মোটিভেশন স্পিকারদের স্বরূপ সন্ধানে – কিছু মানুষ সৃষ্টিগতভাবেই সুন্দরভাবে কথা বলতে পারে। বাচনভঙ্গী খুবই দক্ষ।
অন্যকে কথার জালে সহজেই আঁটকে রাখতে পারে। তার কথা মানুষ ঘন্টার পর ঘন্টা শুনলেও বিরক্তবোধ করবে না। কিন্তু সে তার এই প্রতিভা কোন কাজ ব্যয় করছে?
বর্তমান সময়ে বাজারে মোটিভেশন স্পিকার, মোটিভেশন বইয়ের ছড়াছড়ি। কেউ জীবন নিয়ে, ক্যারিয়ার নিয়ে হতাশাগ্রস্থ? একটা মোটিভেশন স্পিকিং শুনে তার বুকটা ফুলে উঠে।
“আমিও পারবো। আমার দ্বারাও সম্ভব” এমন একটা ধারণা তার মধ্যে জেগে উঠে।
অন্যকে সাহায্য করা, উদ্বুদ্ধ করা তো বড়ই মহৎ কাজ।
কিন্তু আদৌ কি এই মোটিভেশন স্পিকাররা মহৎ হিসেবে করে? প্রথমে সরাসরি কুরআন থেকে কিছু উদাহরণ আনি। এরপর আমরা তা বাস্তবতার সাথে মিলানোর চেষ্টা করবো ইনশাআল্লাহ।
আল্লাহ তা’আলা পবিত্র কুরআনের সূরা বাকারার ২০৪-২০৬ নং আয়াতে বলছেন,
وَ مِنَ النَّاسِ مَنۡ یُّعۡجِبُكَ قَوۡلُهٗ فِی الۡحَیٰوۃِ الدُّنۡیَا وَ یُشۡهِدُ اللّٰهَ عَلٰی مَا فِیۡ قَلۡبِهٖ ۙ وَ هُوَ اَلَدُّ الۡخِصَامِ
মানুষের মধ্যে এমন আছে, পার্থিব জীবন সম্পর্কিত যার কথাবার্তা তোমাকে চমৎকৃত করে এবং সে তার অন্তরে যা রয়েছে, তার উপর আল্লাহকে সাক্ষী রাখে। আর সে খুবই ঝগড়াটে।
وَ اِذَا تَوَلّٰی سَعٰی فِی الۡاَرۡضِ لِیُفۡسِدَ فِیۡهَا وَ یُهۡلِكَ الۡحَرۡثَ وَ النَّسۡلَ ؕ وَ اللّٰهُ لَا یُحِبُّ الۡفَسَادَ
যখন তোমার কাছ থেকে সে ব্যক্তি ফিরে যায়, তখন দেশের মধ্যে অনিষ্ট ঘটাতে এবং শস্যাদি ও পশুসমূহকে ধবংস করতে চেষ্টা করে কিন্তু আল্লাহ ফাসাদ পছন্দ করেন না।
وَ اِذَا قِیۡلَ لَهُ اتَّقِ اللّٰهَ اَخَذَتۡهُ الۡعِزَّۃُ بِالۡاِثۡمِ فَحَسۡبُهٗ جَهَنَّمُ ؕ وَ لَبِئۡسَ الۡمِهَادُ
যখন তাকে বলা হয়, আল্লাহকে ভয় কর, তখন অহঙ্কার তাকে গুনাহর দিকে আকর্ষণ করে, জাহান্নামই তার জন্য যথেষ্ট আর তা কতই না জঘন্য আবাসস্থল!
