ভারতের হায়দ্রাবাদ দখলের ষড়যন্ত্র

ভারতের হায়দ্রাবাদ দখল বা ভারতের হায়দ্রাবাদ দখলের ষড়যন্ত্র – ব্রিটিশরা যখন বুঝতে পারলো, উপমহাদেশে তাদের আর রাজত্ব থাকবে না, তখন তারা উপমহাদেশ ছেড়ে যাওয়ার পরিকল্পনা করতে লাগলো।

ব্রিটিশদের সময় উপমহাদেশে কয়েকরকম রাজ্য ছিল। যেহেতু ভারত স্বাধীন হওয়ার আগেই ধর্মীয় দিক বিবেচনায় ভারত ও পাকিস্তান নামে দুটি দেশ গঠনের পরিকল্পনা করা হয়।

কিন্তু তখনও এই উপমহাদেশে এমন কিছু রাজ্য ছিল, যেগুলো মূলত স্বায়ত্বশাসিত ছিল। তারা ব্রিটিশদেরকে কর দিয়ে নিজেরা ইচ্ছামতো শাসন করতো।

ব্রিটিশরা চলে গেলে এই দেশগুলোর কি হবে, এটা নিয়ে তখন আলাপ উঠলো। এর আগে ১৯৩৫ সালে ভারত শাসন আইনে ব্রিটিশ সর্বভারতীয় যুক্তরাষ্ট্র গঠনের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল।

কিন্তু সেটা আর সম্ভব হয় নি। পরবর্তীতে ভারত স্বাধীনতা আইনে বলা হলো,

১৯৪৭ এর ১৪ আগষ্ট ব্রিটিশ শাসনের অবসান ঘটলে দেশীয় রাজ্যগুলো হয় ভারত অথবা পাকিস্তানের সাথে যুক্ত হতে পারবে। অথবা চাইলে স্বাধীন থাকতে পারবে।

১৯৪৭ সালে এই আইনটি অত্যন্ত যৌক্তিক হলেও কংগ্রেসের নেতৃবৃন্দ এবং ভাইসরয় মাউন্ট ব্যাটেনের ষড়যন্ত্রে এই নীতি কার্যকর হয় নি।

কংগ্রেস নেতৃবৃন্দরা দেশীয় রাজ্যগুলো ভারতের অন্তর্ভুক্ত করতে মরিয়া হয়ে উঠেন।

এ জন্য তারা দেশীয় রাজ্যগুলোর একত্রিত হওয়ার জন্য একটি বিভাগ চালু করেন।

এর প্রধান নিযুক্ত করা হয়, সর্দার বল্লভভাই প্যাটেলকে এবং সেক্রেটারীর পদ দেওয়া হয় ভিপি কৃষ্ণ মেননকে।

ধূর্ত বল্লভভাই প্যাটেল উপলব্ধি করলেন, ১৯৪৭ এর ১৪ আগষ্ট ব্রিটিশ শাসন শেষ হওয়ার পর দেশীয় রাজ্যগুলো স্বাধীন হয়ে যাবে।

সে সময় তাদেরকে একত্রিত করা ঝুঁকিপূর্ণ কাজ। তাই আগে থেকেই কাজটা সেরে ফেলা উচিৎ।

এ ব্যাপারে ভাইসরয় মাউন্ট ব্যাটেনের প্রভাব কাজে লাগানো যেতে পারে বলে তাকে চাকুরিতে বহাল রাখলেন।

ভারতের হায়দ্রাবাদ দখলের ষড়যন্ত্র বিস্তার

ব্রিটিশ ভাইসরয় মাউন্ট ব্যাটেন ১৯৪৭ সালের ২৫ জুলাই দেশীয় রাজ্যগুলোর একটি বৈঠক ডাকেন।

সেখানে তিনি খোলাখুলিভাবে ভারতের সাথে যুক্ত হতে তাদেরকে আদেশ করেন।

তিনি তাদেরকে বলেন, যদি কংগ্রেসের পরিকল্পনায় তোমরা যুক্ত হও তাহলে বিশেষ সুবিধা আছে। কিন্তু সুবিধাটা কি, তা তিনি উল্লেখ করেন নি।

তিনি তাদেরকে আরো বলেন, ১৫ আগষ্টে ভারত ব্রিটিশরা যাওয়ার পর কেউ যদি অস্ত্র সজ্জিত হয়ে নিজেরা স্বাধীন থাকতে চায়, তাহলে তা কোনো কাজে আসবে না।

এছাড়াও যদি ভারতের সাথে তারা থাকে, তাহলে তিনি কংগ্রেসকে বলে তাদের পদ মর্যাদা অক্ষুন্ন রাখবেন বলে ভাইসরয় তাদেরকে বলেন।

কিন্তু বাস্তবিকপক্ষে এটি ছিল মিথ্যা আশ্বাস। যা পরবর্তীকালে ভারতে যুক্ত হওয়া রাজ্যগুলোর দিকে তাকালেই বুঝা যায়।

দেশীয় রাজাদের অধিকাংশই ১৫ আগষ্টের পূর্বে ভারতের পক্ষে থাকার দলীলে সাক্ষর করেন। যারা এ থেকে বিরত থাকেন, তাদেরকে হুমকি দেওয়া হয়।

এছাড়াও কংগ্রেস তাদেরকে সাথে নেওয়ার জন্য ভিন্ন পন্থা অবলম্বন করে। কোথাও জ্বালাও-পোড়াও করে হুমকি দেওয়া হয়।

কোথাও কথার জালে ফাঁসিয়ে ভারতের পক্ষে যুক্ত করা হয়। কোথাও হিন্দুদের সংখ্যাধিক্যকে প্রাধান্য দিয়ে ব্রেনওয়াশ করা হয়।

