সেক্যুলারিজম এর ধর্মীয় স্বাধীনতা

সেক্যুলারিজম এর ধর্মীয় স্বাধীনতা – সেক্যুলার বা সেক্যুলারিজমের খাঁটি বাংলা অর্থ কি, তা অনেক সরলমনা মুসলমানরা না জেনেই সেক্যুলারিজমকে ভালো মনে করে থাকেন।

খাঁটি বাংলায় বলতে গেলে সেক্যুলারিজম মানে ধর্ম নিরপেক্ষতাবাদ। অর্থাৎ রাষ্ট্রীয় কাজের সাথে ধর্মকে সম্পৃক্ত না করা।

ধর্মকে শুধুমাত্র কিছু রীতি-নীতি, আচার-অনুষ্ঠান ও ধর্মীয় স্থানে সীমাবদ্ধ রেখে দৈনন্দিন জীবন থেকে ধর্মকে সরিয়ে দিয়ে রাষ্ট্রের চাপিয়ে দেওয়া নীতিকেই সেক্যুলারিজম বলা হয়।

রাষ্ট্রের এই চাপিয়ে দেওয়া নীতি বা সংবিধানকে বলা হয় সার্বভৌমত্ব সংবিধান। এটির ভুল ধরা যাবে না।

সংবিধানের কোনো নীতি পরিবর্তন করতে হলে সংসদে রীতিমতো তর্কযুদ্ধ করে তা পরিবর্তন করা যাবে। কিন্তু এর মধ্যে আবার মূলনীতি কখনোই পরিবর্তন করা যাবে না।

এমনটাই হলো, সেক্যুলারিজম বা সেক্যুলারের অর্থ। এবার একটু আলোকপাত করি, এই ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ আমাদেরকে কতটা ধর্মীয় স্বাধীনতা দেয়?

রাষ্ট্র ও রাষ্ট্রের কর্মকর্তারা বলে, সেক্যুলারিজম সকল ধর্মকে সমান চোখে দেখে। তারা ধর্ম যার যার উৎসব সবার বলে স্লোগান তোলে।

কিন্তু গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার এই ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ হলো শুধুমাত্র ধোঁকা ও চোখের ভ্রম।

আমেরিকায় শয়তান পূজারিদের অধিকার

ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ যেহেতু বলে, “সকল ধর্ম সমান। সকলের নিজ নিজ স্থানে ধর্ম পালনের অধিকার আছে” –

এই স্লোগানের রেশ ধরেই একটা ভেজাল লেগেছিল আমেরিকাতে।

শয়তানের পূজারিদের ব্যাফোমেট নামক একটি মূর্তি আছে। যেটির আকৃতি হলো, মূতিটির মাথা ছাগলের কিন্তু শরীর মানুষের। মাথায় আছে বাঁকানো দুটি শিং। মাঝে আছে একটি জলন্ত মশাল। কাঁধে আবার এক জোড়া পাখা। এক হাত আকাশের দিকে অন্য হাত মাটির দিকে তাক করা। আরো অনেক কিছু…..

২০১২ সালে আমেরিকার ওকলাহোমা রাজ্যের ক্যাপিট্যাল বিল্ডিংয়ের সামনে স্থাপন করা হয় বাইবেলের দশ আজ্ঞা-সংবলিত ‘টেন কমান্ডমেন্স মনুমেন্ট’ নামের একটি ভাষ্কর্য।

সেখান থেকেই শুরু হয় আমেরিকায় একটি বিতর্ক। ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ যদি আদৌ মান্য করা হয় তাহলে তো সকল ধর্মকেই এখন অনুমতি দিতে হবে, তাদের পবিত্র কিছু স্থাপনের জন্য।

এছাড়াও দেশের সরকারি ভবনের সামনে এমন ধর্মীয় স্থাপনাকে আমেরিকার অনেকে দেখে সেক্যুলারিজমের লঙ্ঘন হিসেবে।

এই বিতর্কে নতুন করে যুক্ত হয় শয়তানের পূজারীরা। ২০১৫ সালের জুলাইতে একটি স্যাইটানিক টেম্পল নামক ধর্মীয় সংগঠন একটি ব্যাফোমেট মূর্তি বানায়। তারা হলো পাক্কা ভোগবাদী।

তাদের কিছু প্রসিদ্ধ স্লোগান হলো,

“সবার উপর মানুষ সত্য, তাহার উপর নাই”, “পৃথিবীর সবচেয়ে বড় আদালত মানুষের বিবেক”, “মানুষের মাঝেই স্বর্গ-নরক” ইত্যাদি।