উপরোক্ত তিনটা আয়াত হলো আমাদের জন্য ফিল্টারিং। আমরা এখন এটার সাথে আমাদের দেশ-বিদেশের মোটিভেশন স্পিকারদের একটু ফিল্টার করবো।
এখানে মোটিভেশন স্পিকার বলতে যাদেরকে দেখে আমরা উদ্বুদ্ধ হই কথা ও কাজের মাধ্যমে অথবা নিজেদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে আমাদের মোটিভেশন করে অথবা আমাদের পরিবারও অন্তর্ভুক্ত।
এককথায় মোটিভেশনের সাথে যারাই যুক্ত, তারা সকলেই এখানে উদ্দেশ্য।
খানিকটা ফিল্টারিং
প্রথম আয়াতটা তথা ২০৪ নং আয়াতটা দেখুন। দুনিয়ার জীবনে অনেক মানুষের কথা, কাজ আমাদের ভালো লাগে। তাদেরকে মহৎ ব্যক্তি মনে হয়। আমাদেরকে তাদের কথাবার্তা, ব্যক্তিত্ব চমৎকৃত করে।
আল্লাহও আমাদেরকে বলছেন, হ্যাঁ। তাদের কথাবার্তা সত্যিই তোমাদেরকে চমৎকৃত করে, মুগ্ধ করে।
কিন্তু যদি একটু তার ব্যক্তিত্ব সম্পর্কে খোঁজ নেওয়া হয় তখন যেন থলের বিড়াল বের হয়ে আসে।
আমরা এই চমৎকার মানুষটার ভিন্ন একটা রূপ দেখতে পাই। দুনিয়ার প্রতি তার লোভ-লালসা, মানুষকে ঠকানো, ব্লাকমেইল করাসহ আরো বিভিন্ন অপরাধ আমাদের সামনে ভেসে উঠে।
এটা যেন আমাদের পরের অংশের ন্যায়। এই মোটিভেশন দেওয়া লোকেরা আমাদের সাথে তাদের একটা সুন্দর ব্যক্তিত্ব দেখায়।
আমরাও বিশ্বাস করি, তারা ভালো মানুষ। কিন্তু পরে জানতে পারি, সে একটা প্রতারক।
দুনিয়াতে এমন বহু মানুষ রয়েছে। আমাদের আশেপাশেই রয়েছে। লোকের সামনে খুবই ভালো সাজবে।
কিন্তু পেছনে তার আসল রূপ প্রকাশ করবে। যে তার এই ভয়ংকর রূপ জেনে যাবে, তাকে ব্লাকমেইল করবে, কষ্ট দিবে ইত্যাদি।
দ্বিতীয় আয়াত তথা ২০৫ নং আয়াতটাতে খেয়াল করে দেখুন।
আল্লাহ বলছেন, যখন তোমার কাছ থেকে সেই ব্যক্তি ফিরে যায়, তখন দেশের মধ্যে অনিষ্ট ঘটাতে এবং শস্যাদি ও পশুসমূহকে ধবংস করতে চেষ্টা করে….।
প্রথম অংশ তো মোটামুটি বুঝে আসে। কিন্তু পরের অংশটা একটু বুঝতে কষ্টকর হবে হয়তো। ব্যাখ্যায় বা তাফসীরে যাচ্ছি।
অর্থাৎ তারা খুবই বক্র ও কর্কশভাষী হয় ব্যক্তিজীবনে এবং তাদের কাজকর্মও হয় অত্যন্ত জঘন্য লেভেলের।
তারা আপনাকে বলবে একটা কিন্তু করবে আরেকটা। মানে কথা ও কাজের বিপরীত। তারা মিথ্যাবাদী ও অসৎ আকিদা-বিশ্বাস পোষণকারী হয়ে থাকে।
এতটুকু কথায় হয়তো দ্বিতীয় আয়াতটাও বুঝতে পেরেছেন। এবার তৃতীয় আয়াত তথা ২০৬ নং আয়াতটার দিকে একটু নজর দেই।
আপনি যখন তাদেরকে আল্লাহর ভয় দেখাবেন তখন তারা এটা নিয়ে হাসিঠাট্টা করবে। তাদেরকে আল্লাহর বিধান দেখালে রঙ-তামাশা করবে।
