শৈশবের দিনগুলি

শৈশবের দিনগুলি – জন্মের পর থেকে এ পর্যন্ত কখনো যদি কোনো স্বরণীয় দিন মনে করার চেষ্টা করি, সর্বপ্রথম মনে পড়ে ২০০৭ সনের কথা।

কি ছিল ২০০৭ সনে? কেন এই বছরটি আমার এত স্বরণীয়, তা আমি নিজেও জানি না। কিন্তু তারপরও এই বছরটি আমার স্বরণীয়। ২০০৭ সনে আমি স্কুলে কে.জি.তে পড়তাম।

পড়ালেখায় ছোটবেলায় খুব আগ্রহী ছিলাম। আর এই বছর আমার সেজোভাই হাবিবুল্লাহ বাহারের জন্ম হয়। ২০০৭ সালের দিনগুলো যেতুটুকু মনে পড়ে, তখন রাস্তায় এতো বেশি গাড়ি ছিল না।

আমাদের বাসার গলিতে তেমন জ্যাম লাগতে দেখি নি। অথচ সেই রাস্তায় এখন প্রায়ই জ্যাম লেগে থাকে।

আমরা তখন যেই বাসায়  থাকতাম, সে সময় সেটি টিনের ঘর ছিল।

বর্তমানে তা মস্তবড় একটি কমপ্লেক্স হয়ে গেছে। তখন বাসার সামনে প্রচুর খালি জায়গা ছিল। সেখানে ইটের টুকরো, বালু নিয়ে দুষ্টমি করতাম।

আমার তখন একজন খেলার সাথি ছিল। তারা আমাদের পাশের বাসায় থাকতো। তার নাম মৌঁ।  সে ছাড়াও আরো অনেকে ছিল।

মৌদের সাথে ২০১০ সনের পর থেকে আমার আর কোনো সাক্ষাৎ হয় নি। আব্বুর সাথে মৌ এর বাবার পরিচয় ছিল। ৫/৬ বছর আগে শুনেছিলাম মৌ এর বাবা ইন্তিকাল করেন এবং তার বাবা মারা যাওয়ার মাসখানেক পর তার মা এই পৃথিবী ছেড়ে চির বিদায় গ্রহন করে।

জানি না, সে এখন কেমন আছে। যতুটুকু জানতাম, মৌ রা দুইবোন ছিল। সে যেখানেই থাকুক, আল্লাহ যেন তাকে উত্তম ধের্যধারণ এবং জীবনে সফলতা দান করেন।

মৌ এর সাথে আমার আরো অনেক হিস্টোরি রয়েছে। আমরা একসাথে একবার কম্বাইন্ড টিউটোরিয়াল স্কুলে পড়েছি। তার সাথে একসাথে কায়দা পড়া শিখেছি। আমরা একসাথে খেলাধূলা করতাম। একসাথে সে সময়  চলাফেরা করতাম।

তারপরের ফ্রেন্ডলিস্টে ছিল আমার আরেক প্রতিবেশি অরিন এবং অহনা। তারা দুইবোন ছিল। ২০০৭ সনে টিভি এখনকার মত এত বেশি ছিল না।

আমি আবার রক্ষণশীল পরিবারের ছেলে হওয়ায় আমাদের বাসায়  টিভি ছিল না। কিন্তু সে সময় আমার কার্টুন দেখার অভ্যাস ছিল। তৎকালীন সময় কার্টূন মানেই ছিল টম এন্ড জেরী এবং ঠাকুমার ঝুলি।

ডোরেমন তখন নতুন চাইনিজ থেকে আমদানি হতো। তবে সেটার সাথে এত পরিচিত ছিলাম না। অরিনদের বাসায় তখন টিভি ছিল। তখন লুকিয়ে লুকিয়ে তাদের বাসায় কার্টূন দেখতে যেতাম।

তারা আমার খেলার সঙ্গীও ছিল। তারা পড়তো অঙ্কুর টিউটোরিয়াল স্কুলে। তাদের সাথেও ২০১০ সনের পর আর তেমন একটা দেখা হয় নি।

২০১৭ সনে একবার গ্রীন হোমিও হলে এক পলকের জন্য দেখা হয়েছিল। এরপর আর কখনো দেখা হয় নি।

আমাদের আরেক প্রতিবেশি ছিল আফিফ এবং আরমা রা।

আফিফদের বাসায় টিভিও ছিল। সেখানে দেখতাম চাইনিজ কার্টূন ডোরেমন। তার সাথে তেমন খেলাধূলা কখনো করি নি। তাদের বাসায় যাওয়া নিয়ে সে সময়ের একটা মারাত্বক ঘটনা ঘটে গিয়েছিল।

