শাহবাগ বাইনারি

শাপলা-শাহবাগ বাইনারি বাংলাদেশে বহু আগ থেকেই সমস্যা। এটির সূচনা ১৩ সালেই নয়। ১৭৫৭ সাল থেকেই।

ইংরেজরা বাংলা অঞ্চল দখল করে ১৭৫৭ সালে। এই অঞ্চলের মানুষ ইংরেজদের মেনে নেয় নি। তাই বলে কি ইংরেজরা ছেড়ে দিয়েছিল জনগণকে? না।

তারা নির্যাতন চালিয়েছে। নিপীড়ন করেছে। মানুষের জায়গা, সম্পদ, পরিবার কেড়ে নিয়েছে। বাংলার উৎপাদনকে তারা ধ্বংস করেছে।

এই সময়ে ইংরেজদের সামনে বড়ো একটি চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়। ‘দেশীয় বিরোধী শক্তি’।

এটিকে দমানোর জন্য ইংরেজরা তাদের ফুট সোলজার খুঁজতে থাকে। বেশি দিন অপেক্ষা করতে হয়নি ইংরেজদের।

বাংলার হিন্দুরা ইংরেজদের সাহায্যে এগিয়ে আসে। তারা ইংরেজদের তাঁবেদারি শুরু করে এবং এ দেশের মুসলমানদের প্রকাশ্য বিরুদ্ধাচরণ করাটাকে পেশা হিসেবে নেয়।

ইংরেজদের সত্যনিষ্ঠ গোলাম হওয়ার জন্য বিভিন্ন সময়ে ইংরেজদের উপহার-উপঢৌকন দিয়ে খুশি রাখে তারা।

১৮৫৭ সালে সিপাহি বিপ্লবের সময় কলকাতাকেন্দ্রিক বাঙালি হিন্দু বুদ্ধিজীবীরা সিপাহিদের বিরুদ্ধে ইংরেজদের সহায়তায় অবতীর্ণ হয়।

তারা পত্রিকা প্রকাশের মাধ্যমে বাংলা অঞ্চলে বিপ্লব বিরোধী কার্যক্রম পরিচালনা করে। ইংরেজদের প্রয়োজনীয় রসদ সরবরাহ করে মুসলিম সিপাহিদের বিরুদ্ধে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয় তারা।

ভৃত্যের এমন নিঃস্বার্থ ভালোবাসার কারণে হিন্দুদের বহু সুযোগ-সুবিধা দেয় ইংরেজরা। এখান থেকেই জন্ম নেয় ইসলামবিদ্বেষ।

বাংলা অঞ্চলে ইসলামবিদ্বেষের গোঁড়া বলা যায় এটিকে। হিন্দুরা যখন দেখতে পেল, মুসলমানরা বিপদে আছে।

তখন তারা মুসলমানদের বিরুদ্ধে প্রকাশ্য ষড়যন্ত্রে মেতে উঠল। সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিল দেশীয় শত্রু ইংরেজদের দিকে।

ইংরেজরা তাদেরকে ‘ইংরেজি’ শিক্ষা দিয়ে জাতে উঠিয়ে দিল। কলকাতাকেন্দ্রিক বাঙালি মধ্যবিত্ত বুদ্ধিজীবীরা ইসলামকেই এই ভূখণ্ডের প্রধান দ্বন্দ্ব বানিয়ে নিল।

১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর মুসলিম বাংলা পাকিস্তানে যুক্ত হয়। বাংলার আরেক অংশ তারও আগে ইন্ডিয়ার সাথে যুক্ত হয় ধর্মীয় কারণে।

ধর্মকেন্দ্রিক ভাগ-ভাটোয়ারা হওয়ার পরও এই ভূখণ্ডে ইসলাম পরিপূর্ণভাবে প্রতিষ্ঠিত হতে পারেনি। কারণ, দাবার চাল আগেই দিয়ে রেখেছিল ইংরেজরা।

তারা বেশ কিছু মাথা বিক্রি করা ব্যক্তিদের বিলেতে পড়াশোনা করিয়ে সেক্যুলারিজম শিক্ষা দিল।

এরপর তাদেরই দেশে স্বাধীনতা আন্দোলনের নেতা হিসেবে আবির্ভূত করল। দেশের জনতা তাদের পেছনে থেকেই দেশভাগের আন্দোলন করল। দেশ তো ভাগ হলো, এরপর? 

2

সেক্যুলার নেতারা এবার তাদের স্বরূপে আবির্ভূত হলো। ইসলামকে বাতিল করে সেক্যুলারিজমকেই সংবিধানে জায়গা করে নিল।

কিন্তু এক চান্সে তো তা করা যায় না। তাই বিভিন্ন সমস্যা দেখিয়ে এই কাজটি করা হলো। মাঝখানে বাংলা অঞ্চলের সাথে জাতি কেন্দ্রিক দ্বন্দ্ব শুরু হলো।

ইংরেজদের থেকে স্বাধীন হওয়ার ২২ বছরের মাথায় দেশ আবার ভাগ হলো। নতুন ভূখণ্ড পরিচিত হলো বাংলাদেশ নামে।

বাংলাদেশ স্বাধীনতার পর থেকেই সাধারণ মুসলমান আর সেক্যুলার চিন্তাধারার ব্যক্তিদের মধ্যে পার্থক্য ছিল সুস্পষ্ট।

