আধুনিক কুফর-শিরক – যুগ যত আধুনিক হচ্ছে, মানুষ বাহ্যিকভাবে ততই অগ্রসর হচ্ছে। তারা দুনিয়াবী শিক্ষার ক্ষেত্রে, সামাজিক প্রভাব-প্রতিপত্তির ক্ষেত্রে, অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে অগ্রসর। কিন্তু স্বেচ্ছায় পিছিয়ে পড়ছে একটি স্থান থেকে। ঈমান। মানুষের নিকট এখন দ্বীন হলো, ইচ্ছাধিকার। মন চাইলে দ্বীন মানবে, মন না চাইলে দ্বীন মানবে না। কোনো পেরেশানি নেই, কোনো আগ্রহ নেই।
যারা খানিকটা প্রাকটিসিং মুসলিম, তারাও কখনো কখনো দ্বীনী বিধানাবলীর সামনে এসে হোঁচট খায়। “অমুক বিধানটি এত কঠিন কেন?” “ইসলাম কি আসলেই এত কঠিন?” এমন নানা প্রশ্ন তাদের মাথায় ঘুরপাক খেতে থাকে।
জাহিলিয়্যাতের এই সমাজের সূচনা পৃথিবীর সূচনা থেকেই। সময়ে সময়ে নবী-রাসূলগণ এসেছেন, পৃথিবীকে সংস্কার করেছেন, আল্লাহর আদেশ মোতাবেক সাজিয়েছেন। এরই ধারাবাহিকতায় আগমন সর্বশেষ নবী হযরত মুহাম্মাদ ﷺ এর। তিনি আসলেন আল্লাহর আদেশ নিয়ে। কুফফার বিশ্বকে দ্বীনের আলো দেখালেন। পশুরূপী মানুষদের পরশ পাথরে পরিণত করলেন।
কখনো কি ভেবে দেখেছি, সাহাবীরা কীভাবে রাসূলের নিকট নিজেদের উৎসর্গ করেছিলেন? কিভাবে তারা রাসূলের সব কথা নির্দিধায় মেনে নিয়েছিলেন? উত্তর হলো, তারা পরিপূর্ণভাবে আল্লাহর নিকট আত্মসমর্পণ করেছিলেন। ইসলাম গ্রহণের পর তারা তাদের পূর্বে রীতি-নীতি, শিক্ষা-দীক্ষাকে স্বেচ্ছায় বাতিল সাব্যস্ত করে রাসূলের নিকট নিজেদের সপে দিয়েছেন।
আমরা যখন খানিকটা হেদায়াত পাই তখন আমাদের মধ্যে একটি রোগ দেখা যায়। আমরা নতুন শেখা ইসলামকে আমাদের পূর্বের শিক্ষার সাথে যাচাই করার বৃথা চেষ্টা করি। অথচ মূলনীতি হলো, “ইসলাম সর্বদা উঁচুতে থাকবে, কখনোই অবধামিত হবে না”। যেখানে আমাদের উচিৎ ছিল, অন্যান্য শিক্ষাকে ইসলামের কষ্টিপাথরে ঘষা দিয়ে মাপা। সেখানে আমরা করি উল্টোটি।
আমাদের পুরুষদেরকে শয়তান ধোঁকা দেয় রাজনীতির মাধ্যমে, আর আমাদের মহিলাদের শয়তান ধোঁকা দেয় অধিকারের নামে। ‘অধিকার’ শব্দটি নিছক ছোট্ট হলেও এর মধ্যে লুকিয়ে আছে বহু শব্দজাদু। দুইটা সংজ্ঞা আনছি এখানে। দুনিয়াবী দৃষ্টিতে, “অধিকার বলতে এমন বৈধ দাবি, স্বাধীনতা বা সুবিধাকে বোঝায়, যা প্রত্যেক মানুষ জন্মগতভাবে বা আইনগতভাবে পাওয়ার যোগ্য। অর্থাৎ, এমন কিছু যা কেউ ন্যায্যভাবে পেতে পারে এবং অন্য কেউ তা অস্বীকার করতে পারে না।”
এখন এখানে আরো কিছু নতুন প্রশ্ন আসবে। “স্বাধীনতা কি?”, “সুবিধা কি?”, “আইনগত শব্দ দ্বারা এই আইনের উৎস কি?”, “ন্যায্য এর মানদন্ড কি?”। এত এত প্রশ্নের মধ্যেও সুক্ষ্ম প্রশ্ন লুকায়িত থাকে। শয়তান ও বৃটিশ আইনের কাজ হলো, এসব সুক্ষ্ম মারপ্যাচ দিয়ে মানুষকে ধোঁকা দেওয়া ও গোমরাহ করা।
ইসলামের ভাষায় অধিকার বা হক হলো, যে বিষয় আল্লাহ ও তাঁর রাসূল মানুষের জন্য নির্ধারিত করেছেন এবং যা আদায় করা বাধ্যতামূলক। কুরআনের সূরা রুম, সূরা হুদ, সূরা নাহলে অধিকার নিয়ে বলা হয়েছে। হাদীসের মধ্যে সহীহাইনের মধ্যে অধিকার সংক্রান্ত আলোচনা এসেছে।
এখানে বারবার অধিকার শব্দটি আনার কারণ হলো, যাতে এই বিষয়টা পরিষ্কার হয়ে যায়, দুনিয়াবী অধিকার ও আল্লাহর নিকট অধিকার এক নয়। এবার মূল শিরোনামের দিকে ফিরে যাই। আধুনিক কুফর-শিরক কীভাবে সমাজে প্রতিষ্ঠিত হয়?
“আধুনিক” মানে যা ১৩০০ শতকের পর ইউরোপে রেনেসা, রিফর্মেশন, এনলাইটেনমেন্টের মাধ্যমে ১৭০০ সনে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। সেই চিন্তাধারার উপর দাঁড়িয়ে আছে বর্তমান বিশ্ব ও ইউরোপ আমেরিকার কুফফার শক্তি। সমাজে বহু বিষয় এমন আছে, যেখানে শুরুতে দেখলে মনে হবে, এটা তো ইসলামিক। কিন্তু ভালোভাবে দেখলে দেখা যাবে, এটা শুধুমাত্র ইসলামের খোলস। ভেতরে ফাঁপা বুলি। খালি।
এমন বহু চিন্তা-চেতনা, চাহিদা, ইচ্ছা-অনিচ্ছার মাধ্যমে কুফর আমাদের মধ্যে প্রবেশ করে। কুফর আমাদের অন্তরে জায়গা করে নেয়। ঈমানের ৭৭টি শাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এছাড়াও কারো মধ্যে আকিদার জ্ঞান পরিপূর্ণ না থাকলে সে সর্বদা ধোঁকায় পড়ে যেতে পারে।
শিরকের আধুনিক ভার্সন হলো, পার্লামেন্ট। আমরা সেখানে কিছু মূর্তি বসাই। সেগুলোকে পূজো দেই। অথচ আল্লাহর কুরআন বলে, “যারা আল্লাহর আইন ব্যতিত নিজেরা আইন তৈরি করে, তারা কাফির —- তারা ফাসিক —— তারা যালিম।”