সেটা আজ পর্যন্ত কাউকে বলি নি। একদিন আমি আফিফদের বাসায় টিভি দেখতে গিয়েছিলাম। কোনো এক কারণে আব্বু তখন আমাকে খুজঁতেছিল।

অনেকক্ষণ খোঁজাখুজির পর আফিফদের বাসায় আসলো। সেখানে আমাকে পেল। তখন আব্বু আমাকে বাসায় নিয়ে আসছিলেন। এতক্ষণ খোঁজাখুজি করে আমাকে না পেয়ে আব্বু খানিকটা রেগে যান।

তাই আমাকে আস্তে ডাক্কা মারেন।কিন্তু আমি নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে না পেরে পড়ে যাই। আর জায়গাটা ঢালু স্থান ছিল। তাই পড়ে দূরে গিয়ে পড়ি।

এতে হাতে আমি প্রচুর ব্যাথা পাই।সন্ধার পর দি বারাকা হাসপাতালে গেলে তারা এক্স-রে করতে বলে।এক্স-রে করার পর ডাক্তার বলে আমার বাম হাতের একটা হাড়ের জোঁড়া ছুটে গিয়েছে।

তখন ডাক্তার আমার হাতে বড় ব্যান্ডেজ বেঁধে গলায় ঝুলিয়ে দিলো। এভাবে প্রায় তিন চারমাস হাত গলায় ঝুলিয়ে রেখেছিলাম।

আবার আগের কথায় ফিরি। আফিফরা বর্তমানে আমাদের বাসার পাঁচ বিল্ডিং পর ইস্টার্ন প্যালেসে থাকে। যুগের পরিবর্তনে সে আজ বড় হয়ে গিয়েছে।

আমিও বড় হয়ে গিয়েছি। আমাদের প্রায়ই চলার পথে দেখা হয়। কিন্তু কথা বলা হয়ে উঠে না।

জীবনে তার পথ এবং উদ্দেশ্য একটা আর আমার পথ এবং উদ্দেশ্য আরেকটা।

সে যেন পৃথিবীর সফল মানুষে পরিণত হয়, সেই প্রার্থনা করি।

(লেখাটি লিখেছিলাম ০৯/০৯/২০২০ ঈসায়ী তারিখে)

এই লেখায় যা যা থাকছে :

সেই ল্যাপটপটি

১৫ বছর পর যখন পুরোনো কোনো স্মৃতি চোখের সামনে ভেসে উঠে, তখন কেই-বা স্থির থাকতে পারে? নিজের অতীত সত্ত্বাকে তখন ভিন্নরুপে আবর্তিত হতে দেখা যায়।

নিজেকে তখন হারিয়ে ফেলি এক অতীত স্বর্গপানে। যেখানে অনাবিল সুখ-শান্তি ব্যতিত কোনো দুঃখ কষ্ট নেই। নেই কোনো ভেদাভেদ।

নিজের সেই সত্ত্বাটি আমার কাছে খুব প্রিয়। কারণ এমন একটা মুহূর্ত ৩৬৫ দিনের মধ্যে হাতেগোনা দুই-তিনদিন দেখা যায়।

শৈশবে সবাই খেলনা দিয়ে খেলতে পছন্দ করে। আমিও এর ব্যতিক্রম নই। তবে শৈশবের দুরন্ত সময়ের কোনো জিনিষ পরবর্তী ভবিষ্যতে অক্ষত থাকে না।

বাচ্চারা গড়ার চেয়ে ভাঙ্গতে পছন্দ করে। তাদের কাছে ভেঙ্গে ফেলার মধ্যে আলাদা এক আনন্দ আছে।

সেই আনন্দ হাঁটে কিনতে পাওয়া যায় না। বড়ই অভাব তাঁর।

আমার অতীতে যত খেলনা ছিল, তার কোনোটাই হয়তো আজ আস্ত নেই। যদি না বাবা-মা তা লুকিয়ে না রাখে। এখন আমি আর সেই ছোট্ট টুকটুকি খোকাটি নই।

২০ বছর বয়সী দাঁড়ি-গোঁফ গজানো এক যুবক। আমার কাছে এখন অতীতের মূল্য আছে। সাথে সাথে মূল্য আছে সেই খেলনাগুলোর।

যা দিয়ে আমি জীবনের বড় একটা সময় খেলে কাঁটিয়েছি। আর ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে হয়তো তা আর নেই। কিন্তু বললাম যে, বাবা-মা লুঁকিয়ে রাখলে কখনো হয়তো পাওয়া যাবে।

