ঈদের দিন করনীয় ও বর্জনীয়

ঈদের দিন করনীয় ও বর্জনীয় – কয়েক মাস ঘুরতে না ঘুরতেই হাজির হলো আবার ঈদ। ঈদ হলো, মুসলিমদের জন্য স্রষ্টা প্রদত্ত আনন্দের দিন। মাসখানেক আগেই আমাদের সামনে দিয়ে অতিবাহিত হয়েছিল ঈদুল ফিতর। এক মাস সিয়াম সাধনার পর এই রমজানের পর আল্লাহ আমাদের জন্য রেখেছিলেন ঈদ।

এখন আমাদের সামনে গুরুত্বপূর্ণ দিনটি হলো কুরবানীর ঈদ।

ঈদের দিন

কুরবানী কেন ফরজ করা হয়েছে?

মানুষ স্রষ্টা কর্তৃক প্রেরিত। স্রষ্টা আমাদের যেই আদেশ করেছেন, সেটা পালন করা আমরা আমাদের গুরু দায়িত্ব মনে করি। আল্লাহ বলেছেন, যাদের কুরবানীর সামর্থ্য রয়েছে, তাদের উপর কুরবানী ফরজ। তাই আমরা এটা মেনে নিয়েছি। এটা নিয়ে কোনো প্রশ্ন তোলার সুযোগ নেই।

ইবরাহীম আ. ও ইসমাঈল আ.

নবীজি স. ছিলেন ইব্রাহিম আ. এর ছেলে ইসমাইলের বংশধর। ইসমাইল আ. কে আল্লাহ আদেশ দেন, তুমি তোমার সবচেয়ে প্রিয় জিনিষকে কুরবানী করো।

তিনি তখন তার প্রিয় সন্তান ইসমাঈলকে কুরবানী করার জন্য রওয়ানা হলেন। তিনি তাকে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য যবেহ শুরু করলেন। তিনি তার গলা কাঁটলো না।

আল্লাহ জিবরাইলের আ. এর মাধ্যমে দুম্বা পাঠিয়ে দিলেন। সেটা দিয়ে কুরবানী করা হলো। ইসলামের এই অমোঘ বিধানটির সূচনা এখান থেকেই।

এই ঘটনা বিস্তারিতভাবে সূরা সাফফাতের ১০১ থেকে ১১০ নং আয়াত পর্যন্ত বর্ণনা করা হয়েছে।

নিচে তা ক্রমানুসারে বর্ণনা করা হলো।

১০১ নং আয়াত

فَبَشَّرۡنٰهُ بِغُلٰمٍ حَلِیۡمٍ

আমি ইব্রাহিমকে এক ধৈর্যশীল পুত্রের সুসংবাদ দিলাম।

১০২ নং আয়াত

فَلَمَّا بَلَغَ مَعَهُ السَّعۡیَ قَالَ یٰبُنَیَّ اِنِّیۡۤ اَرٰی فِی الۡمَنَامِ اَنِّیۡۤ اَذۡبَحُکَ فَانۡظُرۡ مَاذَا تَرٰی ؕ قَالَ یٰۤاَبَتِ افۡعَلۡ مَا تُؤۡمَرُ ۫ سَتَجِدُنِیۡۤ اِنۡ شَآءَ اللّٰهُ مِنَ الصّٰبِرِیۡنَ

অতঃপর তিনি যখন তার পিতার সাথে কাজ করার মত বয়সে উপনীত হলেন, তখন ইবরাহীম বললেন, হে প্রিয় বৎস! আমি স্বপ্নে দেখি যে, তোমাকে আমি যবেহ করছি, এখন তোমার অভিমত কি বল? তিনি বললেন, হে আমার পিতা! আপনি যা আদেশপ্ৰাপ্ত হয়েছেন তা-ই করুন। আল্লাহর ইচ্ছায় আপনি আমাকে ধৈর্যশীল পাবেন।

১০৩ নং আয়াত

فَلَمَّاۤ اَسۡلَمَا وَ تَلَّهٗ لِلۡجَبِیۡنِ

অতঃপর পিতা-পুত্র উভয়েই যখন আনুগত্য প্রকাশ করল এবং ইব্রাহীম তাকে যবেহ করার জন্য উপুড় শায়িত করল,

১০৪ নং আয়াত

وَ نَادَیۡنٰهُ اَنۡ یّٰۤاِبۡرٰهِیۡمُ

তখন আমি ডেকে বললাম, ‘হে ইব্রাহীম!

১০৫ নং আয়াত

قَدۡ صَدَّقۡتَ الرُّءۡیَا ۚ اِنَّا کَذٰلِکَ نَجۡزِی الۡمُحۡسِنِیۡنَ

তুমি তো স্বপ্নকে বাস্তবে পরিণত করে দেখালে। নিশ্চয় আমি এইভাবে সৎকর্মপরায়ণদেরকে প্রতিদান দিয়ে থাকি।

১০৬ নং আয়াত

اِنَّ هٰذَا لَهُوَ الۡبَلٰٓـؤُا الۡمُبِیۡنُ

নিশ্চয় এটা ছিল এক সুস্পষ্ট পরীক্ষা!

