মীর মাসজিদি খান: ভুলে যাওয়া এক আফগান বীর

আফগান ইতিহাসে মীর মাসজিদি খান ছিলেন একজন কিংবদন্তি, একজন বীর-বাহাদুর। মৃত্যুর দেড়শত বছরের অধিক সময় পার হলেও এখনও মানুষ তাকে স্মরণ করে।

আফগান এবং পাকিস্তান সীমান্ত এলাকার মানুষের মুখে মুখে এখনও তার বীরত্বগাথা গল্পগুলো শোনা যায়।

আফগানের আমেরিকাপন্থী শাসক আশরাপ গণী সরকারের শাসনামলে ‘মীর মাসজিদি খান পুরস্কার’ নামে একটি পুরস্কার সে চালু করেছিল।

যেগুলো সে বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূত, খেলোয়াড় এবং উচ্চশ্রেণীর ব্যক্তিদের প্রদান করেছে।

তবে আমরা মনে করি, আফগান জনগণ কখনোই একজন বীরপুরুষকে এতটা সস্তা করে উপস্থাপন করেনি যে, জাতীয় বিশ্বাসঘাতকদের হাতে উক্ত মুজাহিদের নাম সংবলিত পুরস্কার তুলে দেওয়া হবে।

মীর মাসজিদি খানের জন্ম কবে, এ নিয়ে ইতিহাসে তেমন তথ্য পাওয়া যায় না। পরিবারের ব্যাপারে যতটুকু জানা যায়, তারা ছিল তাজিক গোত্রের।

পিতার নাম ইসহাক খান। তিনি একজন জমিদার ছিলেন। পাশাপাশি এই পরিবার এলাকায় ধর্মীয় পরিবার হিসেবে প্রসিদ্ধ ছিল।

মীর মাসজিদি শৈশবে গ্রামীণ পরিবেশে কাঁটান এবং গ্রামেই কুরআন-হাদীস, ফিকহের শিক্ষা অর্জন করেন।

পাশাপাশি ফারসি সাহিত্য নিয়েও পড়াশোনা করেছিলেন এবং সামরিক বিভিন্ন প্রশিক্ষণ গ্রামেই সম্পন্ন করেন।

এক যুদ্ধে মীর মাসজিদি খানের বীরত্ব

১৮৪০ সাল ছিল আফগানিস্তানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি বছর। এই সময় ইংরেজদের সাথে বেশ কিছু ভয়াবহ যুদ্ধ হয়।

এর ফলে ইংরেজরা পিছু হটতে বাধ্য হয়। ১৮৪০ সালের অক্টোবর মাস। ইংরেজরা আফগানিস্তানের একটি দুর্গ অবরোধ করে।

দুর্গে মীর মাসজিদি খান ৫০ জন মুজাহিদকে সঙ্গে নিয়ে অবস্থান করছিলেন। তাদের নিকট তেমন কোনো অত্যাধুনিক অস্ত্র ছিল না।

পুরোনো দীর্ঘকায় বন্দুক, তীর এবং ঢাল তলোয়ার। এতটুকুই ছিল তাদের সম্বল। আফগান মুজাহিদরা এই সময় তলোয়ার চালনায় খুবই পারদর্শী ছিলেন। সম্মুখ যুদ্ধে তাদের সাথে টেক্কা দেওয়ার মতো কেউ ছিল না।

যুদ্ধ শুরু হলো। মুজাহিদরা সমানে তীর চালিয়ে যাচ্ছিলেন। অবিশ্বাস্যভাবে সেদিন একটি তীরও লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়নি।

বহু ইংরেজ তিরবিদ্ধ হয়ে দুর্গের সামনে লাশ হয়ে যায়। ইংরেজরা এত সহজে হাল ছাড়ার পাত্র ছিল না। তাদের নিকট ছিল অত্যাধুনিক কামান।

দুর্গের দেওয়াল লক্ষ্য করে গোলা নিক্ষেপ করতে থাকে ইংরেজরা। ধারাবাহিক নিক্ষেপের ফলে এক স্থানে দেওয়াল বেশি ফেটে যায়।

তারা সেটিকে লক্ষ্য করে আরও গোলা নিক্ষেপ করে ফাঁটলটিতে বড়ো ছিদ্র তৈরি করে। ইংরেজরা ভেবেছিল, এই ছিদ্র দিয়ে তারা ভেতরে প্রবেশ করতে পারবে।

