প্রাচীনকালে হজ যাত্রা যেমন ছিল

প্রাচীনকালে হজ যাত্রা যেমন ছিল – মুসলমানদের ধর্মীয় ইবাদাতের অন্যতম একটি ইবাদাত হলো পবিত্র হজ্জ। এটি ইসলামের পাঁচটি রোকন বা স্তুম্ভের মধ্যে অন্যতম।

প্রতিজন সচ্ছল মুসলমানের জন্য জীবনে একবার হজ্জ করা ফরজ। হজ্জ একটি আবেগের নাম। একটি ভালোবাসার নাম।

আল্লাহ সবাইকে হজ্জের আবেগ-ভালোবাসা দেন না। যাদেরকে দেন তাদেরকে যেন ঠেলে দেন।

কী পরিমাণ আবেগ তাদের, তা দেখলে সত্যিই বিম্মিত হতে হয়।

এখানে আমরা প্রাচীনকালের হজ্জযাত্রার কিছু চিত্র ছবি ও লেখার মাধ্যমে তুলে ধরার চেষ্টা করছি।

সেই সময়ে বর্তমানকালের মতো গাড়ি, উড়োজাহাজ ছিল না।

এখন তো মাত্র কয়েক ঘন্টার মধ্যেই হজ্জে যাওয়া যায়। অথচ সেই সময়ে হজ্জে যেতে কয়েক মাস লাগতো। কেউ পথে মারা যেত।

হজ্জ তাদের নিকট ছিল জীবন মরণের ব্যাপার। বেঁচে থাকলে ফিরে আসবে আর মরে গেলে চিরতরে হারাবে। আর রাস্তাও বর্তমানের মতো এত নিরাপদ ছিল না।

স্থানে স্থানে সন্ত্রাস, ডাকাতদের ভয় ছিল। জাহাজে সফর করা যাত্রীদের জাহাজ ডুবে যাওয়ার ভয় ছিল।

অনেক চড়াই-উতড়াই পার করে তারা হজ্জ করতে পবিত্র মক্কা নগরীতে পৌঁছতেন।

স্পেনের মুসলমানদের হজ্জযাত্রা

স্পেন থেকে তৎকালীন সময়ে হাজীরা কিভাবে পবিত্র মক্কায় আসতো তার বর্ণনা ঐতিহাসিক ও ভূগোলবিদ ইবনে জুবায়ের আন্দুলুসি তাঁর লিখিত ‘আদাবুর রিহলাত’ গ্রন্থে এনেছেন।

৮ শাওয়াল ৫৭৮ হিজরি ইবনে জুবায়ের স্পেনের গ্রানাডা বন্দর থেকে হজ্জ যাত্রা শুরু করেন। এ সফরে বন্ধু আহমদ বিন হাসান তাঁর সঙ্গী হন।

তাঁরা গ্রানাডা থেকে জিব্রাল্টার প্রণালী অতিক্রম করে মরক্কো হয়ে মিসরের ইস্কান্দারিয়া শহরে পৌঁছান।

পথে সিসিলি দ্বীপপুঞ্জ অতিক্রম করেন। সেখান থেকে লোহিত সাগর অতিক্রম করে জেদ্দায় বন্দর করেন।

তিনি তাঁর বইয়ে উত্তাল সমুদ্রের  বর্ণনা দেন। সমুদ্র অনবরত জাহাজে আঘাত করছিল।

সমুদ্রের বৈরী আবহাওয়ার কারণে স্পেনের একটি হজযাত্রী দলের প্রায় ছয় মাস লেগেছিল স্পেনে পৌঁছাতে।

ইবনে জুবায়ের কয়েক মাস মক্কায় এবং কয়েক সপ্তাহ মদিনায় অবস্থান করেন। তিনি তাঁর বইয়ে মক্কা-মদিনার অবস্থা বর্ণনা করেন।

পবিত্র হারাম শরীফের সীমানায় বাজার স্থাপনকারীদের ওপর ক্ষোভ প্রকাশ করেন।

ফেরার সময় তিনি নজদ, কুফা, বাগদাদ, মসুল, তিকরিত হয়ে শামের পশ্চিমাঞ্চলে পৌঁছান।

শামের বিভিন্ন শহর পরিদর্শন করে বাণিজ্যিক জাহাজে সিসিলি দ্বীপপুঞ্জে পৌঁছান। সেখান থেকে সমুদ্র পথে গ্রানাডা যান। তার এই সফর ছিল প্রায় তিন বছরেরও অধিক সময়ের।

