শাম সম্পর্কে হাদিস সমূহ – শাম অঞ্চল। হাদীসের ভাষায় বিলাদুশ শাম। বর্তমান সিরিয়া, জর্ডান, ফিলিস্তিন, লেবানন, সাইপ্রাস ও তুরষ্কের কিছু অঞ্চল (হাতাই প্রদেশ ও আরো কিছু এলাকা) নিয়ে গঠিত এই অঞ্চল।
শামের ফজিলত এবং গঠন-প্রকৃতি নিয়ে নবীজি হাদীসে অসংখ্যবার ইঙ্গিত দিয়েছেন। আখিরুজ্জামানের সাথে ওৎপ্রতভাবে জড়িত এই ভূমি।
নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, নিশ্চয় শাম আল্লাহর ভূমির মধ্যে উত্তম ভূমি (সুনানে আবু দাউদ। হাদীস নং ২৪৮৩)
হযরত আব্দুল্লাহ বিন আমর রা. থেকে বর্ণিত হাদীসে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, আল্লাহর শ্রেষ্ঠ বান্দারা শামে একত্রিত হবেন (প্রাগুক্ত)
ইবনু হাওয়ালা (রাঃ) সূত্রে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ শিঘ্রই ইসলামের ব্যাপক প্রসার ঘটবে যখন জিহাদের জন্য তিনটি সেনাদল গঠিত হবে, সিরিয়ার সেনাবহিনী, ইয়ামেনের সেনাবাহিনী এবং ইরাকের সেনাবাহিনী। ইবনু হাওয়ালা (রাঃ) বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমি সেই যুগ পেলে আমার জন্য কোন দলের সঙ্গী হওয়া মঙ্গলজনক মনে করেন? তিনি বললেনঃ তুমি অবশ্যই সিরিয়ার সেনাবাহিনীতে যোগ দিবে। কেননা তখন এ এলাকাটাই আল্লাহর নিকট সবচেয়ে উত্তম গণ্য হবে। আল্লাহ তাঁর সৎকর্মশীল বান্দাদের এখানে একত্র করবেন। আর তুমি সিরিয়া যেতে রাজী না হলে অবশ্যই ইয়ামেনী সেনাবাহিনীর সঙ্গী হবে। তোমাদের নিজেদের এবং তোমাদের কূপগুলো থেকে পানি উত্তোলন করো। কেননা মহান আল্লাহ আমার ওয়াসিলায় সিরিয়া ও এর অধিবাসীদের ভরণ পোষণের দায়িত্ব নিয়েছেন। (প্রাগুক্ত)
আবু উবায়দা ও মুআজ বিন জাবাল রা. থেকৈ বর্ণিত। রাসূল সা. বলেন, ‘ইসলামের সূচনা হয়েছে রহমত ও নবুওয়তের শাসনের মাধ্যমে। এরপর হবে রহমত ও খেলাফতের শাসন। এরপর হবে অত্যাচারী লুটেরা বাদশার শাসন। এরপর হবে অহংকারী প্রতাপশালী বাদশার শাসন। তখন জমিনে অন্যায়, অবিচার ও ফেতনা ছড়িয়ে পড়বে। সে কালের লোকেরা রেশম (সিল্ক), ব্যভিচার ও মদকে হালাল করে ফেলবে। আল্লাহর সঙ্গে সাক্ষাৎ পর্যন্ত এর মাধ্যমেই তাদেরকে রিযক দেওয়া হবে এবং সাহায্য করা হবে।’ (শুয়াবুল ঈমান : বায়হাকি, খণ্ড-৫, পৃষ্ঠা-১৬, হাদিস নং- ৫৬১৬)
উপরিউক্ত হাদিস থেকে যা জানা যায়, পৃথিবীতে মুসলমানদের শাসনযুগ পাঁচটি ভাগে বিভক্ত-
১. নবুয়্যতের শাসন যেটি রসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সময় মদিনাকেন্দ্রিক জাজিরাতুল আরবে ছিল।
২. নবুয়্যতের আদলে খেলাফত, যেটি খোলাফায়ে রাশেদীনের যুগে ছিল।
৩. রাজতান্ত্রিক খেলাফত, যেগুলো ছিল উমাইয়া, আব্বাসীয়া ও উসমানি খেলাফত প্রভৃতি।
৪. খেলাফতের পতনের পর স্বৈরশাসকদের শাসন। যেটি আধুনিক যুগে আমরা দেখতে পাচ্ছি। হাদিস অনুযায়ী এর সময়কাল হবে সংক্ষিপ্ত।
৫. নবুয়্যতের আদলে খেলাফতের পুনরাবৃত্তি। মাহদির নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠিত এই খেলাফত সাইয়্যেদেনা ঈসা আলাইহিস সালামের আগমনে সমাপ্তি ঘটবে।