১৯৪৭ সালের ১৫ আগষ্ট হায়দ্রাবাদ, জুনাগড় ও কাশ্মীর ছাড়া সকল রাজ্যই ভারতের অন্তর্ভুক্ত হওয়ার দলীলে সাক্ষর করে।

হায়দ্রাবাদে শকুনের শ্যান দৃষ্টি

হায়দ্রাবাদ ছিল বাংলাদেশের চেয়েও অনেক বড়। দেশীয় রাজ্যগুলোর মধ্যে হায়দ্রাবাদ ছিল সবচেয়ে বড়। এছাড়াও স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে টিকে থাকার জন্য সবকিছুই হায়দ্রাবাদের ছিল।

নিজস্ব মুদ্রাব্যবস্থা, নিজস্ব সেনাবাহিনী, আদালত, বিচার ব্যবস্থা শুল্ক বিভাগ, নিজস্ব বিশ্ববিদ্যালয়, নিজস্ব পতাকা, জাতীয় সঙ্গীত ও জাতিসঙ্গে নিজস্ব প্রতিনিধিও ছিল।

১৯৩৫ সালের গভর্নমেন্ট অব ইন্ডিয়া হায়দ্রাবাদকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে মর্যাদাদানের কথা বলেছিল।

আর যদি ভারত তাতে হস্তক্ষেপ করে তাহলে ‍উক্ত দেশের অনুমতি বাধ্যতামূলক ছিল।

১৯৪৭ সালের ৯ জুলাই হায়দ্রাবাদের নিজাম ব্রিটিশ ভাইসরয় মাউন্ট ব্যাটেনকে একটি চিঠিতে লিখেন, ব্রিটিশ ও হায়দ্রাবাদের মধ্যে চুক্তি মোতাবেক হায়দ্রাবাদ তার স্বাধীন অস্তিত্ব বজায় রাখতে চায়।

তিনি ভারত বা পাকিস্তান কোনো রাষ্ট্রেই যুক্ত হবেন না বলে সিদ্ধান্ত জানিয়েছেন।

ভাইসরয় এই চিঠিটি কখনো ব্রিটিশ রাষ্ট্রের কাছে পৌঁছান নি। যদিও তিনি আশ্বাস দিয়েছিলেন!

১৯৪৭ সালের ১৫ আগষ্ট ভারত স্বাধীন হলে সেদিন হায়দ্রাবাদও স্বাধীন হয়। হায়দ্রাবাদ তখন স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে ঘোষণা দেয়।

যেহেতু হায়দ্রাবাদের সাথে কোনো সমুদ্রবন্দর ছিল না, তাই তারা ভারতের সাথে একটি নিষ্ক্রিয়তামূলক চুক্তি করতে আগ্রহী হয়।

নানান টালবাহানা করার পর ১৯৪৭ সালের নভেম্বরে একটি নিস্ক্রিয়মূলক চুক্তি হয়। এরপর থেকেই ভারতের ষড়যন্ত্র শুরু হয়।

১৯৪৮ সালের ৩০ জুলাই পন্ডিত জওহরলাল নেহেরু বলেছিলেন, যখন প্রয়োজন মনে করবো তখন হায়দ্রাবাদের বিরুদ্ধে সেনা অভিযান শুরু করবো।

নেহেরুর এই দাম্ভিক উক্ত সম্পর্কে ব্রিটিশ প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী উইনস্টন চার্চিল কমন্সসভায় বলেছিলেন,

নেহেরুর এই ভীতি প্রদর্শনের ভাষা অনেকটা হিটলারের ভাষার মতো। যা তিনি অস্ট্রিয়া ধ্বংস করার সময় বলেছিলেন।

পরবর্তীতে ব্রিটিশ এই প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী ব্রিটিশ মন্ত্রীসভাকে সতর্ক করে বলেছিলেন,

সমস্ত রাজ্যকে যেই সার্বভৌম মর্যাদা দান করা হয়েছে, সেগুলো গ্রাস করার অপচেষ্টাকে যেন ব্রিটিশ সরকার অনুমোদন না করে।

কে শোনে কার কথা! মুসলমানদের বিরুদ্ধে সমস্ত কুফরী শক্তি একজোট। এটি আবার প্রমাণিত হলো। হায়দ্রাবাদ দখলের সময় ব্রিটিশ সরকার একটুও টু শব্দ করে নি।

তথ্যসুত্র

হায়দ্রাবাদ ট্রাজেডী ও আজকের বাংলাদেশ। পৃষ্ঠা ২৪-৩১

গাজ্জার জন্য অনুদান

৭ অক্টোবর ২০২৩ তারিখে তুফানুল আকসা যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকেই ফিলিস্তিনের গাজ্জায় অসংখ্য মানুষ আহত ও শহীদ হয়েছে। বহু মানুষ নিজেদের ঘর-বাড়ী হারিয়েছে। এছাড়াও বর্তমানে গাজ্জার ৯৮% মানুষ অনাহারে জীবন-যাপন করছে। গাজ্জার মানুষের এই দুঃসময়ে আমরা যদি তাদের পাশে না দাঁড়াই তাহলে কে দাঁড়াবে?

আর-রিহলাহ ফাউন্ডেশন তুফানুল আকসা যুদ্ধের শুরু থেকেই ফিলিস্তিনের গাজ্জার জন্য ডোনেশন সংগ্রহ করে আসছে। এই মহান কাজে আপনিও আমাদের সাথে যুক্ত হতে পারেন।

অনুদান দিন

Scroll to Top