

পাশাপাশি ফাতেমী সাম্রাজ্যের অন্যতম সহায়ক আবু আব্দুল্লাহ শিয়ায়ীর শেষ জীবনে অনুশোচনা এবং জীবনের পরিসমাপ্তি।

আমার তার মৃত্যু তারিখ জানা নেই। তাই এখানে উল্লেখ করতে পারছি না।

তথ্যসুত্র

ফাতেমী সাম্রাজ্যের ইতিহাস

আমি একজন ইসলামিক আলোচক, লেখক। ছোটবেলায় পড়ালেখা করেছি কওমী মাদ্রাসায়। পরবর্তীতে সাইন্স বিভাগ থেকে এসএসসি পরীক্ষা দিয়ে কৃতিত্বের সাথে পাশ করি। বর্তমানে আমি ডিপ্লোমা ইন মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং এ অধ্যায়নরত। অবসরে আমি বই পড়তে পছন্দ করি। নতুন কিছু শিখতে, নতুন কিছু জানতে ভালোবাসি। আমার ইচ্ছা, ভালো মানুষ হয়ে সমাজকে সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজে বিরত রাখার চেষ্টা করা।

https://www.arhasan.com