সুফিয়ানী ফিতনা
হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. হতে বর্ণিত, রাসূল সা. বলেছেন, ‘আমি তোমাদেরকে সাতটি মারাত্মক ফেতনার ব্যাপারে সাবধান করছি যা আমার পরে আসবে- একটি ফেতনা মদিনা থেকে আসবে। একটি ফেতনা মক্কা থেকে আসবে। একটি ফেতনা ইয়েমেন থেকে আসবে। একটি ফেতনা শাম থেকে আসবে। একটি ফেতনা পূর্বদিক থেকে আসবে। একটি ফেতনা পশ্চিম থেকে আসবে এবং একটি ফেতনা শামের পাহাড়ি উপত্যকা থেকে আসবে। এটি সুফিয়ানির ফেতনা।’
ইবনু মাসউদ বলেন, ‘আমরা অনেকে প্রথমগুলো দেখেছি। অবশিষ্টগুলো আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম দেখবে।’ (মুসতাদরাকে হাকেম, আল-ফিতান লি আঈম বিন হাম্মাদ)
পবিত্র মক্কা শহরে যখন মাহদীর আত্মপ্রকাশ ঘটবে তখন প্রথম যেই আরব শাসক মাহদীর বিরুদ্ধে যুদ্ধে জড়াবে।
হাদীসে তাকে সিরিয়ার অত্যাচারী শাসক ও বনু কালব গোত্রের কুরাইশি ব্যক্তি বলা হয়েছে।
হাদীসে অত্যাচারী এই শাসকের পরিচয় তুলে ধরা হয়েছে “সুফিয়ানী” বা কুরাইশি হিসেবে। এই বিষয়ে হাদীসে বলা হয়েছে,
সুফিয়ানির আবির্ভাব হবে দামেশকের দিক থেকে। তার সহচরদের মধ্যে সংখ্যাধিক্য হবে ‘কালব’ গোত্রের। সে মানুষের উপর গণহত্যা চালাবে। মায়ের গর্ভে থাকা সন্তানদের পর্যন্ত হত্যা করবে। সে শিশুদেরকে হত্যা করবে। এর ফলে বনু কায়েস গোত্রের লোকেরা তার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে যাবে। সে তাদের সবাইকে হত্যা করবে। আহলে বাইতের এক লোক (মাহদি) মক্কায় আসবেন। এ সংবাদ সুফিয়ানির কাছে পৌঁছাবে। তখন সে একটি সৈন্যবাহিনী পাঠাবে। ওই বাহিনী পরাজিত হবে। এরপর সে আরেকটি বাহিনী পাঠাবে, যারা ‘বায়দা’ মরুভূমিতে ধ্বসে যাবে। শুধু একজন লোক বেঁচে থাকবে যে (ভূমিধ্বসের) এই সংবাদ পৌঁছে দেবে।’ (ইবনু হিব্বান, তিরমিযি, আবু ইয়ালা, তাবরানি, আল-ফিতান, মুসতাদরাকে হাকেম। হাদিস নং-৮৫৮৬)
হুজায়ফা রাদিআল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত হয়েছে। ইমরান ইবনু হুসাইন। খুযায়ি রাদিআল্লাহু আনহু দাঁড়িয়ে রসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জিজ্ঞেস করলেন,
‘আমরা এই সুফিয়ানিকে কীভাবে চিনবো?’
রসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, ‘তার গাঁয়ে দুটি কাতওয়ানি চাদর থাকবে। চেহারার রঙ হবে ঝলমলে তারকার মতো। তার ডান গালে থাকবে তিলক। বয়স হবে চল্লিশের কম।’ (আস-সুনানুল ওয়ারিদাতু ফিল ফিতান: খণ্ড-৫, পৃষ্ঠা-১১১০)
আলি রাদিআল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত হয়েছে, ‘সুফিয়ানি যে লোক শেষ যুগে সিরিয়ায় দখলদারি প্রতিষ্ঠা করবে, সে বংশগতভাবে খালেদ ইবন ইয়াজিদ ইবনু মুয়াবিয়া ইবনু আবু সুফিয়ানের বংশোদ্ভূত হবে। তার সহচরদের মধ্যে সংখ্যাধিক্য হবে ‘কালব’ গোত্রের। দামেশকের দিক থেকে তার আত্মপ্রকাশ ঘটবে। তার মাথা বড়ো ও মুখে শ্বেতির দাগ এবং এক চোখে একটি সাদা দাগ থাকবে। মানুষের রক্ত ঝরানো তার বিশেষ অভ্যাসে পরিণত হবে। যে লোক বিরোধিতা করবে, তাকেই হত্যা করবে। গর্ভস্থ সন্তানদের পর্যন্ত হত্যা করবে। যখন বায়তুল্লাহতে মাহদির আগমনের খবর প্রকাশ পাবে, তখন এই শাসক মাহদির বিরুদ্ধে একটি বাহিনী প্রেরণ করবে।’ (মাজাহিরে হক জাদিদ: খণ্ড-৫, পৃষ্ঠা-৪৩)