কমান্ডারের ইশারায় ইংরেজ সৈন্যদের একটি দল সেখানে যায়। কাছে এসে তো তাদের চোখ ছানাবড়া! দুর্গে অবস্থানরত মুজাহিদরা অল্প সময়ের মধ্যেই বড়ো বড়ো পাথর এনে ফাটলের মুখ বন্ধ করে দিচ্ছে।

মীর মাসজিদি খান খোলা তলোয়ার হাতে স্থানটি পাহারা দিচ্ছিলেন। যে-ই ইংরেজ টিকটিকি ভেতরে প্রবেশের চেষ্টা করছে তাকে সাথে সাথেই জাহান্নামে পাঠিয়ে দেওয়া হচ্ছিল। 

মুজাহিদরা যখন বুঝতে পারলেন, দুর্গের পতন অনিবার্য তখন তারা হঠাৎ করেই জোরালো হামলা করেন ইংরেজদের উপর।

হামলার ধকল সামনে উঠতে ইংরেজরা পিছু হটতে বাধ্য হয়। এই সময় মীর মাসজিদি মুজাহিদদের সাথে নিয়ে দুর্গ থেকে বের হয়ে বাতাসের বেগে পার্শ্ববর্তী পাহাড়ের দিকে চলে যান। ইংরেজরা কাউকেই আর খুঁজে পায়নি।

পরবর্তী কার্যক্রম

সাময়িকভাবে পিছু হটার পরও মীর মাসজিদি খান জিহাদ ছেড়ে দেননি। বিভিন্ন স্থানে গেরিলা যুদ্ধ অব্যাহত রাখেন।

এই সময় আফগানিস্তানে আমির দোস্ত মুহাম্মাদ খান ইংরেজদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের চেষ্টা করছিলেন। মীর সাহেব সাথিদের নিয়ে তার বাহিনীকে যুক্ত হন।

এতে আমিরের বাহিনীতে নতুন করে উদ্দীপনা সৃষ্টি হয়। আমির দোস্ত মুহাম্মাদের বাহিনীকে তিনি শক্তিশালী করেন।

তাদের সাথে একজোট হয়ে ইংরেজদের বিরুদ্ধে জোড়াল আক্রমণ অব্যাহত রাখেন। বহুবার মীর সাহেব মৃত্যুর মুখ থেকে অলৌকিকভাবে ফিরে এসেছেন।

তার যুদ্ধের বিভিন্ন ঘটনা এখনও আফগান বসতিগুলোতে শোনা যায়। মায়েরা তাদের সন্তানকে বীরদের গল্প শুনিয়ে ঘুম পাড়ান।

আমির দোস্ত মুহাম্মাদ খান যদিও ইংরেজদের বিরুদ্ধে জিহাদ শুরু করেছিলেন, কিন্তু তিনি এতে দৃঢ়ভাবে থাকতে পারেননি।

একটা সময় ইংরেজদের নিকট স্বেচ্ছায় আত্মসমর্পণ করেন একাকী। এর ফলে তার সন্তানরাও আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয়।

ইংরেজরা তাকে নির্বাসন দেয় হিন্দুস্তানে। এটি ১৮৪০ সালের নভেম্বরের ঘটনা। কিন্তু আফগানি মুজাহিদরা এতে মনোবল হারান নি।

তারা আলাদা আলাদাভাবে প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। বিভিন্ন স্থানে ইংরেজদের নাকানিচুবানি খাওয়ান।

কাবুল বিপ্লব

বহু দিন যাবৎ আফগানিস্তানের বিভিন্ন এলাকায় ছোটো ছোটো দল ইংরেজদের উপর হামলা অব্যাহত রেখেছিল।

কিন্তু সময়ের প্রয়োজন ছিল একত্রে বড়ো একটি মরণ কামড়। ১৮৪১ সালের ২ নভেম্বর, ১৭ রমজান ১২৫৭ হিজরি।

এই দিনে আফগানিস্তানের রাজধানী কাবুলে গণবিদ্রোহ তৈরি হয়। দলে দলে মুজাহিদ দলগুলো প্রবেশ করতে থাকে।

কাবুলের মসজিদ থেকে ‘আল জিহাদ, আল জিহাদ’ স্লোগান ভেসে আসছিল। চারিদিকে পদাতিক ও অশ্বারোহী মুজাহিদরা ছড়িয়ে পড়ল। মুজাহিদদের তাকবীর ধ্বনিতে আকাশ-বাতাস প্রকম্পিত হচ্ছিল।