এরপর ব্যাফোমেট মূর্তি নিয়ে শয়তানের পূজারিরা হাজির হয় আমেরিকার বিভিন্ন সরকারি ভবনের সামনে। স্বভাবগতভাবেই খৃস্টানরা তীব্র প্রতিবাদ করে ও বাধা দেয় তাদেরকে।

এই সময় অনেক খৃস্টানকে স্লোগান দিতে দেখা যায়, ‘শয়তানের পূজারিদের কোনো অধিকার নেই’।

ধর্মনিরপেক্ষতার ছা-পোষা ছানা কাদিয়ানী মতবাদ

অমুসলিম ও কাফের সম্প্রদায়ের মধ্যে অন্যতম জঘন্য মতবাদ হলো, কাদিয়ানী মতবাদ।

অন্য কাফেররা নিজেদেরকে কখনোই ইসলামের সাথে সম্পৃক্ত করে না। কিন্তু এই কাদিয়ানীরা নিজেদেরকে ইসলামের দিকে সম্পৃক্ত করে মুসলিম বলে।

১৮৩৫ সালে ভারতের কাদিয়ান নামক গ্রামে জন্ম মির্জা গোলাম কাদিয়ানীর। সে প্রথমে নিজেকে সংস্কারক, এরপর মাহদী এরপর মসীহ এবং নবী দাবী করে।

তৎকালীন সময়ে ইংরেজরা তার এই আন্দোলনকে আরো সহায়তা দিয়ে পৃষ্ঠপোষকতা করে। বর্তমানে তাদের হেডকোয়ার্টার লন্ডনে।

বাংলাদেশে বিভিন্ন সময়ে কাদিয়ানীদেরকে অমুসলিম ঘোষণা দেওয়ার জন্য সরকারকে বলছিল আলেম সমাজ। কিন্তু এখন পর্যন্ত কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয় নি।

উল্টো বিভিন্ন যুক্তি দেখানো হয়েছে সেক্যুলারিজমের আড়ালে।

তারা বলে, দেশ চলে ধর্মনিরক্ষেকতাবাদ মতাদর্শ অনুযায়ী। তাই দেশ কখনোই কোনো ধর্মের পরিচয় পরিবর্তন করতে পারবে না।

সংবিধান অনুযায়, সকল নাগরিককে স্ব স্ব ধর্ম স্ব নামে পালন করার অধিকার দেওয়া হবে। আর প্রত্যেকেরই নিজস্ব ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার অধিকার আছে।

উপরোক্ত দুইটি ঘটনা থেকে আমরা দুইরকম দৃষ্টিভঙ্গি পাই। শয়তানের পূজারীদেরকে ধর্মনিরপেক্ষতা থাকা সত্ত্বেও বাধা দিয়েছে খৃস্টানরা।

কিন্তু মুসলমানদের নামের অবমাননা করা হলেও সরকার তাদেরকে উল্টো সহায়তা করে যাচ্ছে এই দেশে।

তবে এই ঘটনা দ্বারা সেক্যুলারিজম এর ধর্মীয় স্বাধীনতা সম্পর্কে স্পষ্ট কিছু বুঝা যায় না। আমরা এখন সেই বিষয়ে একটু আলোকপাত করি।

সেক্যুলারিজম এর ধর্মীয় স্বাধীনতা

সেক্যুলাররা যদিও মুখে বলে, ধর্মের ক্ষেত্রে তারা সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ। কিন্তু বাস্তবতা হলো, তারা তাদের মতাদর্শ, তাদের মতবাদ অন্যান্য ধর্মপ্রাণ মানুষের উপর চাপিয়ে দিতে চায়।

২০১৭ সালে সুইজারল্যান্ডে একটি ঘটনা ঘটে। বাবা-মা তুর্কি বংশদ্ভূত সুইস নাগরিক।

তাদের সন্তানদের স্কুলের সাঁতার ক্লাসে একত্রে কিশোর-কিশোরীদের সাথে পাঠাতে অস্বীকৃতি জানান।

এর ফলে উক্ত স্কুল সেই বাবা-মাকে ১৬০০ পাউন্ড জরিমানা করে। স্কুল দাবী করে, সাঁতার কালিকুলামের একটি অংশ। তাই সন্তানদের এখানে পাঠানো বাধ্যতামূলক।