দীর্ঘকাল বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ছিল সেক্যুলারিজমের আড্ডাখানা। এখান থেকেই লিবারেল সেক্যুলারিজমের আড়ালে গড়ে ওঠে ধর্মবিদ্বেষী সাংস্কৃতিক আধিপত্য।

বাঙালি সংস্কৃতির নামে গড়ে ওঠে মিথ বাণিজ্য। এমন এমন কিছু কালচারকে বাঙালি কালচার হিসেবে দেখানো হয়, যা আদৌ আমাদের পূর্বপুরুষরা কখনো দেখেনি।

আবার এমন এমন কিছু রীতিনীতিকে বাঙালির রীতিনীতি বলে চাপিয়ে দেওয়া হয়, যা মূলত হিন্দু ধর্মীয় রীতিনীতি।

সাংস্কৃতিক আধিপত্য ধরে রাখতে মিডিয়া ও রাজনীতির ব্যবহার শুরু হয় বহু আগ থেকেই। বাঙালি সংস্কৃতির মুরুব্বি হলো কলকাতার বুদ্ধিজীবীরা।

আর তাদের বুদ্ধিমত্তা কোন ধর্মের আঙ্গিকে গৃহীত হবে, তা একটি দুধের শিশুও বলতে পারবে।

কিন্তু এখানে আধিপত্য ধরে রাখতে ধর্ম পরিচয়কে নস্যাৎ করা হলো। সাথে এটিকে গৃহীত করার জন্য কিছু দেশীয় ইসলামিক ব্যক্তিদেরও সাথে নেওয়া হলো।

এই হলো বাংলাদেশে সাংস্কৃতিক আধিপত্য বিস্তারের খানিকটা আলোকপাত। এখন কথা হলো, এখানে শাহবাগ কোথায়?

উত্তর পাওয়ার আগে শাহবাগ কি এটি বুঝতে হবে। শাহবাগ গড়ে উঠেছিল সাংস্কৃতিক আধিপত্য বিস্তারের আড়ালে ইসলামবিদ্বেষকে পুঁজি করে।

হার্ডকোর সেক্যুলারিজমের আড়ালে এই ইন্ড্রাস্টি ফুলে ফেঁপে উঠে মিডিয়া ও তৎকালীন সরকারের ছত্রছায়ায়।

শাহবাগ হুট করেই কায়েম হয়নি। এর ধারা বহু আগ থেকেই নাট্যমঞ্চ, উপন্যাস, লেকচারে বিরাজমান ছিল।

3

শাহবাগ ইন্ড্রাস্ট্রি পুরোপুরি দাঁড়িয়ে আছে ইসলামবিদ্বেষের উপর। তাদের নিকট ‘লুতুপুতুমার্কা শান্তিময় ইসলামে’ কোনো সমস্যা নেই।

সমস্যা হবে যখন ইসলামের পরিপূর্ণ বয়ান কুরআন-হাদীস থেকে পেশ করা হবে। এই রেডলাইন থেকেই শাপলার উত্থান ঘটে বাংলাদেশে।

সাধারণ মুসলমানরা এই ভূমির প্রকৃত বীর সন্তান। তাদের পূর্বপুরুষদের রক্তে সিঞ্চিত এই ভূমি।

কলকাতার সেই হিন্দু এলিটরা মুসলমানদের রক্তের উপর দাঁড়িয়ে বাঙালি মুসলমানদের সাথে গাদ্দারি করেছিল, এটা এই ভূমির সন্তানেরা ভুলে যায়নি।

শাহবাগ ও শাপলা এই ভূমিতে কখনোই একীভূত হবে না। এটি কখনোই একত্রিত হওয়ার নয়। দুইটি দুই মেরুতে অবস্থিত।

শাহবাগের গোঁড়া বুঝতে পারলে তাদের আগা কর্তন করা সহজ।

যতই তাদের বিরুদ্ধে স্লোগান তোলা হোক না কেন, তাদের অপকর্ম সামনে আসুক না কেন, তাদের মূল দোষ নিয়ে আলোকপাত না করা হয় এবং তাদের সহযোগীদের নিয়ে যদি কথা না বলা হয়, তাহলে শাহবাগীয় নেরেটিভ ফুলে ফেঁপে বড়ো হবে বৈকি, সমূলে ধ্বংস হবে না।

শাহবাগীরা এই ভূমির চিহ্নিত শত্রু। তারা ১৯০ বছর গাদ্দারি করেছে এই ভূমি পুত্রদের সাথে। স্বাধীনতা পরবর্তী সময়েও তাদের গাদ্দারির উপমা ভূরি ভূরি।

এই দ্বন্দ্ব সমাধান হওয়ার নয়। শাহবাগ যতবার মাথা চাড়া দিয়ে উঠবে, শাপলা ততবার বুক পেতে দাঁড়িয়ে যাবে। শাপলার অভিধানে ‘হেরে যাওয়া’ শব্দটি নেই।

শাপলা শাহবাগ বাইনারি এই ভূমিতে ঈমান-কুফরের দ্বন্দ্ব। শাহবাগ যতবার কুফরের নতুন নতুন ভার্সনে হাজির হবে, শাপলা ততবার ঈমানের দাবীতে প্রতিরোধ গড়ে তুলবে। এই দ্বন্দ্ব সমাধান হবার নয়

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top