মানুষ বাঁচে অন্যের জন্য, অন্যের ভরসায়। দুনিয়াতে মায়া মানুষকে আবদ্ধ করে রাখে সম্পর্কে, বন্ধনে, পরিবারে। একজন স্বামী কেন তার স্ত্রীর আজীবনের সুখ দুঃখের সাথী হয়? কিসের লোভে? মায়া, ভালোবাসা, দায়িত্ববোধ। সন্তানকে কেন পিতা-মাতা নিজের চেয়েও বেশি ভালোবাসেন? এখানেও একই কথা। মায়ার জন্য। দুনিয়ার এই সম্পর্ক সৃষ্টির শুরু থেকেই আল্লাহর তৈরি করে দেওয়া নেযাম। আল্লাহ মানুষকে এমনি এমনি সৃষ্টি করেন নি। মানব সৃষ্টির পেছনে আল্লাহর অনেক বড় উদ্দেশ্য আছে। কুরআনে আল্লাহ বলেন,
আর ওই সময়ের কথা স্বরণ করো, যখন আল্লাহ ফেরেশতাদেরকে বললেন, আমি যমীনে আমার খলিফা সৃষ্টি করতে চাই। ফেরেশতারা তখন তা অস্বীকার করে। ফেরেশতারা চায় নি, অন্য কেউ আল্লাহর পছন্দের হোক। তখন আল্লাহ বলেছিলেন, আমি যা জানি, তোমরা তা জান না। ইবলিসের কথা মনে আছে? সে আল্লাহর অবাধ্য হয়েছিল। কিন্তু শুরুতে সে ছিল, ইবাদতগুজার। ইবলিসের ধ্বংসের পেছনে মূলমন্ত্র হলো, অহংকার। সে অহংকার করেছে। আল্লাহ এর ফলে তাকে ধ্বংস করে দিয়েছেন।
মানুষ যখন অন্যের ভরসায় বড় হয়, একটা সময় তার অন্তরে সামান্য হলেও অহংকার চলে আসে। অথচ তার আসার কথা ছিল বিনয়, নম্রতা ও ভদ্রতা। এর কারণটি বড়ই অদ্ভূত! মানুষের অন্তরেও আল্লাহ অহংকারের বীজ দিয়েছেন। কেউ কেউ তো অহংকারকেই বলে বসে গায়রত! অথচ তারা জানে না, কোনটি গায়রত আর কোনটি অহংকার। এই অহংকারের কারণে শয়তান ধ্বংস হয়েছে। এটি খুবই খারাপ একটি গুণ। শয়তানকে আল্লাহ ধ্বংস করে দিয়েছিলেন এই কাজের জন্য। সে শুধু বলেছিল, আমি কেন আদমকে সিজদা করবো? আদম তো মাটির তৈরি আর আমি আগুনের তৈরি! আল্লাহ শুধুমাত্র তার এতুটুকু কথার কারণে তাদের আজীবনের জন্য জাহান্নামী বানিয়ে দিয়েছেন। তাকে জান্নাত থেকে বঞ্চিত করেছেন।
ভরসা মানুষকে বাঁচতে শেখায়, এটা ঠিক। কিন্তু কখনো কখনো ভরসা মানুষকে নষ্ট করে দেয়। তাকে দায়িত্ববোধ হতে বাধা প্রদান করে। একজন মানুষ কখন পূর্ণাঙ্গ দায়িত্ববান হয়? যখন সে উক্ত কাজে অন্যের ভরসা ছেড়ে দেয়। নিজে করা শিখে। বহু পরিবার এমন আছে, বিয়ের আগে তারা কখনো বাজারেও যায় নি। ঠিক সেই ব্যক্তিটি বিয়ের পর বাজারে যাওয়া শুরু করে। কেন? কারণ এতদিন সে ছিল অন্যের রাজপুত্র, আজ সে হয়েছে একজন স্বামী। তাই স্বামী যদি দায়িত্বজ্ঞানহীন হয়, তাহলে সংসারে হাজারে অশান্তি দানা বাঁধতে শুরু করে।
একজন দায়িত্ববান ব্যক্তির জন্য আল্লাহ যেমন জান্নাতের সুসংবাদ দিয়েছেন, তেমনি দায়িত্বজ্ঞানে নীতিহীন হলে তার ব্যাপারে কঠিন হুশিয়ারি আছে। নবীজি সা. বলেছেন, তোমরা প্রত্যেকে দায়িত্বশীল। প্রত্যেককেই তার দায়িত্বের ব্যাপারে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। স্বামী তার স্ত্রী সন্তানদের ব্যাপারে দায়িত্বশীল। তাকে এই সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। স্ত্রী তার স্বামীর সম্পদ ও সন্তানদের ব্যাপারে দায়িত্বশীল। তাকে সেই সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।[1] তাই দিনশেষে একজন দায়িত্ববান ব্যক্তি হওয়া আমাদের জন্য অত্যন্ত সুখের, অত্যন্ত আনন্দের। মহান আল্লাহ আমাদের সেই তাওফিক দান করুন। আমীন।
[1] সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৭১৩৮