আমার বেলায়ও তা ঘটলো।

দুপুর ১:১৮ মিনিটে মাদরাসা থেকে বাসায় আসলাম। সকাল ৭ টায় গিয়েছি আজ। রাস্তাঘাটের বাঁধা-বিপত্তি পেরিয়ে আসতে আমার প্রায় মিনিট বিশেক বা আধ ঘন্টা সময় লাগে।

এরই মধ্যে আজকে বাসায় আসার প্রাক্কালে একটা দোকানের সামনে পড়তে পড়তে বেঁচে যাই। কেউ হয়তো সেখানে গুণা তাঁর জমা করে রেখেছিল।

আমি অন্যদিকে তাঁকিয়ে হাঁটছিলাম। তখনই অঘটনটি ঘটে। এজন্যই তো গুণী ব্যক্তিরা বলে, রাস্তা দিয়ে হাঁটার সময় নজর নিচের দিকে রাখতে হয়।

বাসায় আসার পর আম্মু দরজা খুলে দিলো। প্রতিদিনকার মতো ছোট্টভাই হামিদ দৌড়িয়ে আসলো আমার নিকট। আমি ঘরে ডুকতেই তার এক এক করে আবদার শুরু হলো।

“গতকাল আমাকে কার্টূন দেখাও নি। আজকে দেখাতে হবে” বললো হামিদ। আমিও কিছু না বলে দিয়ে দেই। আমি সারাদিন ইন্টারনেটে ব্রাউজ করে সময় কাঁটাই।

আর তারা একটু কার্টূন দেখলে কিই-বা দোষ হয়? তাকে মোবাইলটা দিতেই সে আমার থেকে ঝট করে নিয়ে অন্যরুমে চলে গেল।

বাহির থেকে এসেছি মাত্র। ঘমার্ত শরীর আমার। পাঞ্জাবী খুলে খানিকটা ফ্রেশ হয়ে আমি চৌকিতে এসে বসি। হঠাৎ চোখ পড়লো খাটের পাশে থাকা পরিচিত একটা খেলনার প্রতি।

কেমন যেন চেনা চেনা লাগছে। এটার সাথে আমার একটা অদৃশ্য টান অনুভব করলাম। খেলনাটা হাতে নিতেই মনে পড়লো, আরে এটা তো আমার ছোটবেলার সেই খেলনাটি। কোথা থেকে আসলো আজ?

মনে পড়ে গেল পুরোনো সব স্মৃতি। আমরা তখন দুইভাই ছিলাম। আমি আর হোসাইন। (বর্তমানে আমরা ৪ ভাই, ২ বোন।) সম্ভবত ২০০৬ সন চলছে তখন।

আমার বয়স সবেমাত্র ৪ বছর। হুসাইনের হয়তো ১ বছর। সঠিক মনে নেই্।

সেই বছর আব্বু কোরবানী ঈদের আগে হজ্জ্বে গেলেন। যাওয়ার আগে আমরা ঢাকা থেকে গ্রামে চলে যাই আম্মুর বাড়িতে অর্থাৎ নানাবাড়ীতে।

আমার নানা তখন শক্তিসামর্থবান একজন পৌঢ় ব্যক্তি। আমাকে কোলে নিয়ে বাজারে যেতেন। কখনো হাতে চিপস বা চকলেট ধরিয়ে দিতেন।

আমার খেলার সঙ্গী ছিল তখন আমার মামাতো ভাই নাইম এবং রায়হান। তারাও তখন ছোট। বর্তমানে দু’জনই প্রতিষ্ঠিত। (আল্লাহ তাদের সচ্ছলতা এবং হালাল রিজিক দান করুন) ঈদ-উল-আযহা গ্রামেই উদযাপন করি।

নানার হাত ধরে গ্রামের ছায়ানিবিষ্ট ঈদগাহে যাই। ঈদের সালাত শেষে চলে আসি বাড়িতে। আজকে গরু যবেহ হবে। কিভাবে গরু যবেহ হয়, আগে কখনো দেখি নি।

আজ যেন কাছ থেকেই দেখলাম। তারপর প্রতিদিনকার মতো আবার খেলাধূলায় লিপ্ত হয়ে পড়ি। বাঁধা দেয়ার কেউ নেই। বাচ্চারা খেললে কে আগ বেড়ে তাদের উত্যক্ত করাতে যাবে? ঈদের সপ্তাহখানেক পর আব্বু গ্রামে আসলেন। নানা বললো, হাজি সাব চলে আইছে।

