হাসিনার পদত্যাগের পরবর্তী বাংলাদেশ – যুগে যুগে বহু ক্ষমতাধর এবং ফ্যাসিবাদ আসে। একটা সময় তারা হারিয়ে যায়। আজীবন মানুষ তাদের ঘৃণাভরে স্বরণ করে।
বাংলাদেশের ইতিহাসে আজকের দিনটি স্বরণীয় হয়ে থাকবে। এই তারিখটি পরবর্তী ইতিহাসের পাতায় হয়তো স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। ০৫ আগষ্ট ২০২৪। রোজ সোমবার।
বিগত কোটা আন্দোলন শুরু হওয়ার পর থেকেই একের পর এক কর্মসূচি চলমান ছিল।
এই দিনে ছিল “মার্চ টু ঢাকা” বা ঢাকা অভিমুখে লংমার্চ যাত্রা। এই দিনটা প্রথমে ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল ৬ তারিখের জন্য।
কিন্তু এর আগেই গতকাল তথা ০৪ তারিখ বাংলাদেশে মোবাইল ইন্টারনেট বন্ধ করে দেওয়া হয়। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে লংমার্চ ৫ তারিখেই নির্ধারণ করা হয়।
সকাল থেকে দেশের অবস্থা ছিল থমথমে। ৪ তারিখ সন্ধার পর থেকে কারফিউ জারি ছিল। পূর্বেই খবর পাওয়া গিয়েছিল, সেনাবাহিনীর মধ্যে বর্তমানে মতানৈক্য ছড়িয়ে পড়ছে।
তারা হাসিনাকে রাখা অথবা না রাখার ক্ষেত্রে একমত হতে পারছিল না। কেউ ছিল হাসিনার পক্ষে আবার কেউ ছিল এর বিপক্ষে।
বিগত ১৪ বছর ধরে বাংলাদেশে হাসিনার শাসন চলমান। এর মধ্যে সেনাবাহিনীকে অনেকটা আওয়ামী বাহিনী বানিয়ে ফেলা হয়েছিল।
সেনাবাহিনীদের মধ্যে এমন মতানৈক্য কোটা আন্দোলনের শুরুর দিকেও ছিল না।
তখন তারা পুলিশের সহায়তায় এবং লীগের সহায়তায় নিরপরাধ ছাত্রদের হত্যা করতেও পিছপা হয় নি।
UN কর্তৃক দেওয়া হেলিকপ্টার ব্যবহার করে সেনাবাহিনী আকাশ থেকে গুলি ছুঁড়েছিল।
বাংলাদেশে বিগত ১৭ জুলাই ২০২৪ এর দিকে মোবাইল ইন্টারনেট বন্ধ করা হয়। পরবর্তীতে ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট ১৮ তারিখ বন্ধ করা হয়।
সর্বশেষ ২৩ জুলাই ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট ফিরে আসে এবং ২৮ জুলাই মোবাইল ইন্টারনেট ফিরে আসে।
প্রথম ধাপে এই ১ সপ্তাহর উপরে এই যুগে ইন্টারনেট না থাকাটা ছিল বিরল।
এই সময় সেনাবাহিনীর মদদে বিভিন্ন হত্যাকাণ্ড সংগঠিত হয় এই বাংলাদেশে। যা পরবর্তীতে ইন্টারনেট ফিরে আসার পর সামাজিক মাধ্যমগুলোতে ভিডিও, ছবি ছড়িয়ে পড়ে।
সেনাবাহিনী কেন হাসিনার বিপক্ষে গেল
বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সাইকোলজিটা একটু জটিল। আপনি তাদেরকে ভালোভাবে নিরীক্ষা না করলে কখনোই বুঝতে পারবেন না। তাদের মিশন ও ভিশন ভিন্ন।
দেশের সেনাবাহিনীর মধ্যে ভারতীয়দের পক্ষে অনেক সেনা এবং অফিসার আছে।
এছাড়াও চীনের পক্ষেও অনেক সেনা এবং অফিসার আছে। আরো আছে আমেরিকার পক্ষেও।