মুজাহিদের একত্রিত হয়ে এমন আক্রমণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল আগের দিন ১৬ রমজানে। পুরো আফগানিস্তান থেকে মুজাহিদরা এসে গোপনে কাবুলে মিলিত হয়।

ইংরেজদের গোয়েন্দারা আগাম কোনো সংবাদ পায়নি। এখানে সকল বড়ো বড়ো মুজাহিদরা মিলে পরবর্তী দিনের কর্মপন্থা ঠিক করেন।

মীর মাসজিদি খান, মোল্লা আহমাদ খান, মীর হাজি মাসুম, আতা মুহাম্মাদ খান, গুল মুহাম্মাদ গুলজাই, শামসুদ্দিন খানের মতো বড়ো বড়ো মুজাহিদরা একত্রিত হন এদিন।

এই পরামর্শ সভা থেকে ১২ জন উচ্চতর মুজাহিদকে মিলে শূরা গঠিত হয়। এরা সকলে মিলে সিদ্ধান্ত নেবেন।

প্রধান আমির হিসেবে সর্দার আতা মুহাম্মাদ খান নির্বাচিত হন। সহকারী ছিলেন আমির আমিনুল্লাহ লোগারি।

মুজাহিদের ছোটো ছোটো কামানগুলো কাবুলের পথ ধরে অগ্রসর হতে থাকে। কাবুলের এক সরকারি বাসভবনে থাকত ইংরেজ জেনারেল আলেকজান্ডার বার্নিস।

মুজাহিদরা ঘেরাও করে ফেলে এই বাসভবন। শুরু হয় গোলাগুলি। ইংরেজরা পালাতে শুরু করে।

হাসান খান নামক এক মুজাহিদ প্রচণ্ড গোলাগুলির মধ্যে বাসভবনের ভেতরে প্রবেশ করতে সক্ষম হন। তার সাথে অন্যান্য মুজাহিদরাও প্রবেশ করে।

কিছুক্ষণের মধ্যেই ইংরেজ জেনারেলকে গ্রেফতার করা হয়। পরবর্তীতে তার মাথা কেটে কাবুলের প্রধান সড়কের চৌরাস্তায় ঝুলিয়ে দেওয়া হয়।

সেদিন আরও অনেক ইংরেজ অফিসার আহত-নিহত হয়। ধরা পড়ে বেশ কিছু বিশ্বাসঘাতক। যাদের মধ্যে হিন্দু বিশ্বাসঘাতক ছিল অনেকজন।

এই সময় কাবুলের শাসক ছিল শাহ সুজা। সে ছিল ইংরেজদের আজ্ঞাবহ। প্রথমে ভেবেছিল বাহিরে হয়তো এমনিতেই শোরগোল হচ্ছে।

তার পুত্রকে পাঠায় সংবাদ আনার জন্য। অবস্থা জানার পর আর কিছু করার ছিল না। মুজাহিদরা পুরো কাবুল শহরের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয়।

শাহ সুজার চাকর-বাকররা তাকে ছেড়ে মুজাহিদদের বাহিনীতে যুক্ত হয়ে যায়।

মীর মাসজিদি খানের মৃত্যু

ইংরেজরা আফগানিস্তানে হেরে যাওয়ার পর নতুন ষড়যন্ত্র শুরু করে। বিভিন্ন স্থানীয় চাটুকার এবং এজেন্টদের কাজে লাগায়।

এদের মধ্যে মোহনলাল নামক একজন এজেন্ট ছিল। সে কাবুল বিপ্লবের দিন ভয়ে ইসলাম গ্রহণ করে।

মুখে কালিমার সাক্ষ্য দিলেও তখনও সে ইংরেজদের হয়ে কাজ করছিল।

ইংরেজরা তার মাধ্যমে আফগানিস্তানের খবর পেত। ইসলাম গ্রহণের পর মোহনলালকে আত্মশুদ্ধির জন্য এক আফগান মুজাহিদের অধীনে দেওয়া হয়েছিল। নাম শিরিন খান।

ইংরেজরা মোহনলালকে নির্দেশনা দেয়, শিরিন খানকে যেভাবেই হোক প্ররোচিত করে ইংরেজদের দলে ভেড়াতে হবে।