আমি তখনো বুঝতাম না, হাজি কাকে বলে? সাথে করে আব্বু অনেক আতর আর জায়নামাজ আনলেন। খেজুর আর জমজমের পানিও আনলেন। আমরা জমজম পান করলাম।

এক অপার্থিব পিপাসা যেন নিমিষেই দূরিভূত হয়ে গেল। আমরা ঢাকায় চলে আসলাম। পুরোনো সেই শহরে। সেই পরিচিত ঘরে।

যেখানে আমার ছোটভাই হোসাইন জন্ম হয়েছিল। বাসায় এসেই তো আমি পুরো তাজ্জব বনে গেছি। আমার খেলনার তালিকায় আরো কিছু নতুন খেলনা যুক্ত হয়েছে।

আব্বু এসব সৌদি আরব থেকে কিনে এনেছেন। সেখানে গাড়ি, লাটিম, বাস, হেলিকপ্টারের মাঝে একটা ভিন্নরকম খেলনা ছিল। ল্যাপটপের আদলে তৈরী সেটি।

তখন তো আমি ল্যাপটপ দূরের কথা। কম্পিউটারই দেখি নি। সেখানে “আলিফ” “বা” “তা” “ছা

” এর আদলে বাটন ছিল। একেকটাতে ক্লিক করলে একেকরকম হারামাইনদের ঈমামদের কুরআন তেলওয়াত বাজতো। কোনোটাতে সূরা ফাতেহা, কোনোটাতে সূরা কাফিরুন, কোনোটাতে সূরা ইখলাস।

সে সময় সেটা নিয়ে অনেক খেলাধূলাই করেছি। যার সব স্মৃতি আজ ১৪ বছর পরে মনে নেই। হয়তো আব্বু, আম্মুর মনে আছে।

বাবা-মায়েরা কখনো সন্তানের সুখের দিনগুলোর কথা ভুলে না। তারা সন্তানের সুখগুলো বুকে ধারণ করে বেঁচে থাকে লাখো বছর।

আমার সেই খেলনাটি অক্ষত আছে আব্বুর কারণে। আব্বু প্রায় সময় খেলনা সর্বদা সামনে রাখতো না। যখন খেলতাম, তখন দিতো।

আর অন্য সময় তা আলমারি বা কোনো নিরাপদ স্থানে রেখে দিতো। এভাবেই এটি এখনো অক্ষত। যদি আরো যত্ন নেই, তাহলে আমার বিশ্বাস আমার সন্তানেরাও সেই খেলনার ল্যাপটপটি দিয়ে খেলতে পারবে।

তখন আমি তাদেরকে বলবো, এটা তোমার দাদার কারামত। তিনি এটা হেফাজত না করলে হয়তো এটা আমিই ভেঙ্গে ফেলতাম।

সেটা হয়তো আজ সমুদ্রের কোনো এক অজানা স্থানে পড়ে থাকতো। কালেভদ্রে তা পঁচে মাছের খাদ্য হতো অথবা কোনো গ্যাসে পরিণত হতো।

তাছাড়া প্লাস্টিকের জিনিষ যতই পঁচুক, তা রি-সাইকেল করতে যথেষ্ট সময়ের প্রয়োজন হয়। ততদিনে হয়তো আমি আর বেঁচে থাকতাম না এই ধরণীতে।

প্রকৃতির লীলাখেলা বুঝতে পারাটা বড়ই দায়!

(লেখাটি লেখেছিলাম ৪ নভেম্বর ২০২১)

আরো পড়ুন

বিডি জার্নালে প্রকাশিত লেখা

শৈশবের সোনালী দিন

শিশুর শিক্ষা অর্জনে বাবা মায়ের গুরুত্ব কতুটুকু?

আমি একজন ইসলামিক আলোচক, লেখক। ছোটবেলায় পড়ালেখা করেছি কওমী মাদ্রাসায়। পরবর্তীতে সাইন্স বিভাগ থেকে এসএসসি পরীক্ষা দিয়ে কৃতিত্বের সাথে পাশ করি। বর্তমানে আমি ডিপ্লোমা ইন মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং এ অধ্যায়নরত। অবসরে আমি বই পড়তে পছন্দ করি। নতুন কিছু শিখতে, নতুন কিছু জানতে ভালোবাসি। আমার ইচ্ছা, ভালো মানুষ হয়ে সমাজকে সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজে বিরত রাখার চেষ্টা করা।

https://www.arhasan.com