এই সময়টাতে তারা নিজেদের মনমতো ইসলামের ব্যাখ্যা করা শুরু করবে।
নিজেদের খারাপটা ঢাকার জন্য খারাপ দিয়ে হলেও নিজের পক্ষে ইসলামের ব্যাখ্যা করবে।
তাদের শাস্তির কথা কুরআনেই বলে দিয়েছেন। জাহান্নামই হবে তাদের জন্য যথেষ্ঠ। তা বড়ই নিকৃষ্ট ঠিকানা।
আমাদের হালচাল
আমরা আজকাল কথার মাধুর্যে ফেঁসে যাই কয়েক জায়গায়।
১. যে বিজ্ঞানকে আমাদের নিকট সবকিছুর সাথে উপস্থাপন করে।
২. যে দর্শন দিয়ে আমাদের সাথে ধর্ম উপস্থাপন করে।
৩. যে নিজের মনমতো সহজ ইসলাম প্রচার করে কাটছাঁট করে।
আপনি দেখবেন, তাদের অনুসারীর অভাব হবে না। তাদের মোটিভেশন বক্তৃতাগুলো, ভঙ্গিমাগুলো খুবই প্রচার করা হয়। মানুষ তাদের ন্যায় হতেও চায়।
অথচ তারা যে নিজের কথার জালে ফাঁসিয়ে দ্বীন বিকৃতি করছে, এটা কেউ দেখার চেষ্টা করে না।
তাদেরকে দেখবেন, সমকামিতাকে স্বাভাবিকরণ করার চেষ্টা চালাচ্ছে।
সমতা, জেন্ডার, বৈষম্য ইত্যাদি বিভিন্ন শব্দের জালে ফাঁসিয়ে তাদের মতাদর্শ বাস্তবায়নের চেষ্টা করছে।
তারা শালীনতাবোধ নষ্ট করার জন্য আপনাকে পরামর্শ দিবে গ্রুপ ট্যুরে যাওয়ার, চিল করার ইত্যাদি।
তাদের নিকট ইসলামের একটা মাপকাঠি আছে। আর তা হলো, ৫টি স্তম্ভ। কালিমা, নামাজ, রোজা, হজ্জ আর যাকাতের মধ্যেই যেন ইসলাম সীমাবদ্ধ – এমন একটা ভাব তারা নিবে।
আবার এই ৫টির মধ্যেও তারা বিভিন্ন কাঁটছাঁট করে নিজেদের মতো পালন করার চেষ্টা করে। তাদের জাহিলিয়্যাত তাদেরকে ধ্বংসের দিকে নিয়ে যাচ্ছে।
আপনি তাদেরকে কালিমা জিজ্ঞাসা করুন, বলতে পারবে। হ্যাঁ পারার ও কথা। মুসলিম ঘরের সন্তান তো। কিন্তু কালিমার আসল উদ্দেশ্য কি? রব কি? একত্ববাদ কি? সার্বভৌমত্ব কি? এটা সে বলতে পারবে না।
নবীজি আরবের রাজা হওয়ার অফার পাওয়ার পরও কেন হন নি? কেন নবীজি আরবের শ্রেষ্ঠ মানব হয়েও চিরসত্যবাদী হয়েও নিকটাত্মীয়দের নিকট নির্যাতিত হয়েছিলেন?
কেন নবীজি ইসলামের দাওয়াত নিয়ে আসার পর নিজের আপন চাচা তাকে বন্দী করে রাখলো শিআবে আবি তালিবে?
অথচ এই চাচা (আবু লাহাব) নবীজির জন্ম হওয়ার পর খুশীতে তার দাসীকে মুক্ত করে দিয়েছিলেন।
তারা কখনো ভাবতে শিখে নি। তারা কখনো বুঝতে শিখে নি।
আল্লাহ কুরআনে বারবার বলেছেন, চিন্তাশীলদের জন্য উপদেশ। এই কুরআনে জ্ঞানীদের জন্য রয়েছে নিদর্শন।
আমরা কি এই নিদর্শন খুঁজে পেয়েছি? কুরআনী তাদাব্বুর অন্তরে ধারণ করতে পেরেছি? নিজেকে চিনতে পেরেছি?
বোরকার মাধ্যমেও শয়তান কিভাবে ধোঁকা দেয়, পড়ুন
লেখাটি শেয়ার করতে সর্ট লিংক কপি করুন