যুগসন্ধির সময়কালে আমাদের করণীয় – “সত্য সমাদৃত, মিথ্যা ধুলিৎসাত হবে। মিথ্যা তো ধ্বংসের জন্যই”, সূরা বনী ইসরাইলের এই আয়াতটা একজন চক্ষ্মুষ্মান ঈমানদারের চোখ খুলে দেয়। মহান আল্লাহ আমাদের জন্য হেদায়াতের পথ দেখিয়ে কত বড় উপকার করেছেন! আল্লাহর জন্য বান্দার হেদায়েতের কোনো প্রয়োজনীয়তা নেই, বান্দারই জরুরি আল্লাহর হেদায়েত।
আল্লাহ চান, আমরা ভুল করি, আবার ক্ষমা চাই। আমরা আবার ফিরে আসি রবের নিকট। যদি মানুষ এমন হতো যে, কোনো ভুল করে না, কোনো গুনাহ করে না। তাহলে আল্লাহ তাদের ধ্বংস করে দিতেন। হাদীসে আছে, আল্লাহ ক্ষমা করতে পছন্দ করেন। সকলেই ভালো হয়ে গেলে আল্লাহ তাদের ধ্বংস করে নতুন জাতি আনতেন, তারা ভুল করতো এবং ক্ষমা চাইতো।
বর্তমান যুগে আমাদের অজান্তেই ভুল হয়ে যায়, গুনাহ হয়। আমরা স্বেচ্ছায় কিংবা অজ্ঞাতে গুনাহ করি। আমরা ভাবি, হয়তো কাজটিতে গুনাহ নেই। কিন্তু বাস্তবে গুনাহ হচ্ছে। এজন্য সর্বপ্রথম আমাদের জরুরি, সর্বদা ইস্তিগফার পড়া। আল্লাহর ভয়ে প্রকম্পিত থাকা। অনেক ব্যক্তি রয়েছেন, যারা মনে করেন, আল্লাহ তো ক্ষমাশীল। তাই গুনাহ করতে থাকি। এটাই শয়তানের সবচেয়ে বড় ধোঁকা। শয়তান মানুষকে গুনাহ করতে উদ্বুদ্ধ করে। মানুষের শয়তানের পাশাপাশি আরেকটি বড় শত্রু রয়েছে। তা হলো, নফস। এটি ব্যক্তিতে ভেতর থেকে ধ্বংসের দিকে ধাবিত করে।
আমরা যখন বিপ্লবের কথা বলি, ইদাদ ও জিহাদের কথা বলি, শরীয়াহ ও সিস্টেম পরিবর্তনের কথা বলি, তখন নিজেদেরকে ভুলে যাই। নিজেদের ইসলাহের কথা আমাদের মনেই থাকে না। অথচ সর্বপ্রথম জরুরি হলো, নিজের সংশোধন। নিজে সংশোধিত না হয়ে যতই দাওয়াতের কাজ করা হয়, সেই কাজে বারাকাহ আসে না। আল্লাহ আমাদের নিকট অনেক বেশি কাজ চান না। তিনি চান, অল্প ও নিয়মিত। হাদীসে আছে, অল্প আমলেই নাজাতের জন্য যথেষ্ঠ হবে। এর কারণ হলো, অল্প আমল, যা নিয়মিত করা হয়, তা আল্লাহর প্রিয় হয়।
আমাদের সমাজে এত এত বিচ্যুতি, কোনটা রেখে কোনটা সংশোধন করবো, এমন চিন্তা মাথায় আসতে পারে। ফোকাস দিতে হবে গোঁড়ায়। সহীহ বুখারীর সর্বপ্রথম হাদীস হলো নিয়্যত সম্পর্কে। কেন ঈমাম বুখারী রহ. নিয়ত সম্পর্কে হাদীস আনলেন, এটা নিয়ে মুহাদ্দিসরা অনেক মতামত দিয়েছেন। এর মধ্যে সবচেয়ে বহুল প্রচলিত মতামতটি হলো, হাদীস পড়ার আগে যেন নিয়্যত শুদ্ধ হয়ে যায়।
কেউ যদি এই চিন্তা নিয়ে হাদীস পড়ে যে, সে মুহাদ্দিস হবে, তার অনেক ছাত্র হবে, সে দরস দিবে, রাজা বাদশাহরা তাকে সম্মান করবে। তাহলে তার এই হাদীস অন্তরে কখনোই যাবে না। কেয়ামতের দিন সে দেখবে, তার হাদীস পড়া ও পড়ানোর জন্য কোনো সাওয়াব লেখা হয় নি। সবই শূন্য। বিপরীতে কেউ যদি চিন্তা করে, সে হাদীস পড়বে নিজে আমলের জন্য। নিজের সংশোধনের জন্য, তাহলে আল্লাহ তাকে এতটা উপরে উঠিয়ে দিবেন, যা সে কখনোই কল্পনাও করে নি।
তাই নিয়্যত হলো সবচেয়ে বড় অস্ত্র। উল্টাপাল্টা নিয়্যত অন্তরে রেখে জিহাদ করলেও তা কবুল হবে না। তার শহীদ হওয়া হবে বৃথা। হয়তো সে দুনিয়াতে অনেক দাম পাবে, কিন্তু দুনিয়া তো ধ্বংসশীল। এখানে দাম পেয়ে বিন্দুমাত্র লাভ নেই। আসল দাম হলো আল্লাহর নিকট। তিনি যদি কবুল না করেন, তাহলে বান্দার সকল আমল বৃথা।
অতএব, তাত্ত্বিক আলাপ একপাশে রেখে আমরা আগে নিজেদের পরিশুদ্ধ করি। আল্লাহ আমাদের দ্বারা কাজ নিবেন। আল্লাহর সাথে সরাসরি কানেক্ট হই। আমল বাড়িয়ে দেই। আর গুনাহ অবশ্যই ছাড়তে হবে। কেউ যদি গুনাহে লিপ্ত থেকে এরপর কাজের চেষ্টা করে, তার কাজে কখনোই সফলতা আসবে না। কেননা আলো আর আঁধার কখনোই এক হয় না।