শৈশবের ঈদ আনন্দ কেমন ছিল, তা এত বছর পর মনে করা কঠিন হলেও অসম্ভব নয়। গ্রামের বাড়িতে পরিবারের সাথে ঈদ উদযাপন ছিল আমাদের সারা বছরের অপেক্ষা।

সাধারণত ঈদুল ফিতর থেকে ঈদুল আযহা গ্রামে কাঁটিয়েছি সবচেয়ে বেশি। জিলহজ মাস আসার পূর্বেই আব্বু হজে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত হতেন।

প্রায় ঈদের ১৫/২০ দিন আগে আমরা গ্রামে যেতাম। তখনও নানা জীবিত ছিলেন। নানু ছিলেন। দাদী ছিলেন।

স্কুল বা মাদ্রাসা ছুটির অনেক আগেই আমার ছুটি নেয়া হয়ে যেত। বয়স আমার তখন ৭/৮ বছর হবে। এরপর আব্বুর সাথে করে গ্রামের বাড়ি যাওয়ার পালা।

সেকালে আমরা রাতে লঞ্চ সফর করতে অভ্যস্ত ছিলাম। আমরা ছিলাম তখন ৩ ভাই। দুপুর থেকেই আমাদের প্রস্তুতি শুরু হতো।

আম্মু ব্যাগ গোছাতেন। আব্বু কেনাকাটা করে আনতেন। আমরা ছিলাম তখন অবুঝ বাচ্চা।

কিছুক্ষণ খেলাধূলো, কিছুক্ষণ মারামারি, কিছুক্ষণ আম্মুকে জ্বালিয়েই সময় কাঁটতো।

আম্মু রাগ করতেন, আদর করতেন, বকা দিতেন। কখনো বা হাতের লেখা দিয়ে বসিয়ে রাখতেন।

এশার নামাজের পর আব্বু মসজিদ থেকে এসে আমাদের নিয়ে বিসমিল্লাহ বলে ঘর থেকে বের হতেন। আনন্দে তখন আমরা যেন আকাশে থাকতাম।

আর সেকালে কুরবানীর ঈদ হতো শীতকালে। যতদূর মনে পড়ে, তখন ইংরেজি নভেম্বর বা ডিসেম্বর মাস থাকতো।

তাই আমি মনে করতাম, কুরবানী আসলে মনে হয় বছর শেষ হয়।

এরপর হয়তো নতুন বছর আসে। হিজরী সনে যদিও এটা সঠিক, কিন্তু আমরা তো তখন ইংরেজি সন হিসাব করতাম।

শীতের সিজন থাকায় তখন রাতে খুব ঠান্ডা পড়তো। জ্যাকেট পরিধান করে কাঁপাকাঁপি করে ঢাকা সদরঘাট থেকে লঞ্চে উঠতাম।

লঞ্চ হয়তো ছাড়তো রাত ১১ টায়। আমাদেরকে লঞ্চে আব্বু ঘুম পাড়িয়ে দিতেন। আব্বু রাতের সফরের জন্য কেবিন নিতেন।

তাই বাসার মতোই ঘুমাতাম। যখন ঘুম ভাঙ্গতো, দেখতাম আম্মু পাশে বসে আছেন। লঞ্চ যেন স্থির! আম্মুকে জিজ্ঞাসা করলে মুচকি হেসে বলতেন, লঞ্চ চলছে।

২ – শৈশবের ঈদ আনন্দ

আমি কেবিন থেকে বের হয়ে দেখতাম, চারিদিকে অন্ধকার। দূরে আকাশে মিটমিট করে তারা জ্বলজল করছে। অপার্থিব ছোঁয়া আমাদের মুগ্ধ করে দিত।

খুব ভোরে যখন আলো ফুঁটতো, তখন আমরা গ্রামের ঘাটে লম্বা সিঁড়ি দিয়ে লঞ্চ থেকে নামলাম।

গ্রামের শিশিরভেজা স্নিগ্ধ বাতাস আমাদের মুগ্ধ করে দিত। কুয়াশার কারণে চারিদিক অন্ধকার থাকতো।

সেকালে বর্তমানের মতো অটোরিকশা কিংবা ব্যাটারিচালিত রিকশাগুলো ছিল না। তাই নদীঘাট থেকে বাড়ি যাওয়ার একমাত্র উপায় ছিল ভ্যান, পায়েচালিত রিকশা অথবা সিএনজি।