চীনের জন্য বাংলা অঞ্চল খুবই গুরুত্বপূর্ণ তাদের স্বার্থে। কারণ, যদি চীন এই ভূমিতে নিজেদের কর্তৃত্ব হারায় তাহলে ভারতের সাথে এক হয়ে আমেরিকা বাংলায় সেনাঘাঁটি করবে।
এর ফলে আমেরিকার মিসাইলের রেঞ্জে চীন চলে আসবে। এটা তাদের জন্য অনেক ক্ষতির কারণ।
তাই তো আমরা দেখতে পাই, বাংলাদেশে বিভিন্ন মেগা প্রজেক্টে চীন এগিয়ে আসছে, ঋণ দিচ্ছে।
সর্বশেষ মোংলা বন্দর নিয়ে চীনের সাথে বাংলাদেশের একটা ফাইট হয়। যেখানে মোংলার নিয়ন্ত্রণ চীন চেয়েছিল। কিন্তু তা পায় নি। এর বদৌলতে ভারতকে দেওয়া হয় মোংলা সমুদ্র বন্দরের দায়িত্ব।
এর ফলে দেশে রেল ট্রানজিট এবং বন্দরের দায়িত্বের মতো গুরুত্বপূর্ণ দুইটা প্রজেক্ট পায় ভারত। এটা ছিল চীনের জন্য মাথাব্যাথার কারণ।
তাই চীন অবশ্যই চাইবে, তার স্বার্থের পক্ষের সরকার রাখার জন্য। যেহেতু আওয়ামী লীগ শেষের দিকে একেবারে অতিরিক্ত ভারত ঘেঁষা হয়ে যাচ্ছিল, তাই আমার আশঙ্কা অনুযায়ী চীন বাংলাদেশের সেনাবাহিনীর মধ্যে দ্বন্দ্ব তৈরি করে দেয়।
এছাড়াও বিগত কারফিউতে এবং ছাত্র আন্দোলনে সেনাবাহিনীর নিরস্ত্র শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরায় এবং জাতিসংঘের অনেক ইন্সটুমেন্ট ব্যবহার করায় আমেরিকা থেকেও চাপ আসে সেনাবাহিনীর উপর।
তাই তো পরবর্তীতে দেখা গিয়েছিল, সেনাবাহিনীরা অনেকটা সহনশীল আচরণ শুরু করেছিল। তারা ছাত্রদের নিরাপত্তা দিচ্ছিল। আরো বিভিন্নভাবে আন্দোলনের পক্ষে থাকার ঘোষণা দিচ্ছিল।
ইন্টারনেটে রাষ্ট্রীয় শোক কে উপেক্ষা করে সকলে নিজেদের প্রোফাইল লাল করে ছাত্র আন্দোলনের সমর্থকরা।
তখন সেনা কর্মকর্তাদের অনেকে এবং সাবেক সেনাপ্রধানকেও প্রোফাইল লাল করতে দেখা যায়।
এটাই ছিল হাসিনার বিপক্ষে যাওয়ার সেনাবাহিনীর পক্ষ হতে ইঙ্গিত। কারণ, সেনারা যদি আন্তর্জাতিক স্যানশনে পড়ে যায় তাহলে তারা জাতিসংঘের মিশনে যেতে পারবে না।
তার মানে কি সেনাদের মধ্যে ভারতপন্থীরা চুপ করে বসে ছিল বা থাকবে? নাহ্। তারা কাজ করে গিয়েছিল এবং ভবিষ্যতেও যাবে।
হাসিনার পদত্যাগে দেশে জনতার উল্লাস
০৫ আগষ্ট ২০২৪ তারিখে শেখ হাসিনা পদত্যাগপত্রে সাক্ষর করে। এরপর তাকে সেনাবাহিনীর হেলিকপ্টারে করে পরিবারের লোকেরাসহ ভারতে পাঠানো হয়।
শেষ তথ্যমতে ভারতের আগরতলায় নেমেছিল। কিন্তু পরবর্তীতে সেখান থেকে অন্যত্র যেতে পারে। বলা হচ্ছে লন্ডনে যাবে হাসিনা।
সকাল থেকে ঢাকায় কারফিউর কারণে লোকজন জড়ো হতে পারছিল না।
প্রধান সড়কগুলোতে পুলিশ এবং সেনাবাহিনীর সদস্যরা ছিল। তারা লোকদেরকে গলির মধ্যে ঢুকিয়ে দিচ্ছিল।
খেলা ঘুরে যায় দুপুর ১টার পর। ৫ তারিখ সকালে ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট বন্ধ করা হয়।
মোবাইল ইন্টারনেট ৪ তারিখ থেকেই বন্ধ ছিল। ইন্টারনেট অতঃপর আসে দুপুরে দেড়টায়।