অপর বর্ণনায় আছে, ‘শুরুর দিকে (সুফিয়ানি) আত্মপ্রকাশ করবে ন্যায়পরায়ণ শাসকরূপে। পরে শক্তি ও ক্ষমতা পাকাপোক্ত হলে অত্যাচারে অপকর্মে লিপ্ত হবে।’ (ফয়জুল কাদির: খণ্ড-৪, পৃষ্ঠা-১২৮)
বর্ণনা
ইমাম যুহরি রাহিমাহুল্লাহ বলেছেন, ‘সিরিয়ার লোক সুফিয়ানির আনুগত্য মেনে নেবে এবং সে পূর্বদিকের (খোরাসানের) বাহিনীকে যুদ্ধে পরাজিত করবে, যতোক্ষণ না তারা (সুফিয়ানির বাহিনী) ‘মার্জ আস-সাফার’ (দামেশকের দক্ষিণে বিশাল সমভূমি) পর্যন্ত পৌঁছে।
এরপর আবার এই দুই বাহিনী যুদ্ধে লিপ্ত হবে এবং পূর্বদিকের (খোরাসানের) বাহিনীকে পরাজিত করবে।
যতোক্ষণ না তারা (সুফিয়ানির বাহিনী) ‘মার্জ আস-সানিয়্যা’ (দারা প্রদেশের অন্তর্গত আল-কারাক শহরের নিকটবর্তী একটি জায়গা) পর্যন্ত পৌঁছে।
পরে তারা আবার যুদ্ধে লিপ্ত হবে এবং পূর্বদিকের (খোরাসানের) বাহিনীকে পরাজিত করবে যতোক্ষণ না তারা (সুফিয়ানির বাহিনী) ‘আল- হিস’-এর (একটি পরিবারের নাম/জায়গার নাম) নিকট পৌঁছে।
এরপর তারা আবার যুদ্ধে লিপ্ত হবে এবং পূর্বদিকের (খোরাসানের) বাহিনীকে পরাজিত করবে যতোক্ষণ না তারা ধ্বংসপ্রাপ্ত প্রাচীন শহর (‘কিরকিসিয়্যা’) পর্যন্ত পৌঁছে।
আবার এই দুই বাহিনী যুদ্ধে লিপ্ত হবে এবং পূর্বদিকের (খোরাসানের) বাহিনী যুদ্ধ করবে।
যতোক্ষণ না ‘আকার কুফ’ (ইরাকের বাগদাদ প্রদেশের অন্তর্গত একটি স্থান, বর্তমানে পরিবেশ বিপর্যয়ের শিকার ও বসবাসের অযোগ্য) পর্যন্ত পৌঁছে।
এরপর এই দুই বাহিনীর মাঝে আরেকটি যুদ্ধ হবে এবং পূর্বদিকের (খোরাসানের) বাহিনী পরাজিত হবে। সুফিয়ানি তাদের সমস্ত সম্পদ হস্তগত করবে।
এবার সুফিয়ানির গলায় একটি ফোঁড়া উঠবে। সে সকালবেলা কুফায় প্রবেশ করবে। বিকালবেলা তার সৈন্যবাহিনীসহ বের হয়ে আসবে।
এরপর সিরিয়া প্রবেশের পর সে মারা যাবে। এবার সিরিয়ার লোকেরা বনু কালবের এক মহিলার পুত্রের আনুগত্য মেনে নেবে যার নাম, ‘আবদুল্লাহ ইবনু ইয়াজিদ ইবনুল কালবিয়্যা।
সে প্রচ্ছদৃষ্টি ও রুক্ষ্মমুখারেস স্প্যান বাদিকের বাহিনী (খোরাসানবাসী) সুফিয়ানির মৃত্যুর খবর শুনে বলবে,
‘সিরিয়ার জনগণের খারাপ দিন শেষ হয়ে গেছে। ’
তারা বিদ্রোহ করে বসবে। বনু কালবের মহিলার ওই পুত্র এই খবর শুনবে তারা সে যুদ্ধের জন্য তার বাহিনীকে প্রস্তুত করবে।
সে পূর্বদিবেরে এবার পিনের) বাহিনীকে পরাজিত করবে ফয়ে ও মিড কেফা’ (খোরাস সেখানে সে তার শত্রুদের হত্যা করে নারী ও শিশুদেরকে বান্ধি করবে এবং কুফায় ধ্বংসযজ্ঞ চালাবে।
এরপর সে হিজাজে (মক্কা-মদিনা) সৈন্যবাহিনী পাঠাবে।’ (আল-ফিতান লি নু’আইম ইবনু হাম্মাদ: পৃষ্ঠা-৬৪)
তথ্যসুত্র
সিরিয়া মহাযুদ্ধের কাল