ইংরেজদের পক্ষ হতে শিরিন খানকে তৎকালীন সময়ের ১ লাখ রুপি দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়। তার দায়িত্ব হবে মুজাহিদদের মধ্যে বিভক্তি সৃষ্টি করা।

মোহনলাল এই প্রস্তাব নিয়ে শিরিন খানের নিকট যায়। ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করেন এই মুজাহিদ।

ইংরেজরা একে একে আরও মুজাহিদ নেতার নিকট প্রস্তাব পাঠায়। কেউই রাজি হয়নি। 

ফলে নতুন ষড়যন্ত্র শুরু করে ইংরেজরা। তারা নিম্ন পর্যায়ের মুজাহিদ নেতাদের টার্গেট করে। তাদের মধ্যে বেশ কিছু উচ্চাকাঙ্ক্ষী ব্যক্তিদের পেয়ে যায় এজেন্ট হিসেবে।

তারা টাকার বিনিময়ে গাদ্দারি করতে প্রস্তুত ছিল। ইংরেজরা তাদেরকে প্রাথমিক দায়িত্ব দেয়, শীর্ষ মুজাহিদ নেতাদের হত্যা করা।

ব্রিটিশ এজেন্ট মোহনলালের প্ররোচনায় টাকার নিকট বিক্রি হয়ে যাওয়া এক গাদ্দারের নাম হলো মুহাম্মাদুল্লাহ।

সে মীর মাসজিদি খানকে হত্যার দায়িত্ব নেয়। এই সময় মীর সাহেব অসুস্থ ছিলেন। মুহাম্মাদুল্লাহ গোপনে তার খাবারে বিষ মিশিয়ে দেয়।

এভাবেই বিষ প্রয়োগের মাধ্যমে মীর মাসজিদি খানকে শহীদ করে দেওয়া হয়।

সময়টা ছিল ১৮৪১ সালের শেষের দিকে অথবা ১৮৪২ সালের সূচনালগ্ন। 

পরবর্তী সময়ে আরও কিছু গাদ্দার বেশ কয়েকজন আফগান মুজাহিদদের শহীদ করে দেয়।

বিখ্যাত মুজাহিদ আবদুল্লাহ খান আচাকজাইকে পেছন থেকে গুলি করে শহীদ করে দেওয়া হয়।

অথচ এই সময় তিনি ইংরেজদের নাকানিচুবানি খাইয়ে তাদেরকে এক দুর্গে অবরোধ করে ফেলেছিলেন।

বহুকাল আগ থেকেই আফগান মুজাহিদদের বীরত্বগাথা ইতিহাসের পাতায় সোনালি অক্ষরে লিপিবদ্ধ আছে।

এত গাদ্দারি এবং হত্যাযজ্ঞের পরও ইংরেজরা কখনোই পুরোপুরি আফগানিস্তানের নিয়ন্ত্রণ নিতে পারেনি।

এক মুজাহিদের মৃত্যুর পর নতুন মুজাহিদদের উত্থান হয়েছে। কেউ না কেউ আল্লাহর ঝান্ডা উত্তোলনের দায়িত্ব নিয়েছেন। ঝান্ডা কখনোই অবনমিত থাকেনি।

তথ্যসূত্র

আফগানিস্তানের ইতিহাস, খন্ড ২, ইসমাইল রেহান, পৃষ্ঠা ১১-২৬

মীর মাসজিদি খান কে ছিলেন?

ইংরেজদের বিরুদ্ধে আফগানিস্তানে যারা জিহাদের ঝান্ডা উত্তোলন করেছিলেন, তাদেরই একজন মীর মাসজিদি খান।

মীর মাসজিদি খানের জন্ম কবে?

তার জন্ম সাল সম্পর্কে বিস্তারিত জানা যায় না। শুধুমাত্র জানা যায়, তিনি তাজিক গোত্রে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা জমিদার ছিলেন। পরবর্তী ইংরেজরা তাদের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করেছিল।

মীর মাসজিদি খান কিভাবে মৃত্যুবরণ করেন?

কাবুল বিদ্রোহের পর মীর মাসজিদি খানকে ইংরেজ গুপ্তচর বিষ দিয়ে শহীদ করে দেয়। তিনি তখন অসুস্থ ছিলেন। ধারণা করা হয়, তার খাবারে তারা বিষ মিশিয়েছিল। এই কাজটি করে ইংরেজ এজেন্ট মুহাম্মাদুল্লাহ।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top