তুর্কিদের হজ্জযাত্রা

উসমানীয়রা হজ যাত্রা শুরু করতো ইস্তাম্বুল থেকে। হজ কাফেলা আনাতোলিয়া ও সিরীয় মালভূমি অতিক্রম করে দামেস্ক হয়ে মক্কায় পৌঁছাত।

এটা ছিল একটি রাজকীয় হজ যাত্রা। কয়েক মাস আগে থেকে এর প্রস্তুতি শুরু হতো।

উসমানীয় সুলতান হাজিদের উপহার দিতেন এবং মক্কা-মদিনার জন্য নির্ধারিত নজরানাও তাদের কাছে বুঝিয়ে দিতেন।

সুলতান নিজে উপস্থিত থেকে তাদের বিদায় দিতেন। সুলতানের পক্ষ হতে সশস্ত্র নিরাপত্তা বাহিনী নিযুক্ত করা হতো।

নিরাপত্তা ও সার্বিক সুযোগ-সুবিধার কথা বিবেচনা করে বলকান, ককেসাস, সিরিয়া, ইরাক—এমনকি মধ্য এশিয়ার হাজিরা এই কাফেলার সঙ্গে যুক্ত হতো।

হাজিরা স্থল ও নৌপথে বিভিন্ন অঞ্চল থেকে দামেস্কে এসে কাফেলার জন্য অপেক্ষা করত। কেউ কেউ রমজানেই দামেস্ক পৌঁছে যেত।

দামেস্কে হাজিদের অবস্থানের জন্য বিশেষ মেহমানখানা ও আশ্রয়কেন্দ্র ছিল। কাফেলার সার্বিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার জন্য একজন আমিরুল হজ নিযুক্ত করা হতো।

১৯০০ সালে হাজিদের সুবিধার্থে সুলতান আবদুল হামিদ আনাতোলিয়া থেকে মদিনা পর্যন্ত রেললাইন তৈরির নির্দেশ দেন।

দামেস্ক থেকে মদিনা পর্যন্ত যার নির্মাণকাজ শেষ হয়। কিন্তু প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর রেললাইনের কাজ থেমে যায়। পরবর্তীতে ব্রিটিশ গোয়েন্দারা এই রেলপথ ধ্বংস করে দেয়।

দক্ষিণ এশিয়ার মুসলমানদের হজ্জযাত্রা

দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার হাজ্জীরা প্রধানত সমুদ্র পথে হজ্জে যেতেন। তাঁরা সিঙ্গাপুর, মোম্বাই, কলকাতা, করাচি, জাভা প্রভৃতি বন্দর থেকে হজ যাত্রা শুরু করতেন।

পথে এডেন, মাসকাট, কুসাইর ও পোর্ট সুদান প্রভৃতি বন্দরে যাত্রা বিরতি দিতেন। অতঃপর জেদ্দা সমুদ্রবন্দর থেকে মক্কায় যেতেন।

ভারতের মোগল সম্রাটরাসহ অন্য মুসলিম শাসকরা হজ কাফেলা ও হাজিদের বহনকারী জাহাজগুলোকে আর্থিক ও নিরাপত্তা সহযোগিতা করতেন।

করাচি ও মোম্বাই বন্দর থেকে সবচেয়ে বেশি হাজি যাত্রা শুরু করতেন। মধ্য এশিয়ার দেশগুলো থেকে হাজিরা আরব সাগর ও লোহিত সাগর হয়ে জেদ্দা যেতেন।

হজ্জের কিছু প্রাচীন দুর্লভ ছবি

প্রাচীনকালে হজ যাত্রা যেমন ছিল , তার কিছু চিত্র তুলে ধরার চেষ্টা করা হলো। ক্যামেরা আবিষ্কারের পর উনিশ শতকে ও বিশ শতকে এই ছবিগুলো তোলা হয়।

ছবিগুলো এখানে লোড হতে সমস্যা হলে বা দেখতে না পারলে এখানে ক্লিক করে দেখুন।

তথ্যসুত্র

কালের কণ্ঠ

আল জাজিরা ফিলিস্তিন

লেখাটি শেয়ার করতে সর্ট লিংক কপি করুন

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top