১০৭ নং আয়াত

وَ فَدَیۡنٰهُ بِذِبۡحٍ عَظِیۡمٍ

আর আমি তার (ইসমাইলের) পরিবর্তে যবেহযোগ্য এক মহান জন্তু দিয়ে তাকে মুক্ত করে নিলাম।

১০৮ নং আয়াত

وَ تَرَکۡنَا عَلَیۡهِ فِی الۡاٰخِرِیۡنَ

আর এ বিষয়টি পরবর্তীদের জন্য স্মরণীয় করে রাখলাম।

১০৯ নং আয়াত

سَلٰمٌ عَلٰۤی اِبۡرٰهِیۡمَ

ইবরাহীমের উপর শান্তি বৰ্ষিত হোক।

১১০ নং আয়াত

کَذٰلِکَ نَجۡزِی الۡمُحۡسِنِیۡنَ

নিশ্চয় আমি এইভাবে সৎকর্মশীলদের প্রতিদান দিয়ে থাকি।

আল্লাহ কুরআনের সূরা কাউসারের ২ নং আয়াতে আরো বলেছেন,

তোমরা সালাত কায়েম করো এবং কুরবানী করো।

কি দ্বারা কুরবানী দিবেন?

নবী সা. তার যামানায় কুরবানী করেছেন উট দ্বারা। কিংবা কখনো কখনো করেছেন ছাগল, ভেড়া বা দুম্বা দিয়ে। হযরত ইব্রাহিম আ. কুরবানী করেছেন দুম্বা দ্বারা।

আমাদের উপমহাদেশে উটের প্রচলন নেই। আমরা কুরবানী করি গরু দিয়ে। সাধারণত কুরবানী করা যায়,

উট, গরু, মহিষ, ছাগল, ভেড়া বা দুম্বা দিয়ে। এখানে শরিকানার একটা বিষয় আছে।

সাধারণত উট, গরু বা মহিষে সাতজন মিলে শরীকে কুরবানী করতে পারবে। আর ভেড়া, দুম্বা ও ছাগলের ক্ষেত্রে একজনই কুরবানী করতে পারবে।

কুরবানীর দিন আপনি তাদেরকেও মনে রাখুন

রাসূল রা. বলেছেন, তোমরা তোমাদের আত্মীয়দের মনে রাখ। অসহায়দের সাহায্য করো।

কুরবানীর দিন অনেক গোশত আমরা পাই। এটা আল্লাহর বড় একটি নেয়ামত। যিনি যাকে ইচ্ছা দান করেন। যাকে ইচ্ছা দেন না।

আপনি আপনার কুরবানীর গোশত থেকে আপনার নিকটাত্মীয়দের জন্য একটি অংশ রাখুন। তাদেরকে দিন। এতে আপনি দুইটি সওয়াবের অংশীদার হবেন।

বর্তমানে শহরে আমাদের আত্মীয়রা একত্রে বসবাস করে না। সকলেই রয়েছে সকলের কর্ম ব্যস্ততায়। ঈদের দিনেও কারো বিরতি নেই। যদি আপনি এই মহান সওয়াবের ভাগিদার না হতে পারেন তাহলে আপনি কুরবানীর গোশতের একাংশ গরীব অসহায়দের মাঝে বিরতণ করে দিন।

এতে আপনিও সওয়াবের অংশীদার হবেন এবং তারাও ভালো আহার করতে পারবে। এটি একটি মানবিক দায়িত্ব।

গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা

কুরবানীর ঈদের দিন আমাদের অনেক রকম উল্টাপাল্টা কাজ করতে দেখা যায়। এই কাজগুলোর দ্বারা আপনি কুরবানীর সওয়াব থেকে বঞ্চিত হতে পারেন। এমন কি তখন আপনার কুরবানী নাও হতে পারে।

১. ঈদের দিন ঈদের নামাজ না পড়ে কুরবানী করবেন না। এতে আপনার কুরবানীর বিন্দু পরিমাণও আদায় হবে না।

২, ঈদের দিন গরু বা অন্য কোনো প্রাণী যবেহ করতে গিয়ে প্রাণীকে অতিরিক্ত কষ্ট দিবেন না। অতিরিক্ত কষ্টের জন্য কেয়ামতের দিন আপনাকে কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হতে পারে।

৩. ঈদের দিন সেলফি তোলার জন্য ব্যস্ত হবেন না। এতে লৌকিকতা চলে আসে। আর লৌকিকতা আল্লাহ পছন্দ করেন না।

৪. ঈদের দিন বর্জ্য-আবর্জনা নির্দিষ্ট স্থানে ফেলুন। পরিবেশ নষ্ট করবেন না।

৫. ঈদের আনন্দ সকলে মিলে উপভোগ করুন। হারাম কাজ থেকে বিরত থাকুন। নিজেকে সংশোধন করুন। অন্যকে উপহার দিন। ছোটদের চমক দিন। বড়দের সম্মান করুন। এতে আপনি দুনিয়া-আখেরাতে উভয় ক্ষেত্রেই সফল হবেন।

আল্লাহ আপনাকে সুস্থ রাখুন। ঈদ মোবারক।

আরো পড়ুন

নামাজে পড়া সূরাগুলোর অর্থ কি?

আবু বকর রা. কে ছিলেন?

আমি একজন ইসলামিক আলোচক, লেখক। ছোটবেলায় পড়ালেখা করেছি কওমী মাদ্রাসায়। পরবর্তীতে সাইন্স বিভাগ থেকে এসএসসি পরীক্ষা দিয়ে কৃতিত্বের সাথে পাশ করি। বর্তমানে আমি ডিপ্লোমা ইন মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং এ অধ্যায়নরত। অবসরে আমি বই পড়তে পছন্দ করি। নতুন কিছু শিখতে, নতুন কিছু জানতে ভালোবাসি। আমার ইচ্ছা, ভালো মানুষ হয়ে সমাজকে সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজে বিরত রাখার চেষ্টা করা।

https://www.arhasan.com