এত বছর পর স্পষ্ট মনে নেই, আমরা কি দিয়ে তখন বাড়ি যেতাম। তবে রিকশায় যাওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। কারণ, বাড়ি থেকে উক্ত নদীঘাট প্রায় ২০/৩০ মিনিটের পথ।

লঞ্চঘাট থেকে আমাদের নানাবাড়িতে গিয়ে দেখতাম, সকালের মিষ্টি রৌদ উদিত হয়েছে। শৈশবে সবচেয়ে বেশি নানাবাড়িতেই গিয়েছি।

আমি তখন মামাতো ভাইদের সাথে খেলায় মেতে উঠতাম। বন-বাদাড়ে, খাল-বিলে ঘুরে বেড়াতাম। আব্বু আমাদেরকে গ্রামে রেখে ঢাকায় চলে আসতেন।

এরপর যথারীতি হজে চলে যেতেন। আমাদের ঈদ কাঁটতো অন্যরকম এক আনন্দে।

ঈদের চার/পাঁচদিন আগে আমাদের গ্রামের বাজারের উত্তর পাশে তখন গরুর হাঁট বসতো।

রাস্তা দিয়ে বিক্রেতারা গরু নিয়ে হাঁটে যেতেন। আমরা কখনো ঘরের জানালা দিয়ে, কখনো হাঁটে গিয়ে গরু দেখতাম।

নানার হাত ধরে হাঁটে যেতাম কখনো কখনো। গরু-ছাগলে হাঁট ভরপুর থাকতো। আমরা নানাকে জিজ্ঞাসা করতাম, গরু কিনবেন কবে? নানা বলতেন, খুব তাড়াতাড়িই।

ঈদের দুই/একদিন আগে নানা গরু কিনে আনতেন। আমরা বাড়ির আঙ্গিনায় গরু নিয়ে আনন্দে মেতে উঠতাম।

ঈদের দিন খুব ভোরে আমাদের ঘুম থেকে উঠিয়ে দেয়া হতো।

শীতের এই সকালে কম্বল বা লেপের নিচ থেকে উঠতে কষ্ট হলেও ঈদের আনন্দে আমরা উঠে যেতাম।

সকালে আমরা খানিকটা নাস্তা করে নানার হাত ধরে ঈদগাহে রওয়ানা হতাম।

তখন আমাদের গ্রামে একটাই ঈদগাহ ছিল। ঈদগাহে নামাজ শেষে পাশে থাকা মেলা থেকে নানা অনেক কিছু কিনে দিতেন।

বাড়ি আসার পর এতদিন আদর করে পালা গরুটি কুরবানী করা হতো। সকলের হৃদয় থাকতো ভারাক্রান্ত।

এরপরও মহান আল্লাহর বিধানের সামনে সকলেই নত হতেন।

এভাবেই আমাদের ঈদ কাঁটতো আনন্দের সাথে। আমরা ঈদ যাওয়ার পর ভারাক্রান্ত হয়ে আবার আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করতাম, কবে আবার ঈদ আসবে?

শৈশবের ঈদ আনন্দ লেখাটি মাসিক নবীন দীপ্ত ম্যাগাজিনের জুলাই ২০২৩ (ঈদসংখ্যা) সংখ্যাতে প্রকাশিত হয়

গাজ্জার জন্য অনুদান

৭ অক্টোবর ২০২৩ তারিখে তুফানুল আকসা যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকেই ফিলিস্তিনের গাজ্জায় অসংখ্য মানুষ আহত ও শহীদ হয়েছে। বহু মানুষ নিজেদের ঘর-বাড়ী হারিয়েছে। এছাড়াও বর্তমানে গাজ্জার ৯৮% মানুষ অনাহারে জীবন-যাপন করছে। গাজ্জার মানুষের এই দুঃসময়ে আমরা যদি তাদের পাশে না দাঁড়াই তাহলে কে দাঁড়াবে?

আর-রিহলাহ ফাউন্ডেশন তুফানুল আকসা যুদ্ধের শুরু থেকেই ফিলিস্তিনের গাজ্জার জন্য ডোনেশন সংগ্রহ করে আসছে। এই মহান কাজে আপনিও আমাদের সাথে যুক্ত হতে পারেন।

অনুদান দিন

Scroll to Top