দুপুরের দিকে সেনাবাহিনী সরে যায়। পুলিশরাও স্থান ত্যাগ করে চলে যায়। মানুষ বাধভাঙ্গা জোয়ারের মতো প্রধান সড়কগুলোতে জড়ো হতে থাকে।
আনন্দে উল্লাসিত ছিল সকলেই। এর মধ্যেই শোনা যায়, সেনাপ্রধান জাতির উদ্দেশ্যে ভাষণ দিবে। এটা দ্বারাই মানুষ বুঝে ফেলে, হাসিনার ক্ষমতা শেষ।
অবশেষে দুপুর ৩টায় সেনাপ্রধান ভাষণ দেয় এবং জানায় হাসিনা সরকার পদত্যাগ করেছে।
এখন সেনাবাহিনী নিরাপত্তার জন্য দেশে অন্তবর্তীকালীন সরকার গঠন করবে প্রধান দলগুলো নিয়ে।
ইসলামপ্রিয় মানুষের দেশে সরকারে ইসলামী দলগুলো কোথায়?
বাংলাদেশে ইসলামপ্রিয় মানুষ অনেক। শরীয়াহ শাসন চায় বহু মানুষ। সচেতন নাগরিক এবং শিক্ষিত সমাজের পছন্দের তালিকাতেই রয়েছে শরীয়াহ শাসন।
কিন্তু প্রতিবারই এটার পক্ষে বাঁধা এসেছে। এদেশে এখন পর্যন্ত যতবার নতুন সরকার এসেছে ততবারই ইসলামপন্থীরা বিপদে পড়েছে।
এই আন্দোলনে যদিও শেষের দিকে অনেক ইসলামী দল এবং মাদ্রাসার ছাত্র অংশগ্রহণ করছিল, এছাড়াও শুরুর থেকেই তরুণ আলেমরা অংশ নিয়েছিল, কিন্তু এর ফলে বাস্তবতা পরিবর্তন হয় নি।
দেশের সেনাবাহিনীর গাড়ির উপরে যদিও কালিমার পতাকা দেখা যায় এবং বিজয়ের পর কালিমার পতাকা, ফিলিস্তিনের পতাকা হাতে উল্লাস করতেও দেখা যায়, কিন্তু বাস্তবতা হলো দেশ পূর্বের তিমিরেই রয়ে গিয়েছে।
অন্তবর্তীকালীন সরকার গঠনের আলোচনাসভায় যদিও ইসলামী দলগুলোর কিছু আলেমকে ডাকা হয়েছে, কিন্তু তাদেরকে সরকারে বড় কোনো দায়িত্ব দেওয়া হবে বলে আমি মনে করি না।
৩ মাসের জন্য অস্থায়ী সরকারে দেশের পুরোনো বুদ্ধিজীবী ও রাজনৈতিক ব্যক্তিরা যুক্ত হবে।
ড. ইউনুসসহ আরো অনেকে যুক্ত হতে পারে। যুক্ত হতে পারে অনেক সমকামী অ্যাক্টিভিস্ট এবং নব্য ফ্যাসিবাদীরা।
তাহলে এত এত মানুষের চাওয়ার দাম কি এদেশের নীতি-নির্ধারকদের নিকট নেই? এককথায় গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে নেই।
যতদিন এই দেশে গণতন্ত্র থাকবে ততদিন আলেম-উলামার বিশেষ কোনো লাভ হবে না।
হয়তো সরকার পরিবর্তনে আলেমদের উপর চাপ কম-বেশি হবে। এর বেশি কিছু হবে না। এটাই নির্মম বাস্তবতা।
আন্দোলনের পরবর্তী সময়ে ইসলামপন্থীদের ফায়েদা কি
তেমন একটা ফায়েদা নেই। আবার অনেক ফায়দাও আছে। যেগুলোকে ফায়েদা মনে হচ্ছে, হতে পারে তা ক্ষণস্থায়ী।
যেমন বলা হচ্ছে, কারাবন্দী আলেমদের মুক্ত করা। হক কথা সঠিকভাবে বলার পারমিশন থাকা। এছাড়াও আরো যা কিছু হতে পারে।
একটা বিষয় চিন্তা করেন। কারাবন্দী আলেমদের মুক্তি দেওয়া হলো। তারা বের হয়ে হক কথা বলা শুরু করলো।
কয়েকমাস বা কয়েক বছর পর আবার বন্দী হলো নতুন ফ্যাসিস্টের দ্বারা। কোনো লাভ হবে এতে?