কিন্তু এই মুসলিম বাবা-মা হাল ছাড়ার পাত্র নন। তারাও পাল্টা স্কুলের বিরুদ্ধে মামলা করে দেন।

কারণ, মুসলিম ধর্মে ছেলে মেয়ে একত্রে সাঁতার শেখা বৈধ নয়। আর সুইজারল্যান্ড নিজেদের সেক্যুলার দাবী করে।

কিন্তু সুইস আদালত এই মামলা নাকচ করে দেয়। হাল না ছেড়ে বাবা-মা হিউম্যান রাইটস এর কাছে যান। তারাও অপারগতা জানায়।

ইউরোপের আদালত বলে, অভিবাবকের আপত্তি অগ্রহণযোগ্য। আর একত্রে সাঁতার ক্লাসে পাঠাতে বাবা-মা আইনত বাধ্য।

আদালত বলে, যদিও অভিবাবকদের এভাবে বাধ্য করার ফলে ধর্মীয় স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করা হচ্ছে।

কিন্তু এরপরও এতে ধর্মীয় স্বাধীনতা লঙ্ঘন হচ্ছে না! (বড়ই আশ্চর্যজনক)

আরেকটি ঘটনা ঘটে ২০১৬ সালে জার্মানীতে। সেখানেও একত্রে সাঁতার সংক্রান্ত বিষয়ে এক মুসলিম পরিবার মামলা করে।

তখন জার্মান আদালত বলে, মুসলিম কিশোরীরা ছেলেদের সাথে সাঁতার ক্লাস করতে বাধ্য। এক্ষেত্রে কোনো ধরণের ছাড় পাওয়ার সুযোগ নেই।

পরবর্তীতে জার্মানীতে আরেক মুসলিম পরিবারকে ৫,০০০ ফ্রাঙ্ক জরিমানা করা হয়।

কারণ হিসেবে বলা হয়, তাদের ছেলে সন্তান স্কুলের মহিলা শিক্ষিকার সাথে হাত মেলাতে রাজী হয় নি।

২০১১ সালে ইউরোপের প্রথম দেশ হিসেবে ফ্রান্স নারীদের নিকাব পরিধান করাকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। কারণ হিসেবে তারা বলে,

নিকাব নারীদের দাসত্বের চিহ্ন। আর সেক্যুলার ফ্রান্সে এটির কোনো জায়গা নেই। এরপর যারা জনসম্মুখে নিকাব পরে বের হবে তাদেরকে ১৫০ ইউরো জরিমানা করা হবে।

এমন আরো হাজারো ঘটনা আছে। যেখানে মুসলিম ধর্মের বেলায় তারা ডাবল স্টান্ডার্ড দেখায়। অন্যান্য বেলায় সেক্যুলার সাজে।

ভারতের বাবরি মসজিদের ঘটনা, ফিলিস্তিন-ইসরাইল দ্বন্দ্ব, কুরআনের ব্যাখ্যা করলে ফাঁসি বা জেল, এই সকল কিছুইতেই আমরা সেক্যুলারদের নিজস্ব মুলনীতির অবাধ্য দেখি। এমনটাই হলো সেক্যুলারিজম এর ধর্মীয় স্বাধীনতা এর সুক্ষ্ম ধোঁকা।

তথ্যসুত্র

চিন্তাপরাধ, আসিফ আদনান, পৃষ্ঠা ৪৩-৫৮

গাজ্জার জন্য অনুদান

৭ অক্টোবর ২০২৩ তারিখে তুফানুল আকসা যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকেই ফিলিস্তিনের গাজ্জায় অসংখ্য মানুষ আহত ও শহীদ হয়েছে। বহু মানুষ নিজেদের ঘর-বাড়ী হারিয়েছে। এছাড়াও বর্তমানে গাজ্জার ৯৮% মানুষ অনাহারে জীবন-যাপন করছে। গাজ্জার মানুষের এই দুঃসময়ে আমরা যদি তাদের পাশে না দাঁড়াই তাহলে কে দাঁড়াবে?

আর-রিহলাহ ফাউন্ডেশন তুফানুল আকসা যুদ্ধের শুরু থেকেই ফিলিস্তিনের গাজ্জার জন্য ডোনেশন সংগ্রহ করে আসছে। এই মহান কাজে আপনিও আমাদের সাথে যুক্ত হতে পারেন।

অনুদান দিন

Scroll to Top