ফায়েদাগুলো ক্ষণস্থায়ী। তারপরও অনেক কিছু করার আছে আমাদের। দেশের বৃহত্তর অংশকে যদি ইসলামের সঠিক বুঝ দেওয়া যেত তাহলে ভবিষ্যত বাংলাদেশের ইসলামী রাষ্ট্র গঠন সম্ভব।
বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা এতটাই ধর্মনিরপেক্ষ করা হয়েছে যে, বহু ছাত্র-ছাত্রী নবীজির পূর্ণ জীবনী জানে না।
সাহাবাদের ইতিহাস জানে না। স্বর্ণযুগের মুসলমানদের ইতিহাস জানে না। পরাশক্তি উসমানী এবং আব্বাসীদের ইতিহাস জানে না।
ইংরেজদের সময় থেকেই এদেশের জেনারেল শিক্ষাকে এমনভাবে বিধ্বস্ত করা হয়েছে, যা কল্পনার বাহিরে।
আলেম সমাজ এবং ইসলামপ্রিয় মানুষদের একটি দীর্ঘ পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করা উচিৎ।
শাইখ আবু মুস’আব আশ-শামী রহ. শরীয়াহ শাসনের ব্যাপারে বলেন,
“মানুষের ব্যাপারে আপনাকে সহানুভূতিশীল হতে হবে। ধীরে ধীরে তাদের হাত ধরতে হবে। কেননা আপনার মূল কর্তব্য হচ্ছে, মানুষকে সাহায্য করা, তাদের থেকে যুলুম দূর করা, তারপর তাদের ইসলাহ করা, তাদের দ্বীনের সংশোধন করা। তারপর তাদের ওপর আল্লাহর শরীয়াহ বাস্তবায়ন করা।
আপনি যদি আকস্মিক উপস্থিত হয়ে বলেন, আমি মানুষের ধার ধারি না। যে চায় আমাকে সাহায্য করুক আর যে চায় আমার বিরোধিতা করুক… – আপনি আসলে আপনি শার’ঈ ভুল করছেন।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ছিলেন বন্ধুসুলভ, ধৈর্য্যশীল, মমতাপূর্ণ; তিনি কর্কশভাষী ও কঠিন হৃদয়ের ছিলেন না।
আল্লাহ তা’আলা বলেছেন,
যদি আপনি কর্কশভাষী ও কঠর হৃদয়ের হতেন তাহলে তারা আপনার পাশ থেকে সরে যেতো। [তরজমা, সূরা আলে ইমরান, ১৫৯।
রাসূলের কাছ থেকে মানুষ দূরে সরে না যাওয়া দাওয়াহর ক্ষেত্রে অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। যেহেতু তাঁকে পাঠানো হয়েছে মানুষের রাহমাহ হিসেবে। তাই জরুরী ছিল যে তিনি তাদের ভালোবাসবেন, তাদের ব্যাপারে সবর করবেন…তাই আপনার জন্য আবশ্যক হল, সেই পদ্ধতিগুলো জানা, যা দিয়ে আপনি মানুষের হৃদয়ে পৌছাতে পারবেন…।
সাবধান! কখনো বলবেন না, ‘মানুষ জাহান্নামে যাক, মানুষ মানুক বা না-মানুক আমি আমার কাজ করে যাবো।’ এটি ভুল। আপনার জন্য জরুরি হচ্ছে, মানুষের হৃদয় জয় করা, যাতে আপনি তাদেরকে দ্বীনে প্রবেশ করাতে পারেন।”
লেখাটি শেয়ার করতে সর্ট লিংক কপি করুন
হাসিনা বাংলাদেশের স্বৈরাচারদের জন্য শিক্ষা হয়ে থাকবে
তা অবশ্যই। প্রতিটা ফেরআউন শিক্ষণীয় হয়ে থাকে পরবর্তীদের জন্য